প্রেমিকের মনোলগ – অভি চক্রবর্তী

কথা ছিলো কথা হবার, অনেক্ষন ধরে কথা হবার …কথা ছিলো আবার দেখা হবার। চোখে চোখে কথা হবার। বারান্দায় বসে কথা ছিলো চায়ের চুমুক, ধোঁয়া ওঠা কাপে একাকার স্মৃতিগুলো খুলে খুলে দেখার। স্মৃতি আসলে হোমিওপাথিক পুরিয়ার মতো, মিষ্টি খেতে …অসুখ সেরে যায়, কিন্তু প্রথমে খানিক বারে অসুখ।

স্মৃতি আমাদের ভিতর মেলানকলির ময়নাকে খুঁচিয়ে দেয়। ময়না ডাকে। অনর্থক কথা বলে। চুমুকে চুমুকে কথা হবার কথা বলে। চুলে বিলি কেটে দেবার কথা মনে করিয়ে দেয়। আঙ্গুল চালাতে চালাতে বলে…
কথা ছিলো অনর্থক বসে থাকার তাকিয়ে থাকারও কথা ছিলো…


কথা ছিলো কোণাভাঙ্গা প্লেট থেকে ভাগ করে খাবার খাইয়ে দিতে দিতে, রোজকার অভাব ভাগ করে নেবার 
কথা ছিলো বিকেল গড়ানো ছাদে ওঠবার জড়িয়ে ধরতে বাধা দেবার, কথা ছিলো …
কথা ছিলো কপালে বাম ঘষে দিতে দিতে বুজে আসা চোখে ভুলিয়ে দেয়া মাইগ্রেন, কথা ছিলো…
কথা ছিলো আলোচনার, বইপত্র গোছগাছেরহায়রোগ্লিফিক থেকে নাস্তিক পণ্ডিত এসব সাজিয়ে রাখবার…


কথা ছিলো ফোনে বা হোয়াটসআপে নয় মুখোমুখি বসিবারে, কথা ছিলো বনলতা সেন, কথা ছিলো 
কথা বলা হয় না, তোমার মধ্যে কি দেশ নেই আমেরিকা ? এবারে কোথায় যাবে কলম্বাস ? কথা ছিলো ! কলম্বাসেরও তো কথা ছিলো …
কাকে বলবে ? কাকে ? কথাগুলো ? 
কম্পাস স্থির ! কথা ঠেলে আসছে। কাজ করছেনা জোফার বা এভোমিন। 

কলম্বাসের ছায়া স্থির হয়ে যায় নাকি ঢেউ থেমে যায় সমুদ্রের নাকি কথার ? 
কথা মরে গেলেই ছায়া ফেলে কথার স্বভাব, ছায়া কথা ছেঁড়া ছেঁড়া হয় নতুন শেখা গানের মতো, কেটে যাওয়া তালে দিন কেটে যায় বাধ্যত! কথা ঘেঁটে যায়। তখন কথা দিয়ে ডালনা রাঁধে সংসার।

যেভাবে নতুন দুধ কেটে গেলে মধ্যবিত্ত ডালনা করে খেয়ে নেয়, এরপর দিবানিশি ঘুম। কথা হজম…কথা ফ্ল্যাশ করে …ঘুমিয়ে যায় সমস্ত ময়নারা …আমি স্মৃতির মেঘের মধ্যে করে তোমার বাড়ির দুপুর রাখা থাকে যে ঘরে সেখানে গিয়ে বসি, কে যেনো জল ছিটিয়ে তালপাখার হাওয়া করে, ভাত মেখে খাইয়ে দেয় গন্ধ লেবু ও মুশুর ডাল দিয়ে। আমি খাই আর দুপুরের অনুচ্চার কথোপকথনের অংশীদার হয়ে উঠি। এমনিতে তো খুব বেশি দেখা হয়না আমাদের। 


অনেকদিন পরপর দেখা হয় তোমার সঙ্গে দেখা হলেই খানিক আলো তুলে নি তোমার হাসি থেকে সেসব ভাঙ্গিয়েই চলে মধ্যবিত্তের গোটা মাসমাসের শেষে টানাটানি পড়ে যথারীতি, চেয়ে নি দু একটা ছবি…
এভাবেই আলো জমিয়ে, হাসি জমিয়ে কেটে যাক আমাদের প্রেম মানেই তো বিরহের দিকে চলে যাওয়া…


আর সম্পর্ক মানে কি বলো তো? সম্পর্ক আসলে যে নতুন টাই বাঁধতে শিখেছে তার অপটু হাতের মতো, টাই এর সঙ্গে সেই নতুন হাতের বনিবনা হবার মতোই এ এক ঝকমারি ব্যাপার। যতোই নিষ্ঠ নিয়মে পুজারীর বেশে সে আয়নার সামনে আসুক। প্রতিবিম্ব তাকে ঠকাবেই। টাই বাঁধা হবেনা তার।

সম্পর্কও আসলে এক অনভিপ্রেত টাই বাঁধার গেরোর মধ্যে ঢুকে পড়বার মতোই। সকলকে দেখলে মনে হয় কি সোজা জীবন, কি সুন্দর সন্ধের মতো এই সম্পর্ক! কিন্তু নিজে জড়িয়ে পড়লেই বোঝা যায় সামান্য এদিক ওদিক হোক না হোক নট গন্ডগোল হয়ে যাবেই। ফলত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া আসলে একটু গিটের গন্ডোগোলে গলায় ফাঁস পড়বার মতোই অহেতুক রিস্ক নেয়া…

আমি দেখেছি তো,সম্পর্ককে ছেড়ে চলে যেতে বহুদূর!এরপর পড়ে থাকা সম্পর্কের খোলস নিয়ে বেড়াতে যায় মানুষ, রান্নাবাটি খেলে পাশে বসে বায়োস্কোপ দেখে আরচোখে এ ওর খোলস মাপে মনে মনে বরাত দেয় কোনো অদৃশ্য সুপারি কিলারকে  খুব কাছ থেকে …এসব দেখেছি আর এসব বিলাসের মধ্যে থেকে যাওয়া কিছু অনর্থক বিবাদী মানুষ দেখেছি।

যারা সম্পর্কের মধ্যে সিংহাসন খোঁজে, অযোগ্য হয়েও মেঘেদের ঘরবাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ে জীবনের যাবতীয় কলঙ্ক নিয়ে এভাবেই ছেড়ে যাওয়া সম্পর্ক দুজন মানুষকে দুরকম করে দেয়, অথচ তারা একসঙ্গেই ছিলো ঘর বাঁধবে ভেবেছিলো একসঙ্গে …ভেবেছিলো আরো অনেক কিছুই এসব ভাবতে, ভাবতেই কতো প্রত্যয়ের ফিলামেন্ট কেটে যায়, গ্যাস কমে আসে কতো প্রকৃত বিশ্বাসের। শ্বাস নিতে রীতিমতো কষ্ট হয় তখন।

দপ্ করে আলো জ্বলে ওঠে মোবাইল স্কিনে।তোমার উদ্বেগের মেসেজ পেয়ে খানিক উদ্বেলিত হই, পুরোনোকালের হেরিকেনের আলোর মধ্যে, ভেঙ্গে পড়া অনেক গাছেদের মাঝেও।

খবর নেওয়াতে ভেবেছিলাম আমরা নিশ্চিত দ্রুত সেরে উঠবো। কারণ তুমি খবর নিলে। হেরিকেনের কাঁচে জমা কালি, কে যেনো ওয়াইপার দিয়ে মুছে দিচ্ছিলো তখন। তারপরে এলাকা স্বভাবতই স্বাভাবিকের দিকে এগোলো, আমি মেসেজ করলাম। ফোনও করলাম। নো রিপ্লাই। জানিনা হয়তো তুমি আরো বড় কোনো সমস্যায় আছো। যাক অভিমান করবার মতো শব্দ বা সম্পর্কের জোর কোনোটাই আমার নেই, অধিকারের আস্ফালন তো দূর অস্ত। 


সাবধানে থেকো। আমার কোনো গোঁসা ঘর বা চিলেকোঠাও নেই। যেখানে বসে দুঃখগাথার কথা লেখা যায়!!! এগুলোকে তুমি মনোলগ বলেই যেনো! উত্তর দেবার দায় এড়ানো যায়  তাহলে কি বলো? এইসব সাত-সতেরো ভাবনার মধ্যে দিয়েই মানুষ এক নিদ্রাহীনতার দিকে হেঁটে চলে যায়। যেখানে অনিদ্রাও ছড়িয়ে পড়ে মহামারীর মতো…প্রচুর প্রেমিক সেই মহামারীর মধ্যনিশিতে কোনো এক অজানা বিপ্লবের স্বপ্ন দেখতে দেখতে, অস্ফুট স্লোগান মুখে করে তীর্থযাত্রা করে…
আমাদের তীর্থ নয় তীর্থযাত্রার কথা মনে রাখা উচিৎ।

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: