নয় – ৮ — সুব্রত মজুমদার


নয় - ৮      --  সুব্রত মজুমদার

শালীবাহনও বিপরীত দিকে হাঁটা শুরু করল। কিছুটা যেতেই রামানুজ দত্তগুপ্তের সঙ্গে মুখোমুখি দেখা। দত্তগুপ্তের পরনে একটা কালো জামা আর কালো প্যান্ট, মুখে একটা কালো রুমাল বাঁধা রয়েছে। ডানহাতে ওয়াকিং স্টিক। এই অন্ধকারেও দত্তগুপ্তকে চিনে ফেলল শালীবাহন।


কি ব্যাপার রামানুজদা এরকম ব্ল্যাক ক্যাট সেজে চলেছেন কোনদিকে ?” শালীবাহন টিপ্পনি কাটল।
না সেরকম কিছু নয়, আসলে কালো আমার খুব ফেভারিট রং কিনা তাই….. আর এই বসন্তের বাতাসে ফুলের পরাগ হতে ধূলিকণা কি নেই। খুব দূষণ ভাই। তাই রুমালটা নাকে বেঁধে নিলাম।
দত্তগুপ্তের সাফাইয়ে শালীবাহনকে সন্তুষ্ট হতে দেখা গেল না। শালীবাহন বলল, “ভালো। খুব ভালো। তাছাড়া সঙ্গে একটা লাঠিসোঁটা রাখাও ভালো। ওকে রামানুজদা, গুডনাইট  গুডবাই, কাল দেখা হবে
                 কিছুটা এগিয়ে যেতেই পেছন হতে একটা লাঠির মতো জিনিস সক্রোধে আছড়ে পড়ল শালীবাহনের মাথার উপর। অজ্ঞান হওয়ার আগে মাথা ঘুরিয়ে আততায়ীকে দেখবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হল সে। আস্তে আস্তে চোখের সামনেটা কালো হয়ে এল। তারপর আর কিছু মনে নেই।
জ্ঞান হতেই শালীবাহন দেখল সে একটা চেয়ারে হাতপা বাঁধা অবস্থায় বসে আছে। আশেপাশে কেউ নেই। ঘরটা সম্ভবত একটা পাতালঘর টাইপের, কারণ মাথার উপরের সোলার লাইটটা ছাড়া আর আলোর কোনও উৎস চোখে পড়ছে না। তাছাড়া ঘরটা কেমন যেন নিস্তবদ্ধ। একটা ভাপসা গন্ধ ঘরটার ভেতরে খেলা করছে।
           একটা ধারালো কিছু খুঁজতে লাগল শালীবাহন। কিন্তু সেরকম কিছুই দেখা গেল না। কেবল সামনের দেওয়ালের একটা পাথর সামান্য উঁচু হয়ে আছে। পাথরটার উপরতল বেশ এবড়োখেবড়ো। শালীবাহন অনেক কষ্টে চেয়ারশুদ্ধ দেহটাকে এগিয়ে নিয়ে গেল সেই পাথরটার কাছে। তারপর সেই পাথরটার দিকে পেছন ফিরে অনেক কষ্টে হাতের দড়িটা পাথরে ঘঁষতে লাগল দড়ির সাথে সাথে হাতও ঘষে যেতে লাগল। কিন্তু থামলে চলবে না। অনেক কষ্টে দড়িটা কাটা সম্ভব হল।
পায়ের দড়িটা খুলতেই যাবে এমনসময় শালীবাহন দেখল একটা ষণ্ডাগুণ্ডা লোক ভেতরে ঢুকছে। তড়িঘড়ি নিজের জায়গায় ফিরে এল সে।
গুণ্ডামতো লোকটা এসে দেখল শালীবাহনের জ্ঞান এখনো ফেরেনি। সে বিরক্ত হয়ে আপনমনে বলে, “লাঠির একটা বাড়ি খেয়েই যদি কোমায় চলে গেছে বাছাধন। স্যারের পেছনে কেন লাগিস ভাই ! নে সামলা এবার
              সামনের টেবিলের উপর খানতিনেক খাবার প্যাকেট আর একটা দুলিটারের জলের বোতল নামিয়ে রেখে বেরিয়ে যায় লোকটা। শালীবাহন জানে এই খাবার তার জন্যই আনা। সে এখন অজ্ঞান বলে খাবারটা নামিয়ে রেখে চলে গেছে লোকটা। একটু পরেই ফিরে আসবে।
শালীবাহন পায়ের বাঁধন টা খুলে টেবিলের দিকে এগিয়ে যায়। প্যাকেটগুলো খুলে ফেলে ঝটপট। পনির দিয়ে ভেজ বিরিয়ানি, মটরপনির আর মিষ্টি আছে।
 লোকটা শালীবাহনকে ভেজিটেরিয়ান ভেবেছে। যাইহোক খেতে খুব উপাদেয়। পরম তৃপ্তিভরে খেয়ে মিনারেল ওয়াটারে হাত ধু শালীবাহন। তারপর পেটের বাকিটুকু জল দিয়ে ভর্তি করে নিল। এমারজেন্সিতে স্বাস্থ্যবিধি মানা সম্ভব নয়। তারপর আবার গিয়ে বসল চেয়ারম্যান হয়ে।
                   লোকটা আবার এল। টেবিলের উপর চোখ পড়তেই চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল লোকটার। সন্দেহের দৃষ্টি নিয়ে শালীবাহনের দিকে তাকাতেই দেখল শালীবাহন এখনও অজ্ঞান। কিন্তু হঠাৎ যেন মনে হল দড়ির বাঁধন টা ঠিকঠাক নেই। একটু ঝুঁকে বাঁধনটা পরীক্ষা করতে গেল লোকটা। আর ঠিক তখনই এক লহমায় জেগে উঠে লোকটার ঘাড়ে লাগাল একটা রদ্দা।
কাটা কুমড়োর মতো গড়িয়ে পড়ল লোকটা। অজ্ঞান। লোকটাকে দড়ি দিয়ে ভালো করে বেঁধে বাইরের পথ ধরল শালীবাহন।  তবে বেরোবার আগে জায়গাটা ভালো করে দেখে নিল সে। এটা একটা গুহা। লোকটার পকেট হতে পাওয়া অ্যান্ড্রয়েড ফোন হতে গুগল ম্যাপটা খুলল। জায়গাটা পূর্ণীয়া আর কাটি হারের মাঝামাঝি। 
গুহার দেওয়ালে কিছু ছবি। ছবিগুলো অনেক পুরোনো। ছবিতে একটা রাজাকে দেখা যাচ্ছে। তিনি কিছু ব্রাহ্মণকে কি যেন নির্দেশ দিচ্ছেন। এক.. দুইতিনচার…. হঁ, মোট নয়জন ব্রাহ্মণ। তাহলে কি ডায়েরিটায় নয় মানে এই নয়জন ?
              রাজার ছবির নিচে লেখা আছে  ‘দেবানপিয়েন পিয়নদশিন  “দেবানপিয়েন পিয়নদশিন ! মানে দেবপ্রিয় প্রিয়দর্শী রাজা অশোক ! স্ট্রেঞ্জ !”  স্বগতোক্তি করে শালীবাহন। এরপর বাইরে বেরিয়ে আসার পথ ধরে। 
 হ্যাঁ এটা গুহাই। গুহার মুখটা একটা ঝোপের ভেতরে উন্মুক্ত হয়েছে ঝোপের ভেতর হতে একটা সরু রাস্তা চলে গিয়েছে। বোঝায় যায় যে এই গুহাপথে নিয়মিত লোকের আনাগোনা হয়  ঝোপের বাইরে এসে গুগল হতে স্থানীয় থানার নাম্বারটা সার্চ করে নিল শালীবাহন। এরপর ফোন করল থানায়  
বড়বাবু ফোন তুললেন।হ্যাঁলো ওসি ধর্মেশ কুমার স্পিকিং। ক্যা ? আপ কন বোল রাহা হ্যা ? …. বঙ্গাল কি মশহুর কিরমিনাল ভোঁদা বিষু আপকি গিরফ্ত মে হ্যা ? ওকে। হাম জল্দি যা রহে  হ্যা। ওকে…. হ্যাঁওকে
                        বড়বাবু গাড়ি বের করলেন। এদিকে শালীবাহন বাড়ি ফেরার উদ্যোগ করল।
                           টানা দুদিন ধরে মেসবাড়ির একজন সদস্যের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। সবাই যে মতো মন্তব্য করছে। প্রশান্ত সরখেল আমুদে হাসি হেসে বললেন,”তান্ত্রিক নিখোঁজ ! যিনি হারানো জিনিস খুঁজে দিতে পারেন তিনিই আজ হারাধন। এজন্যই আমি জ্যোতিষ তান্ত্রিকে বিশ্বাস করি না।
আমিও এগিয়ে এলেন রামানুজবাবু।  “তবে কি জানো, ওই তোমরা যেভাবে মানুষকে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়ার সার্থকতা বোঝাও সেটাও আমার ঠিক ভালো লাগে না মিঃ  সরখেল। আপনারা নিজেদের নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত, তাই আপনাদের মুখে দুনিয়াদারির কথা শুনলে হাসি পায়।
                প্রশান্ত সরখেলের মুখটা তখন দেখার মতো। নিমপাতার রসখাওয়ার পর বাচ্চাদের মুখের যেমনটা পরিবর্তন হয় ঠিক সেইরকম। তিনি পালিয়ে যেতে পারলে বাঁচেন রামানুজবাবু সতরঞ্জির উপর বসে মৃদঙ্গটা কোলে তুলে নিলেন। আনমনে মৃদঙ্গে চাঁটি মারতে মারতে বললেন,”শালীবাহন লোকটা ঠিক সহজ সরল নয়। অবশ্য আপনার ক্ষেত্রেও কথাটা খাটে। আপনারা দুজনেই অকর্মার ঢেঁকি। বিদ্যের কণামাত্রও আপনাদের নেই, শুধু মুখের জোরে করেকম্মে খাচ্ছেন।” 
প্রশান্ত সরখেল আরক্তনয়নে বললেন, “দেশে আপনিই একমাত্র মহাপুরুষ। অনেক দেখেছি মশাই, আপনার মতো লোক অনেক দেখেছি। আপনি কি তা কি আমি জানিনা ? আপ একটা….. “
“…. কি আমি কি ? “
আপনি একটা খুনে। বেআইনি রিভলভার নিয়ে ঘোরাফেরা করেন আপনি।প্রশান্ত সরখেল আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু দত্তগুপ্তের দিকে তাকিয়েই গলা শুকিয়ে যায় তার দত্তগুপ্তের হাতে উঠে এসেছে রিভলভার। রিভলভারের সেফটি ক্যাচ খুলে সরখেলের কানপাটিতে ধরে বললেন,”এটা বেআইনি আর্মস নয় মিস্টার সরখেল।
এটার  যথারীতি লাইসেন্স আছে। আর আপনাকে মেরে আমি শুধু বলবো, আপনি আমাকে খুন করতে এসেছিলেন। সাক্ষী ? উপস্থিত কেউই তোমার হয়ে সাক্ষী দেবে না। কি বলেন আপনারা ? “
উপস্থিত সকলেই মাথা নিচু করে বসে রইল। পালাতে পারলে বাঁচে সবাই। দত্তগুপ্ত রিভলভারটা সরখেলের কানপাটিতে হতে সরিয়ে লক করে আবার পকেটে রাখতে রাখতে বললেন,”আর্মিতে বাঙালি রেজিমেন্ট নেই কেন জানেন ? বাঙালির জীবনের ভয় প্রচুর। সে যা পারে তা হল অন্যের পেছনে কাঠি করতে।
(চলবে )

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: