বাংরিপোসির তিন রাত্তির… : পৃথা সিনহা দাস

আমার মামা শ্বশুরের বাড়ি দূর্গাপূজার প্রচলন আছে। বিশাল পরিবার, পুজোর কটা দিন সবাই মিলে মিশে, আড্ডায় হৈ হৈ করে কেটে যায়। একাদশীর দিন বাধ্যতামূলক ভাবে পরিবারের পাঁচমিশালী সদস্যরা মিলে ২/৩ দিনের জন্য কাছে পিঠে ঘুরে আসা প্রায় একটা রেওয়াজে পরিনত হয়েছে।

কথায় আছে না… “যদি হ ও সুজন, তেঁতুল পাতায় ন জন”…. সেরকমই…আমরাও সুজন, একসাথে ঘুরতে যাব ৩০ জনজন, তাই সদলবলে বেড়িয়ে পরা হল উড়িষ্যার ঠাকুরানি পর্বতশ্রেণীর পাদদেশে অবস্থিত ময়ূরভঞ্জ জেলার অন্তর্গত বাংরিপোসির উদ্দেশ্যে। আপন রূপের মাধুরী মিশিয়ে প্রকৃতি ঠাকরূন তাকে সাজিয়েছেন। অপার শান্তি, নিস্তব্ধতার মাঝে শহুরে জীবন থেকে যেন এক ছুটে স্বপ্ন রাজ্যে গমন।

নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলায় চড়ে মন ভেসে যায় সুদূরে
হারিয়ে যাব হাওয়ার সাথে তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে।।

বালাসোর থেকে গাড়ি ছুটে চলেছে হাওয়ার গতিতে। আকাশে মেঘ, রোদ্দুরের লুকোচুরি খেলা। খোলা জানলা দিয়ে মেঠো বাতাস গাড়ির ভিতর ছড়িয়ে দিল মন ভালো করা নাম না জানা ফুলের সুবাস। এই অপরূপ পারিপার্শ্বিকতার সাথে যেন আমার জন্ম জন্মাতরের সম্পর্ক। কি অদ্ভূত…. গাড়ির অডিও সিস্টেম এ বাজছিল কিশোর কুমারের গান….. ‘তেরা মুঝসে হ্যায় পেহলে কা নাতা কোই, ইঁয়ু হি নেহি দিল লুভাতা কোই’… আশ্চর্য সমাপতন।

সবুজে ঘেরা নিরালা খৈরি রিসোর্ট এ আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল। সবুজের মাঝে দিন তিনেকের বিশ্রাম। পাঁচমিশালী সদস্যরা মিশেল ভেঙে বেড়িয়ে যে যার বয়সানুসারে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে গেলাম। আমাদের মহিলা মন্ডলীর উৎসাহ দেখার মতো। থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোড়ের রোজনামচা মুক্ত তিন দিনের ছুটি কে চেটে পুটে নিতে ভীষণ আগ্রহী। দ্বিপ্রাহরিক আহারের পর বেড়িয়ে পরলাম পারিপার্শ্বিকতার সাথে আলাপ জমাতে।

রিসোর্ট এর শেষ যেখানে তার কিছু দূর থেকে পর্বত শ্রেণীর শুরু। রিসোর্ট এর উল্টো দিকেই এক নিস্তরঙ্গ দীঘি। টলটলে জলে ফুটে আছে সাদা, গোলাপি পদ্ম। কিছুদূর এগিয়ে একটি ছোট টিলার উপর মহিলাদের গোলটেবিল বৈঠক বসে গেল। দলের কম বয়সী আমরা চুপি চুপি প্ল্যান সেরে ফেললাম রাতের আহার পর্ব মিটিয়ে বেড়িয়ে পরবো রাত্রিকালীন বাংরিপোসির রূপ প্রত্যক্ষ করতে।

চাঁদের আলোয় পথ চলতে বেশ ভালো লাগছিল। দূরের কোনো সাঁওতাল গ্রাম থেকে ভেসে আসছিল মাদলের দ্রীম দ্রীম আওয়াজ, যা মাদকতা ছড়িয়ে দিচ্ছিল বাতাসে। খোলা আকাশের নীচে রাস্তার ওপরেই বসে পরলাম আমরা। সবাই যেন কেমন বাক্য হারা। বুনো ফুলের গন্ধ, ঝিরিঝিরি বাতাস, মাদলিয়া মিঠে বোল, চাঁদ ওড়া আকাশ আর আমি। বাকি সব তুচ্ছ। এমন পরিবেশে মৃত্যুও সুখের। দলের এক সাবধানী সদস্যের তাড়নায় ভাললাগা টুকু সঙ্গে নিয়ে ফিরে আসলাম রিসোর্ট এ।

পরের দিন সকাল সকাল বেড়িয়ে পরা হল সদলবলে। যাওয়া হবে যথাক্রমে ২৬ কিমি দূরবর্তী বাঁকেবল ড্যাম ও ৫৫ কিমি দূরবর্তী সুলাইপাত ড্যাম। আজকের আকাশে যেন আলোর বাঁধ ভেঙেছে। গতকালের মেঘ রোদের লুকোচুরি খেলায় মেঘ কে বন্দী করে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান রোদ আজ তেজি ঘোড়ার মত ছুটছে, পাল্লা দিয়ে ছুটছে আমাদের বাহন ও গন্তব্যে। ছায়াঘেরা পথ, ছোট ছোট গ্রাম, রাস্তায় শুকোচ্ছে সোনালী ধান, দূরে ছোট ছোট পাথুরে টিলা,আদিগন্ত বিস্তৃত সবুজ প্রান্তর।

সব যেন কোন শিল্পীর নিপূন তুলির ছোঁয়ায় সজীব, জীবন্ত। মনের মধ্যে ভাবান্তর ঘটায়। ভাবের ঘরে আগল দিয়ে ফিরে আসি বাস্তবে। চোখের সামনে বিশাল জলাধার…বাঁকেবল ড্যাম। রৌপ্যজ্জ্বল জলের ধারে দাঁড়িয়ে কেটে গেল বেশ খানিকটা সময়। ক্লিক.. ক্লিক.. ক্লিক.. সম্মিলিত শব্দ, বিভিন্ন ভঙ্গিমায় সেলফি আর উথালপাতাল বাতাস সুলাইপাত ড্যাম এর চারপাশের সবুজ বনানী হাওয়ার সাথে গভীর আলোচনায় মগ্ন। হঠাৎ হঠাৎ এ ওর গায়ে ঢলে পরছে কিশোরী সুলভ উচ্ছাসে।

অস্তগামী সূর্যালোকে জলে মায়ার খেলা। সেই মায়াঞ্জন চোখে মেখে ফিরে এলাম আস্তানায়। গতকাল যাদের ফাঁকি দিয়ে রাত্রি কালীন ভ্রমণে বেরিয়েছিলাম আজ আর তাদের ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হল না। অতঃকিম… ঘোড়ার ডিম… অভিমানীরা সব রিসোর্ট এর ভেতর আড্ডায় মাতলাম এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই বিরোধী পক্ষের সঙ্গে সখ্যতা হয়ে গেল। মাথার উপরে গাছের ফাঁক দিয়ে চাঁদ আজ লুকোচুরি খেলছে। মিঠে বাতাস, মাদলিয়ার তাল, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর আমরা অসম বয়সী মহিলারা সেই রাতে প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলাম।

গতকাল রাতের মুগ্ধতা কাটিয়ে ঘুমোতে দেরী হয়ে ছিল বটে… তাতে কী, আজ ভোর বেলা গাড়ি করে কয়েকজন রিসোর্ট এর উল্টো দিকের রাস্তা ধরে পৌঁছে গেলাম বুড়িবালাম নদীর ধারে। সময়ের স্বল্পতার জন্য নদীর সাথে আলাপ তেমন জমলো না। ফিরে এসেই প্রস্তুত হয়ে নিলাম৫০ কিমি দূরের ব্রাহ্মণকুন্ড যাত্রার জন্য।

আজকের পথের ছবি একটু অন্যরকম। রাঙামাটির পথ, বাঁশঝাড়, স্বচ্ছসলীলা নাম না জানা ছোট ছোট নদী। নেমে পরলাম শীতল জলের স্পর্শ নিতে। আঃ! কি শান্তি… জল এত ই স্বচ্ছ যে নদী বক্ষের নুড়ি পাথর স্পষ্ট ভাবে দৃশ্যমান।


ছোট্ট পাহাড়ে ঘেরা ব্রাহ্মণ কুণ্ডের অবস্থান অতুলনীয়। যেন এক প্রাকৃতিক পাথরের বাটি। কখনো কখনো নিস্তব্ধতাও যে কানে তালা লাগায় ওখানে গিয়ে সেটি অনুভব করলাম। যে দিকেই তাকাই সে দিকে ই শুধু সবুজ আর সবুজ। এই হরিতাভা চোখে ঘোর লাগায়, মনে লাগায় নেশা। নেশাতুর মনে রওনা দিলাম কুলিয়ানা গ্রামের পথে।

বাংরিপোসি থেকে ২০ কিমি দূরের পথ। এই গ্রাম ডোকরা গ্রাম নামেই বহুল পরিচিত। কেন জানি না ডোকরা শিল্পী দের কাজের নিদর্শন দেখার থেকে আমাকে টান ছিল রাঙ্গামাটির পথ, মাটির বাড়ি র দাওয়া, সোনালী ধান, নদীর জল, ছায়া মাখা পথ, বুনো ফুল,সবুজ বনানী,দৃষ্টিপথের সীমানা ছাড়ানো আদিগন্ত সবুজের বিস্তার … রিসোর্ট এ ফিরে আজ যেন বড়ো বিষন্ন লাগছিল।আজ ই তো শেষ রাত। সাঙ্গ হল স্বপ্ন যাপন, পুনরায় খেলাঘরে প্রত্যাবর্তন।

আজ ফেরার পালা। মনে একটা আক্ষেপ থেকে গেল…. বুদ্ধদেব গুহ যে হোটেলে বসে তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘বাংরিপোসির দু রাত্তির’ রচনা করেছিলেন সেই স্থান টিকে সামনে থেকে দেখা হল না। সামনের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় দূর থেকে দর্শন করেই সন্তুষ্ট থাকতে হল।
বিস ই এর হাটের নাম শুনেছি। প্রতি শনিবার করে এই হাট বসে বাংরিপোসি থেকে ১৮ কিমি দূরে। আমাদের ফেরার দিন টিও ছিল কপাল গুনে শনিবার।

হাট ছুঁয়ে স্টেশন এ যাওয়া হবে ঠিক হল। লোকে লোকারণ্য শনিবাসরীয় হাট। সুসজ্জিত সাঁওতাল মেয়ে পুরুষ দের দেখতে বেশ লাগছিল। ভীড়ের মধ্যে ই সেঁধিয়ে গেলাম গ্রাম্য হাটের সাথে একাত্ম হতে। সীমিত সময়ের ঘেরাটোপে আটক হয়ে বিস ই এর হাটের মূল আকর্ষণ মোড়গের লড়াই চাক্ষুষ করতে পারলাম না। সময় শেষ। ফিরতে হবে আপন পথে।

ট্রেনে উঠে বসা মাত্র মন টা হু হু করে উঠলো। আমি যত সম্মুখে এগোচ্ছি মন তত পিছনে হাঁটছে, ফিরে ফিরে যাচ্ছে ফেলে আসা মেঠো পথ, বুনো ফুলের গন্ধ, পদ্মফুল, মাদলের দ্রীম দ্রীম শব্দের কাছে। বাংরিপোসির সাথে আমার প্রেম অনেক কালের। বুদ্ধ বাবুর বিখ্যাত উপন্যাস ‘ বাংরিপোসির দু রাত্তির’ পড়ার পর থেকেই ভালোলাগা, ভালোবাসা।

ব ই এর পাতার বর্ননা আর নিজের চাক্ষুষ অনুভূতির যখন মিশেল ঘটল তখন বাংরিপোসি ভীষণ ভাবে জীবন্ত হয়ে উঠল আমার কাছে। এমন প্রকৃতির মাঝেই তো নিজেকে নতুন ভাবে আবিষ্কার করা যায়, বুদ্ধ বাবুর উপন্যাসের নায়ক নায়িকা অরি আর কিশার মত সমাজ ভুলে ভালোবাসায় মগ্ন হওয়া যায়। এই প্রকৃতির মাঝে যে আমায় ফিরতেই হবে, অপেক্ষায় থাকি….. কারণ… ‘তেরা মুঝসে হ্যায় পেহলে কা নাতা কোই…….

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: