পেটের পীড়া -কামরুল হাসান

‘খাঁটি’ জিনিস এই কথা রেখোনা আর চিত্তে

‘ভেজাল’ নামটি খাঁটি কেবল আর সকলই মিথ্যে।

-সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘ভেজাল’ কবিতার এই দুটি পংক্তি কী বর্বর বাস্তবতা  তা হাড়ে হাড়ে হজম করছি  আমি।

ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার আলাপ-আলোচনা পর্ব থেকেই আরম্ভ হয় কী কী খাব  সেসবের পর্যালোচনা। চলনবিলের চান্দা-পুঁটির চরচরি, আত্রাই নদীর গাং ঘাইরা, পাবদার ঝোলের তরকারি নিয়ে কথা উঠলেই জিভে জল এসে যায়। এছাড়া আম-কাঁঠালসহ মৌসুমি ফল-ফলাদি তো আছেই। অর্থাৎ খাঁটি জিনিস খাওয়ার আক্ষেপ-আফসোস, আকুলতা-অস্থিরতা ফুটে উঠে নানাভাবে। বাড়ি যাওয়ার দিন সামান্য কিছু মুখে দিয়ে সাতসকালে যাত্রা শুরু করি। ভ্রমনকালেও ভক্ষণ করি না তেমন কিছু। মা ও ভাবির হাতের নানা পদের মাছের তরকারি, ভর্তা দিয়ে শান্তিমতো রয়ে-সয়ে মজা করে খাওয়ার স্বাদ হাতছাড়া করার সাহস করি না। প্রথম দিন বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপণা নিয়ে তৃপ্তিসহকারে তৃপ্ত হতে থাকি। গোংসা টেংরার ঝোল, লাইয়্যা গুচি-বায়েম মাছের ভুনা নাকি চিংড়ি মাছের ভাজি কোনটা রেখে কোনটা খাই খেতে খেতে খেই হারিয়ে ফেলি।

দমে যাই দিনখানেক পরেই। বিগড়ে বসে পেট। ছোট ঘরের সাথে সম্পর্ক সুগভীর হয়। ঝাল হয়েছে, ঝোল হয়েছে, একটু সবজি দিলে স্বাদ বাড়ত, ভাত শক্ত বা নরম হয়েছে-অন্তহীন অজুহাতে আহার কমিয়ে দেই। একদিনের ব্যবধানেই বিপুল উচ্ছ্বাসের ভাটার টান। ছোট ঘরের সাথে উঞ্চতার চরম উন্নতি ঘটে। পেটের সাথে মনও বিগড়ে বসে। একটু কাচকলা সবজি করে দিত পারোনা, পেঁপের ঝোল করতে পারোনা, সামনে ওই খাবারটা দিলে কেন-শুরু হয় ছোটখাটো বিষয়ে বউয়ের সাথে বড় বড় মেজাজের বাড়াবাড়ি। বাজারে টং ঘরের চায়ের আড্ডায় সবাই তিরস্কার করে যে, ‘ভেজাল খাতে খাতে তোর প্যাটই ভেজাল হয়া গ্যাছে’। যথারীতি আরেকটি উড়ন্ত স্বপ্নের করুণ পতন। রসনা বিলাসের বদলে বিষাদময় শরীর-মন নিয়ে ঢাকা ফিরি।

করোনাকালের অনাকাংখিত দীর্ঘ ছুটিতে অতি কাংখিত ইচ্ছে পূরণের আশা সমাগত। সুতরাং করোনার ভাবনার মাঝেও মন ভরানোর সুযোগ চলে আসে সামনে। নতুন পরিকল্পনা নিয়ে নামি। চূড়ান্ত ক্ষুধায় সবকিছু দ্রুত চুরমার হয়ে যায়। তাই খেতে হবে ক্ষুধা লাগিয়ে। কথায় বলে, পরিকল্পনা করা যত সহজ, বাস্তবায়ন ততই কঠিন। তার মানে যে লাউ সেই কদু। চোখের সামনে সবকিছু গোগ্রাস করি। ফলাফল, দিনখানেক পর পুরাতন দুর্দশা নতুনরূপে দাপিয়ে বেড়ায়।

এবার ঈদুল আযহায় অবস্থা তো অসহনীয় পর্যায়ে চলে যায়। ঈদের আগের দিন থেকে প্রায় টানা তিন দিন ছিলাম জাউ খেয়ে। পেটের সমস্যায় এই প্রথম খেতে হলো এন্টিবায়েটিক। ঈদের দিন বিকেলে ভাবলাম, ওষুধ খাব আর মাংস খাব। কিন্তু অসুখের কাছে ওষুধ হেরে গেল। ঈদের পরেরদিন মামার বাড়িতে অনুষ্ঠানে যাওয়া হলো না। তারপরের দিন ভাগ্নির বাড়িতে নাতির আকিকাতে ডিম ভাজি দিয়ে ভাত খেলাম। ডিমও দুর্ভোগ বাড়িয়ে দিল। নিজের উপর বড়ই ত্যাক্ত-বিরক্ত। সবাই গ্রামে মহানন্দে খায়, ঘুরে-ফিরে। আর আমার ঘটে উল্টোটা। ঠিকানা হয় শোবার ঘর আর টয়লেট ঘর। আর এভাবেই শেষ হতে চলল দুর্ভোগ-দুর্ভাবনার সাত দিনের ছুটি। ভাবছি, যাক ঢাকা গিয়ে পেট নিয়ে অন্তত গড়াগড়ি খেতে হবে না। দুর্ভোগ দূরে ঠেললেও সে কিন্তু আমার দুয়ারেই দাঁড়িয়ে। পড়ন্ত বিকেল। আমি যাব বাজারে। এদিকে বউ-বাচ্চা বেড়াবে বিলে। আবদার পরবর্তী ঘটনা কবিতার কথায়…

         পেটের প্রবলেম

বউ-বাচ্চা বেড়াবে নৌকায় প্রাণের চলনবিলে

ঘুরে ঘুরে শাপলা-শালুক তুলবে সবাই মিলে।

মাঝে মাঝে পেটের ডান-বামে দেয় কিছু মোচড়

কারও হওয়ার কথা নয় এই সমস্যা দৃষ্টিগোচর।

বাজারে, নাকি টয়লেটে যাব নাকি নেব বৈঠা হাতে

নিম্নচাপ শুরু হলে কী হবে দশা ওই না জলের মাঠে?

চলনবিলে বইছে তখন মাতাল দমকা ঝড়ো বাতাস

নৌকা সামাল দিতে হবে কি আমার মহা সর্বনাশ?

একবার করে লগি-বৈঠা দিয়ে দেই নৌকা ঠেলা

পেটের ভিতর মোচড়ামুচড়ির চলে কত খেলা।

কখনও কখনও শীতল বাতাসে লাগে বেশ ভালো

একটু পরেই নিম্নচাপে মুখটি আবার বেজায় কালো।

বউ-বাচ্চা ফুল তোলে, তোলে শাপলার অনেক ঢ্যাপ

আমি শুধু খুঁজি নৌকা ঘাটে ভিড়ানোর শর্টকাট ম্যাপ।

যা হউক, এ যাত্রা  বিরাট বিপদ হতে পরিত্রাণ পেলাম। আল্লাহকে ডাকতে ডাকতে বউ-বাচ্চার শাপলা-শালুক তোলা শেষ হলো। লগি-বৈঠা ফেলে দিলাম এক দৌড়। আহা কী যে শান্তি পেট খালি করে। গোপাল ভাঁড়ের মলত্যাগের গল্পটির মতোই শান্তি। 

অনেকেই হয়তো অবগত আছেন গোপাল ভাঁড়ের সেই বিখ্যাত গল্পটি সম্বন্ধে। তারপরেও বলি, রাজার পুত্র সন্তান হয়েছে-এই সুখবরে রাজদরবারে সাজ সাজ রব। সবাই নানাভাবে খুশির উপমা উপস্থিত করছেন। গোপাল ভাঁড়ের মন্তব্য না পাওয়া পর্যন্ত মন ভরছে না রাজার। গোপাল ভাঁড় রাজদরবারে আসলেন একটু বিলম্বে। রাজা জানতে চাইলেন, গোপাল আমার পুত্র সন্তান হওয়ায় কেমন খুশি হয়েছো? গোপাল উত্তর দিলেন, সকালে তীব্র বেগ পাওয়া প্রাতঃকর্ম হওয়ার মতো খুশি হলাম। রাজপুত্র আগমনের সাথে মলত্যাগের তুলনা! রাজা গোপালের উপর বেশ অসন্তষ্ট হলেন। রেগে প্রিয় গোপাল ভাঁড়কে শাস্তি দেয়ার চেষ্টাও বাকী রাখলেন না। তো একদিন রাজা উজির-নাজির, সৈন্য-সামন্ত নিয়ে নৌবিহারে বের হলেন। যাত্রাপথে রাজার তলপেটে হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল। একপর্যায়ে অসহনীয় বেগের সৃষ্টি হলো। রাজা গোপালকে বললেন নৌকা ভিড়াও, পেটে পীড়া । গোপাল চালাকি শুরু করলেন। ওখানে মেয়েরা গোসল করে, ওখানে আড়াল নেই, ওখানে শ্মশান-নানা অজুহাতে বিলম্ব করতে লাগলেন গোপাল ভাঁড়। রাজার অসহ্য পর্যায়ে গেলে নৌকা ভিড়ানো হয়। রাজা কোনমতে দৌড়ে গিয়ে মলত্যাগ করেন। ফিরে এসে বলেন, গোপাল কী যে আরাম পেলাম! গোপাল ভাঁড় তখন মুচকি হেসে বলেন, আপনার পুত্রের জন্মেরদিন আমিও এমনি সুখ অনুভব করেছিলাম। মহা শান্তির মলত্যাগ করে বিছানায় শুয়ে শুয়ে গোপাল ভাঁড়ের এই গল্পটিই বারবার মনে পড়ছিল।

বিচিত্র মানবজাতির কত স্বাভাবিক-অস্বাভাবিক, বিচিত্র-অদ্ভুত সমস্যা রয়েছে তা লিখে শেষ করা যাবে না। আমার সমস্যা হলো, পেটের মহা পীড়া। সমস্যা এতটাই প্রকট যে, একটু ঝাল খেলে বা খাওয়াতে সামন্য উনিশ-বিশ হলেও পেট বিদ্রোহ করে বসে। এখন কেউ পরামর্শ দিতে পারেন, নিয়ন্ত্রিত নিয়মে খেলেই তো হয়। যৌক্তিক কথা বটে। কিন্তু মায়ের হাতের বাড়ির গরুর দুধের পায়েস, পিঠা, একটু চাপড়ি, গরম গরম মুড়ি, চাল ভাজার কাছে যে যুক্তি খাটে না। আর এভাবেই এটা সেটা খেয়েই ক্ষুধা যায় হারিয়ে। প্রায় ভরাপেটে ভাত খেলে ১০-১১ নং লক্করঝক্কর মার্কা বাসের মতো আমার দুর্বল পরিপাকযন্ত্রের অকেজো হয়ে পড়ে থাকাই স্বাভাবিক। 

আমার পরিপাকযন্ত্র এতটাই দুর্বল অথবা অদ্ভুত যে, গ্রামের গভীর নলকূপের সুপেয় পানিও হজম করতে অক্ষম। পানি বাজার থেকে কিনে খেতে হয়। কবি সুকান্তের মতো মনে হচ্ছে, আমার ক্ষেত্রে ভেজালই খাঁটি।  ভেজাল খেতে খাঁটি জিনিস আর সহ্য হচ্ছে না। এখন বলতে পারেন, ভালো চিকিৎসা করালেই তো ঝামেলা মিটে যায়। ঠিক তাই, ডাক্তার ব্যবস্থাপত্র দিয়েছেন। ব্যবস্থাপত্র হলো, যা খেলে ভালো থাকেন তাই খাবেন। আর যা খেলে খারাপ থাকেন সেগুলোর সবই বাদের খাতায়।

ফ্যাক্ট: আইবিএস (ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম)।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top