ফাঁকি – অসীম কুমার চট্টোপাধ্যায় ( ভবঘুরে )

আজ কমলেশ্বর বাবুর বাড়িতে সকাল থেকেই সানাইয়ের সুর । টালিগঞ্জের সার্কুলার রোডের ওপর ” দা ক্লাউড ” এপার্টমেন্টের সমস্ত আবাসিকরা আজ খুব খুশি । আনন্দে মাতোয়ারা ।

কমলেশ্বর বাসুর একমাত্র নাতির শুভ অন্নপ্রাশন । বাড়ি ভর্তি লোক । আত্মীয়-স্বজনে সমাগম । যদিও মূল অনুষ্ঠান এবং খাওয়া দেওয়ার জন্য হোটেল ” দা ওসেন ” বুক করা হয়েছে । নিমন্ত্রিতরা সব ওখানেই আসবেন ।


এপার্টমেন্টের বেসমেন্টে কার পার্কিং । গ্রাউন্ড ফ্লোরে শপিং কমপ্লেক্স । ফার্স্ট ফ্লোরে দুটো ব্যাঙ্ক । একটা ATM । সেকেন্ড ফ্লোরে একদিকে নার্সিং হোম আর অন্য দিকে ফার্টিলিটি সেন্টার । থার্ড ফ্লোর থেকে রেসিডেন্সিয়াল । টোটাল আটটা ফ্লোর ।

প্রত্যেকটা ফ্লোরে চারটে করে ফ্যামিলি । এক একটা ফ্লাট ১২০০ থেকে ১৪০০ স্কোয়ার ফুট । দুটো ক্যাপসুল লিফ্ট বিল্ডিংয়ের সামনের দিকের দুপাশে ।একটা আবাসিকদের আর অন্যটা নার্সিং হোম আর ফার্টিলিটি সেন্টারের জন্য । মাঝখান দিয়ে সিঁড়ি । লিফ্ট দুটোর দুদিকে দুটো সিকিউরিটি গার্ডস রুম ।


সেভেনথ ফ্লোরে থাকেন কমলেশ্বর বাবু । চাকরি করতেন ডাক বিভাগে । হেড পোস্ট মাস্টার । রিটায়ার করেছেন বছর চারেক আগে । এক ছেলে এক মেয়ে ।সুতীর্থ আর সোমদত্তা । সোমদত্তা থাকে লন্ডনে । মাইক্রো বায়োলজির ওপর গবেষণা করছে । হাসবেন্ড বেসবল প্লেয়ার । একটি ছেলে । স্কুলে পড়ে । সুতীর্থ ডাক্তার । কার্ডিওলজিস্ট । স্ত্রী মধুরিমা কলেজে পড়ায় । চার বছরের বিবাহিত জীবন । কোনো সন্তান হয় নি ।

অনেক ডাক্তার দেখিয়েছে । মোটামুটি সব গাইনোকলজিস্টরাই এক কথাই বলেছেন । নরমালি সম্ভব নয় । ফেলোপিয়ান টিউব মারাত্বক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত । সুতীর্থর ও কিছু সমস্যা আছে । অবশেষে IVF ( ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন ) পদ্ধতির মাধ্যমে সন্তান ধারনে সক্ষম হয়েছে মধুরিমা । আজ ওদের সন্তান দিমিত্রভের শুভ জন্মদিন ।


নিমন্ত্রিতদের মধ্যে অনেকেই ডাক্তার । এসেছেন সপরিবারে । তিন রকম ব্যবস্থা । নিচে বার । একটা রুমে ভেজ আর বাঙ্কোয়েটে নন ভেজ । অতিথি অভ্যাগত মিলিয়ে সংখ্যাটা ৮০০ ছাপিয়ে গেছে । কমলেশ্বরবাবু নিজে তদারকিতে নেমে পড়েছেন ।

আর নামবেন নাই বা কেন ? একমাত্র ছেলের ছেলে । তাও এত বছর বাদে । এ কী একটু আধটু ব্যাপার । সারা শহরকে যেন ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে , দেখ , আমার দাদু সোনার আজ মুখে ভাত । আমার বংশধর এসে গেছে । এখন আমার মরেও শান্তি । শুধু দুঃখ একটাই সুতীর্থর মা দেখে যেতে পারলো না । আমাদের সকলকে আকুল পাথারে ভাসিয়ে চলে গেছে ।


দেখতে দেখতে পাঁচ বছর হয়ে গেল । ব্রেন টিউমার । প্রথম দিকে তো কোনো সিমটমই ছিল না । দিব্যি সুস্থ মানুষ । হেসে খেলে কাজ করে বেড়াতো । তারপর হঠাৎ মাথা ধরার উপসর্গ । অসহ্য যন্ত্রনা । কাউকে না জানিয়ে পেইন কিলার ট্যাবলেট খেত । একদিন রান্নাঘর থেকে ডাইনিং টেবিলে আস্তে গিয়ে পড়ে গেল । ধরাধরি করে শুয়ে দেয়া হলো বিছানায় ।

পরে বলল, চোখে কেমন সব অন্ধকার দেখলাম । তারপর ব্যালেন্স হারিয়ে পড়ে গেলাম । সুতীর্থ আর দেরি করে নি । ফোন করলো নিউরোলজিস্ট বন্ধু ডাক্তার বটব্যাল কে । তখনই গাড়ি বের করলো সুতীর্থ । নিয়ে যাওয়া হলো পরমাকে । প্রাইমারি চেক আপ করে ডাক্তার বটব্যাল জানিয়ে দিলেন যে কয়েকটা টেস্ট এবং স্ক্যান করার পরই ফাইনাল ওপিনিয়ন দেবেন ।

পরপর তিনদিন নিয়ে যেতে হয়েছিল পরমাকে । দিন সাতেক বাদে সুতীর্থকে চেম্বারে ডেকেছিলেন । বললেন , ব্রেন টিউমার । ইটস টু লেট । এক্সপান্ডেড এ লার্জ এরিয়া । ফর সেকেন্ড ওপিনিয়ন উই বেটার কনসাল্ট উইথ নিউরো অনকোলজিস্ট ডক্টর এন শ্রীবাস্তব , দি বেস্ট ওয়ান ইন এশিয়া ।


পরের সপ্তাহে ডক্টর এন শ্রীবাস্তব এর সাথে এপয়েন্টমেন্ট করা হলো । ততদিনে সমস্ত রিপোর্ট এসে গেছে । সব দেখে শুনে একই কথা বললেন ডক্টর শ্রীবাস্তব । রোগটা ছড়িয়ে গেছে । কিছু করার নেই । মেডিসিন আর থেরাপি করে কিছুদিন বাঁচিয়ে রাখা গেছিল পরমাকে । তারপর সব শেষ ।
কমলেশ্বরবাবু ভেজ আর ননভেজ ঘর দুটো তদারকি করছিলেন । সুতীর্থ ছিল নিচ তলার বারে । অধিকাংশই তার বন্ধুবান্ধব । ডাক্তারের দল । পার্টি যখন মাঝ পথে ডাক্তার দীপায়ন মিত্র টলতে টলতে হলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বললেন , লেডিস এন্ড জেন্টেলমেন , ইওর এটেনশন প্লিস ।

হাতে গ্লাস । অর্ধেক পানীয় । সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছেন না । দেখেই বোঝা যাচ্ছে ফুল্লি ড্রাঙ্ক । জড়ানো গলায় বললেন , সরি ,এখানে তো কোনো লেডিস নেই । শুধুই জেন্টেলমেন । আপনারা জানেন আপনারা আজকে এখানে কেন এসেছেন ? কী ভেবেছেন , ডক্টর সুতীর্থ বাসুর ছেলের অন্নপ্রাশনে ? নো ।

ইউ আর এবসোলুটলি রঙ । হি ইস নট হিস বায়োলজিকাল ফাদার । সবাই বলে উঠলেন ডক্টর মিত্র আপনার নেশা হয়ে গেছে । আপনি বসুন । কোন শ্লা বলে আই এম ড্রাঙ্ক । নেভার । সি , আই ক্যান ওয়াক স্ট্রেট । দেখাতে গিয়ে ধাক্কা খেলেন পিলারে । তারপর টলতে টলতে বেসিনে গিয়ে হর হর করে কিছুটা হালকা হলেন । ধরাধরি করে বসিয়ে দেওয়া হোল একটা সোফায় ।

বেশ কিছুক্ষন রেস্ট নেওয়ার পর দুজনে এসকর্ট করে নিয়ে গেল ডক্টর মিত্র কে সোজা তার গাড়িতে । চলে গেলেন । কিন্তু যে বীজ পুঁতে দিয়ে গেলেন সুতীর্থর মনে সেটা রয়ে গেল । আবার সবাই মেতে উঠলো আনন্দে । পার্টি ফিরে এল তার নিজের রঙে । কিন্তু একমাত্র ফ্যাকাশে সুতীর্থ । বাকি সময়টা ভান করে কাটিয়ে দিল ।কাউকে বুঝতে দিল না তার মনে কী চলছে । এমন কী মণিদীপাও জানতে পারে নি ।


একদিন বাদেই খুব সাবধানে যোগাযোগ করলেন এক প্রাইভেট গোয়েন্দার সাথে ।খুলে বললেন সবটাই । অনুরোধ সত্য উদ্ঘাটন করতেই হবে । টাকা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না ।

প্রশ্ন একটাই তাদের সন্তানের প্রকৃত বায়োলজিকাল বাবা কে ? সাথের ব্রিফকেস থেকে বের করলেন চেকবই । জানতে চাইলেন উনার ফিস কত লিখবেন । গোয়েন্দা ভদ্রলোক অত্যন্ত অমায়িক । সামান্য কিছু টাকা নিলেন কাজ চালাবার মত । বললেন যদি সত্য উদ্ঘাটন করতে পারি তবে ফিস নেব নাহলে কিছু না ।

দিন দশেক বাদে আমি আপনাকে জানাবো । বাই দি বাই আপনার স্ত্রীর আর ডক্টর দীপায়ন মিত্রের ফটো স্ক্যান করে আমাকে পাঠিয়ে দেবেন । আপনার মোটামুটি পরিচিত ডাক্তারদের নামের তালিকা এবং মোবাইল নাম্বার আমাকে মেল করে দেবেন । এর বাইরেও ঘনিষ্ট মানে আপনাদের ফ্যামিলি ফ্রেন্ড কেউ থাকলে তার বা তাদের নামের লিস্ট উইথ মোবাইল নাম্বার পাঠাবেন । বাকিটা আমি দেখে নেব ।


খুব দুশ্চিন্তার মধ্যে দিয়ে কাটতে লাগলো দিনগুলো । চেম্বারেও মন বসাতে পারছে না । ফিরিয়ে দিচ্ছে রুগীদের । মধুরিমা জানতে চেয়েছিল তার শরীর খারাপ কিনা । শুধু বলেছিল না । কথা আর বাড়ায় নি সুতীর্থ । সিগারেট ধরিয়ে চলে গেছিল ব্যালকনিতে । রেলিঙে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল রাস্তার যানজট । এত রাতেও সার্কুলার রোডে সমান ব্যস্ততা ।

কিন্তু সুতীর্থ দেখছিল না কিছুই । শুধু ভাবছিল ডক্টর মিত্র র কথাটা । মধুরিমা সম্পর্কে ভাবতেই সমস্ত শরীরটা রি রি করে উঠছে । তার চার বছরের বিবাহিতা স্ত্রী । এতগুলো বছর একসাথে । সুখ দুঃখ ভাগ করে নিয়েছে দুজনে সমান ভাবে । ডাক্তারির হাজারো ব্যস্ততার মাঝেও সময় বের করে নিয়েছে স্ত্রীর জন্য ।

সন্তান না হওয়ার বেদনা ভুলাতে সব সময় তার ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দিয়েছে । যখন যা বলেছে সুতীর্থ তাই করেছে । আর সেই স্ত্রী কিনা তাকে ফাঁকি দিল । তার বিশ্বাসের এত বড় অমর্যাদা । যে সম্পর্ক ফাঁকি দিয়ে তৈরী সেই সম্পর্ক থাকা না থাকা দুই সমান । নিছক লোক দেখানো সম্পর্কের তো কোনো মানে নেই । আজ না হোক কাল সবাই জানবে ।

এই ছেলেই একদিন বড় হয়ে জানতে চাইবে তার আসল বাবা কে ।কী উত্তর দেবে সুতীর্থ ? বলবে , তোমার মা জানে । যে ছেলে জানে না তার বাবা কে তার সামাজিক অস্তিত্বই বিপন্ন । বন্ধুরা বলবে , বাবা কে তোর ? বেজন্মা তুই । আর ভাবতে পারছে না সুতীর্থ । মাথাটা ঝিম ঝিম করছে । লাইটটা নিভিয়ে শুয়ে পড়লো বিছানায় ।


দিন দশেক বাদে একদিন তার চেম্বারে হাজির গোয়েন্দা সোডি । আসলে তার ভালো নাম সোমনাথ দে । সংক্ষেপে একটু কায়দা করে সো ডি । খবর এসেছে । একদম ঘোড়ার মুখের খবর । ডক্টর মজুমদার সঠিক কথাই বলেছেন । তিনি নিজে এই সন্তানের পিতা । তারই ঔরস জাত সন্তান দিমিত্রভ । আচ্ছা , এবার তাহলে দিমিত্রভ নাম রাখার পেছনের ইতিহাসটা বোঝা গেল ।

মধুরিমার যখন সাত মাস কি আট মাস হবে ,একদিন সন্ধ্যে বেলায় ব্যালকনিতে বসে দুজনে ঠিক করছিল নবাগতর কী নাম রাখা হবে । যদি ছেলে হয় তাহলে সুতীর্থ নামের সাথে মিলিয়ে সুগত বা সুস্নিগধ । মধুরিমার পছন্দ না । যে নামই সে বলে মধুরিমার এক কথা এ সব চলে না । এ সব আদ্দিকালের নাম বাদ । আধুনিক নাম চাই । সুতীর্থ বলল, তাহলে তুমি বল ।

একটুও না ভেবে মধুরিমা বলল , দিমিত্রভ । রাশিয়ানদের মত । সুতীর্থ হেসে বলেছিল , তাই বলো ,তুমি আগের থেকেই ঠিক করে রেখেছিলে । শুধু শুধু আমাকে বোকা বানালে । মধুরিমা বলেছিল , বোকা তো তুমি বরাবর ই । নতুন করে কী আবার বানাবো ? আজকে বুঝতে পারছে সুতীর্থ দিমিত্রভ নাম রাখার কারনটা । দি ফর দীপায়ন এবং মিত্র তো দীপায়নের সারনেম । দি মিত্র ।

ভ টা জুড়ে দিয়েছে যাতে সুতীর্থ বুঝতে না পারে । মানতেই হচ্ছে সে বোকা । কিংবা তার সাথে আরো দু অক্ষর ।
কিন্তু মিস্টার সো ডি , সুতীর্থ বলেছিল , শুধু মাত্র নামের মিলের জন্যই তো একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে যায় না । অকাঠ্য প্রমান প্রয়োজন । আবার সেটা শুধু মুখের কথা হলেই হবে না ।

যে প্রমান কোর্ট বিশ্বাস করে সেই প্রমান । একটা সিগারেট ধরালেন সো ডি । একমুখ ধোয়া ছেড়ে বললেন , আমি জানি ডক্টর বাসু । আমাকে বলতে দিন । সরি । প্লিজ বলুন । আপনার পাঠানো নামগুলো আমি একটা একটা করে চেক করেছি । রাখা এবং না রাখার পেছনে যুক্তি সাজিয়েছি ।

তেমন জুতসই প্রমান পাই নি । ট্রায়াল এন্ড এরর মেথড এপ্লাই করে আটকে গেছি ডক্টর দি মিত্রতে । এরপর ডক্টর মিত্র এবং আপনার স্ত্রী মধুরিমার যাবতীয় তথ্য সংগ্ৰহ করলাম । তাতে যা জানলাম শুনলে আপনি চমকে উঠবেন । সমস্ত কাগজ , ভিডিও রেকর্ডিং আমার কাছে মজুত । আপনাকে ফাঁকি দেওয়া হয়েছে ।

আপনাদের সন্তান না হওয়ার পেছনে যাবতীয় পরিকল্পনা ওদের দুজনের । সহবাসের সময় , প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড , আপনি ইজাকুলেট করতেন আর তারপর উনি , আই মিন ,মধুরিমা দেবী ওয়াশরুমে গিয়ে ওয়াশ করতেন এবং পিল খেয়ে নিতেন যাতে পরের মাসে ঠিক মত পিরিয়ড হয় |

ডক্টর মিত্র ম্যাডামকে চেক করে বলেছিলেন ফ্যালোপিয়ন টিউব ড্যামেজ এবং নরমাল ওয়ে তে বাচ্চা হবে না । সেকেন্ড , থার্ড ওপিনিয়নের জন্য আপনারা আর যে দুজন ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করে ছিলেন তারাও ডক্টর মিত্রের রেফারেন্সের ডাক্তার । নিখুঁত অভিনয় করে গেছেন ম্যাডাম । সমস্ত রিপোর্টই সাজানো ।

আপনাকে রাজি করানো হলো IVF এর মাধ্যমে প্রেগনেন্সি করানো । আপনি তাই করলেন যা আপনাকে বলা হয়েছিল । সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিলেন আপনি । ওটা আসলে একটা নাটক । আসলে দিমিত্রভ মধুরিমা আর ডি মিত্রের ভালোবাসার ফসল । এই নিন সমস্ত ডকুমেন্টস এবং বিভিন্ন ল্যাব এবং ডক্টরস কনফেশনস রেকর্ডিং ।

এরজন্য অবশ্য অর্ধেক কৃতিত্ব দাবি করতে পারেন আমার বন্ধু লাল বাজারের গোয়েন্দা প্রধান সিতাংশু পত্রনবীশ । তাহলে আমি এখন আসি । এক মিনিট দাঁড়ান , মিস্টার সো ডি । আপনার ফিসটা নিয়ে যান । ধন্যবাদ ।
বহুদিন আগে একদম ক্যাসুয়ালি আমেরিকার মিচিগান উনিভার্সিটি হসপিটালে একটা এপ্লিকেশন পাঠিয়েছিল সুতীর্থ ।

সেদিনের মেলেই উত্তর আসে । একমাসের মধ্যে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে । ডাক্তার হলেও সুতীর্থ ভগবানে বিশ্বাসী । ভগবানের উদ্দেশে জানালো প্রণাম । চিঠিটার কয়েকটা প্রিন্ট আউট বের করে খামের ভিতর রাখলো ঢুকিয়ে । এরপর মেল পাঠালো আন্দামানে রামকৃষ্ণ মিশনে ।

চাইলো বিনা পারিশ্রমিকে সেবার অনুমতি । মিশনের সব রকম শর্তে সে রাজি । তিন দিনের মধ্যে পেয়ে গেল উত্তর । তার পাঠানো সিভি স্বামীজীর পছন্দ হয়েছে । বেলুড় মঠের সম্মতির অপেক্ষায় । সেখান থেকে চিঠি এলেই জানিয়ে দেওয়া হবে । পরবর্তী কাজ একজন ল ইয়ারের সাথে যোগাযোগ করার । বন্ধু সুবিমল আছে ।

কিন্তু আর বন্ধু নয় । একদম অচেনা । সবটাই অন লাইনে । মধুরিমা যেহেতু কলেজে পড়ায় আর্থিক ভাবে যথেষ্ট সাউন্ড । নিজের এবং ছেলের দেখভাল ভালো ভাবেই করতে পারবে । তা ছাড়া বাবার পেনশন তো রেয়েছে । মোটা টাকা পেনশন পায় বাবা । সবটাই জমছে । তবুও আইনজ্ঞের পরামর্শ প্রয়োজন ।


এডভোকেট প্রেমাংশু দস্তিদারের সাথে কথা বলে সেই ভাবে একটা উইল বানিয়ে রাখলো সুতীর্থ । তার জমানো অর্থের একটা বড় অংশ দান করলো মিশন কে । এক মাসের মধ্যেই সমস্ত কিছু প্রস্তুত ।

শুধু বলতে হবে দুজনকে । এক বাবা আর দুই মধুরিমা । সেদিন রাত্রে মধুরিমাকে জানালো যে সে আমেরিকায় যেতে চায় । একটা ভালো অফার পেয়েছে । একটু ডিটেইলসে বলল । দেখালো মিশিগান ইউনিভার্সিটি থেকে আসা চিঠি । মধুরিমা জানতে চাইলো তাকে আগে কেন জানায় নি ।

আসলে চিঠিটা এসেছেই কয়েক দিন আগে । সবাইকে ছেড়ে যাওয়া । যাবে কী যাবে না ভাবতেই সময় চলে গেছে । সুযোগ যখন এসেছে ছাড়া ঠিক হবে না । যেমন ভেবে ছিল তেমনই হলো । মধুরিমা নিমরাজি । ন্যাকামি করে একবার বলেছিল , তোমাকে ছেড়ে থাকতে খুব কষ্ট হবে । কিন্তু কী আর করা যাবে । যেতে যখন হবেই ।


যাক , একটা ফাড়া গেল । এবারই সবচেয়ে কঠিন কাজ । বাবাকে মিথ্যা কথা বলা । জীবনে কোনোদিন বাবা মা কে সে মিথ্যা কথা বলে নি । দুচোখ জলে ভরে আসছে । মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে সংসার ত্যাগ । নিজেকে বোঝালো বহু মনীষী আরো অনেক অল্প বয়সে গৃহ ত্যাগ করেছেন । সংসার ত্যাগ করেছেন । রাজসুখ পর্যন্ত ত্যাগ করেছেন ।

তাদের কাছে সে তো কিছুই নয় । তাঁরা যদি পারেন সে পারবে না কেন ? ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন । কিন্তু তাঁরা কেউ গৃহ ত্যাগ করতে বা সংসার ত্যাগ করতে মিথ্যার আশ্রয় নেন নি । সে নেবে । বাবাকে এই বয়সে দুঃখ দিতে চায় না সে । খুব কষ্ট পাবে মানুষটা । কিন্তু আমেরিকাতে আছে জানলে দুঃখ তো পাবে না । আর ল ইয়ার বলে দিয়েছেন ডিভোর্স নিয়ে এখনই কিছু ভাবার দরকার নেই । সময় হলে তিনি নিজেই সব জানিয়ে দেবেন ।


আজ সেই কঠিন পরীক্ষার দিন । বাবার সামনে দাঁড়িয়ে মিথ্যে কথা বলার । এর চেয়ে ওপেন হার্ট সার্জারি অনেক সহজ । প্রচন্ড টেনশন হচ্ছে ।ঘাড়ে , মুখে জল দিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার আপ্রাণ প্রচেষ্টা । এই সময় বাড়িটা ফাঁকা ।মধুরিমা কলেজে । আয়ার কাছে দিমিত্রভ । বাবা এখন পেপারটা পড়ছে । সো , দিস ইস দা রাইট টাইম । একটু একথা সে কথার পর সরাসরি মূল কথায় প্রবেশ করলো সুতীর্থ ।তার আমেরিকায় যাওয়ার কথা ।

সব শুনে বাবা মেনে নিলেন । বাবা মেনে নেওয়াতে টেনশনটা চলে গেল । এখন অনেক স্বাভাবিক সে । ফোনে কথা হবে । তাছাড়া ভিডিও চ্যাট তো করাই যাবে । ওদিকটা একটু গুছিয়ে নিতে পারলে সবাইকে নিয়ে যাবে ওখানে । বাবাকে ভালো করে সব ঘুরিয়ে দেখাবে । সবাই একসাথে থাকলে বাবার ভালোই লাগবে । আরো কিছুক্ষন গল্প করে ঘর থেকে বেরিয়ে এল সুতীর্থ ।


আন্দামান থেকে চিঠি এসে গেছে । সেলুলার জেলের কাছেই মিশনটা । এও একধরনের বন্দি জীবন । দীর্ঘদিনের পরিচিত সবাইকে ছেড়ে থাকা । এখন থেকে একটাই তার ধর্ম । মানব ধর্ম । একটাই কাজ । মানুষের সেবা ।। একজন পথ প্রদর্শক । স্বামী বিবেকানন্দ । আর একজন ভগবান । ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব |

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: