না পাওয়ার হিসাব // সম্পূর্ণা সাহা

04

তখন আমার জীবনে পুরো শনি চলছে। হ্যাঁ,মাথা গরম থাকলে এইসব কথাই বেরোয়। তবে আমার ভাষার ব্যবহারকে গুলি মেরে চলুন ঘটনাটায় মনসংযোগ করা যাক।

আমি তখন আমার কোম্পানির চাকরিটা নিয়ে খুব অসন্তুষ্ট। মাস গেলে যে ক’টা টাকা পাই তাতে ছাপোসা একটা জীবন চালানো ছাড়া অন্যকিছু হয় না। ছেলেটার পড়ার খরচ দিয়ে সংসার চালিয়ে যা থাকে,তাতে মাসে দুইদিনের বেশী বাইরে খেতে যাওয়া যায় না,বছরে একটার বেশী ট্যুর করা যায় না। এর সাথে বসের খিটখিট,ওভার টাইম তো আছেই। এত করেও শান্তি নেই। মনে মনে ঠিক করলাম চাকরিটা ছেড়ে দেবো। এর মধ্যে একদিন বসের সাথে উদুম ঝামেলা হলো। তাড়াতাড়ি অফিস থেকে বেরিয়ে ট্রেন ধরলাম বাড়ি ফিরবো বলে।

ট্রেন থেকে নেমে স্টেশনের একটা ফাঁকা জায়গা দেখে বসলাম কিছুক্ষণ। আকাশ-পাতাল ভাবছি বসে বসে। চাকরি ছাড়লে কী করবো-না করবো এসব ভাবছি। খেয়াল করিনি দূর থেকে দুটো চোখ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ সেদিকে চোখ যাওয়াতে সে আমার দিকে এগিয়ে আসে।

এক ক্ষীণ পুরুষ,চেহারা দেখে ভদ্রলোক মনে না হওয়ায় পুরুষ বলেই সম্বোধন করছি তাকে। তার দুটো হাতে ছোট ছোট দুটো ছেলে। এগিয়ে এসে সে আমার থেকে একটু দূরে ওই ছেলে দুটোকে বসিয়ে নিজেও বসলো পাশে। আমি আড়চোখে সব দেখছি। লোকটি আমতা আমতা করে কিছু বলবে কী বলবে না ভাবছে এমন সময় আমার সাথে লোকটির চোখাচোখি হলো।

সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমাকে বললো-“বাবু,কিছু টাকা দেবেন,ছেলেরা সারাদিন কিচ্ছু খায়নি।বড্ড খিদে পেয়েছে”। আমি এতক্ষণ যা সন্দেহ করছিলাম সেটা সঠিক হলো-ব্যাটা ভিখারী। একে তো মেজাজ খারাপ তারপর এই উঠকো ঝামেলা দেখে রেগে গেলাম। “যা তো এখন”-বলে ঝাঁঝিয়ে উঠলাম।

সে আমার পা জড়িয়ে বসলো-“দিন না বাবু কিছু টাকা,ছেলেরা আমার খিদেয় কষ্ট পাচ্ছে”। আমি আরও রেগে বললাম-“এই তোদের মতোগুলোকে ভালো করে চেনা আছে আমার।অন্যের ছেলে ধরে এনে শহরে পাচার করিস,আর লোকের কাছে ওদের নামে চেয়ে চিন্তে যা পাস নিজের উদর ভরাস। হবে না হবে না-এখন যা”। আমার কথাটা মোটেই ভুল কিছুনা,এখন আকছাড়্ এইসব ঘটনা ঘটে,টিভিতে দেখায়,কাগজে পড়ি।

“না বাবু বিশ্বাস করুন ওরা সত্যি আমার ছেলে। আমি ওদের অন্যের হাতে তুলে দেবো না। ওরা ছাড়া যে আমার কেউ নেই।”
লোকটার কথায় এবার ছেলেদুটোর দিকে তাকিয়ে দেখলাম ভালো করে। সত্যি লোকটার সাথে ছেলেদুটোর মুখের মিল আছে। ওদের শুকনো মুখ দেখে আমার বাবুর মুখটা ভেসে উঠলো।

মনে হলো আমার ছেলেটা খেতে না পেয়ে মুখ শুকনো করে বসে আছে। এসব ভেবে গায়ে কাঁটা দিল। উঠে পড়লাম বেঞ্চ থেকে। সামনে একটা দোকানে পরোটা বানাচ্ছিল,সেখান থেকে প্রথমে বাচ্ছাদুটোকে পরোটা কিনে দিলাম,তারপর ওই লোকটাকে,অবশেষে নিজেও খেলাম। লোকটি আমার পাশে বসে খাচ্ছিল,আর আমি খাচ্ছিলাম কম,ওকে দেখছিলাম বেশী।

আমার চারগুণ বেশী তাড়াতাড়ি সাবাড় করলো পরোটাগুলো। বুঝতে বাকি থাকে না যে ওর পেটে কিছু পরেনি কয়েকদিন। দোকানদারকে বললাম ওকে আরও ক’টা পরোটা দিতে। আমার এই বিনম্র স্বভাবে সে একটু অবাক হলো বটে। প্রথমে যেভাবে ব্যবহার করেছি,তারপর এই ব্যবহার সত্যি আশ্চর্যকর। ওই ‘জুতো মেরে গরুদান’-এর মতো।

ধীরে ধীরে সে একটু হালকা হলো। নিজের কষ্টটা আমাকে বলা শুরু করলো। জানতে পারলাম সে তিনদিন কিছু খায়নি। তবে তাতে ভ্রুক্ষেপ নেই,ছেলেদুটোকে আগলে রাখায় তার যত ব্যস্ততা। এটা তার বাবা হওয়ার দায়িত্ব। লোকটির বাড়ি কোনো এক গ্রামে-নামটা এখন আর মনে নেই,বেশ খটোমটো নাম ছিল তো। শেষ বর্ষায় তার গ্রামে বন্যা হয়, মা-বাবা,বউ,ভাই সবাই তখন মারা যায়। ঘর-বাড়ি,চাষের জমি সব ভেসে যায়।

ছেলে দুটোকে বাঁচাতে একপ্রকার পালিয়ে আসে সেখান থেকে। তারপর থেকে চলছে রোজ এক লড়াই, বাঁচানোর লড়াই-বাঁচার লড়াই। ভিক্ষা করে যখন যা পায়,সেই দিয়েই চলে দিন। গায়ে-গতরে খেটে উপার্জনে রাজি সে,তবে এই পোড়া শহর তাকে সেটুকু দিতে পারেনি। অচেনা লোক বলে সে কাজ পায়না,যেখানে পায় সেখান চায় পরিচয় পত্র।

হায় অদৃষ্ট!পালিয়ে এসে বাঁচার জন্য লড়ছে যে,তার আবার পরিচয় লাগে? সাহসিকতা,অসহায়তা,প্রবল ইচ্ছাশক্তি কী যথেষ্ট নয়? এই সমাজে এটাই নিয়ম? নিয়মের অদৃশ্য শিকলে যে সবাই বন্দী।
অবাক করা একটা বিষয় লক্ষ্য করলাম ওই লোকটির মধ্যে। আমাকে সে শোনালো তার ছোট বয়সের গল্প। বাবা-ঠাকুরদাদার আমল থেকেই তাদের চাষবাস ভরসা।

ছোট বয়সে গ্রামে তার কাটানো দিনগুলো,বড় হয়ে ওঠা-সমস্ত গল্প সে বলে আমাকে। প্রিয়জনকে হারিয়ে মানসিকভাবে দুর্বল সে,তবে বাঁচার লড়াই করতে সে পিছু পা হয় না। আশ্চর্য লাগে কীভাবে সব হারিয়েও স্বপ্ন বুনছে সে,স্বল্পতায় মানিয়ে নিচ্ছে। সেদিন আমি বুঝলাম,আমার থেকেও খারাপভাবে কতজনে বেঁচে আছে,এবেলা খেলে ওবেলার কথা ভাবতে হয়,অভাবে না খেয়েও থাকতে হয়,তাতেও মানিয়ে আছে,নিজের দায়িত্ব পূরণ করছে মুখ বুজে। তাহলে আমি কেন পারবো না?

ওদের থেকে অনেক বেশী স্বাচ্ছন্দ্য আছে আমার। আমার যা আছে,কতজনের সেটুকুও নেই,তাই আমিও থাকতে পারি খুশি-এইটুকুতেই। নিজের কথা না ভেবে ছেলেটাকে মানুষ করার দায়িত্বটা পালন করতে হবে। আর ভালো থাকার জন্য শুধু অর্থ না,ভালো মনেরও দরকার হয়।
হঠাৎ লোকটি পাশ থেকে উঠে পড়ল। আমাকে বিদায় জানিয়ে ছেলেদুটোকে নিয়ে এগিয়ে চলল এক অনির্দিষ্ট ভবিষ্যতের কাছে,আমি দূর থেকে দেখলাম সেই দৃশ্য।

ধীরে ধীরে ভীড়ে হারিয়ে গেল তারা। এক গ্রাম্য-অশিক্ষিত(শহুরে ভাষায়) শিখিয়ে গেল জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। আর কোনোদিন দেখিনি ওদের,স্টেশন চত্তরে কতদিন খুঁজেছি-পাইনি। কী জানি হয়তো আরও কোনো শর্মাকে সে তার অশিক্ষিত ভাষায় শেখাচ্ছে বাস্তবিক সত্য।
সেদিন রাতে বাড়ি ফেরার সময় স্টেশনে দেখলাম একদল অসহায়ের বাঁচার লড়াইয়ের চিত্র। অদৃষ্টকে ধন্যবাদ জানালাম আমাকে এতকিছু দেওয়ার জন্য।

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: