বাউল গাজী // নূপুর সেনগুপ্ত

42542

এক বাউল, প্রকৃত অর্থে বাউল। পরনের পোশাক এবং দেহের অবয়ব প্রমাণ করে তাঁর সঙ্গহীন, সহায়হীন, সংসারত্যাগী যাপনের সত্যতা।
মালাগুচ্ছ কিন্তু কণ্ঠে অমলিন। আর তাঁর কণ্ঠের গান! সে যেন এক বিস্ময়!
আমি পথ ছেড়ে থমকে যাই!
বলেছিলাম, ‘আরো একটু গান করুন’। মাথা নামিয়ে
শ্বাস নিয়েছিলেন।

যেখানে যেমন পায়, যাকে পায় মাতিয়ে রাখে কথার মাধুর্যে, মনের রসে। সাথে থাকে তার প্রাণ মাতানো
গানের ভান্ডার, আর সুরের অবাধ ওঠা নামায় সমৃদ্ধ
তার কন্ঠ। সাবলীল সঞ্চরণ। কিন্তু গাজী তার দৃষ্টি শক্তি হারিয়েছে। গাজী আজ বাউল হল। গাজী বাউল ছিল না। সংসারী ছিল। গান গায় গাজী চিরকাল। আজ সেই গানই তার শান্তির আশ্রয়। আজ সে অন্ধ বাউল।

দেশ গাঁয়ের বাড়ি, একই উঠোনের বেশ কিছুটা দূরত্বে
দুই বাড়ি। এক বাড়ির মাচায় যখন লাউ ফলে, অন্য বাড়ির মাচায় তখন কুমড়ো ফুলে ভরে যায়।
সন্ধ্যামালতী তার হলুদ বেগুনী স্নিগ্ধতা নিয়ে দুই বাড়ির আঙিনাই আলো করে তোলে প্রতি সন্ধ্যায়।
গাজীর মা’ নমাজ পড়ে, হারিকেনের আলো পড়ে তার মুখে। সেখানে প্রশান্তি। মণির মা’ সন্ধ্যাপ্রদীপ হাতে এগিয়ে যায় তুলসীমঞ্চের কাছে। প্রণাম করে করজোড়ে। উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তার কপোল। প্রভাত,
সে ও তার উদার আনন্দময় নরম আলোর পরশ ছড়িয়ে দেয় উভয় আঙিনায়, দুটি উঠোন ভরে যায়
নতুন দিনের নতুন আনন্দে।

গাজী আর মণি, সমবয়সী বলা চলে। একজন যায় ছেলেদের স্কুলে, মণি যায় গার্লস স্কুলে। সময় একই প্রায়। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত। বাড়ি ফিরে ভাত খাওয়া। তারপর মাঠে খেলতে যাওয়া। আবার সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে বই হাতে বসা। সাথে কখনো মুড়ি বাতাসা, কখনো নারকেল মুড়ি। সুন্দর অনাবিল জীবন, দুই পরিবারে কোথাও কোনো বিরোধ নেই, নেই কোনো অসাচ্ছন্দ‍্য। ওরা বড় হয়, ধীরে ধীরে বন্ধুত্বের গভীরতাও বৃদ্ধি পায়। সখ্যতা থেকে ভাললাগা, প্রণয়। বাড়ির অভিভাবক বোঝে অনেক পরে। মণির মা আতঙ্কিত, গাজীর মা, সেও শঙ্কিত।
তারা বাধা দিতে চায়, বোঝাতে চায়। কিন্তু এ যে হৃদয়বন্ধন, কোন বাধা মানবে কেন।

গাজীর বাবা প্রভাবশালী রাজনৈতিক সামাজিক নেতা। সকলে সমীহ করে।
সাধারণ ঘরের মেয়ে মণি। আত্মসম্মান বোধ, তথাকথিত মর্যাদাবোধ, কিছু কুন্ঠাবোধ―কাজ করে পরিবারে। তাই সংশয়, তাই দ্বিধা।
তবুও কালের নিয়মে দিন কাটে, ওরা বড় হয়―বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় তারপর বিশ্ববিদ্যালয়।

গাজীর চাকরি হয়। মণি গৃহশিক্ষিকার ভূমিকায়। ভালই উপার্জন। দেখা সাক্ষাৎ হয় বহু ব্যস্ততার মধ্যেও। একদিন ওরা বিয়ের প্রস্তাব রাখে উভয়ের
অভিভাবকের কাছে। যথারীতি চমক। কেউ রাজি নয়।
বিষাদ ভরা দিন, বিনিদ্র রজনী কেটে যায়। মণি ছাত্র
পড়ানোর অবকাশে গান শেখে, গাজীর কাছেও শেখে অনেক গান।

গাজীর পরিবার একদিন দূর গ্রামের এক রূপবতী
কন্যার সাথে গাজীর শাদি দিয়ে দেয়। অনেক ধূমধাম, অনেক আয়োজন। গাজীর মতামতের কোনই মুল্য সেখানে ছিল না। শিক্ষার আলোর প্রবেশ যেন নিষিদ্ধ। মণির নিদ্রাহীন রজনী আরো গভীর হয়। মণি একা থাকার সংকল্পে দৃঢ়। একাকীত্বই তার একান্ত অবলম্বন। সে নিজেকে সমৃদ্ধ করে তোলে। আরো নিবিড় করে পড়াশোনা আর গানকে আঁকড়ে ধরে।

মণিরা একসময় তাদের পুরোনো আবাস ছেড়ে দূরে চলে যায়। মণি চাকরি পায় একটি স্কুলে, অন্য গ্রামে।
সঙ্গী বৃদ্ধ পিতা-মাতা । বেদনার দৃষ্টি ফিরে ফিরে চায়, ছেড়ে যেতে চায় না মন, তবু যেতে হয়।
মণির মা মারা যান কিছুদিন পরে। একা মণি, আর তার বৃদ্ধ পিতা। সময় চলে মন্থর গতিতে। চাঞ্চল্যহীন
নীরব পরিবেশে থাকে শুধু মণির গান, যা আজ আরো উন্নত।

গাজী তার সংসারে ব্যস্ত। দায়বদ্ধ। নিজের চাকরি,
বাবার পরিজনবর্গ সবই তাকে সামলাতে হয়।
সর্বদা কর্মব্যস্ত। গাজীর মা’ অবাক দৃষ্টি মেলে থাকেন
ছেলের মুখে। নীরব গাজী বিস্মিত হয়। গাজী ঘুমিয়ে থাকলে কখনো বা মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে দেন। গাজী অনুভব করে, তার চোখদুটি জ্বালা করে ওঠে।
গাজীর বউ সংসার কর্মে সুনিপুণা, গৃহলক্ষ্মী, সবার আদরের। শুধু দিন যায়, বছর যায়―সন্তানহীন থাকে।
একবার গাজী অসুস্থ হয় ভীষণভাবে। অনেক চেষ্টায় সুস্থ হয়ে ওঠে। তবে দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে আসে। ভালো আর হয় না। গাজীর বাবার সব চেষ্টা ব্যর্থ, ছেলে ক্রমশ অন্ধ হয়ে যায়। মাত্র চল্লিশ বছর বয়স, গাজী যেন তার সব শক্তি হারায়। হতাশা গ্রাস করে
পুরো পরিবারকে। গাজীকে গ্রাস করে ব্যর্থতার গ্লানি। কিন্তু গান তার হারায় না। যেন আরো ভাল
গাইতে পারে গাজী। গাজী বাউল হল। বিবাগী হল।
সংসার পিছনে ফেলে নিরুদ্দেশের পথে এগিয়ে গেল। এবার গাজী ছুটি পেল। সে অনুভব করল― আকাশে তার তেমনি আছে ছুটি। দিগন্তের পানে চলে, এদেশ থেকে সেদেশ, পথে সঙ্গী পায় যাকে
তাকেই গান দিয়ে বশ করে নেয়। অসীম ক্ষমতা গাজীর। দিন যায়, বয়স বাড়ে, পিতৃহীন হয়, মাতৃহীন হয়। সে খবরও তাকে ঘরের পানে ফেরাতে পারে না।
গৃহলক্ষ্মী তার গৃহেই থাকে একা। সেখানে গাজীর কোন অন্তরের টান নেই, নেই কোনও বন্ধন। সে মুক্ত।
ক্রমশঃ জীর্ণ শীর্ণ দেহটাকে টেনে চলে। তবুও পিছন
ফিরে চায় না। গানই তার একমাত্র সাথী।

মণির দিন কাটে তার মতো করে। বৃদ্ধ বাবা, তার পড়া ও পড়ানো, আর সুযোগ পেলেই প্রাণের গান।
মণি মাঝে মাঝে ভাবে, ‘একবারও কোনো কারণে
কোনো এক বাউল যদি আমার দরজায় আসত, আমি গাজীর খবর পেতাম কী!’ গাজী আছে তো!
কেমন করে আছে! ভাবে গাজী কী মণিকে মনে রেখেছে! কখনো কখনো বাবাকে নিয়ে তীর্থ ভ্রমণে
যায় মণি। মণির দুই চোখ খুঁজে ফেরে গাজীকে ।
কোন পথিক বাউল মণিকে বিচলিত করে। নিজেকে সংযত করে মণি।
একবার এক পাহাড়ে এক জীর্ণ ফকির আপনমনে গেয়ে যায় গান। সুর দিকবিদিক ভরিয়ে তোলে। কথা
অস্পষ্ট। যেন শোনা গেল―’সুখে-দুঃখে যে ভাবে হে,
থাকি যেথা সেথা। যেন তোমার নামের মালা, আমার
প্রাণে থাকে গাঁথা।’ মণির মনে হয়, ফকির কী দাগা খেয়েছে! তবে এমন প্রাণ ঢেলে গায় কেমন করে!
মণি নিচু হয়ে ফকিরের মুখ দেখার চেষ্টা করে। ব্যর্থ
হয়। গলার কাছে একটা ব্যথা অনুভূত হয়। যে ব্যথা মণির জীবনের পরম পাওয়া, পরম সাথী।
সে ব্যথায় নেই কোন ধর্মের রঙ, নেই কোন সংস্কারের ভ্রান্ত বিলাস।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *