বই সন্দেশ — দুই — কুড়িকুড়ি — মানিক বৈরাগী

ডুবোজাহাজের ডানা – মোশতাক আহমদ
ধরণ-কবিতা, প্রচ্ছদ -নির্ঝর নৈঃশব্দ্য, প্রকাশক -কবিতা ভবন
মুল্য -১৩৪টাকা
অক্ষরবন্দি জীবন #মোশতাক আহমদ #ধরণ-গদ্য-জীবনী #প্রচ্ছদ -মোস্তাফিজ কারিগর #প্রকাশক#বেহুলা বাংলা#মুল্য২৫০টাকা।

.

বইমেলা এলেই নতুন বইয়ের খবর পাঠকের কাছে পৌছানো,  অক্ষর কর্মী হিসাবে দায়িত্ব মনে করি।

.

মেলা উপলক্ষে প্রকাশিত নতুন বইয়ের ঘ্রাণ আমার কাছে সদ্যস্নান করা প্রেমিকার দেহের ঘ্রাণ কেও হার মানায়।আহ কি সুখ।নতুন বই হাতে পাওয়া মাত্রই আমি বইয়ের দেহে আদর করে চুমু খাই।তারপর বইটা খোলে দেখি, এরপর পড়ি সময় সুযোগ মতো। যদি বইটি কোন প্রিয় মানুষের হয় তাহলে আর কোন কথাই নেই।

.

কবি মোশতাক আহমদ আমার দুর্দিন সুদিনের অনন্য সুহৃদ। যেদিন থেকে কবি’র সাথে আমার পরিচয় সেদিন থেকে আমার ভেতর তাকে নিয়ে একটি টান অনুভব করি।

.

এবছর মেলায় কবি’র একসাথে দুটো বই প্রকাশিত হয়েছে।একটা কবিতা গ্রন্থ আর একটি গদ্য। প্রথমে
“অক্ষরবন্দি জীবন ” নিয়ে কিছু আলোকপাত করতে চাই।”অক্ষরবন্দি জীবন মুলত কবি’র আত্মজীবনী ঘরনার।  লেখক তার শৈশব থেকে এ পর্যন্ত যতো বই পড়েছেন, এর মধ্যে যে সব বই  কবিকে আকৃষ্ট করেছে,সেই বই কেন্দ্রিক স্মৃতি তিনি সাজিয়েছেন এ বইতে।বইয়ের সাথে জীবন কোথায় কিভাবে কেটেছে ছাত্র থেকে পেশাগত জীবনের বিষয় গুলো এ বইতে কবি বিবৃত করেছেন।

.

.

আমার পাঠ খুব সীমিত। কারণ মোশতাকের মতো নিপাট ভালো ছাত্র ও সুবোধ বালকময় জীবন আমি পাইনি, বা হয়নি।তারমানে এই নয় তিনি ছাত্র জীবনে শুধু স্কুল কলেজের পড়া মুখস্থ, করা আর নভেল পড়ে সময় কাটানো এমন নয়।তিনি দারুণ আড্ডাবাজ, ছিলেন সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠক।  চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচন করে বিজয়ী ছাত্রনেতা।

.

বন্ধু বান্ধবের সাথে যেমন আড্ডাবাজি করেছে ঠিক একি ভাবে বই কেন্দ্রিক দারুণ সখ্যতা গড়েছেন তার শিক্ষকদের সাথে।বলা যায় স্কুল কলেজ জীবনে তিনি লেখা পড়ার পাশাপাশি অপরাপর কাজ করেও তিনি বই পড়া লেখা কে জীবনের অন্যতম সৃজনশীল কর্ম হিসাবে গ্রহণ করেছেন।
.
আমার কাছে বিশ্ময় লাগে তিনি সেই শৈশব কৈশোর থেকে বই পাঠ কেন্দ্রিক যখন যে বইটি পড়েছেন তা তিনি মগজের  ডায়েরিতে জমা রেখেছেন। এটাই হচ্ছে প্রকৃত বই প্রেমি ও পাঠাকের অনুকরণীয় বৈশিষ্ট্য।

.

আমার বই কেন্দ্রিক আত্মজীবনী এভাবে হয়নি।বিখ্যাত লেখকের প্রচুর ডায়েরি পড়েছি।তবে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সম্ভবত দুটি বই পড়েছি এখন মনে পড়ছে না সেখানে তিনি অনেক গুলো বইয়ের কাছে কিভাবে ঋণী ও বই সম্পর্কিত নোট দিয়েছেন। আহমদ ছফা’র যদ্যপি আমার গুরু বইটিতে কি কি বই পড়েছেন তার একটা চমৎকার বিবরণ পাওয়া যায়।
অক্ষরবন্দি জীবন এমনই একটা বই যা একজন লেখকের বই পাঠকে  ঘিরে  আত্মজীবনী হতে পারে। প্রত্যেক লেখক বা জীবনি লেখকেরা লেখকের কখন কি বই কি কি কারণ উল্লেখ করেছেন। প্রথমেই বলেছি আমার পাঠঘাটতি আছে তাই মোশতাকের এই বই কে আমার কাছে অমিয় সুধা মনে হতে পারে।

.

তবে বইটি পড়ে আমি তৃপ্ত। কারণ এটি পড়ে আমি অনেক গুলো বই না পড়েই সেই সব বই সম্পর্কে অবহিত হয়েছি,জেনেছি।নিজেও আমার না পড়া বই ভবিতে পড়ার জন্য নোট করেছি।সাথে অনেক অনেক কবি লেখক সম্পর্কে অবহিত হয়েছি। তাদের পেশা সম্পর্কে ও জেনেছি।

.

আগামী তে অক্ষরবন্দি জীবন বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর গবেষণায় ও কোন ছাত্রের রেফারেন্স বই হিসেবেও কাজে আসবে।পাঠক হিসেবে এ আমার ধারণা।

.

কবি বইটি তার দু’জন শিক্ষক কে।বইয়ের ভূমিকা ও তার জীবনের অনন্য শিক্ষক রফিক কায়সার লিখেছেন।  অক্ষরবন্দি জীবন উৎসর্গঃ করেছেন বিখ্যাত দুজন মানুষ কে যাদের স্নেহ সান্নিধ্য লেখক পেয়েছেন তাঁরা হলেন রফিক কায়সার ও সাফায়েত জামিল কে।

.

বইয়ের শেষে কিছু জীবন স্মৃতির ফটোগ্রাফ রয়েছে।
এই বইটিতে আমার মতো নালায়েক কবিতা কর্মী ও কবিতা বিষয়ে যে ক’লাইন কবি স্থান দিয়েছেন এ ঋণ শোধ করার নয়।

.

আমি বইটির ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা আশা করি।এবং বাংলা সাহিত্যে বইপাঠ নিয়ে আত্মজীবনী লেখা একটি নতুন ধারার প্রথম প্রয়াস। এটা একটি অনুকরণীয় ও আগামীর লেখকদের প্রনোদিত করবে।

.


কবি মোশতাক আহমদ এর অপর বইটি কবিতার। “ডুবোজাহাজের ডানা” এটি কবি’র ৬ষষ্ঠ কবিতা গ্রন্থ। বইটি প্রকাশ করেছে বাতিঘর এর সহযোগী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান “কবিতা ভবন “। প্রচ্ছদ -নির্ঝর নৈঃশব্দ্য।
.
ডুবোজাহাজের ডানা কবিতা গ্রন্থে প্রকাশিত কবিতা কে কবি চারটি  পর্বে ভাগ করেছেন। প্রথম পর্বে
সাবমেরিনের শার্সি — এ পর্বে আঠারো টি কবিতা স্থান পেয়েছে। এ আঠারোটি কবিতা থেকে আমি  প্রথম কবিতাটি পাঠকের জন্য তুলে আনলাম
অনুপস্থিত জলের এলিজি
এই দেশে একদিন থাকবে না যে নদী, /তার তীরে বিছিয়েছে ঘুমের বাঁশির আঁচল /আমাদের মেরুদণ্ড, সফেদ নমুনা;/কশেরুকার শার্সিপথে বিবাগী সুরের গতায়াত।

.

যে চোখে একদিন থাকবে না কোন অশ্রুজল,/ তার পাশে জমকালো আয়োজন / রাত্রি-উদ্বেল / অবহেলার অন্তিম চাঁদমারি উল্লাস।

.

বিভিন্ন জনপদে তরুণ -তরুণীর স্বপ্নিল ক্যানভাস – / সময়ের এসফল্ট রঙ-ডুবানো তুলি /মধ্যবয়সের ইজেল কংকালে /ছায়া ফেলে যায়।

.

এবার আসাযাক আরও একটি পর্বে, যে পর্বটির শিরোনাম ” দীর্ঘ ইমন”আমি এ পর্ব থেকে আরও একটি কবিতা তুলে আনবো

.

ঝড়-বাদলে
এমন ঝড়-বাদলের দিনে /বারান্দা থেকে খামোখাই হারিয়ে যাবে দু-এক ফালি মোজা/ কিংবা রুমাল,  /অফিস ফেরতা গলির মুখে ভিজে একাকার – / রিকশাওয়ালা নিজেই হুডের নিছে,অনিচ্ছুক সহিস–/ ডুবে-যাওয়া জুতো।

.

ঝড় শেষ হলে বারান্দা জুড়ে / হাওয়া মহল, / সোঁদা রাস্তায় ঝরা পাতা,চিপসের প্যাকেট —/খিচুড়ি মাংসের ঘ্রাণ।
.
কোন কোন দিন গান ভালো লাগে /কোন কোন দিন ভালো লাগে কবিতা /কোন কোন দিন উদাসীন /সান্ধ্য হাওয়ায়।
ঝড়ের দিনে সাহসের বাদামে ঢেউ–/বজ্রপাতেও নির্বিকার /নাগরিক হাটাহাটি ; / প্রাচীনা সবুজ ভেঙে পড়ে,ইতস্তত।
ঝড়ের দিন চলে গেলে /বিরহের আদি পিতা কালিদাস / বেড়াতে আসেন ঝমঝমিয়ে /আমাদের গ্রহে।

.

(৩৯পৃষ্ঠা)
এ পর্বের কবিতা গুলো একটু বড়ো কবিতা। কবি “ডুবোজাহাজের ডানা”য় আগামী পর্বে আপনাদের জন্য সাজিয়েছেন গদ্য প্রকৃতির কবিতা। এ পর্ব থেকে আরও গদ্য কবিতা আপনাদের জন্য রাখছি
.
কবি এ পর্বের শিরোনাম দিয়েছেন ” গদ্যগহন করোটি “।এখান থেকে দেখি কোন কবিতা টি ছেঁকে আনা যায়।
স্বপ্ন দুজন
.
ঠিকানা বদল হয়েছে, ফুরিয়েছে ধাক্কাধাক্কি নৈকট্য।
এ পাড়ার ফুটপাতে আমার স্বপ্নেরা হাঁটে বিকেলবেলা সব্জির ভ্যান,কলাবিক্রেতা পাশ কাটিয়ে ;তোমার অভিজাত স্বপ্ন হাঁটে সকাল সকাল রবীন্দ্র সরোবর – স্বাস্থ্যসম্মত উন্নাসিকতায়;ধাক্কা লাগা তো দূরের কথা -ওদের দেখাও হয় না আজকাল।

.

আমার স্বপ্নগুলো রাত করে বাড়ি ফেরে-বেদনার বৈঠক শেষে দু-একটা  সুখী সুখী কবিতার রাজহাঁস হাতে করে; তোমার  স্বপ্নেরা ততক্ষণে স্বাতী নক্ষত্রের কোলে হাওয়ার রাতের মশারিদূর্গ।

.

আমাদের সঙ্গবিহীন স্বপ্নেরা এতিম পায়ে হেটে চলেছে অলৌকিক কোন সম্পর্কের দিকে! (৪৮পৃষ্ঠা)
প্রিয় পাঠক আমরা একেবারে অন্তিম পর্বে চলে এসেছি। কবি আপনাদের জন্য চতুর্থ পর্বটি সাজিয়েছেন বাংলা কবিতার বিলাসী কবিতা সনেট দিয়ে। কবি এ পর্বের শিরোনাম দিয়েছেন ” আর্ত চতুর্দশী “।

.

আমি সনেট গুচ্ছের শেষ সনেট টি আপনাদের জন্য উপহার দিয়ে এ পর্বের  বই সন্দেশ ইতি টানবো।
বাংলা সাহিত্যের প্রিয় পাঠক পাঠিকারা আপনারা কবি মোশতাক আহমদ এর বই দুটো কিনে পাঠ করে তৃপ্তি পাবেন আশাকরি। আমি নিজে পাঠ করে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছি আপনাদের পাঠতৃষ্ণা বাড়ানোর জন্য।চলুন এবার কবি মোশতাক আহমদ এর একটি সনেট পাঠকরি।

.

সমুদ্রপীড়া
ঢেউয়ের পিঠে সূর্য শাঁখের করাত /পিয়াসি ঠোঁটে আদিগন্ত লবণ তৃষা। / নিদ্রামগ্ন  স্থিতি জড়তা, গতি জড়তা–/ দু দিক থেকে হানে গভীর প্ররোচনা :/ফেনিল ঢেউয়ে গাংচিলের উস্কানি, / জীবনজাহাজে বাজে গৎবাঁধা ধ্বনি ; / দ্বিমুখী গতির তাড়ায় বেগতিক — / ক্যালেন্ডার থেকে উধাও দিনরাত্তির।

.

কাটের কেবিনবন্দি,ও সুদূরতমা— /দুলছে প্রচন্ড সামুদ্রিক সংসার ; / গোধূলির মুখোমুখি আড়মোড়া ভাঙে /সমুদ্র-আকাশের নীলাভ বিহবলতা :/ গড়িয়ে পড়ছে জলে দালির ঘড়িটা — / পাণ্ডুর সময় গিলেছে সমুদ্রপীড়া।
.

.

কক্সবাজার, বাংলাদেশ।
২জানুয়ারি ২০২০.
ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: