বাংলা কবিতার নিভৃত সাধক অশোককুমার সাহা // তৈমুর খান

 

 

smritisahitya.com

.

.

মানুষটিকে আমরা তেমনভাবে চিনতেই পারিনি। বীরভূম জেলার মল্লারপুরে “ভালোবাসা”তেই চিরদিন বন্দি থেকে গেলেন। যৌবনের মধ্যগগনে স্ত্রীকে হারিয়ে দুটি ছোট সন্তানকে তিল তিল করে মাতৃস্নেহে নিজেই বড়ো করেছেন। একদিকে স্ত্রীর স্মৃতিনির্ঝরে নিজেকে ক্ষয় করে লিখেছেন কবিতা, অপরদিকে স্নেহমমতায় সন্তান দুটিকে আঁকড়ে ধরেছেন।

.

.

সারাজীবন স্ত্রীর উপস্থিতি টের পেয়েছেন। সর্বব্যাপী একাকিত্বে তাকে উপলব্ধি করেছেন। আর আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে এক একটি শব্দের ফুল তুলে মালা গেঁথেছেন ।  একাধিক বইও প্রকাশ করেছেন, কিন্তু প্রচারের আলোয় আসতে চাননি। সম্প্রতি সপ্তর্ষি প্রকাশন থেকে তাঁর কাব্যসমগ্র প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া বাছাই একশো কবিতাও। কোনও দৈনিক তাঁকে নিয়ে একটা লাইনও লেখেনি। আশ্চর্যভাবে উপেক্ষিত এই কবি পাঠকের উদাসীনতায় অগোচরেই থেকে গেছেন।

.

.

অশোককুমার সাহা ১৯৪৩ সালে ১৯ অক্টোবর মাতুলালয় বেনাগাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। অধুনা ঝাড়খণ্ডের দুমকা জেলার অন্তর্গত। স্থায়ী বসবাস বীরভূমের মল্লারপুরেই। পিতার নাম কাশীনাথ সাহা, মাতা শ্রীমতী মলয়বাসিনী সাহা। প্রেরণাদাত্রী স্ত্রী শ্রীময়ী অর্চনা ১৯৯০ সালের জুন মাসে প্রয়াত হন। মল্লারপুর হাইস্কুল, রামপুরহাট কলেজ এবং বঙ্গবাসী কলেজেও তিনি পড়াশোনা করেছেন। বাংলাভাষা ও সাহিত্যে সাম্মানিক স্নাতক। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ অসমাপ্ত রেখেই পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শ্রমদফতরে চাকুরিতে প্রবেশ করেন।

.

.

১৯ ৭১ সালে পিতৃ বিয়োগ এবং ১৯ ৯০ সালে অকালে স্ত্রী বিয়োগ তাঁর তারুণ্যকে অনেকটা ধূসর করে দেয়। দুটি নাবালক ছেলেমেয়ে নিয়ে তিনি শোকবিহ্বল হয়ে পড়েন। সেই থেকেই কবিতাকে আশ্রয় করে বাঁচতে চান। কবিতাই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের ও মনের ভাষা। ঐশ্বরিক মন্ত্রের স্তবস্তুতি। কবিতাতেই তিনি খুঁজতে থাকেন তাঁর প্রিয় নারীর মুখ।

.

.

একান্ত কথোপকথন কবিতাতেই চলতে থাকে। ছেলেমেয়েরা বড়ো হয়ে গেলেও আজও তিনি একা কবিতাকে আঁকড়ে আছেন। তাঁর লেখার উৎস তো এখানেই। একাধিক বইও প্রকাশ করেছেন, কিন্তু প্রচারের আলোয় আসতে চাননি । সম্প্রতি সপ্তর্ষি প্রকাশন থেকে তাঁর “বাছাই একশো কবিতা”ও প্রকাশিত হয়েছে, এমনকী “কাব্যসমগ্র”ও  দুইখণ্ডে প্রকাশিত । কাব্যগ্রন্থগুলি হল : “সারারাত গোলাপ”(১৯৭৪) , “ভালোবাসার আয়নায়”(১৯৯১), “নিস্তরঙ্গ জলের ভেতর”(২০০২), “সামনে এক জানালা আকাশ”(২০০৪) , “চেতনার বিমূর্ত বাগানে”(২০০৬), “জলের মলাটে”(২০০৮), “একা ঘরে একঘর কথা”(২০১০), “বলা যায় তবে সবটুকু নয়”(২০১১), “হলুদ বসন্তের তৃষ্ণা”(২০১২) প্রভৃতি। এছাড়া গদ্যের বইও আছে।

.

.

সমস্ত কাব্যের কবিতাগুলিতেই কবিহৃদয়ের শোক ও শূন্যতার হাহাকার গভীরভাবে ছায়া ফেলেছে। নারীও ঈশ্বর হয়ে উঠেছে। তেমনি প্রকৃতির যাবতীয় কানাকানিতেই ফুটে উঠেছে তাঁর অকালপ্রয়াতা স্ত্রীর মুখ। “জীবনে বসন্ত আসে, বসন্ত যায় —  তবু তৃষ্ণা থেকে যায় বাসনার ঘ্রাণে।”

.

.

এই দর্শনেই কবি বিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন। কবিতাগুলিতে বৈষ্ণবীয় বাউলের সহজিয়া তত্ত্বটি যেমন সহজে লক্ষণীয়, তেমনি রবীন্দ্রনাথের আত্মদর্শনের প্রজ্ঞাটিও ভাবসম্মেলনের বা মিস্টিসিজমের ছায়াপাতে উজ্জীবিত। কবিতার জটিল পরীক্ষা নিরীক্ষায় তিনি যাননি। হৃদয় ও আবেগকেই প্রতিপালন করেছেন। নাম যশের ঊর্ধ্বে আত্মস্থিত শূন্যতার তাগিদ থেকেই তাঁর এই যাত্রা। জীবনের রূপান্তর খুঁজতে খুঁজতে কবি প্রবহমান হয়ে ওঠেন —

.

.

“আমি প্রতিদিনই আরও একটা
ভোরের অপেক্ষা নিয়ে থাকি,
প্রতিটি ভোরই আমাকে হাত ধরে
কবিতা লেখায় —
রং বদলাতে বদলাতে কখন যেন সে
নিজেই রমণীয় নারীর মতো
কবিতা হয়ে যায়,
জীবনের গান হয়ে ভিতরে ভিতরে শঙ্খ বাজায়।”

.

.

“ভোরের অপেক্ষা নিয়ে”  এভাবেই কবির পথ চলা। যে ভালোবাসা গার্হস্থ্যজীবন থেকে আধ্যাত্মিক, স্বপ্ন থেকে আত্মোৎসর্গ পর্যন্ত ব্যাপ্তি রচনা করে — সেই ভালোবাসারই পথিক অশোককুমার সাহা ।  বিখ্যাত লেখক ম্যাক্সমুলারের কথায় বলা যায় : “A flower can not blossom without sunshine, and man can not live without love.” সূর্য ছাড়া যেমন ফুল ফোটে না, ভালোবাসা ছাড়া একজন মানুষও বাঁচতে পারে না। অশোক সাহা সেরকমই মানুষ।

.

.

প্রেমের স্পর্শে তিনি জীবনের মহিমা উপলব্ধি করেন। তাঁর কবিতা মোহের স্তর অতিক্রম করে নির্মোহ হতে পেরেছে। তেমনি ঘরকেও পৃথিবীর অঙ্গনে এনে বসিয়েছেন। ব্যক্তিকে করেছেন আবহমান প্রেমিক। “নিস্তরঙ্গ জলের ভেতর”তিনি শুনতে পেয়েছেন সেই প্রেমেরই পদধ্বনি —

.

.

“যে ঘরের অন্দরমহল তোমার

অমল হাতের স্পর্শে

          পাহাড়ি ঝরনার মতো কথা বলে।”

.

.

এই কথা প্রেমিকের কানেই পৌঁছয়। প্রেমিকও সাধক হয়ে যান। দীর্ঘ তপস্যা চলতে থাকে কবিতাযাপনে। তখন লিখতে পারেন —

.

.

“বস্তুত, কবিতায় এখন আমার ঘরবাড়ি,

কবিতাকে ভালোবেসে ঘর বেঁধে আছি।”

এই ঘর তো পৃথিবীময়। Love is world যেমন, তেমনি Love is words ও ।  কেননা সেখানে তো হৃদয়েরই কথা থাকে। প্রিন্সেস ডায়ানা বলেছেন —

.

.

“Only do what your heart tells you.”

তখন তো বস্তু আর বস্তু থাকে না। অশোককুমার সাহাও লিখেছেন —

“ চৌকাঠ পেরিয়ে রোদ্দুর

ওই রোদ্দুরে বসন্তমেঘ

চুল শুকায় ।”

.

.

মেটাফোরের আলোক পড়ে আবার কখনও তা মেটাফিজিকস্ হয়ে যায়। রোদ্দুরের চৌকাঠ পেরোনো এবং বসন্তমেঘের চুল শুকানোতে এই ধর্মই ফুটে ওঠে। সর্বময়তার বোধে উদ্দীপিত হয় প্রেমের জগৎ। কবিতাও ভিন্নতার আশ্রয় পায়। ষাট-সত্তর দশকের অনালোকিত কবি হলেও অশোককুমার নির্বেদ জীবনের স্বয়ংক্রিয় অভিমুখে পৌঁছাতে চেয়েছেন । তাঁর কবিতা আবহমান প্রেমিকহৃদয়ের মানবিকরসের আবেদনে বেজে ওঠে ।

.

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *