নয় – পর্ব ৫ — সুব্রত মজুমদার

banglastorynews.com
ফোনটা জনৈক সুদর্শন রায়চৌধুরীর। 
“হ্যালো বিক্রম মুখার্জি স্পিকিং.. “
“গুড ইভিনিং মিস্টার মুখার্জি, আমি মিশিগান হতে সুদর্শন রায়চৌধুরী বলছি। “
“গুড মর্নিং মিস্টার রায়চৌধুরী, কি প্রয়োজন বলুন।” 
“আপনাকে একটা কেস দিতে চাই, কিন্তু সবকথা ফোনে বলাটা সম্ভব নয়। আপনি কবে আসছেন বলুন আমি ফ্লাইট বুক করে দিচ্ছি। ইচ্ছা করলে দেবলীনা ম্যাডামকেও আনতে পারেন, একটা হলিডে ট্যুর হয়ে যাবে আপনাদের। কি আসছেন তো ? “
“হ্যাঁ সেটা আপনাকে পরে বলছি কিন্তু দেবলীনার কথাটা…. “
“সায়কবাবুর লেখার খুব ভক্ত আমি। সেখান থেকেই আপনাদের রিলেশনটার কথা জেনেছি। “
“ওকে আমি পরে কল করছি। ”  আমি ফোনটা রেখে দিলাম। পরে দেবলীনাকে জানাতেই ও রাজি হয়ে গেল। অঘোরবাবুর হাতে বাড়ির দায়িত্ব দিয়ে চলে গেলাম মিশিগান। সুদর্শনবাবুর পয়সায় খেয়েদেয়ে ঘুরে বেড়িয়ে দিনগুলো বেশ আনন্দেই কেটে গেল। 
আসার আগের দিন সুদর্শনবাবু বসলেন কাগজপত্র নিয়ে। আমি বললাম,”এতসব দলিল দস্তাবেজ দিয়ে কি হবে ? আমার কেস কই ?”
“এটাই আপনার কেস মিস্টার মুখার্জি। আপনাকে আমি আমার ইন্ডিয়াতে থাকা সমস্ত সম্পত্তির কেয়ারটেকার নিযুক্ত করছি। আজ থেকে আপনি আমার ইন্ডিয়াতে থাকা যাবতীয় সম্পত্তির বিক্রি বন্দোবস্ত বা অন্য যেকোনো লিগাল প্রসেসিং এর অধিকারী। এবার কাজের কথায় আসি। আমার বাবা শ্রী পঙ্কজ রায়চৌধুরী আমার এখানেই সজ্ঞানে পরলোক গমন করেন। মৃত্যুর পূর্বে কিছু কথা আমাকে বলে যান, আপনাকে এখন সেগুলোই বলছি।
আমাদের পূর্বপুরুষের আদি নিবাস ছিল মহারাষ্ট্রের পুনে শহরে। বর্গি আক্রমণের সময় আমাদের বংশের আদিপুরুষ  শ্রী আত্মারাম তিলকজী ভাস্কর পণ্ডিতের দলে একজন সিপাহসালার ছিলেন। পণ্ডিতজীর মৃত্যুর পর আত্মারামজী আর দেশে ফিরে যাননি। তিনি হুগলির কেদারডাঙ্গার কাছাকাছি একটা গ্রামে আত্মগোপন করেন। যে বাড়িতে তিনি আশ্রয় নেন সেটা ছিল একজন স্বাধ্যায়ী ব্রাহ্মণের বাড়ি। 
আত্মারামজী ছিলেন ঋগ্বেদীয় জমদগ্নী গোত্রের দেশস্থ ব্রাহ্মণ ।সুতরাং ব্রাহ্মণের একমাত্র কন্যাকে বিবাহ করে থিতু হতে সমস্যা হল না। মুর্শিদাবাদ লুঠের সময় প্রভূত  ধনরত্ন পেয়েছিলেন আত্মারামজী। সেগুলোর কিয়দংশ ব্যবহার করে প্রভূত জমিজমা কিনে ভূস্বামী হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
আত্মারামজীর পুত্র বিনোদবিহারী   ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির আনুকূল্যে  রায়চৌধুরী উপাধি পান। ইংরেজ আমলে আমাদের পরিবারের গৌরব চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছয়। মুর্শিদাবাদ লুঠের সময়ের বহু ধনসম্পদ এখনো আমাদের বাড়ির গোপন কুঠুরিতে সিন্দুকবন্দি হয়ে রয়েছে।
এরকমই একটা মূল্যবান বস্তু হল মৌর্য্য যুগের একটা যক্ষিণী মূর্তি। আমার দাদুর খুব প্রিয় ছিল এটা। এটাকে গোপন কুঠুরি হতে বের করে নিজের সিন্দুকে রাখেন। মাঝে মাঝে বের করে দেখতেন। ঠাকুমা জিজ্ঞাসা করলে বলতেন, “তোমার সতীন।”
ঠাকুমা বলতেন, “তাহলে ওর সঙ্গেই ঘর সংসার করো। আমি ছেলেপুলে নিয়ে বাপেরঘর চলে যাই।”  দাদু হেসে উঠতেন। একদিন সকালে দাদুকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেল। দাদুর বুকের উপর সেই যক্ষিণী মূর্তি। ঠাকুমা মূর্তিটা নিয়ে সিন্দুকে তালাবন্ধ করে রেখে দিলেন। এরপর আর ওই যক্ষিণী মূর্তিটা সিন্দুক হতে বের হয়নি।
বহুবছর পর আমার বাবা সিন্দুক খুলে মূর্তিটা বের করেন। কি যেন দেখতেন মূর্তিটার মধ্যে। এর মধ্যেই মা মারা গেলেন, আমি বাবাকে নিয়ে চলে এলাম মিশিগানে। মূর্তিটাও সঙ্গে এল। কিন্তু একদিন হল কি মূর্তিটা বের করতেই দেখা গেল মূর্তিটার উপর ঊজ্জ্বল নীল রঙের একটা চিপচিপে আস্তরণ পড়েছে। নমুনা নিয়ে ল্যাবরেটরিতে পাঠালাম। ওরা বলল ওই আস্তরণ আসলে একধরনের এককোষি প্রাণীর কলোনি। তবে এধরনের এককোষি প্রাণীগুলো একেবারেই নতুন প্রজাতির।
কিভাবে জানি না মূর্তিটার ব্যাপারটা  মিডিয়ার কানে যেতেই তারা অত্যাচার শুরু করল। তবে আমার দৃঢ় ধারণা কলকাতার যে ল্যাবে আমি নমুনা পাঠিয়েছিলাম সেই ল্যাবেই কীর্তি এটা। “
বললাম,” কলকাতার কোন ল্যাব ? “
সুদর্শনবাবু বললেন,” কলকাতা ডাইগনেস্টিক প্রাইভেট লিমিটেড। আমেরিকার ল্যাবগুলো খুবই প্রফেশনাল। ওরা ক্লায়েন্টের খবর কোনোমতেই লিক করবে না। কলকাতার ল্যাবটিই যত সমস্যার মূলে। এরই মধ্যে রহস্যময়ভাবে বাবার মৃত্যু হল। আমি দেশে গিয়ে শুনলাম ও বাড়িতেও মাঝে মধ্যেই কিছু অচেনা অজানা লোক ঢুঁ মেরে যায়।
এখন আপনাকে যেটা করতে হবে সেটা হল ওই মূর্তিটা ও আমার বাবা আর দাদুর মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করা। কারণ আমার দৃঢ় বিশ্বাস তাদের মৃত্যু স্বাভাবিক ভাবে হয়নি।”
সুদর্শনবাবুর কাছ হতে পঙ্কজবাবুর মেডিক্যাল রিপোর্ট, ওকালতনামা সহ যাবতীয় কাগজপত্র নিয়ে চলে এলাম এখানে। দেবলীনাকে ওর ঘরে ছেড়ে দিয়ে এসে পঙ্কজবাবুর গেটআপ নিয়ে ঢুকলাম রায়চৌধুরী প্যালেসে। প্রত্যাশামতোই শুরু হল লোকজনের অত্যাচার। এখানকার কেউই জানে না পঙ্কজবাবু মৃত, সুতরাং একমাত্র নেপালদা ওরফে রামুকাকা ছাড়া আমার আসল পরিচয় এখানে কেউই জানে না। “
চরম রেগে গিয়ে বললাম,” তাহলে আমাদেরকে বোকা বানালে কোন সুখে ?” আমার কথাকে অঘোরবাবুও ঘাড় নেড়ে সমর্থন জানালেন।
বিক্রম বলল,”ছদ্মবেশ কেমন হয়েছে সেটাই দেখাতে গিয়েছিলাম। কিন্তু গিয়ে দেখলাম শার্লক হোমস আর ওয়াটসন আমার কেস নেওয়ার জন্য তৈরি, তাই আর ছদ্মবেশ হতে বেরিয়ে এলাম না।”
এবার আমি অজিতবাবুর কেসটা বিক্রমকে বললাম । সবশুনে বিক্রম ডায়েরিটা চাইল। ডায়েরিটা তার হাতে দিয়ে বললাম, “ইয়োর কেস হোমস।”
        নেপালদার রান্নাও বেশ ভালো। পুকুর হতে ধরানো টাটকা মাছের ঝোল, ফুলকপি আলুর রসা, মুগের ডাল, চাটনি, – খাওয়া দাওয়াটা দারুণ হল। অঘোরবাবুকে দেওয়া হয়েছিল বিশাল মাছের মাথা। একহাতে করে বাগ করতে না পেরে দু’হাত লাগিয়ে মাছের মাথাতে কামড় বসালেন ভদ্রলোক। আমি হেসে উঠতেই অঘোরবাবু বললেন, “হাসির কি হে ? মাছেভাতে বাঙালি । আরে খাওয়ার স্টাইলে কি এসে যায় ? খাওয়াটাই আসল।”
   খাওয়া দাওয়ার পর বসলাম আলোচনায়। বিক্রম বলল, “যেটুকু জানলাম বা বুঝলাম তাতে আমার মনে হয় দুটে কেসেরই একটাই কমন ফ্যাক্টর, – ‘কলকাতা ডাইগনেস্টিক ল্যাবরেটরি’। আমাদের প্রথম কাজ হল কাগজপত্রগুলো ভালোভাবে স্টাডি করে একটা রুপরেখা তৈরি করা। এরমধ্যে একবার কলকাতা ডাইগনেস্টিকে যাব। তোমাদের অজিতবাবুকেই একবার দেখে আসি। “
(চলবে )

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: