বরাহ গ্রহের আলো // ৭ // সুব্রত মজুমদার

বরাহ গ্রহের আলো // ৭ // সুব্রত মজুমদার
হেনরি ঝুঁকে পড়ল বৃদ্ধের উপর। অনুচ্চ গলায় বলল, “দাদু ! ও দাদু ! দাদু.. উউ.. ! টেঁসে গেলে নাকি  !”   তারপর এমার দিকে ঘুরে বলল, “দাদুকে একটু টাচ করে দাও তো। তোমার মতো রুপবতীর স্পর্শে দাদু তো দাদু  শ্যাওড়া গাছের প্রেতাত্মাও নবজীবন পাবে। একটু….”

.

কথা শেষ হবার আগেই হেনরির চোয়ালে পড়ল একটা বিরাশি শিক্কার রামঘুঁষো, হেনরি মেঝেতে উল্টে পড়ল। অগত্যা মধ্যস্থতা করতে শঙ্করকেই এগিয়ে আসতে হল। শঙ্কর হেনরিকে মেঝে হতে তুলে ভৎর্সনা করে বলল,” তোমার বয়স কমছে না হেনরি, তুমি যে বাচ্চাছেলেদের মতো আচরণ করছ সেটা মোটেই কাম্য নয়। এই বিপদের সময়ে আমাদের মাথা ঠাণ্ডা রেখে একজোট হয়ে বিপদের মোকাবিলা করতে হবে।”

হেনরি মাথা নামিয়ে শঙ্করের কথাগুলো হজম করে নিল। তারপর শঙ্করকে বলল, “স্যরি ক্যাপ্টেন !”   তারপর এমার কাছে গিয়ে হাত জোড় করে বলল,” পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও। তোমার সাথে আর কোনোদিন ইয়ার্কি করব না।

এমা একটু নরম হয়ে বলল, “ইয়ার্কি করাটা অন্যায় নয়, তবে লিমিট রেখে। “

শঙ্কর ইতিমধ্যে বৃদ্ধকে জাগানোর চেষ্টা শুরু করে দিয়েছে। শঙ্কর বিনম্র গলায় বলল,” স্যার ! স্যার ! আমরা খুব বিপদে পড়েছি যদি দয়াকরে যদি একটু সাহায্য করেন।”

বৃদ্ধ আস্তে আস্তে মাথা তুলল। বয়সের ভারে ঘাড় বেঁকে গেছে, চামড়া ঝুলে পড়েছে বিশ্রীভাবে। বৃদ্ধ কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, “সাহায্য। কে কার সাহায্য করে বাপু ! এই তো সেদিন আমার সর্দি হল, কিচ্ছুটির গন্ধ পাই না, সারা নাক শুধু সর্দিতে ভরা। কই কেউ তো সাহায্য করল না, কেউ তো বলল না যে এসো তোমার নাকটা মুছিয়ে দিই।”

এরপর এমার দিকে তাকিয়ে বুড়ো গেয়ে উঠল,

               “ও রসের নাগরী

                                                                                           কোথা গেল তোর ভরা গাগরী ? “

এমাও বুড়োর গা-ঘেঁষে দাঁড়াল । তারপর বুড়োর লম্বা পাকা দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে বলল,” কিন্তু দাদু এই প্রেতপুরী হতে বেরোবো কিভাবে ?….. বলনা দাদু !! “

বুড়ো এমার থুতনিটা ধরে বলল,” বুড়ো বলো না, বুড়ো বলো না ! কি এমন বয়স আমার। হ্যাঁ, চুলটা একটু পেকেছে বটে…… তবে সব দাঁতই আছে, একদম সাদা স্ফটিকে বাঁধানো। তা মেয়ে তুমি যদি আমায় বিয়ে করো তাহলে বাকিদের ছেড়ে দেব। বলব এখান হতে বেরোবার উপাই। “.

.

শঙ্কর বলল, “আপনি যদি হাঁসি তামাশা করেন তাহলে ঠিক আছে, কিন্তু যদি ভেবে থাকেন এমাকে আপনার কাছে ছেড়ে যাব তাহলে খুবই ভুল ভাবছেন। “
.

বুড়ো কাষ্ঠ হেঁসে বলল,” মানবে কি মানবে না সেটা তোমাদের ব্যাপার। আমি আমার কথা বললাম। “

যোগিন্দর রেগে গিয়ে বুড়োকে মারতে গেল। শঙ্কর যোগিন্দরকে শান্ত করে বলল,” মাথা ঠান্ডা রাখ যোগিন্দর, এসময় মাথা গরম করা ঠিক নয়। শান্ত হও। “
.

বুড়ো কি যেন একটা ভেবে উপর নিচে মাথা দোলালো দু’তিন বার। এরপর বলল,” আরেকটা উপাই আছে। যদি পারো তাহলে তোমাদের ছেড়ে দেওয়া হবে। আর না পারলে….”

বুড়োর কথা শেষ করতে না দিয়ে হেনরি বলে উঠল, “বলুন বলুন, আমরা পারবো। “
.

বুড়ো আবার চেয়ারে এসে বসল। তারপর  টেবিলের নিচ হতে একটা হুকো বের করে বেশ জোরে জোরে দু’তিনটে টান লাগালো।  নাকে মুখে ধোঁয়া বের করে বলল,” শঙ্কর, মন দিয়ে শোন। “.

শঙ্কর বুড়োর মুখে নিজের নাম শুনে বেশ অবাক হয়ে গেল। বুড়ো বলে চলল। “তুমি কি ভাবছ আমি জানি। তুমি ভাবছ আমি তোমার নাম জানলাম কিভাবে। আমি সব পারি। তোমাদের মহাকাশযান গঙ্গা আমারই ইঙ্গিতে ওয়ার্মহোল মারফত এই সৌরজগতে এসেছে। খনাও এখন আমারই ইঙ্গিতে চলে। আর হেনরির ডিবাগ ডিভাইস আমার এখানে অচল। যাইহোক এবার কাজের কথায় আসি।

আমি তোমাদের মতোই রক্তমাংসের মানুষ। আমার নাম চেতনক। গল্পটা তখনকার যখন পৃথিবীর মহাকাশবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন গ্রহে যাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। অনেকেই সফল। কিন্তু টেকনোলজি তখনও এতো উন্নতি হয়নি। মঙ্গলের পর বৃহস্পতিই ছিল অভিযাত্রীদের অন্যতম লক্ষ্য।

একদিন সকালবেলা আমার বাল্যবন্ধু রমেন আমাকে ফোন করে জানালো যে আমার জন্য একটা ভালো খবর আছে।

আমি বললাম, “বলিস কি রে একদম বৃহস্পতি। কিন্তু আমাকে নেবে কেন ভাই ?”

” ম্যালা ফ্যাচফ্যাচ করিস না। কলকাতায় চলে আয়। আমি তোকে ‘স্পেস রিসার্চ কোম্পানি’র সিইও এর সঙ্গে কথা বলিয়ে দেব। দ্যাখ কনভিনস করতে পারিস কি না।”

“ওকে ভাই, আমি সন্ধ্যাতেই রওনা হচ্ছি।”.

“হ্যাঁ, চলে আয়। কাল তোকে নিয়ে যাবো। রাখছি রে। বাই। “

রমেন ফোনটা কেটে দিল। আমি ব্যাগপত্র গুছিয়ে সন্ধ্যার ট্রেনে রওনা দিলাম। যাত্রাপথে গোয়েন্দা বিক্রমের কাহিনীগুলো পড়তে পড়তেই সময় কি করে কেটে গেল বুঝতে পারলাম না। হাওড়ায় নেমে ট্যাক্সি করে রমেনের বাড়ি যখন পৌঁছালাম তখন মধ্যরাত্রি।

‘স্পেস রিসার্চ কোম্পানি’র সিইও ডঃ পওন গনপত টেণ্ডুলকরের সাথে দেখা হল। খুব হাঁসিখুশি লোক। নিজেই উঠে এসে আমার সাথে করমর্দন করলেন।

-“হাউ আর ইউ মিঃ ভট্টাচার্য্য ! আপনার ব্যাপারে রমেনবাবুর কাছে সবই শুনেছি। একইসাথে ফিজিক্স আর বায়োলজিতে এমন পাণ্ডিত্য খুবই রেয়ার।”

… চলবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *