বরাহ গ্রহের আলো // ৩ // সুব্রত মজুমদার

বরাহ গ্রহের আলো // ৩ // সুব্রত মজুমদার

হেনরি এই গ্রহের নাম রেখেছে  বরাহ। হেনরি আমেরিকার ছেলে। বিজ্ঞানের ছাত্র হলেও ভারতীয় দর্শনে তার কৌতূহল খুব। অ্যামাইনো অ্যাসিডের খোঁজ মেলার পর হতেই সে ভাবছে বিবর্তনের কথা।

.

হেনরি বলল, “বিষ্ণুর দশাবতার যেন বিবর্তনের একটা আদিম ইতিহাস। বিবর্তনের মতানুসারে পৃথিবীর প্রথম মেরুদণ্ডী প্রাণী হল  জলচর মাছজাতীয়, বিষ্ণুর প্রথম অবতারও মৎস্য।

তারপর জলচর প্রাণী জলে ও ডাঙ্গায় দু’জায়গাতেই শ্বাস নিতে সক্ষম হয়, সৃষ্টি হয় উভচর প্রাণীর। বিষ্ণুর পরবর্তী অবতারও তাই কূর্ম বা কচ্ছপ। এরপর মেরুদণ্ডী স্তন্যপায়ী প্রাণীর সৃষ্টি হয়।

.

বিষ্ণুর তৃতীয় অবতার তাই বরাহ বা শূকর। ঠিক এইভাবে পশুত্ব হতে মনুষ্যত্বে উত্তরণ ঘটে, সৃষ্টি হয় পশু আর মানুষের মাঝামাঝি নরসিংহ। এরপর একে একে নিম্নশ্রেণীর মানুষ বামন, শিকারী পরশুরাম, যোদ্ধা – যাযাবর রাম, কৃষক হলধর, আধুনিক কূটনীতিবিদ কৃষ্ণ, সমাজ সংস্কারক বুদ্ধ ও শেষে ধ্বংসাত্মক কল্কি। এরপরেই সভ্যতার বিনাশ। “

হেনরি দার্শনিক হলেও রিও কিন্তু কোডিং ডিকোডিং এর বাইরে খুব একটা বোঝে না।  ‘খনা’র প্রোগ্রামিংয়ের  কিছু গলদ খুঁজে বের করেছে রিও ।.

কিন্তু কোনো ডি-বাগিং এর সূযোগ তার নেই। খনার ত্রুটি বিচ্যুতি একমাত্র খনাই দূর করতে পারে। খনা এতটাই শক্তিশালী যে আশেপাশের যেকোনো সিস্টেম বা ডিভাইসকে নিজের বশে আনতে পারে। মোটকথা এই মহাকাশযানের আসল ক্যাপ্টেন হল খনা, খনা’র ইচ্ছার বিরুদ্ধে শঙ্করের কিচ্ছু করার নেই।

শঙ্কর আর তার টিম স্পেসবোটে ফেরামাত্র খনা তাদের সাবধান করে দিয়েছে। ওরা ফেরামাত্র জায়েণ্টস্ক্রিনে একটা নারীমুখ ভেঁসে উঠল, এই হল খনা । খনা মিষ্টি গলায় বলল, “গুড ইভিনিং শঙ্কর ! বাকি টিমমেটদেরও আমার সান্ধ্য অভিনন্দন।”

সকলে পাল্টা অভিনন্দন জানলো। এরপর খনা বলল, “সারাদিন খাটাখাটনির পর সকলেই ক্লান্ত; আর এই গ্রহ সম্পূর্ণ নিরাপদ নয় তাই স্পেসবোটের দরজা আমি বন্ধ করে দিয়েছি। তোমরা বিশ্রাম নাও। কাল থেকে হিউম্যানওয়েড কিকি কে অ্যাক্টিভেট করে দেওয়া হবে। প্রোটেকশন শিল্ড অন। আউটার লাইটস অফ।..”

এরপরেই জায়েণ্টস্ক্রিন হতে উধাও হয়ে গেল খনা। সকলে চলে গেল নিজের নিজের রুমে। বরাহ গ্রহে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে, বাইরে বাতাসের গর্জন প্রবেশ করতে পারছে না স্পেসবোটে।

 শেষরাতে আর ঘুম এল না শঙ্করের, সে ল্যাপটপ অন করে খনার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করল। কিন্তু খনার সিস্টেম কোনোরকম রেসপন্স করছে না। শঙ্কর তবুও নাছোরবান্দা। একসময় খনা সাড়া দিল।

খনার আওয়াজ এখন আর সুরেলা নেই, একটা যান্ত্রিক আওয়াজে খনা বলল, “চুপচাপ শুয়ে পড়। সকালেই বেরিয়ে পড়তে হবে।”

শঙ্কর বলল, “আমি তোমার মতো কোনো প্রোগ্রামিং নই, আমি মানুষ। তোমার হিসাবমতো আমাকে চলতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। আমি এই মহাকাশযানের ক্যাপ্টেন তোমাকে অর্ডার করছি স্পেসবোটের দরজা খুলে দাও।”

খনা আর কোনো উত্তর দিল না। শঙ্করের ল্যাপটপ শাটডাউন হয়ে গেল। আর রুমের সমস্ত আলো নিভে গিয়ে একটা ঘুমপাড়ানিয়া গানের  সুর বাজতে লাগল। শঙ্করের চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসতে লাগল।

শঙ্করের ঘুম যখন ভাঙল তখন সবাই উঠে পড়েছে, হাতে চায়ের ট্রে নিয়ে হাজির কিকি। কিকি একটা হিউম্যানওয়েড, অর্থাৎ অবিকল মানুষের মতো দেখতে উন্নত প্রজাতির রোবট। কিকি  চায়ের কাপটা শঙ্করের দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলল, ” গুডমর্ণিং ক্যাপ্টেন !”.

শঙ্কর চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে কিকিকে পাল্টা অভিভাদন করে বলল, “গুডমর্ণিং কিকি, তোমার খবর কি ?”
.

কিকি বলল, “আজই আমাকে জাগানো হয়েছ ক্যাপ্টেন। চা খেয়ে বাইরে আসুন, সবাই রেডি।”

কিকি চলে গেল। শঙ্কর চা শেষ করে ডাইনিং হলে এল।  সবার ব্রেকফাস্ট করা হয়ে গেছে, শঙ্কর ব্রেকফাস্ট করতে বসল। স্পেসশিপের নিজস্ব গার্ডেনের টাটকা ফল আর ফ্রিজারে রাখা অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে সংরক্ষিত দুধ দিয়ে তৈরি সুস্বাদু সব খাবার। শঙ্কর তাড়াতাড়ি ব্রেকফাস্ট শেষকরে হলে এল, সেখানে টিমের সকলে হাজির।

                     স্পেসবোট হতে বেরিয়ে রোভারটি আবার চলতে লাগল। কিকি এই গ্রহের ব্যাপারে খুব কৌতূহলী। সে বারবার জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য উপভোগ করছে।

শঙ্কর কিকিকে বলল, “আচ্ছা কিকি তোমার তো নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেম আছে তাই না ? মানে তোমার সিস্টেম কি মেইন সিস্টেমের উপর নির্ভরশীল ?”
.

কিকি বলল, “আমার সিস্টেম সম্পূর্ণরূপে স্বতন্ত্র। মেইন সিস্টেমের সঙ্গে একটা অদৃশ্য ওয়াইফাই সংযোগ দিয়ে যুক্ত ছিলাম। এই সংযোগটা অনেকটা ভ্রূণের সাথে মায়ের আম্বিলিক কর্ডের মাধ্যমে যুক্ত থাকার মতো। এখন আমি না চাইলে মেইন সিস্টেম আমাকে কন্ট্রোল করতে পারবে না। “.

শঙ্কর হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। শঙ্করের এহেন প্রশ্নে সবাই অবাক হয়ে গিয়েছে। এমা শঙ্করের কাঁধে হাত রাখল, তারপর বলল,” তোমার এরকম প্রশ্নের মাথামুণ্ডু কিছুই আমরা বুঝতে পারছি না। কি ব্যাপার একটু বুঝিয়ে বলবে ? “

শঙ্কর বলল,” কিছু একটা গোলমাল হচ্ছে।  “

হেনরি বলল,” কি গোলমাল ? আমি তো গোলমালের কিছু বুঝছি না।”

শঙ্কর এবার রিওকে বলল, “আমাদের আম্বিলিক কর্ড কাটা যাবে কি ?”

“মাত্র দশ মিনিটের জন্য ” রিও জবাব দিল।

শঙ্কর বলল,” লেটস ট্রাই। দেখ তো একবার। “

রিও  কিকিকে ডেকে নিল, তারপর কিকির পিঠের ইউএসবি পোর্টে  মিনি ল্যাপটপ হতে নির্গত ইউএসবি কেবল গুঁজে দিল। এবার চলল কোডিংয়ের কাজ। মিনিট দুয়েকের মধ্যে মেইন সিস্টেমের সঙ্গে রোভারের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।

.

… চলবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *