নয় – পর্ব ৭ – সুব্রত মজুমদার

নয় - পর্ব ৭      -    সুব্রত মজুমদার

অঘোরবাবু গম্ভীর হয়ে গেলেন। তারপর কিছু একটা বলতে গিয়েও না বলে হাঁটতে শুরু করলেন। কিছুটা হেঁটেই একটা ফার্স্টফুডের দোকান। বিক্রম সোজা ঢুকে গেল সেই দোকানে। আমরাও তাকে অনুসরণ করলাম। আলুর পরোটার সাথে বাটার চিকেন। পরোটার একটা টুকরো মুখে ভরতে ভরতে বিক্রম বলল,”ডায়েরির ধাঁধার একটা সম্ভাব্য সমাধান আমি বের করেছি। কিন্তু আমার বিশ্লেষণ যদি ঠিক হয় তবে রহস্যটা অনেক গভীরে। কি যেন ছিল ধাঁধাটা ?”

“‘এক আছে কিছু কিছু, তিনের পাই আভাষ
 তিনের ঘরে লুকিয়ে আছে ঘুঘু হরিদাস।
দুই পাশে দুই তালবেতাল তাকেই করি ভয়। 

সাবধানে এগোলে পরে পাবো খুঁজে নয়।। ”   আমি চটজলদি উত্তর দিলাম।
                    বিক্রম বলল,” আমার ধারণা এখানে ঘুঘু হরিদাসটা আমিই। কিন্তু তিনের ঘরে লুকিয়ে থাকাটা ঠিক বোধগম্য হচ্ছে না। আর আমি তো স্বয়ং রাজা বিক্রমাদিত্য। তবে অঘোরবাবু আর সায়কের মধ্যে কে তাল আর কে বেতাল সেটা নিজেদেরকেই ঠিক করে নিতে হবে।

অঘোরবাবু গটগট করে এগিয়ে চললেন। বোঝাই গেল মন তার ভালো নেই। পরপর এত অপমান নেমে আসছে যে তিনি যথারীতি বিরক্ত।
                                   তিন
                 মালদহ শহরের একটা মেসবাড়ি। তিনতলা বাড়িটার নিচের তলায় গোটা চারেক দোকান আর দ্বিতীয় তৃতীয়তলায় ছাত্রদের মেস। সর্বমঙ্গলা ছাত্রাবাস। একটা সময় এই মেসের যথেষ্টই সুনাম ছিল।



আশেপাশের গ্রামগঞ্জ হতে ছেলেরা এসে থাকত এখানে। তবে সবাই যে সূযোগ পেত এমনটা নয়। অর্থনৈতিকভাবে দূর্বল অথবা অনেক দূর হতে আগত মেধাবী ছাত্র হলেই তবে সেই সূযোগ হত। 

সেসময় এই ছাত্রাবাসের মালিক ছিলেন স্বর্ণপ্রভা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জ্যোতিপ্রসাদবাবু।

                               জ্যোতিপ্রসাদবাবুর মৃত্যুর পর ছাত্রাবাসটি হস্তান্তর হয় এক কাপড়ের ব্যবসায়ীর হাতে। তিনি নিচেরতলায় কাপড়ের দোকান খোলেন। সঙ্গে নিচের তলার বাকি  রুমগুলো দোকান হিসেবে ভাড়াও দেন। শুধু দুই আর তিনতলাটা ছাত্রাবাসই রয়ে যায়। অবশ্য এখন এটাকে ছাত্রাবাস না বলে মেস বলাই ভালো। এখন আর এখানে মেধাবী ছাত্ররা আসে না। পরিবর্তে এসে ভিড় জমিয়েছে বিভিন্ন পেশার কতগুলো বাউণ্ডুলে লোক। 


এরকমই একজন হলেন  রামানুজ দত্তগুপ্ত। মেস এর সবাই তাকে  রামদা বলেই ডেকে থাকেন। মেসবাড়ির বছর তিনেকের পুরোনো এই বাসিন্দাটি আদতে কি করেন  তা কেউই জানে না। অনেকের ধারণা উনি বড় ডাক্তার ছিলেন, কোনও একটা কারনে প্র্যাকটিস ছেড়ে সন্ন্যাসীর মতো জীবন বেছে নিয়েছেন। অবশ্য তাদের বক্তব্যের স্বপক্ষে যুক্তি আছে। মেসের কারোর কিছু হলে প্রাথমিক চিকিৎসাটুকু রামানুজবাবুই করেন।
                    জীবনবীমার দালাল প্রশান্ত সরখেলের মতামত আবার অন্যরকম। হাতের সিগারেটটায় একটা রামটান মেরে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে তিনি বললেন, “যাই বলো ভাই রামদা কিন্তু  খুব সুবিধার লোক নয়। এই তো সেদিনই গিয়েছিলাম রামদার ঘরে। ফেব্রুয়ারির আগে টার্গেট পূর্ণ করতে হবে, ভাবলাম রামদাকেই একবার বলে দেখি। দরজায় নক করতেই দরজাটা খুলে বাইরে উঁকি মারলেন রামদা। আমাকে দেখেই বললেন, – প্রশান্ত ! ভেতরে এসো।

ভেতরে ঢুকতেই দরজাটা বন্ধ করে দিল। কোনওরকম ভদ্রতার ধার না ধেরে তক্তপোশের উপর বসে পড়লাম এরপর দরজা বন্ধ করেই আমাকে বসতে বলে চা করতে গেল। আমিও এদিকওদিক সরেজমিনে দেখতে লাগলাম। হঠাৎ আমার নজর গেল একটা জিনিসের উপর। লাল শালুতে মোড়া একটা বইজাতীয় কিছু সেটার উপর একটা মড়ার খুলি আর……”
কি আর ? ” সমবেত শ্রোতার  মুখের পেশী টানটান হয়ে ওঠে।

একটা  রিভলভার। আমি এদিকওদিক তাকিয়ে রিভলভারটা হাতে তুলে নিলাম। রিভলভারের নলে বারুদের গন্ধ। মানেকিছুপূর্বেই গুলি চলেছে। আমি সভয়ে রিভলভারটা রেখে দিলাম।
কবেকার ঘটনা বল তো হে ? ”  শালীবাহন শাস্ত্রী জিজ্ঞাসা করল এই শালীবাহন শাস্ত্রী একজন উঠতি জ্যোতিষি। দিন তিনেক হল এই মেসে এসেছে। ছোকরা নাকি মুখ দেখে ভুতভবিষ্যৎ বলে দিতে পারে। 

শালীবাহনের প্রশ্নের উত্তরে প্রশান্তবাবু মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললেন,”দাঁড়াও দাঁড়াও মনেকরি।…. হ্যাঁ মনে পড়েছে, গত শুক্রবার। আমার একজন ক্লায়েন্টের একটা বড়সড় বীমার সেদিন ম্যাচুরিটি ছিল।

শালীবাহন বিড়বিড় করে বলল, “যোগটা সেদিন ভালো ছিল না। মৃত্যুস্থানে শনি, রাহু আর মঙ্গল একত্রিত হয়েছিল। রক্তাক্তি কাণ্ড।

                        মেসের রাঁধুনিঠাকুর ঠিক তখনই চায়ের ট্রে নিয়ে হাজির। সবার জন্য চা আর ফুলকপির বড়া। ছোকরা তান্ত্রিকের জন্যই কেবল এককাপ কফি। চায়ের কাপগুলো নামাতে নামাতে ঠাকুর বলল, “শুক্রবার সন্ধ্যার সময় আমাদের দুটো গলি পরে একটা গুন্ডামতো লোক মরে পড়েছিল। কে নাকি গুলি মেরে রেখে গেছে। পুলিশ এসে তুলে নিয়ে যায়। পাড়ার রবি সাউ নাকি নিজের চোখে লোকটাকে মরতে দেখেছে। মরবার সময় লোকটা নাকি দুবারনয় নয়বলেছে। কি নয় কে জানে বাবা !”
শালীবাহন কফির কাপটা দ্রুত শেষ করে বেরিয়ে গেল। চেম্বার আছে। খোলা দরজাটার দিকে তাকিয়ে ঠাকুর বলল,”এই জ্যোতিষবাবুও কেমন সন্দেহজনক।


বাড়ির মালিক জনার্দ্দন ভকত ঠাকুরের দিকে একটা বিরক্তির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,”তুমি আর  কাকে কাকে সন্দেহ কর বল তো ? ছোকরা হালে পয়সা দেখেছে, এসময় একটুআধটু ছিটগ্রস্থ হাবভাব হয়। যাও নিজের কাজে যাও। তারপর বলুন প্রশান্তবাবু….. “
                     শালীবাহন হাঁটতে হাঁটতে এসে পৌঁছাল একটা বড় বাড়ির পিছনদিকে। বাড়িটা একটা স্কুল। ছুটির পর স্কুল ফাঁকি থাকে বলে জায়গাটা নিরাপদ। তবুও সাবধানের মার নেই। এদিকওদিক তাকাতে লাগল শালীবাহন কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা বাদামওয়ালা গলায় বাদামের ঝুড়ি নিয়েবাদাম বাদামবলে হাঁকতে হাঁকতে এগিয়ে এল। শালীবাহনকে দেখে বলল, “ভালো বাদাম আছে স্যার।


বাদামওয়ালা শালীবাহনের কাছ ঘেঁষে দাঁড়াতেই শালীবাহন বলল, “খবর কি ? বাড়িটার উপর নজর রেখেছো তো ? “
                 লোকটা বলল, “হ্যাঁ স্যার। লোকটা একটা বাস্তু ঘুঘু। তবে ওর পেছনও আরেকজন আছে যাকে আমি কাল হতে ট্রেস করছি।

শালীবাহন বলল, “সে আমি জানি। ওই লোকটাকই আমি নজরে নজরে রাখছি। তবে তোমার কথা সত্যি নাও হতে পারে। এই লোকটা ধূর্ত হলেও  ঠিক জাত ক্রিমিনাল নয় এ। জুনায়েদকে  সম্ভবত এই মেরেছে। কাজগুলো দিয়েই চলে যাও। জায়গাটা ভালো নয়।

বাদাম দেওয়ার জন্য রাখা কয়েকটা খবরের কাগজ শালীবাহনের হাতে দিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল লোকটা।


ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: