পাউরুটি -অসীম কুমার চট্টোপাধ্যায় (ভবঘুরে)

সকাল থেকেই বাড়িতে চিৎকার চেঁচামিচি । এমনিতে খুবই শান্ত থাকে বাড়িটা ।কিন্তু আজকের ব্যাপারটা আলাদা ।  এক বাড়ি লোক । টালিগঞ্জ থেকে বড় মামা এসেছে ।  সাথে মামী আর কমলিকার বয়সী মেয়ে দ্বিপান্বীতা । বড় মামা  উকিল । কলকাতা হাইকোর্টে প্রাকটিস করেন । যথেষ্ট নাম ডাক । চন্দন নগর থেকে এসেছে ছোট পিসিমা । বিধবা মানুষ । সত্তরের ওপরে বয়স ।

এখনো এই পরিবারে শেষ কথা বলেন তিনি । মেজমামা ফোন করেছে ।  গাড়িতে আসছে বাগুইআটি থেকে । মাঝ রাস্তায় টায়ার পাংচার । আসতে  একটু দেরি হবে । কমলিকার বাবার দুই ঘনিষ্ট বন্ধু এসেছেন । একজন আছেন কলকাতা পুলিশে আর একজন রাজনৈতিক নেতা । মা আর পিসিমা সকাল থেকেই কমলিকাকে তার এই অসভ্যতামির জন্য বকাবকি করে চলেছেন । এই তোদের শিক্ষা ।

মানুষকে তার প্রাপ্য সম্মান দিতে শিখলি না । এখন দেখ কেমন লাগে । মাঝে বাবা এসে বললেন , তোমরা একটু থামো তো । স্বামী -স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া কোথায় হয় না ? তাই বলে। . । না না , এ আমি মানতে পারছি না । এর একটা বিহিত না করে ছাড়বো না । পিসিমা বললেন , দেখ ছোটু , রাগের মাথায় কিছু  করিস  না । মাথা শান্ত কর । বাচ্চা  মেয়ে । সারা জীবন এখনো পড়ে  আছে । ওই মনে হয় মেজ এল ।

           কমলিকার  বিয়ে হয়ে গেছে । থাকে কোন্নগরে । নতুন কেনা ফ্ল্যাটে । গঙ্গার  ধারেই  । সৌমিত্রের মানে কমলিকার  স্বামীর এখানে আসার ইচ্ছা ছিল    না । বাবা মায়ের বয়স হয়েছে । তার ওপর বাবা অসুস্থ । হার্টের পেসেন্ট । ডাক্তার কাকু নিষেধ করেছে । ঘরেই থাকে । সব কাজ মাকেই করতে হয় । নারুর  মা অবশ্য আছে । ঠিকে  কাজ করে ।

 খুব বিশ্বাসী । মা কে  খুব ভালো বাসে । আসলে মা ও তো গোপনে ওর যখন যা দরকার সে টাকাই  হোক বা অন্য  কিছু দিয়ে    দেয় । বাবা জানতেও পারে না । সৌমিত্রর  দাদা বাইরে থাকে । বাড়ির সাথে খুব একটা সম্পর্ক রাখে না । তবে প্রয়োজন পড়লে ফোন করে । এক নাটক   প্রতিবার । প্রথমেই বলবে । অফিস থেকে ফোন করছি । 

মৌপ্ৰিয়া জানে না । কে কেমন আছে এই সব ছাই পাশ বলে তার পর মোদ্দা কথাটা পারবে । কিছু টাকা চাই । একটু অসুবিধায় পড়েছি । মা সব জানে । বোঝে । কিন্তু কী  করবে ? হাজার হলেও মা । সন্তান চাইলে না তো বলতে পারে না । সন্ধ্যে বেলায় অফিস থেকে ফিরে  সৌমিত্র যখন ল্যাপটপ নিয়ে কাজে ব্যস্ত , চুপি চুপি মা ঢুকবে ঘরে ।

 হাতে চায়ের কাপ । পাশের ঘরে কমলিকা তাদের মেয়ে মলিকে নিয়ে বসেছে পড়াতে । টেবিলের এক কোনে চায়ের কাপটা রেখে সৌমিত্রর পেছনে এসে দাঁড়াবে  । পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বলবে দাদার কথা । মানে দাদাকে টাকা পাঠাতে হবে । মুচকি হাসে সৌমিত্র ।

 বলে ঠিক আছে  । কালকে অফিস থেকে দাদার  একাউন্ট এ পাঠিয়ে দেব । মা চলে যায় । আর ঠিক তখনি ঘরে ঢোকে কমলিকা ।ঝড়ের গতিতে । প্রথমেই বলবে , তোমার মা এসেছিল ? কেন ,  বড় ছেলের জন্য     টাকা চাইতে  ? 

কী  ভেবেছে তোমার মা , আমাদের টাকার কল আছে না খাজাঞ্চিখানা ? এতই যখন দরদ শ্বশুরের থেকে টাকা নেয় না কেন ?  তোমাকেও বলিহারি । মা চাইলো আর অমনি  দিয়ে দিলে । কেন , না বলতে পারো না । অত পীড়িত যখন মা র সঙ্গে থাকলেই পার । কই  আমার বাবা মার  জন্য তো এক পয়সা বের হয় না ।

বিয়ের পাঁচ বছরে আমার বাপের বাড়ির জন্য মাত্র একটা ওয়াশিং  মেশিন আর একটা  ব্রেভিয়া ওয়াল হ্যাঙ্গিং টিভি কিনে দিয়েছ । গতবার পুজোয় কত করে বললাম , মার জন্যে একটা ঊষা সেলাই মেশিন কিনে দিতে । দিলে না । এবার বাবার জন্ম দিনে বললাম একটা স্মার্ট ফোন কিনে দিতে । দিয়েছ ? বললে পরে দেবে ।

সেই পরটা  কবে আসবে   শুনি ? শোনো , আমি বাড়িতে  ফোন করে বলে দিয়েছি পয়লা বৈশাখ আমরা যাচ্ছি । ওই দিনই কিন্তু বাবাকে সারপ্রাইস দেব । রিলায়েন্স ডিজিটাল আমি দেখে এসেছি । পাশের বাড়ির সুপর্ণা  বৌদির  সাথে গেছিলাম । সুপর্ণা বৌদির হাসবেন্ড আলোকেশদার মত মানুষ হয় না । কোনো ব্যাপারেই প্রশ্ন করে না  । কিনে আনলো সুপর্ণাদির বাবার জন্য একটা স্মার্ট ফোন ।

কী  সুন্দর দেখতে । আমিও সুপর্ণাদির সাথে গিয়ে কিনে আনবো  । এরপর দুদিন ধরে কমলিকা এত অশান্তি করলো যে সৌমিত্র বাধ্য হয়ে  টাকা ধার করে এনে দিল কমলিকা কে । কিন্তু এতেই সব সমস্যার সমাধান হলো ? না , হলো না । বরঞ্চ বেড়ে গেল । সে অফিসে চলে গেলেই মার সাথে  অশান্তি করত ।

সেটা এমন পর্যায়ে গেল যে মা বুকে পাথর চেপে সৌমিত্রকে বলতে বাধ্য হলো অন্য  কোথাও উঠে যেতে । একসাথে আর থাকা সম্ভব নয় । একান্তে কেঁদেছিল সৌমিত্র । সে স্বপ্নেও ভাবে নি তাকে একদিন মা বাবাকে ছেড়ে চলে যেতে হবে । শুধু মাত্র বৌকে খুশি করতে । চলে এসেছিল নতুন ফ্ল্যাটে ।

      কমলিকার বাবা সুজিত মুখার্জি । ব্যবসা  করেন। অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি থেকে অর্ডার নিয়ে বন্দুকের স্পেয়ার স্পার্টসের । উল্টোডাঙা খালের ধারে পুরনো বস্তিতে অনেক ছোটো ছোটো কারখানা আছে । ওখান থেকে মাল বানায় । 

প্রফিট ভালোই থাকে ।  কমলিকাদের বাপের বাড়ির অবস্থা ভালোই । একটা অ্যাম্বাসেডর  গাড়ি ছিল । সেটা বিক্রি করে এখন নতুন জাইলো কিনেছে । শ্যামনগরে  নিজেদের দোতালা বাড়ি । কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ের ধারে  বিঘা দশেক একটা বাগান বাড়ি আছে । ওখানে একটা ছোট ফ্যাক্টরি বানিয়েছে । 

নিজের ফ্যাক্টরিতে মাল বানায় । এতে মার্জিন ভালো থাকে ।  প্রতিবছর বিশ্বকর্মা  পুজো হয় । বেশ জাঁকজমক  করেই । কমলিকা মেয়ে মলি কে নিয়ে দু দিন আগেই চলে আসে । রাত্রি বেলা সৌমিত্র  আসে । অফিস ফেরত । খাওয়া-দাওয়া করে ফ্ল্যাটে  ফিরে  যায় । কমলিকা থাকে আরো দু’দিন । বাবার গাড়ি পৌঁছে দেয় । এভাবেই চলে আসছিল । কিন্তু গোল বাধলো  এবার । সৌমিত্রর শরীরটা ভালো ছিল না ।

জ্বর জ্বর ভাব । সাথে প্রচন্ড মাথা ধরা । অফিস থেকে ফোন করে কমলিকাকে জানিয়ে ছিল সে কথা । কমলিকা বলেছিল ওসব নাটক তার জানা আছে । আসলে না আসার ছুতো । আসতে  তাকে হবেই । বেচারা সৌমিত্র ! শান্তি বজায় রাখতে গিয়ে তার জীবন  হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ । সে আর পারছে   না । প্রতিবারের মত এবারেও পুষে রাখলো রাগ মনের গভীরে । শরীর খারাপ নিয়েই এল শ্বশুর বাড়ি বিশ্বকর্মা পুজোয় ।

রাত্রে খাওয়ার সময় সে জানালো তার শরীর খারাপ । সে কিছু খাবে না । শাশুড়ি বললেন কিছু একটু খাও । বলো , কী      খাবে ? সৌমিত্র বলল , এক কাপ চা আর দু পিস্ পাউরুটি । পুজোর বাড়িতে থুড়ি কারখানায় পাউরুটি পাবে কোথায় ? তার ওপর হাইওয়ের ধারে  কোনো দোকানও নেই । আছে বটে , সে তো স্টেশনের দিকটায় । একটি ছেলেকে পাঠানো হলো । রাত্রি অনেকটাই  পরিণত ।

ঘেমে নিয়ে ফিরে  এল ছেলেটি । পাউরুটি পাওয়া যায় নি । লজ্বায় পড়ে গেলেন শ্বাশুড়ি । জামাই বলে কথা । খুব ভালো ছেলে । মনে মনে যথেষ্ট স্নেহ করেন ।কিন্তু মেয়ের ভয়ে থাকতে হয় চুপ করে । কী  যে করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না । ছেলেটিকে বললেন  , বাবা , আর একটি বার দেখে  আয় । অন্য্ কোথাও যদি একটা পাউরুটি পাওয়া যায় । কারখানার ম্যানেজার দুলাল দাস সবটা শুনে বলল , বৌদি আমি দেখছি ।

স্কুটিটা নিয়ে বেরিয়ে গেল দুলাল ।একটা প্লেটে কয়েকটা মিষ্টি দিয়ে গেলেন । বললেন , পাউরুটি পাওয়া যায় নি । চা পাঠিয়ে দিচ্ছি । সৌমিত্র বলল , মিষ্টিটা নিয়ে যান । শুধু চা হলেই হবে । মলি তখন ছিল বাবার ঘরে । ছুটে মা র  কাছে গিয়ে বলল , মম , দাদি মিষ্টি দিয়েছে কিন্তু বুবা বলছে খাবো না ।

ঝড়ের গতিতে ঘরে ঢুকলো কমলিকা । পেছন পেছন মেয়ে মলি । সৌমিত্রকে শুয়ে থাকতে দেখে চিৎকার করে উঠলো । এক  বাড়ি  লোকের সামনে আমার মা কে  তোমার অপমান না করলে চলছিল না ? তোমার মা তোমাকে এই শিক্ষা দিয়েছে । আর শেখাবেন কী  ভাবে ? তার নিজেরই কী  শিক্ষা দীক্ষা । ছোটো লোকের ছেলে ছোটোলোকই  হয় । পুজোর দিন পাউরুটি ! কেউ কোনো দিন

শুনেছে ? তোমার মা কী তোমাদের বাড়িতে পুজোতে সবাইকে পাউরুটি খাওয়াতেন । মানুষকে বিপাকে না ফেললে চলে না ? এই রাত্রি বেলা কোথায় পাবে পাউরুটি ? সিন ক্রিয়েট করা টা তোমাদের গুষ্টির স্বভাব ।

     অনেক সহ্য করেছে আর নয় । আমাকে যা বলার বলো । আমার নিরীহ মাকে এই সব নোংরা কথা বলা । যে কি না কোনো  কিছুর সাথে পাছে  নেই । জ্বরটা অনেক বেড়েছে । তার সাথে মাথার য্ন্ত্রনাটাও । কোনো মতে বিছানা থেকে উঠে সপাটে চড় কষিয়ে দিল কমলিকার গালে । বলতে গেছিল ,ইউ বাস .. কিন্তু শ্বাশুড়ীকে দরজার সামনে আসতে দেখে নিজেকে কন্ট্রোল করে নিল ।

পাউরুটি পাওয়া গেছে । একটা ট্রেতে চার পিস সেঁকা  পাউরুটি । আর এক কাপ চা । সব শুনেছেন । সব দেখেছেন । কিন্তু একটা কথাও বললেন না । টেবিলের ওপর ট্রে  টা  রেখে যেমন এসেছিলেন ঠিক সেভাবেই নিঃশব্দে চলে গেলেন । চলে গেল সৌমিত্র । চুপচাপ । পড়ে থাকলো পাউরুটি । শুধু এল উকিলের চিঠি । সৌমিত্র ডিভোর্স চায় । না না , ডিভোর্স নয় । মুক্তি চায় । 

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: