নয় – ১০ — সুব্রত মজুমদার

নয় - ১০    --   সুব্রত মজুমদার

“চায়ের কাপটা এগিয়ে দিয়ে দত্তগুপ্ত বললেন, “আমাদের গুপ্তসংগঠনে যেমন বহুপেশার লোকজন আছে তেমনি ওদের দলেও বিভিন্ন পেশার বিভিন্ন লোক কিলবিল করছে। আসলে হয় কি, একটা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে নিয়ে কিছু লোক একত্রিত হলেই একটা সংগঠন গড়ে ওঠে।
 
আমাদের বিরুদ্ধ সংগঠনটির একটা পোশাকি নাম আছে।  KOLI   – Killing of loyalty and innocence । এদের মুখ্য উদ্দেশ্য হল  বিশ্বস্ততা ও সরলতার বিনাশসাধন। লোক একে অন্যের সঙ্গে মারামারিক করবে, কাটাকাটি করে মরবে, একে অপরকে অবিশ্বাস করবে এটাই ওদের প্রধান উদ্দেশ্য। এরা সমাজের সমস্ত স্তরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যেমন ধরো একজন ব্যাঙ্ক ম্যানেজার, তুমি সাধারণ মানুষ তোমাকে ছোট্ট ছোট্ট কাজে হ্যারাস করবে। ও চাইবে তুমি উৎকোচ দাও অথবা হিংসায় প্রবৃত্ত হও। এইভাবে রাজনীতিবিদ হতে শুরু করে একজন সাধারণ ছাপোষা মধ্যবিত্ত সবাই ওদের নাগালে চলে আসবে। তখন ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হয়ে যাবে। আমরা অনেক চেষ্টা করেও এদের কিংপিনকে ধরতে পারিনি। “
 
                  চায়ের কাপটাও নামিয়ে রেখে বিক্রম বলল,” তাহলে আমার ছদ্মবেশও কাজে এল না ! সত্যিই কেসটা আস্তে আস্তে গুলিয়ে যাচ্ছে। এই নাটকে এক এক করে কুশীলবেরা এসে যুক্ত হচ্ছেন। শেষতম সংযোজন আপনি। এখন সকলই কলির ইচ্ছা। “
একপ্রস্থ হেসে উঠল দুজনে। বিক্রম ঘর হতে বেরিয়ে গেল। কালকেই ঘরে ফিরে যেতে হবে। এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া বাকি।
দত্তগুপ্তর ঘর থেকে বেরিয়েই বিক্রম দেখল সরখেল সহ মেসবাড়ির অন্যান্য সদস্যরা কৌতুহলী হয়ে  দাঁড়িয়ে আছেন। যেতেই বিক্রমকে ছেঁকে ধরলেন। সরখেল বললেন, “ভয়টয় দেখালো নাকি ? ও খুব মারাত্মক লোক মশাই। ওর নজরে যখন একবার পড়েছেন তখন আর বাঁচোয়া নেই। এখান হতে সরে পড়াটাই মঙ্গল।”
মুখ গম্ভীর করে চিন্তিত চিন্তিত ভাব করে বিক্রম বলল, “আমিও তাই ভাবছি।”
 
                   পরদিন সকালেই ঘরে ফিরে গেল বিক্রম। ঘরে গিয়ে দেখে সে এক লণ্ডভণ্ড কাণ্ড। গোটা ঘরে যেন ঘূর্ণীঝড় তাণ্ডব করে বেরিয়েছে। মাধবদা সদর দরজায় কপালে হাত দিয়ে বসে আছে। বিক্রমকে দেখেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সে।
“ডাকাত পড়েছিল বাবু ! আমার কপালে বন্দুক ঠেকিয়ে বললে, মূর্তিটা কোথায় ? বল, নাহয় তোকে মেরে ফেলতে আমাদের এক সেকেন্ডও লাগবে না। তারপর সব জিনিস ছড়িয়ে ছিটিয়ে ভেঙ্গেচুরে একেক্কার করে দিল গো।”    মাধবদা কাঁদতে লাগল।
“তুমি লোকগুলোকে চিনতে পারবে ?”
“হ্যাঁ দাদাবাবু, আমি সবাইকে চিনতে পারবো। ওদের পত্তেকের মুখ আমার মনে আছে। “
” তাহলে আর মনে রেখে কাজ নেই।  মুখ ঢেকে আসেনি মানে ভাড়া করা গুণ্ডা ওরা গুণ্ডাগুলোকে ধরে কোনও লাভ হবে না। ও সায়ক, এসো এসো। বলো খবর কি তোমার ?”
বিক্রম না থাকলে সকাল সন্ধ্যা  দুবেলা খবর নিয়ে যাই। সেরকমই খবর নিতে এসে এই বিক্রমের ঘরের এইরকম অবস্থা দেখে যথেষ্টই মুষড়ে পড়েছি। বললাম,” কাল সন্ধ্যায় যখন এসেছিলাম তখন তো সব ঠিকঠাকই ছিল। তাহলে রাতের বেলায়… “
 
” না সায়ক দাদাবাবু রাতে নয় গো ভোর বেলাতে এসেছিল মুখপোড়ারা। সব শেষ করে দিয়ে গেল গো!”  মাধবদা আবার কাঁদতে শুরু করল। বিক্রম বলল, “কান্নাকাটি করে কোনও লাভ নেই। এসো সবাই মিলে হাত লাগাই।  গোছগাছ করে সাজিয়ে গুছিয়ে তুলতে খুব একটা বেশি সময় লাগবে বলে মনে হয় না । “
গোছগাছ করতে করতে বললাম,” আচ্ছা বিক্রম একটা কথা ঠিক করে বল তো, ওরা দুনিয়াতে এতো জায়গা থাকতে ওই মূর্তিটার খোঁজ হঠাৎ এখানেই করতে এল কেন ? আমি যতদূর জানি মূর্তিটাকে এখানে কোনোদিনও  আনা হয়নি। তাছাড়া তোমার কাছে যা যা শুনেছি তাতে তুমিও ওই মূর্তিটা দেখেছো কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহ আছে।”
কলমমগুলোকে গুছিয়ে টেবিলের উপর রাখা কলমদানিতে রাখতে রাখতে বিক্রম বলল,”মূর্তিটা এবাড়িতেই আছে। “
 
” মানে ! “
“মানে আর কিছুই না, মূর্তিটা এবাড়িতেই আছে। তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে সায়ক যেদিন পঙ্কজ রায়চৌধুরী সেজে এবাড়িতে এসেছিলাম সেদিনকার কথা। সেদিনই মূর্তিটা সঙ্গে করে এনেছিলাম আমি। আমি জানতাম আর কেউ জানুক আর না জানুক শত্রুরা এটা ভালোকরেই জানত যে আমি বহুদিন যাবৎ বাড়িতে নেই। সুতরাং আমার বাড়িটা সন্দেহের বাইরে ছিল। আর এজন্যই অতি সন্তর্পনে যে বৃদ্ধের ছদ্মবেশে ঘরে ঢুকলাম। কিন্তু বিধি আমার বিবাদী। “
” কেন ? “
 
“কেন আবার, ওরা আমার থেকেও বুদ্ধিমান। আমি যে ঘরে এসেছিলাম সেটা ওদের বুঝতে সমস্যা হয়নি।  তুমি তো জানই  ছদ্মবেশে আমার জুড়ি কেউ নেই। কিন্তু দুঃখের কথা কি জানো, অমন ঘুঘু অ্যাস্ট্রোলজারের ছদ্মবেশটাও মাটি হয়ে গেল। “
আমি আগ্রহপ্রকাশ করতেই সমস্ত ঘটনা খুলে বলল বিক্রম। বললাম,”তাহলে মূর্তিটা রেখেছো কোথায় ?”
বিক্রম স্টোরেজ হতে একটা খুরপি নিয়ে বাগানের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,”সঙ্গে এস বৎস। ”  আমি সঙ্গ নিলাম। বিক্রম এগিয়ে গেল বারোমেসে গোলাপঝোঁপটার দিকে। তারপর গোলাপঝোঁপের পাশে আদা বসানোর জন্য রাখা  মাটির বস্তা হতে খুরপি দিয়ে মাটি খুঁড়তে লাগল। এরপর অনায়াসেই  মোটা পলিথিনে মোড়া ভারি কিছু একটা বেরিয়ে এল।  পলিথিনের ভেতরে খবরের কাগজে মোড়া যক্ষিণী মূর্তি।
 
                 বেশ চিন্তিত হয়ে টেবিলে রাখা মূর্তিটা  নাড়াচাড়া করতে করতে বিক্রম বলল, “মূর্তিটার গায়ে একটা নীলাভ ঊজ্জ্বল শ্যাওলার আস্তরণ পড়েছে । এটা ছাড়া আপাতত আর কোনও অস্বাভাবিকতা দেখতে পাচ্ছি না। তবে মূর্তিটা কিন্তু অ্যান্টিক। আনুমানিক খ্রীষ্টপূর্ব তেইশশো বছর আগের এই মূর্তিটার দাম কয়েক কোটি টাকা তো হবেই। এখন প্রশ্ন হল এই যে হানাদারদের উপদ্রব সেটা কি শুধু এই মহামূল্যবান মূর্তিটি হস্তগত করার জন্য ? নাকি… “
বিক্রমের কথা শেষ হল না। টেবিলের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়লেন এক ভদ্রলোক।  আমি ঢোকার পর দরজাটা বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিলাম, আর তারই খেসারত হল এটা। লোকটার ধাক্কায় মূর্তিটা টেবিল হতে মাটিতে পড়ে তিনটুকরো হয়ে গেল। আমিও রাগে লোকটার পাঞ্জাবীর কলার চেপে ধরলাম। কিন্তু  জামাকাপড়ে এত  নোংরা আর দূর্গন্ধময় যে আমার বমি পাওয়ার জোগাড় হল।
 
           লোকটা আমার মারমূর্তি দেখে রীতিমত কেঁদে ফেলল। বিক্রম তাকে প্রবোধ দিতেই লোকটা বলল, “মারুন মারুন মশাই, সবাই মিলে মেরে ফেলুন আমাকে। অঘোর বাঁড়ুজ্জে মলে যদি শান্তি হয় তবে তাই করুন। কোন কুক্ষণে মোহিনীমায়া ক্রিম কিনতে গিয়েছিলাম !…..”
আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। ইনি কোনও স্পাই নন, মাতাল নন, পাগল নন, এমনকি পাওনাগণ্ডা চাইতে আসা  কাবুলেও নন। ইনি আমাদের একমেব অদ্বিতীয় অঘোরবাবু।
 
 
 
(চলবে )
 
 
ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: