নয় – পর্ব ১৩ – সুব্রত মজুমদার

নয় - পর্ব ১৩     -  সুব্রত মজুমদার
 তামার প্লেটটা বাগিয়ে ধরল হলধর। তামার প্লেটটা খুব বেশি হলে বছরখানেকের পুরোনো। লিপিটা ইংরেজি। তবে মাঝে মাঝে  দেবনাগরী হতে শুরু করে বাংলা ও গ্রীক অক্ষরও রয়েছে । এলোমেলো অক্ষরগুলো বিভিন্নভাবে সাজিয়ে দেখতে লাগল সে। কিছুতেই কিছু মিলছে না। এলোমেলো অক্ষরগুলোর কিছু তো একটা মানে আছেই । আর সেই মানেটই জানতে চায় চক্রবাক চক্রবর্তী।
সেকেন্ড ফ্লোরের সর্বত্রই গোপন ক্যামেরার ছড়াছড়ি। নিজের বেডরুম হতে সারাক্ষণ নজর রাখছে চক্রবাক। হলধর সেটা আগেই টের পেয়েছে। হলধরের অভিজ্ঞ চোখ সিসিটিভির ক্যামেরার চেয়েও তুখোড়। সে সমস্ত ক্যামেরার কভারেজ এরিয়া ক্যালকুলেশন করে  ডেডজোন চিহ্নিত করে রেখেছে। ফোনটোন করতে হলে ওই জায়গা থেকেই করতে হবে। যেহেতু চক্রবাক নিজেই ক্যামেরাগুলো অপারেট করছে তাই সুবিধাটাও বেশি।
                   আর পারছে না হলধর। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। ডেলিভারি বয়ের দেওয়া খাবারের প্যাকেটটা খুলে বসে। পনির-আলুর পরোটা আর চিকেন চিলি। সঙ্গে লস্যিও আছে। যদিও পরোটা আর চিলিচিকেনটা একটু গরম করে নিলে ভালো হত, কিন্তু উপায় কি ! খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়ে সে।
সকালবেলা ব্রেকফাস্টের টেবিলে দেখা হয় চক্রবাকের সঙ্গে। চক্রবাক কিন্তু নিজেকে নিয়ে অনেক সচেতন। ঘরের আলো এতটাই কম থাকে যে ভালোকরে মুখ দেখা যায় না তার। তাছাড়া প্রয়োজন ছাড়া বিশেষ একটা কথাবার্তাও বলেন না চক্রবাক। কিছু যেন একটা লুকোতে চাইছেন।
“আমার কাজ কতদূর এগোলো ?”
“এই তো কাজে  হাত দিয়েছি স্যার। এটা যদি এতই সহজ হত তাহলে এর পেছনে এতগুলো টাকা আপনি খরচ করতেন না। আমার উপর বিশ্বাস রাখুন স্যার, আশাকরি দু’চারদিনের মধ্যেই সুখবর দিতে পারব।”  হলধর জবাব দিল।
চক্রবাক চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়েই নামিয়ে রাখল। তারপর গম্ভীর গলায় বলল,”বরবাদ করার মতো সময় আমার হাতে নেই। জলদি করো। যেকোনোভাবেই হোক ওই তাম্রফলকে কি লেখা আছে আমি জানতে চাই। “
বেরিয়ে গেলেন চক্রবাক। হলধর ব্যস্ত হয়ে পড়ল বাকি খাবারগুলো শেষ করার কাজে।
               আজ হোলি। আকাশে বাতাসে শুধু রঙের ছুটোছুটি। যেন স্কুল হতে ছাড়া পাওয়া একদল বখাটে ছেলে। ছুটে বেড়াচ্ছে এঘর হতে ওঘরে, এ গাল হতো ও গালে। বিক্রম নেই বলে আমাদের মনের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। বিক্রমের সঙ্গে কথা হয়েছে বার দুয়েক। ও ভালোই আছে। ফোন রাখার পর অঘোরবাবু বললেন, “বিক্রম নেই বলে মনটাও ভালো নেই সায়ক। প্রতিবছর ওর উদ্যোগেই তো রং আবীর কিনে আনা হয় । গামলায় পলাশ ফুল ভিজিয়ে রং তৈরি করা হয়। কি অপূর্ব ঘ্রাণ তার ! এবছর আর সেরকম হবেনা। তবে চলো আমরাই রং হাতে বেরিয়ে পড়ি রাস্তায়।”
                 অঘোরবাবুর প্রস্তাবে সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলাম। রং হাতে বেরিয়ে পড়লাম রাস্তায়। এরকম হোলি খেলার মজাই আলাদা। জোরজবরদস্তি নয়, হোলি খেলতে ইচ্ছুক লোকের গালে আলতো করে লাগিয়ে দেওয়া বাসন্তী রংয়ের রেখা। রঙিন হয়ে ওঠা রঙের উৎসবে। 
এত আনন্দের মাঝেও অঘোরবাবুর মনে আনন্দ নেই। রাস্তা হাঁটতে হাঁটতেই মাঝে মাঝে পেছন দিকে তাকাচ্ছেন। আমি জিজ্ঞাসা করতেই বললেন, “বদখত কুকুরগুলোর কথা ভাবছি আর  কলজে শুকিয়ে যাচ্ছে সায়ক। সেদিন যা হয়েছিল ! তুমিও একটু লক্ষ্য রেখো।”
আমি হেসে বললাম, “আপনি শুধু শুধু ভয় করেন। কই আমাকে তো তাড়া করে না ? আপনি যাচ্ছেতাই মাখবেন আর ওরা ছেড়ে দেবে ?”
                  অঘোরবাবু চুপচাপ পথ চলতে লাগলেন । তিনি যে রীতিমত ক্ষুব্ধ হয়েছেন তা বোঝাই যায়। মনে মনে নিজেই নিজেকে শাসন করলাম। এরকম বেফাঁস কথাবার্তা বলা ঠিক নয়, পরবর্তীতে যথেষ্টই সাবধান থাকতে হবে। রেগেমেগে দ্রুত পা চালিয়ে অনেকটা এগিয়ে গেছেন অঘোরবাবু। আমি “ও অঘোরবাবু… ও অঘোরবাবু….” বলে ডাকতে ডাকতে এগিয়ে গেলাম। 
আর ঠিক তখনই ঘটল সেই ঘটনা। জোরদার ধাক্কা। একজন  অনলাইন ফুড ডেলিভারি বয়ের সঙ্গে প্রবল ধাক্কায় উল্টে পড়লেন বাঁড়ুজ্জেমশাই। ডেলিভারি বয় বিন্দুমাত্র সৌজন্য না দেখিয়ে বাইক ছুটিয়ে চলে গেল। আমি ছুটে গিয়ে অঘোরবাবুকে টেনে তুললাম। উনি কোমরে হাত দিয়ে আর্তস্বরে বললেন, “উহ্ গেছি রে ! কোমরের দফা রফা করে ছেড়ে দিয়েছে। এরা নিজেদের ভাবে কি ! গাল টিপলে দুধ বেরোবে, আর রাস্তায় বেরিয়েছে বাইক নিয়ে ! কেস করব আমি।”
                তেমন একটা আঘাত লাগেনি অঘোরবাবুর। বাইকটা কেবল হাল্কা করে টাচ করেছে। এদিকে প্রচণ্ড খিদেও পেয়েছে । অঘোরবাবুকে বললাম,”আপনি হাঁটতে পারবেন তো ? চলুন ওই দোকানটায় কিছু খেয়ে নিই। “
গরম গরম কচুরি আর মিষ্টি খেলাম। সঙ্গে তরকারি ফ্রি। খাওয়া দাওয়ার শেষে মানিব্যাগ বের করতে গিয়ে অঘোরবাবু চমকে গেলেন। কে যেন পকেটে একটা কাগজ ভরে দিয়েছে। ঠিক কাগজ নয়, – একটা চিঠি। বিক্রমের হাতের লেখা। ও কিছু জিনিস জোগাড় করতে বলেছে। ওই ডেলিভারি বয়টাই আজ সন্ধ্যায় দরজার কাছে ওয়েট করবে। ওর হাতেই  জিনিসগুলো দিতে হবে।
“ও আচ্ছা, তাহলে ধাক্কাটা এমনি এমনি লাগেনি, ইচ্ছা করেই এসব হয়েছে। এই বিক্রমটাকে আমি ঠিকঠাক বুঝতে পারি না সায়ক। ও নিজেই একটা রহস্য। চলো, জোগাড় যন্ত্র করি।”
বেশ অনেকটাই ঘোরাঘুরি হল। হোলির দিনে রংমাখা কাস্টমার দেখে দোকানদার খুব একটা স্বস্তি প্রকাশ করে না। আমাদেরও আস্বস্তি হচ্ছে। কিন্তু হাতে সময় বড়ই কম বলে আর বাড়ি গিয়ে ফ্রেশ হওয়ার অবকাশ নেই। অনেক ঘুরে একটা তামার পাত, কিছু ইলেকট্রনিক সার্কিট, তাঁতাল, গ্লুগান এসব কিনে বাড়ি ফিরলাম। আমাদের কাজ শুধু জিনিসগুলোকে খাবারের পার্শেলে ভরে ডেলিভারি বয়ের হাতে দেওয়া ।
                    সন্ধ্যা নাগাদ ডেলিভারি বয় এসে হাজির হল। সে আমাদের দরজার সামনে না দাঁড়িয়ে পাশের দরজার কাছে দাঁড়াল। বুঝলাম কেউ আমাদের উপর নজর রাখছে। অমিই বেরিয়ে পড়লাম। সামনের গলিটা বেশ অন্ধকার। গলিটায় ঢুকে জামাটা চেঞ্জ করে মুখে রং ঘষে উল্টো দিক দিয়ে বেরিয়ে এলাম। ডেলিভারি বয়ের কাছাকাছি হতেই পার্শেলটা ওর হাতে দিয়েই দ্রুতগতিতে এগিয়ে গেলাম।  কিছুদূর এগিয়ে একবার মুখ ঘোরাতেই দেখতে পেলাম ডেলিভারি বয় কেটে পড়েছে।
                অঘোরবাবু আমার দশা দেখে একটু অবাক হলেন। বললেন, “কি ব্যাপার সায়ক কোথায় ছিলে এতক্ষণ ? আর তোমার মুখের এমন অবস্থা কিকরে হল ? কোনও বেওড়ার পাল্লায় পড়েছিলে ?”
আমি তাকে সব কথা বুঝিয়ে বললাম। সব শুনে বললেন, “আমি যতদূর বিক্রমকে চিনি তাতে এটা ওর কেস গুটিয়ে আনার লক্ষন। তবে চিন্তা হচ্ছে ওর জন্য। সেদিন অজিতবাবুর যা ক্ষমতা  দেখলাম, মানে তোমরা দেখেছ তাতে এ  ভয়ের যথেষ্টই কারণ আছে।”
আমিও অঘোরবাবুর কথায় সম্মত হলাম। অজিতবাবু ওরফে মিস্টার দেশাই যখন যা খুশি করতে পারেন। আর এসময় বিক্রমকে যে সাহায্য করব তার উপাইও নেই। বিক্রম এখন কোথায় আছে, কিভাবে আছে তা আমরা কেউই জানি না।
(চলবে )
ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: