নয় – পর্ব ৬ — সুব্রত মজুমদার

bsb

চায়ের দোকানদারের দেওয়া পকেটডায়েরিটা  খুলল  বিক্রম। সাংকেতিক ভাষায় কিছু লেখা আছে। শেষের পাতায় কয়েকটা অগোছালো কথা  লেখা রয়েছে।

.

‘এক আছে কিছু কিছু, তিনের পাই আভাষ, 

 তিনের ঘরে লুকিয়ে আছে ঘুঘু হরিদাস।

দুই পাশে দুই তালবেতাল তাকেই করি ভয়। 

সাবধানে এগোলে পরে পাবো খুঁজে নয়।।’ 

.

 আজব কেমিক্যাল লোচা। কাল সকাল সাড়ে ন’টা। ‘ 

কথাগুলো আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ মনে হলেও খুব যে সাধারণ কথা ওগুলো নয় তা বেশ বুঝতে পারছে বিক্রম । কিন্তু এইসব  দিয়ে কি বোঝাতে চেয়েছে লোকটা ?

.

সাড়ে ন’টার কথাটা পড়তেই বিক্রমের মাথায় বিদ্যুৎ খেলে গেল। নজর না ঘুরিয়েই বলল, “অ্যাক্সিডেন্টটা ঠিক কখন হয়েছিল সায়ক ?”

.

                “তা সকাল নটা সাড়ে ন’টা নাগাদ হবে। ” আমি উত্তর দিলাম। বিক্রম গম্ভীর হয়ে বলল,”সবই পরিকল্পিত বিক্রম। অ্যাক্সিডেন্টটা পরিকল্পনা করে ঘটানো হয়েছে। এদিকে পঙ্কজবাবুর মেডিক্যাল রিপোর্টও খুব গোলমেলে। শরীরের মধ্যে একটা হরমোনাল চেঞ্জ হয়েছিল। পিটুইটারির অস্বাভাবিকত্ত্ব লক্ষ্য করা গেছে। “

.

বললাম,”মানে?”

“সাইকোলজিক্যাল সমস্যাও ছিল। তবে সেটা পিটুইটারির সঙ্গে  সম্পর্কিত কিনা তা জানি না। সাইকোলজিক্যাল কিছু সিটিংও হয়েছিল। সাইক্রিয়াটিস্ট ভদ্রলোক শেষের একটা রিপোর্টে কি লিখেছেন শুনলে অবাক হবে।.. “

.

                  মুখে কথা সরল না। আমি অবাক হয়ে বিক্রমের দিকে চেয়ে রইলাম । বিক্রম বলল,” লিখেছেন, – ‘রোগীর বর্তমান অবস্থা চিকিৎসা শাস্ত্রের আয়ত্তের বাইরে। ঈশ্বর না করুন রোগীর বদ্ধ উন্মাদ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। “

.

     পরেরদিন সকাল সকাল গেলাম কলকাতা ডাইগনেস্টিক ল্যাবরেটরির হেডঅফিসে। বিক্রম সঙ্গে থাকায় অঘোরবাবুর মানসিক বল অনেকটাই বেড়েছে। তিনি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা প্রহরীদের কাছে একটু দাঁড়িয়ে মোবাইলখানা বের করলেন। উদ্দেশ্য সেলফি। গার্ডরাও আপত্তি করল না।

.

অজিতবাবুর রুমে এসে বসতেই আমাদের টপকিয়ে বিক্রমের দিকে নমস্কার ছুঁড়ে দিয়ে অজিতবাবু বললেন, “আপনি আসবেন সেটা আমি জানতাম স্যার। আর সত্যি বলতে কি আপনাকে না পেয়ে মনটা আনচান করছিল। একদম মাছকে জলের বাইরে আনলে যা হয় আরকি। “

.

             অঘোরবাবুর মুখটা বাংলার পাঁচের মতো হয়ে গেল। তিনি বসে বসে উশখুশ করতে লাগলেন। বিক্রম বলল, “কিন্তু আপনার তো এখন জেলে থাকার কথা মিঃ দেশাই। “

.

একটা আঁতেল হেসে মিঃ দেশাই বললেন,”পৃথিবীর এমন কোনও জেল হয়নি যা এই দেশাইকে আটকে রাখতে পারে। আপনার সঙ্গে অনেক হিসাবপত্র বাকি আছে বিক্রমবাবু, আর এজন্যই আবার আসতে হল। তবে এবার অপরাধী আপনার সামনে কিন্তু অপরাধ বা তার মোটিভ দুটোই আপনার অধরা। আমি চাইলে আপনার এই সঙ্গিটিকে এখনই একটা ছাগল বানিয়ে দিতে পারি মিস্টার গোয়েন্দা। “

.

মিঃ দেশাই অঘোরবাবুর দিকে অঙ্গুল দেখাতেই অঘোরবাবু ভুত দেখার মতো চমকে উঠলেন। বিক্রমের উপর আর ভরসা হল না। তিনি চেষ্টা করলেন পালাবার। কিন্তু দরজার কাছ হতেই ঘুরে এলেন। এবার কিন্তু তারমধ্যে একটা পরিবর্তন এসেছে। সোজা গিয়ে দাঁড়ালেন মিঃ দেশাইয়ের পাশে।

.

                এবার ঘটল সেই চমকপ্রদ ঘটনা অঘোরবাবু হাঁটুমুড়ে চার হাত পায়ে বসে ছাগলের মতো ডাকতে লাগলেন। মিঃ দেশাই তার টেবিলে রাখ বেলটা বাজাতেই একটা লোক বেশ কিছুটা  কাঁঠাল পাতা নিয়ে এসে অঘোরবাবুর সামনে রাখতেই অঘোরবাবু গোগ্রাসে তা খেতে শুরু করে দিলেন। আমরা অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম।

.

বিক্রম এবার মিঃ দেশাইয়ের চোখে চোখ রেখে বলল, “অঘোরবাবুর পর আমার পালা। দেখি আপনার বিদ্যা।”

.

হো হো করে হেসে উঠলেন মিঃ দেশাই। বললেন, “আপনাকে আমি আমার পালতু কুত্তা করে রাখব। আমি ‘তু’ করলে ছুটে এসে লেজ নাড়াবেন। ও হো হো  আপনার তো লেজই নেই। তবে মূর্তিটা পেলে আপনার লেজেরও ব্যবস্থা হয়ে যাবে।”

.

                মিঃ দেশাই তার মানসিক শক্তিকে একত্রিত করে বিক্রমের দিকে স্থির ভাবে চেয়ে রইলেন। চোখ তো নয় যেন মাছের চোখ। একবারও পলক পড়ে না। সেই চোখের দিকে তাকানও অসম্ভব। চোখদুটো যেন গভীর দুটো কুয়ো, মনে হচ্ছে যেন আমি তলিয়ে যাচ্ছি। ঝট করে দৃষ্টি নামিয়ে নিলাম। মাথা এখনও ঝিমঝিম করছে। চারপাশের সবকিছু ঝাপসা লাগছে। মিনিট খানেকের মধ্যেই অজিত দত্ত ওরফে মিঃ দেশাইয়ের চোখদুটো লাল হয়ে গেল। শরীরটা আস্তে আস্তে বেঁকে যেতে লাগল।

.

কিছুক্ষণ পর অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন মিঃ দেশাই। বিক্রম আমার দিকে জলের গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে বলল, “ম্যাজিসিয়ানের জ্ঞান ফেরাও।”

.

                    জলের ছিটে মারতেই জ্ঞান ফিরে এল মিঃ দেশাইয়ের। তিনি টেবিলে মাথা ঝুঁকিয়ে বসে রইলেন। বিক্রম বলল, “আমিও কিছু কিছু জানি মিঃ দেশাই। কিন্তু আপনার বিদ্যেটা যে লেটেস্ট তা মানতেই হবে। তাই আমাকে বাগে আনতে না পারলেও ডোন্ট ওরি আপনিই বেস্ট। “

.

মিঃ দেশাইয়ের অফিস হতে বেরিয়ে আসার সময় অঘোরবাবু বললেন, “আপনার মানসিক ক্ষমতাকে স্যালুট করতে হয় মশাই। ঠিক যেন পিসি সরকার। কিন্তু একটা আহাম্মকি করে ফেলেছেন মশাই, ওই অজিত দত্ত না দেশাই, ওকে হাতের কাছে পেয়েও ছেড়ে দিলেন কেন ? “

.

বিক্রম হেসে বলল,”যাকে তাকে ধরে হাজতে পুরে দেওয়া যায় না অঘোরবাবু। ইনোসেন্ট লোকেদের অযথা হেনস্থা করতে পারি না আমরা । “

.

                           অঘোরবাবু বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বললেন,”ইনোসেন্ট ! এতগুলো লোককে ডিম পাড়িয়ে সে ইনোসেন্ট কিকরে হয় ? আপনার মাথার ছিট হয়েছে মশাই, ডাক্তার দেখান। বেশি দেরি করলে  সোজা রাঁচি। “

.

 বিক্রম হো হো করে হেসে উঠল। আমি বললাম,”অঘোরবাবু, কাঁঠালের পাতাগুলো বেশ টেস্টফুল ছিল, তাই না ? অবশ্য খেয়ে দেখার অভিজ্ঞতা আমাদের নেই।”

.

আমার কথায় অঘোরবাবু যেন ঘাবড়ে গেলেন, তারপর  জ্বর দেখার মতো আমার কপালে হাত দিয়ে কব্জিটা ধরে ডাক্তারি মতে পরীক্ষা নীরিক্ষা করে বললেন, “এই যে বিক্রমবাবু, সায়কের হাবভাব আমার ভালো লাগছে না। ওরও.. “

.

                    বিক্রম বলল,” আপনি টেনশন নেবেন না অঘোরবাবু, ও ঠিকই আছে। আপনিই বেশ কিছুটা সময় প্রকৃতিস্থ ছিলেন না। বলতে সঙ্কোচ হচ্ছে বাঁড়ুজ্জে মশাই, কিছুটা সময় আপনার দেহে একটা পাঁঠার অতৃপ্ত আত্মা ভর করে ছিল। সম্ভবত আগের জন্মের অতৃপ্ত বাসনার বশবর্তী হয়ে কেজিখানেক কাঁঠালপাতা খেয়েছে সে। “

.

বিক্রমের রহস্য বুঝতে পারলেন না অঘোরবাবু। আমি বুঝিয়ে বলতেই লজ্জায় জিভ বের করে বললেন,”বাঁদরামোটা দেখো। ওই অজিত দত্তকে গর্ত করে না পুঁতে দিই তো আমার নাম…. “

.

“.. অঘোরনাথ বাঁড়ুজ্জে নয়। কি ঠিক বললাম তো !” বিক্রম অঘোরবাবুর দিকে তাকাতেই অঘোরবাবু একখানা পেটেন্ট হাসি হেসে মুখ নামিয়ে দিলেন। বিক্রম বলল, “মোটিভ মোটেই পরিস্কার নয় অঘোরবাবু ।

.

মিঃ দেশাই আমার পূর্বপরিচিত। দিল্লির একটা আর্কিওলজিক্যাল সামিটে একটা খুন হয়, আর সেই সূত্রেই মিস্টার দেশাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়। এরপর হুয়াকোপায় আবার দেখা হয় ভদ্রলোকের সঙ্গে। আমার প্রচেষ্টাতেই গ্রেফতার হন উনি।”

.

.

(চলবে )

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: