পারুলবালা // সুবীর কুমার রায়

পারুলবালা // সুবীর কুমার রায়
শ্বশুরের পৌনে এক কাঠা জমির ওপর টালির চালের দেড়খানা মাটির ঘরে ছেলেকে নিয়ে বাস করে বাল্য বিধবা পারুলবালা। পাড়ার সবার বিপদের ত্রাতা, পারুল। বেশ কয়েক বাড়ি কাজ করে সে অতি কষ্টে সংসার চালিয়ে ছেলেকে বড় করেছে। ঠাকুর দেবতায় তার অগাধ বিশ্বাস। অল্প জায়গার ওপর টালির চালের মাটির বাড়ি হলে কি হবে, বাড়ির সামনের অধিকাংশ জমিই সে নিজের জন্য ব্যবহার না করে, অতি কষ্টে সাদা পাথরের তৈরি ছোট্ট একটা মন্দির করে মা কালীর এক মুর্তি প্রতিষ্ঠা করেছে।
লোকে বলে পারুলের স্বপ্নে পাওয়া দেবীটি খুব জাগ্রত, তাঁর কাছে ভক্তিভরে চাইলে, সকল মনস্কামনা পূর্ণ হয়। বাড়ির সামনে সকাল বিকাল বহু মানুষের ভিড়। দিনের মধ্যে যতটুকু সময় পারুল পায়, মন্দির পরিচর্যার কাজেই ব্যয় করে। আর কাউকে মন্দির, বা মন্দির সংলগ্ন বাঁধানো জায়গাটা পরিস্কার করতেও পারুল কোনদিন দেখেনি। পূজার প্রসাদ হিসাবে কোন ফল বা মিষ্টিও তার হাতে কেউ কোনদিন তুলে দেয়নি, অবশ্য পারুল সেটা আশাও করে না।
বেশ চলছিল, সমস্যা দেখা দিল পারুলের ছেলের বিয়ে ঠিক হওয়ায়। একটা অতিরিক্ত ঘর তৈরি না করলে, সেই শুভ কাজটি সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। জমি অনেকটাই আছে, মন্দিরটি একটু এগিয়ে তৈরি করলেই, সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। নিজেদের খরচ কমিয়ে, ধারদেনা করেও সে সকলের জন্য নিজেই আবার নতুনভাবে মন্দিরটি তৈরি করে দিতেও চায়, কিন্তু তার জন্য পারুলের জমির অংশ ছাড়া আর সামান্য একটু জমির প্রয়োজন।
বাড়ির সামনের ফাঁকা জমিটি ধনী ব্যবসায়ী অলোকবাবুর। তিনিও গরদের কাপড় পরে ওই মন্দিরে পূজো না দিয়ে কোনদিন জল পর্যন্ত পান করেন না, কারণ তাঁর বিশ্বাস মায়ের আশীর্বাদেই তাঁর ব্যবসার আজ এই রমরমা অবস্থা। তাঁর প্রাসাদসম বাড়িটির ঠিক পিছনেই, পারুলের জমি সংলগ্ন অনেকটা জমি ফাঁকা পড়ে আছে। তাছাড়া পারুল তাঁর বাড়িতে বাসন মাজা, ঘর মোছা, ইত্যাদি কাজও করে। তাই সাহস করে সে অলোকবাবুকে চার-পাঁচ ফুট জমি তাকে মন্দির নির্মাণের জন্য দান করতে অনুরোধ করে, যাতে পারুলের জমির সাথে তাঁর সামান্য জমিটুকু নিয়ে সে নিজ খরচায় আবার মন্দিরটি তৈরি করতে পারে।
ছেলের বিয়ের জন্য মন্দিরটি ভাঙতে হবে শুনে অলোকবাবু আঁতকে ওঠেন। পাড়ার এতগুলো লোকের বিশ্বাস ধুলিসাৎ করে মন্দির ভেঙে জাগ্রত দেবীর বিগ্রহ স্থানচ্যুত করার ফল খুব সুখকর হবে না বলে ভয়ও দেখান, কিন্তু নিজ জমির এক ইঞ্চি জায়গাও তিনি মন্দিরের জন্য ছাড়তে রাজি নন বলে পরিস্কার জানিয়ে দেন। মাসে মাসে পারুলের মাইনে থেকে জমির দাম শোধ করে দেওয়ার প্রস্তাবে, তিনি উত্তেজিত হয়ে ‘তোর বড় টাকার দেমাক হয়েছে’, ইত্যাদি বলে চিৎকার করতে থাকেন।
বাধ্য হয়ে পারুল পাড়ার সবার কাছে, বিশেষ করে যাঁরা রোজ সকাল-সন্ধ্যা মায়ের আরাধনা করতে আসেন, তার হয়ে অলোকবাবুকে অনুরোধ করতে বলেন, কিন্তু তার প্রস্তাবে কেউই সাড়া দিলেন না।
সব কিছুই আগের মতো চলতে লাগলো, অলোকবাবু রোজ সকালে গরদের কাপড় পরে মায়ের মুখ দর্শন করে পূজো দিয়ে বাসায় গিয়ে জলপান করেন। অন্যান্যরা রোগমুক্তি, অর্থ কামনা, পুত্র কামনা, ব্যবসা বা চাকরিতে উন্নতি, মামলায় জয়, ইত্যাদি কামনা করে মন্দিরে পূজা বা প্রণাম করতে নিয়মিত আসেন।
পারুলও তার ছেলের বিয়ে দিয়ে পুত্রবধু ঘরে নিয়ে আসে। পারুল আগের মতোই বাড়ি বাড়ি কাজ সেরে, মন্দির পরিস্কার করে, রাতে এখন মাদুর পেতে মন্দিরের বাইরেটায় খোলা আকাশের নীচে শোয়। সবাই দেখে, এই অবস্থায় তার ছেলের বিয়ে করা উচিৎ হয়েছে কী না, বা ছেলের এখন তার মায়ের জন্য কি করা উচিৎ, ইত্যাদি নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করলেও বা পারুলকে মুখে কিছু না বললেও, দেবী মুর্তিটির সেই হাসি মুখ ও কমনীয় দৃষ্টির কিছু পরিবর্তন হয়েছে বলে তাদের যেন মনে হয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *