নয় – ৯ — সুব্রত_মজুমদার

নয় - ৯     --    সুব্রত_মজুমদার
দত্তগুপ্ত বেরিয়ে যেতেই একে একে কেটে পড়ল সবাই। কারোর মুখে কোনও উচ্চবাচ্য নেই।  এদিকে সন্ধ্যার মুখে শালীবাহন ফিরলে সবাইমিলে ঘিরে ধরল শালীবাহনকে। শালীবাহন বলল,”সে এক কাণ্ড মশাই, রাতে চেম্বার হতে ফিরছিলাম, কে বা কারা মাথায় বাড়ি মেরে অজ্ঞান করে নিয়ে যায় বিহারে। অনেক কষ্টে বেঁচে ফিরলাম মশাই।
                    প্রশান্ত সরখেল কিছু বলতেই যাচ্ছিলেন কিন্তু ঠিক সেসময় দত্তগুপ্ত এসে পড়ায় চুপ করে গেলেন। দত্তগুপ্ত সরাসরি শালীবাহনের দিকে তাকিয়ে বললেন,”আপনার সঙ্গে কিছু কথা আছে আমার। আমার ঘরে আসুন।
কথাটা বলেই দত্তগুপ্ত ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। প্রশান্ত সরখেল এতক্ষণে নীরবতা ভঙ্গ করল। শালীবাহনের হাত ধরে বললেন, “দেখুন শাস্ত্রীমশাই, একটু সাবধানে থাকবেন। দত্তগুপ্তর সঙ্গে কথাকথান্তরে জড়াবেন না। সাংঘাতিক।
                        সরখেলের কথার সমর্থনে ব্যারিস্টার মজুমদার সকালের ঘটনাটা বললেন। শালীবাহন সবাইকে আস্বস্ত করে দত্তগুপ্তর ঘরের দিকে রওনা হল।
শালীবাহন চলে যেতেই সরখেল বললেন, “শাস্ত্রীটার নির্ঘাত মৃত্যুযোগ আছে। পরের ফাঁড়া কাটায়, এবার নিজের ফাঁড়া সামলাক।
            ঘরের ভেতরে ঢুকতেই একটা পরিচিত গন্ধ নাকে এল।  অগুরুর গন্ধ। এর ব্যবহার প্রধানত সুগন্ধি হিসেবে করা হলেও আয়ুর্বেদে এই গাছের অনেক উপকারের কথা উল্লেখ আছে। শালীবাহন যেতেই দত্তগুপ্ত গম্ভীর গলায় বললেন,”চেয়ারটায় বসো
শালীবাহন বলল,”বলুন
অবশ্যই বলব, বলার জন্যই তোমাকে ডেকেছি। তুমি যে পথে হাঁটছ সে পথে যেকোনো সময় জীবন যেতে পারে তা তুমি জানো ?”
শালীবাহন শাস্ত্রী মৃত্যু এড়াবার উপায় জানে। সে মৃত্যুকে ভয় পায় না।শালীবাহন দৃঢ়তার সঙ্গে বলল।
ওসব বুজরুকি তুমি তোমার ক্লায়েন্টদের দেখিও। বাস্তবটা বড়ই কঠিন। এখানে তোমার বুদ্ধি, বোধ আর বিবেকের সঠিক তালমেল না ঘটলেই পতন নিশ্চিত। আর পতন মানেই মৃত্যু।
                 “মৃত্যুকে আমি ডরাই না মিঃ দত্তগুপ্ত। মৃত্যু আমার পায়ের ঘুঙুরের মতো সাথে সাথে ঘোরে।
ওয়েল। তবে তুমিই পারবে। যে কাহিনী আমি এতদিন কাউকে বলিনি সে কাহিনী তোমাকে বলছি শোনো। আমার দৃঢ় বিশ্বাস তুমি যেই হও তুমি সৎ সাহসী। তোমাকে অপহরণ আমিই করিয়েছিলাম। তোমাকে যাচাই করার জন্য।
হঠাৎ আমাকেই কেন ? দুনিয়ায় এত এত লোক থাকতে আমাকেই নির্বাচন করা হল কেন ? ”  দৃপ্তকণ্ঠে বলল শালীবাহন। তার চোখেমুখে যেন একটা অনির্বাণ জ্যোতি খেলা করছে।
                দত্তগুপ্ত বললেন,”যে শত্রুর নাম ধারণ করে সত্যান্বেষ করে তাকে কম করে আঁকি কিভাবে ? কি মিস্টার অ্যাস্ট্রোলজার, ঠিক বললাম তো ? “
শালীবাহন মুচকি হেসে বলল,” কাজের কথা বলুন। কিজন্য ডেকেছেন আমাকে ?”
দত্তগুপ্ত বললেন, “আমাদের পথ একটাই, কেবল উদ্দেশ্য আলাদা। আমি চাই তুমি আমাকে আমার কাজে সাহায্য কর। বিনিময়ে তুমি তোমার গন্তব্যে পৌঁছে যাবে। কি ডিলটা মন্দ হল কি ?”
           ” কিন্তু তার আগে আমাকে সমস্ত কিছু জানতে হবে।
ওকে। তবে শোনো। আজ থেকে প্রায় দুহাজার দু কুড়ি বছর আগে মগধের সিংহাসনে রাজত্ব করছেন দেবপ্রিয় প্রিয়দর্শী রাজা অশোক জীবনসায়াহ্নে এসে তিনি বুঝতে পারেন যে আগামীতে যে  দিন আসছে তা খুবই ভয়ঙ্কর মানুষের মনুষ্যত্ব লোপ পাবে। সনাতন ধর্ম কলুষিত হবে। হত্যা আর নৃশংসতাকেই কিছু লোক ধর্ম বলে মনে করবে। তারা সচেষ্ট হবে নিজেদের ক্ষমতাবৃদ্ধি করে নারী শিশু বৃদ্ধ আর অসমর্থদের দাস হিসেবে ব্যবহার করে কৌমস্বার্থ চরিতার্থ করতে।
             রাজা এই ভেবে শঙ্কিত হলেন যে বৈদিক জ্ঞান যদি ওইসব অশুভ শক্তির করায়ত্ত হয় তবে মানব সভ্যতার বিনাশ হবে। রাজা তার প্রধানমন্ত্রীকে গুপ্ত মন্ত্রনাকক্ষে ডাকলেন। সবশুনে প্রধানমন্ত্রী বললেন, “আপনার চিন্তা নিরাধার নয় মহারাজ। কল্কিপুরাণেও একথা আছে। বৈদিক জ্ঞানকে লোকচক্ষুর আড়ালে না নিয়ে গেলে ভবিষ্যতে তা সাধুব্যক্তিদের পক্ষে যথেষ্টই পীড়াদায়ক হবে।
            রাজা অশোক তার প্রধানমন্ত্রী মিলে নয়জন বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণকে নির্বাচন করেন। এরপর বৈদিক জ্ঞানকে নয়ভাগে বিভক্ত করে তাদের হাতে তুলে দিয়ে মন্ত্রগুপ্তির শপথ পাঠ করান। উত্তরাধিকার সূত্রে এরাই এই জ্ঞানের সংরক্ষণ সম্প্রসারণ করবে। কলির শেষে ভগবান কল্কির জন্ম হলে তপস্যারত ভগবান পরশুরামের হাতে এই জ্ঞানভাণ্ডার সমর্পন করা হবে।
তারমানে সেই জ্ঞান এখনও সংরক্ষিত হচ্ছে, আর আপনি….. “
হ্যাঁ, আমিই সেই নয়জনের একজন। আমরা শুধু জ্ঞানের সংরক্ষণ নয় সম্প্রসারণও করি। আমাদের বিপরীতে রয়েছে একটা দুষ্টচক্র, যারা এই জ্ঞানকে হাতে পেতে চায়। প্রথম  গ্রন্থটির একটা বিষয়ের উপর পরীক্ষা নীরিক্ষা করার সময় সেই বিশয়াংশটি শত্রুদের নজরে পড়ে। আচার্য্য ভবভট্টকে হত্যা করা হয়। মৃত্যুর পূর্বে তিনি শত্রুদের হাত হতে বাঁচাতে গ্রন্থটি লুকিয়ে রাখেন। এখন আমাদের কর্তব্য হবে ওই শত্রুগোষ্ঠিকে ধরা লুকিয়ে রাখা তৃতীয় গ্রন্থের পুনরুদ্ধার।
সবই তো বুঝলাম, কিন্তু অজিত দত্ত ওরফ মিস্টার দেশাই কিভাবে ইনভলভ হলেন ? উনি তো মেক্সিকোর জেলে ছিলেন।শালীবাহন প্রশ্ন করল।
             রামানুজ দত্তগুপ্ত সটান খাট হতে উঠে দেওয়াল ঘেঁষে লাগানো টেবিলটার কাছে গিয়ে কি যেন খুঁজতে লাগলেন।  তারপর জিনিসটি না পেয়ে হতাশ হয়ে আবার খাটে গিয়ে বসলেন। বললেন,” হ্যাঁ, কি বলছিলেন যেন, – মিঃ দেশাইয়ের কথা। একটা ঘোড়েল। কিভাবে এসবে জড়িয়ে পড়ল তা আমার কাছেও ধাঁধা। তবে কাল আমি তোমাকে অপহরণ না করলে দেশায়ই সেই কাজটা করত। অপহরণ আপনার হতই।
এতটা বলেই দত্তগুপ্ত আবার উঠে পড়লেন। ঘরের এককোণে ছোট্ট একটা পাঁচকিলো গ্যাসের সিলিন্ডার। ওর মাথাতেই ওভেন সেট করা। চায়ের জল চাপাতে চাপাতে বললেন,”এই দেখো, আমার ঘরে প্রথম এলে একটু চা না খাওয়ালে অভদ্রতা হয়। কি বলো বিক্রম ? “
অ্যাঁ…. হ্যাঁ উত্তর দিয়েই অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে শালীবাহন। দেখেশুনে দত্তগুপ্ত বললেন, “থাক, আর শাক দিয়ে মাছ ঢাকার দরকার নেই। আমি অনেক আগেই আপনাকে চিনেছি। স্যরি তোমাকে চিনেছি। সম্পর্কটা যখন তুমি আমিতে এসে পৌঁছেছে তখন আর সেটা আপনিতে নিয়ে যাওয়ার কি দরকার।” 
বিক্রম বলল, “আপনি যে আমাকে চিনেছেন তা আমি জানি। ওই যে বললেন আমি শত্রুর নাম ধারন করেছি। রাজা বিক্রমাদিত্যের শত্রু যে রাজা শালীবাহন তা কে না জানে।



(চলবে )

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: