নন্দিনী – উমা ভট্টাচার্য

নন্দিনী  -  উমা ভট্টাচার্য

আজ চারদিন পর নন্দিনী বাড়ি ফিরল হাসপাতাল থেকে। না,ও কোনো পেশেন্ট না,ও একজন নার্স।এরকম এতদিন টানা ওকে আর কোনদিন ই থাকতে হয়নি হসপিটালে। এবার থাকতে হল,করোনায় আক্রান্ত রোগীদের সেবা করার জন্য। আসার পথে পাড়ার এক কাকিমার সাথে দেখা হল, কাকিমা তার অস্বস্তি মাখানো মুখেই  জিজ্ঞেস করল, হ্যাঁরে তোর বুঝি হাসপাতালে থেকে যেতে হয়েছিল, তোর শরীর ঠিক আছে  তো, শুনলাম ডাক্তার নার্স দের নাকি সবার হচ্ছে? তুই তো ওখানেই ঘর ভাড়া নিয়ে  থাকতে পারতিস ।

নন্দিনী ক্লান্ত শরীরে আস্তে করে জবাব দেয়,ভয় পেওনা কাকিমা। এখনো পর্যন্ত  ঠিকই আছি, তোমরা সবাই ভালো আছো তো ?  খুব দরকার না পড়লে, বাড়ির বাইরে বেড়িও না কেউ।আমাদের নিজেদের জীবন তুচ্ছ  করে এই লড়াই টা কিন্তু তোমাদের সবার জন্য।  বাড়ি পৌছে নন্দিনী ফ্রেশ হয়ে, কিছু খেয়ে নিজের ঘরে চলে গেল রেস্ট নিতে।।  কিছুক্ষণ পর রমা দেবী, অর্থাৎ নন্দিনীর মা ঘরে এলেন।।  মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, বুল্টি তুই চাকরি টা ছেড়ে দে মা।  নন্দিনী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,কেন মা, তোমার ভয় করছে?
 ভয় পেয়োনা, তোমাদের আশীর্বাদ আছে, আমার কিচ্ছু হবেনা।  হাসপাতালে আরও কত মেয়ে আছে আমার মত, তুমি জানো? আমি তো তবু বাড়ি আসতে  পেরেছি,কত মেয়ে আছে, বাড়ি-ঘর ছেড়ে হাসপাতালের কাছে ঘরর ভাড়া নিয়ে থাকছে।  এইতো জুলিকে আসতে বলেছিলাম, আমার সাথে।ও রাজি হলনা।বলল,সীমা দের সাথেই থাকবে।  তুমি অত চিন্তা কোরোনা তো।।  রমা দেবী কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেলেন।  নন্দিনী বলল, কিছু বলবে মা?  না কিছু না, তুই ঘুমো একটু, বলে রমা দেবী বেড়িয়ে এলেন।    সবে ঘুমটা এসেছে নন্দিনীর। তার ই মধ্যে  কানে এল, বাবা কি যেন বলছে মা কে। বুল্টি কে বলেছ, কথা টা?  রমা দেবী আস্তে করে বললেন,আ: আস্তে বল। মেয়ে টা ক্লান্ত, ঘুমিয়ে পড়েছে হয়ত,  কালতো বাড়ি আছেই, দুপুরে খাবার সময় বোল। 
কি এমন কথা, এটা ভাবতে ভাবতে নন্দিনী একসময় ঘুমিয়ে পরল।  পরদিন সকালে ব্রেকফাস্ট এর টেবিলে বাবাকে দেখে কেমন চিন্তিত লাগলো নন্দিনী র।  বাবা, তোমার কি হয়েছে, খুব চিন্তিত দেখাচ্ছে,?  না রে মা, শরীর ঠিকই আছে। ওই একটা ব্যাপার।  বুল্টি, তোকে একটা কথা বলার ছিল। হ্যাঁ বাবা, বল ,কি বলবে।  অমর বাবু একটু বিমর্ষ হয়েই বললেন, জানি,  তোর শুনলে ভালো লাগবে না। তবুও বলতে  তো হবেই। রজতের মা কাল ফোন করেছিল, বলছিল মেয়েকে বলুন চাকরিটা ছেড়ে দিতে। ওকে যে  চাকরি করতে হবে এমন খারাপ   অবস্থা তো আমাদের না।
আর রজতও তো ভালই ইনকাম করে। নন্দিনী একটু বিরক্ত হয়েই বলল,  চাকরি ছেড়ে দিতে বলছে, কিন্তু কেন?  না রজতের মা বলছে, হসপিটালের চাকরি, ভাইরাস টা  নিয়ে যা শুনছি,   ডাক্তার-নার্সরাও আক্রান্ত হচ্ছে। তাই মন্দ কিছু হওয়ার আগে চাকরিটা ছেড়ে   দিলে ভালো হয়।  সব আত্মীয়-স্বজন কেই তো জানানো হয়ে গেছে যে, সামনের জানুয়ারিতেই ওদের   বিয়ে।
বিয়েটা তো আমরা ক্যানসেল করতে পারবো না, তার চেয়ে আপনার মেয়ে যদি  চাকরিটা ছেড়ে দেয়। সেটাই ভালো। নন্দিনী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল, তার ভাবি শাশুড়ি মায়ের কথা শুনে। তারপর অমর বাবুকে জিজ্ঞাসা করল, বাবা তুমি বা মা কিছু বলোনি ওনাকে?  রমা দেবী রান্নাঘর থেকে উত্তর করলেন, আমি কিছু বলিনি ,  যা বলার তোর বাবাই বুঝিয়েই বলেছে সব।  
ওর এই নার্সের চাকরিটা অনেক স্বপ্নের, ও কোন অবস্থাতেই এই চাকরি ছাড়তে রাজি  হবে না। আমরা বললেও না। আর তাছাড়া এই সংকট ময় অবস্থায় তো এই চাকরি ছাড়াই  যাবে না ।  বুল্টি একটু ঈষৎ হেসে অমর বাবুকে বলল, বাবা আমার ভাবলে অবাক লাগছে, এই  ভদ্রমহিলাই যখন গত ফেব্রুয়ারীতে গলব্লাডার অপারেশনের জন্য ভর্তি ছিলেন। তখন  তো ,আমিই ওনার দেখাশোনার ভার নিয়ে ছিলাম।
তখন কত প্রশংসা, আশীর্বাদ করলেন  আমাকে আর আজকে যখন এই পরিস্থিতিতে আমি অন্যদের সেবা করছি তখন উনি নিজেদের কথা   ভেবে নার্সের চাকরি বলে ছেড়ে দিতে বলছেন!!  অদ্ভুত, মহিলা তো।  অমর বাবু বললেন, দেখ আমারও ওনার কথা যুক্তিযুক্ত মনে হয়নি কিন্তু যেহেতু   তোদের বিয়ের ব্যাপারটা সাথে জড়িত,  তাই একটু চিন্তায় আছি।
আচ্ছা বাবা ওনার ছেলের কি একই মত,  কিছু বলেছেন কি?  না, সে বিষয়ে রজতের মা কিছু বলেনি আমাকে। অমর বাবু বললেন। নন্দিনী অমর বাবুকে আশ্বস্ত করে বলল, বাবা তুমি এটা নিয়ে ভেবোনা, আমি রজতের  সাথে কথা বলেনি একবার, তবে কোন পরিস্থিতিতেই আমি চাকরিটা ছাড়বো না।   সেই রাতেই নন্দিনী রজতকে ফোন করল।  
হ্যাঁ বুল্টি বল, হঠাৎ এই সময় ফোন ,তোমার ডিউটি নেই আজকে ? শরীর ঠিক আছে তো?  বুল্টি একটু  মুড অফ নিয়েই বলল, হ্যাঁ  ভালো আছি। না আজ তো আমি বাড়িতে, কাল আবার জয়েন করতে হবে। রজত তোমার সাথে আমার কিছু দরকারি কথা ছিল।  হ্যাঁ বুল্টি বল, শুনছি।  নন্দিনী সমস্ত ঘটনাই জানালো রজতকে।
রজত সব শুনে অবাক হয়ে বলল, কই মা তো আমাকে এ ব্যাপারে কিছু বলেনি বরং গতকালই
বলছিল মেয়েটা কে ফোন করছিস তো, কেমন আছে, ডিউটির চাপ কেমন ইত্যাদি ইত্যাদি।  তবে হ্যাঁ, মা বলছিল, এই করোনায় ডাক্তার নার্সরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, তুই  বুল্টিকে ছুটি নিতে বল এখন।  আমি বললাম, কি যে বলো মা, এখন তা হয় নাকি? ওদের কত দায়িত্ব।  
তবে এরপর মা আর কিছু বলেনি।।  বুলটি বলল, আচ্ছা রজত তোমার কোন আপত্তি আছে, আমার এই জবটা নিয়ে এই মুহূর্তে?  তাহলে বলে ফেলতে পারো। কেননা ভবিষ্যতের সিদ্ধান্তটা তো নিতে হবে আমাকে,  চাকরিটা আমি কিন্তু কোন অবস্থাতেই ছাড়বো না।  রজত কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর, কপট গাম্ভীর্য নিয়ে বলল ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত? 
 তারপরেই হো হো করে হাসতে হাসতে বলল, ভবিষ্যতে আমাদের বিয়েটা হচ্ছে ম্যাডাম,  আপনি নিজের খেয়াল রেখে নিশ্চিন্তে আপনার সেবা কার্য চালিয়ে যান আর আপনার   শাশুড়ি মাকে বোঝাবার দায়িত্ব আমার বুঝলেন?  ফোনের অপর প্রান্ত থেকে একটা মিষ্টি চুমুর শব্দ নন্দিনীকে ভালোলাগায় ভরিয়ে   দিল। আস্তে করে মিষ্টি সুরে নন্দিনী বলল, লাভ ইউ ডিয়ার ,প্রাউড অফ ইউ। সেম টু ইউ ডিয়ার বলে, রজত আবারও নন্দিনীকে মিষ্টি ভালোলাগায় ভরিয়ে দিল।
ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: