নারী নির্যাতন // একটি বিশ্লেষণ // অভ্র

4545

জ্ঞানবিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দিক দিয়ে বিশ্ব অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করলেও এখনও কিছু কিছু নৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা মানব সমাজকে পীড়া দেয়। এর একটি হচ্ছে নারী নির্যাতন। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকাংশই নারী এবং সমাজের উন্নয়নে তাদের অবদান অনস্বীকার্য।

কিন্তু তারপরেও সাধারণভাবে তারা শান্তি, নিরাপত্তা ও অধিকারের দিক থেকে এখনও পুরুষের সমকক্ষ নয়। পৃথিবীর অনেক অংশে সাধারণ পারিবারিক রীতি অনুযায়ী পুরুষরাই সংসারের অধিকাংশ সম্পত্তির মালিকানা ভোগ করেন। এটি পরিবারের মধ‌্যে ক্ষমতার বৈষম‌্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হয়ে উঠতে পারে।

লিঙ্গ বৈষম‌্যের নিষ্ঠুরতম রূপের একটি হলো নারীদের উপর দৈহিক অত‌্যাচার। কেবল অপেক্ষাকৃত দরিদ্র বা অনুন্নত আর্থিক সমাজেই নয়, সমৃদ্ধ ও আধুনিক সমাজেও এই হিংসার ঘটনা বেশ দেখতে পাওয়া যায়। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের সাম্প্রতিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিশ্বের দরিদ্র জনগণের ৭০ শতাংশই নারী এবং মাত্র এক শতাংশ নারীর নিজস্ব মালিকানায় সম্পত্তি আছে। এ প্রতিবেদনটিই প্রমাণ করে যে, নারীরা কোনভাবেই পুরুষের সমানাধিকার পাচ্ছে না।

এছাড়া দুঃখজনকভাবে বিশ্বের অধিকাংশ দেশে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে। বস্তুত, খুবই সমৃদ্ধ ও অর্থনৈতিক দিক থেকে উন্নত দেশগুলিতে নারী নিগ্রহের ঘটনা আশ্চর্যজনকভাবে বেশি। কিছু সমীক্ষাতেও দেখা যাচ্ছে যে কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই প্রতি বছরে ১৫ লক্ষ ধর্ষণ ও নারীদের উপর শারীরিক নিগ্রহের ঘটনা ঘটে থাকে।

বিশ্বের কমপক্ষে এক তৃতীয়াংশ নারী তার জীবনের কোন না কোন সময়ে শারিরীক নির্যাতন কিংবা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। এছাড়া গর্ভাবস্থায় ভ্রুনের লিঙ্গ শনাক্তকরণের পর বহু মেয়ে পৃথিবীর আলো দেখার আগেই নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হচ্ছে ( বান কি মুন, ২০১৫ )। ভারতের কথায় ফিরে এলে প্রথমেই স্বীকার করতে হয় যে এই দেশে নারী নিগ্রহের ঘটনা খুবই বেশি। এই ভয়াবহ সাধারণ সত‌্যটিকে মাথায় রাখার সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ কিছু সামাজিক বৈশিষ্ট‌্যের কথাও বলতে হয়, যথা পণপ্রথা ও একপেশে আর্থিক বন্দোবস্ত।

নারী নির্যাতনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রূপ হচ্ছে স্বামীর হাতে স্ত্রী নির্যাতন। প্রতি তিন জন নারী’র একজন তার স্বামীর হাতে নির্যাতিত হয়। যে নারী ও পুরুষ জীবনে সুখী হওয়ার জন্য সংসার জীবন গড়ে তুলেছেন, তাদের কাছে এই পরিসংখ্যান অত্যন্ত দুঃখজনক। মার্কিন ফেডারেল পুলিশ বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের শতকরা ৭০ ভাগ পুরুষ তাদের স্ত্রীদের ওপর নির্যাতন চালায়। এর মধ্যে শতকরা ত্রিশ ভাগ নারীর উপর এতো বেশি দৈহিক অত্যাচার চালানো হয় যে, তাদেরকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়।

বিশ্বের বিশেষ কোন একটি দেশে নারীদের ওপর যেমন নির্যাতন চালানো হয় না, তেমনই এ নির্যাতনের ধরনও এক এক জায়গায় এক এক রকম। যেমন নারীদের সম্ভ্রমহানী ও তাদের যৌন ব্যবসায় বাধ্য করার ঘটনা পশ্চিমা দেশগুলোতে বেশি দেখা যায়। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে “অজ্ঞতা”, “কুসংস্কার” ও “অন্যায় সামাজিক প্রথা”র কারণে নারীরা বেশি নির্যাতনের শিকার হয়। এছাড়া নারীরা অনেক সময় সহিংস হামলার শিকার হচ্ছে।

নারী সমাজের পশ্চাদপদতা এবং পুরুষের তুলনায় তারা নিন্মস্তরের এ বিষয়ে বিভ্রান্তিকর চিন্তাধারায় তাদের ভাবনাগুলোকে আচ্ছন্ন রাখার কিংবা তাদের পিছিয়ে রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চলে। এর জন্য শুধু পুরুষরা দায়ী নয়, পুরুষতান্ত্রিকতায় আক্রান্ত নারীরাও অনেক ক্ষেত্রে দায়ী। যুগ যুগ ধরে নারীদের মনে যে ধারণার সৃষ্টি হয়েছে, তা হলো সামাজিক ও রাজনৈতিক কাজ নারীদের জন্য নয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারী শিক্ষা এবং তাদের অধিকার রক্ষার ব্যাপারে বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠন গড়ে তোলার মাধ্যমে নারী নির্যাতন উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে আনা সম্ভব।

তবে সবার আগে সমাজের প্রচলিত ভুল রীতিনীতিগুলোর পরিবর্তন করতে হবে এবং নারীদের প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে হবে। সমাজে নারীকে মানুষ হিসেবে এবং সংসারে নারীকে সম অংশীদারিত্বের মর্যাদা দিতে হবে।

মানব সমাজে অপরাধ নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু দিনে দিনে অপরাধের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। যেমন ধর্ষণ এবং পারিবারিক নির্যাতন এক ভয়ঙ্কর অবস্থায় পৌঁছে যাচ্ছে। বিশেষ করে নারী নির্যাতনের মতো ঘটনা ইদানীং মহামারী আকার ধারণ করেছে। এ নিয়ে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ও কঠোর সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে এর কোনো প্রতিকার হবে বলে মনে হচ্ছে না।

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: