প্রতিরোধ — বন্য মাধব

প্রতিরোধ    --   বন্য মাধব

অঙ্ক পরীক্ষা খারাপ হলো, কেন হলো বুঝতেই পারলাম না, শালা, মাথা কেমন গুলিয়ে গেলো, মাধ্যমিকেও এমনটা হয়েছিল, সেটা সামলাতে পেরেছিলাম, এটা আর পারলাম না, ভাগ্য কিছুটা হলেও ভাল রে – অ্যান্টি বলেছিলেন, চুলচেরা কাটাছেঁড়া করে সেদিনই সন্ধ্যেবেলা তিনি জানিয়ে দিলেন – ৭৫ থেকে ৮২ পাবই, আমি চুপচাপ হয়ে গেছিলাম, আরো চুপচাপ হয়ে গেলাম, আমার স্বপ্ন অধরা থেকেই গেল, মাধ্যমিকেও গড় নম্বরটা ইতিহাস আর বাংলার জন্যে অধরা থেকে গিয়েছিলো।

আমার কি তাহলে সবকিছুই অধরা থেকে যাবে? ছোটবেলা থেকেই অবশ্য একটুর জন্যে আমার
সবকিছুই অধরা থেকে গেছে, ২ থেকে ৭ নম্বর প্রতিবারেই কম পাওয়ার জন্যে ফার্স্ট আর হওয়া হোতো না, হেরে যাওয়ার জন্যেই বোধহয় জন্মেছি, প্রতিবারই অ্যান্টি বলতেন – ধ্যুস, এটাকে ওভাবে দেখো না, নিজের তো কোনো ফাঁকি ছিলো না, ওটা কপাল ভাবো না। হুম, মাঝেমধ্যে যে ভাবি না সেটা নয়, ভাবি, কিন্তু এবার ভাবতে পারছি না, অ্যান্টিকেও আর সহ্য করতে পারছি না, বিরক্তিকর ঠেকছে ওনার কথাবার্তা, আগেও যে ঠেকতো না তা নয়, এখন যেন বেশি বেশি ঠেকছে।

যেদিন থেকে জেনেছি অ্যান্টির পঞ্চস্বামী স্বভাব, সেদিন থেকেই গা ঘিনঘিনে ভাবটা এসেছে, ভদ্রভাবে বারন করেছি, রাগ করেছি, তাতে অ্যান্টির আমাকে আঁকড়ে ধরা যেন আরো বেড়ে গেছে, মাঝেমধ্যে মরে যেতে ইচ্ছে করে, আমার মনমরা ভাব চলতে থাকলে অ্যান্টি কত বোঝায়, সবগুলোই ভাটের কথা বলে আমার মনে হয়, বলতে পারি না, শুধু গায়ে হাত দিলে ঠেলে সরিয়ে দিই, আর বলি – কাজের কথা থাকলে বলুন…..। উনি স্বপ্ন দেখান, আমার প্রিয় স্বপ্নটা, একদিন সারা দেশ আমার মেধা নিয়ে গর্ব করবে, দেশ বিদেশে সেমিনার এ্যাডেন্ড করতে ছুটবো, আমি অরিঞ্জয়, চারদিকে আমার জয়ধ্বনি উঠবে, এরপরই অ্যান্টি সেন্টু খাওয়াবেন, আমার নরম জায়গায় ঘা পড়বে, শেষে অবধারিতভাবে বলবেন – তারপর অরি, আমার হৃদয়, এই পিছনের মানুষটাকে ভুলে যাবে, তারপর নির্ঘাত গাইবেন – যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে…….

সব অভিনয়, ছেলে পটানোর অভিনয়, নিশ্চয় সবার সঙ্গে এই ট্যাকটিক্স চালান, কি করে পারেন এসব! গা ঘিনঘিনে ব্যাপার স্যাপার, বলিও, উনি তখন শান্ত থাকেন, আমাকে যেন মাপতে থাকেন, আর শেষে ভুল স্বীকার করেন, ফোঁত ফোঁত করে কাঁদেনও, আমার মনে হয় – এগুলোও এক একটা ট্যাকটিক্স, মন আরও শক্ত হয়ে ওঠে, কারো পাল্লায় পড়েছি বলে উনি তখন সন্দেহও করেন, আমি বলি – আবার! যা একবার অভিজ্ঞতা হলো! কিন্তু আবার আস্তে আস্তে মন নরম হয়, আবার হারিয়ে যাই, আসলে হেরে যাওয়াটা বোধহয় আমার রক্তে! নিজের ওপর খুব রাগ হয়, আমি কার কাছে যে হেরে যাই! অ্যান্টির গরম শরীর নাকি আমার জন্যে তাঁর করা কাজগুলো, আমাকে তিলতিল করে গড়ে তোলা? সব কেমন গুলিয়ে যায়!

কিন্তু এবার ঠিক করেছি, অনেক হয়েছে, নিজেকে সরিয়ে নেবই এই ফালতু রিলেশন থেকে, মনকে শক্ত করেছি, করছি, তারমানে এই নয় অ্যান্টির মুখ দেখবো না, ওনাকে একটা সীমার মধ্যে বেঁধে ফেলতে হবে, গন্ডী টানতেই হবে, হুম, আর নড়চড় হবে না, দেখি আমার স্বপ্ন হাতের মুঠোতে ধরা দেয় কিনা! দেখি পরের পরীক্ষাগুলো কেমন খারাপ হয়, এবার অ্যান্টি ভ্যানর ভ্যানর শুরু করতেই ঠান্ডা গলায় বললাম – আমাকে আমার মতো ভাবতে দিন, বাঁচতে দিন, গলাটার আওয়াজে তিনি চমকে গেলেও শান্তভাবে উত্তর দিলেন, নিশ্চয়ই। আর কথা হয় নি, উনি চুপ করে গেলেন, আমার কাজ হলো ওনাকে চিরদিনের মতো এবিষয়ে আজ থেকে চুপ করিয়ে রাখা।
ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: