বান্ধবহীন // অভ্র

12321

— দে কাকা, একটা cigarette দে। শালা মাথাটা ব‌্যাপক দপদপ করছে । যা খাটনি হলো আজ….

( আর্যর হাতটা কাঁধে পড়া মাত্র চমকে তৎক্ষণাৎ মাথা ঘুরিয়েছিলো অরণ‌্য। আর্যর পাশেই মাদুরে বসলো ও । )

— কী রে, কতোক্ষণ ?

— এই তো, মিনিট খানেক। মাসিমাকে দেখলাম নীচের ঘরে, সিরিয়াল দেখছেন । মঞ্জু দরজাটা খুলে দিলো, বললো ‘দাদা ছাদে আছে। ‘ তা এখানে এসে তো দেখছি শালা আকাশের তারা গুণছিস।

— ধুস, খামোখা তারা গুণতে যাবো কেন? এমনই বসেছিলাম। এই নে।

( একটা Silk Cut আর্যর হাতে দেয় অরণ‌্য। )

— তা বল, আর সব খবর বল। বাড়িতে সবাই কেমন আছেন ? মাসিমা, মৌ ওরা? আমার তো আর যাওয়ারই সময় হয় না। এতো কাজের চাপ পড়েছে, শালা পুরো শুষে নিচ্ছে !  দিনে তেরো ঘন্টা। আজ নেহাৎ এক সহকর্মী মারা গিয়েছেন বলে সারা দিন ছুটি কাটালাম । তাই এখন সামান‌্য হাওয়া উপভোগ করবো বলে ছাদে আসা। তায় আবার ফুটফুটে পূর্ণিমা। তা, আজ তো তোর একটা interview ছিলো, তাই না ?

— দাঁড়া boss দাঁড়া, তোর এতোগুলো প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তো আর cigarette-টাই জ্বালানো হবে না আমার।

( অরণ‌্য এক গাল হাসে। আর্য cigarette-টা জ্বেলে নিয়ে একটা টান দিয়ে পরপর দুটো নিপুণ ধোঁয়ার ring বাতাসে ভাসিয়ে দেয়। তুড়ি মেরে ছাইটা এক পাশে ফেলে। )

— বাড়িতে সবাই ভালোই… মা সময় কাটাচ্ছে বই পড়ে আর সেলাই করে ; সিরিয়ালের নেশাটা নেই তেমন। মৌ পাড়ার কিছু বাচ্চাদের ঘরে বসে পড়ানো শুরু করেছে। আমাদের দক্ষিণের ঘরটা ‘দিদিমণি’র classroom। আর আমি… যাক গে,হ‌্যাঁ আজ interview একটা ছিলো বটে কিন্তু…

— কিন্তু কী ?

( উঠে দাঁড়িয়েছে আর্য। এগিয়ে গিয়ে ছাদের একেবারে কিনারায় গিয়ে দাঁড়ালো ও । পাশের বাড়ির television থেকে ভেসে আসে ‘বাজলো তোমার আলোর বেণু’। )

— আরে এই আর্য, ওতো ধারে যাচ্ছিস কেন ? ন‌্যাড়া ছাদ একেই…

— নিপুণ ধারাবাহিকভাবে ধারাবাহিক রঙ্গ চলছে রে অরু। শালা ভাবতে পারিস, এই জৌলুসহীন বৈশাখে HMV-র ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র গান শুনতে পাচ্ছি আমরা ! জীবন আমাদের কতো সস্তা হয়ে গিয়েছে তাই না রে ? আর সস্তা হয়ে যাচ্ছে মানুষ আর মানুষের শ্রম, ধৈর্য‌্য, মূল‌্য !

( গভীর অথচ মজারু কন্ঠে বললো আর্য )

— সেইটেই তো দুনিয়ার নিয়ম ভায়া। দুনিয়ার রথের চাকায় তো পিষে মরতে আমাদেরকেই। আসলে সবটাই সস্তা আর ষোলো আনাই রঙ্গ । আমরা সকলেই salesman, কিছু না কিছু বেচবো বলেই বাড়ির বাইরে পা বাড়াই। কিন্তু এই সিরিয়ালের সঙ্গে interview-এর কী যোগাযোগ?

( অরণ‌্যর দিকে মুখ করে দাঁড়ায় আর্য। )

— ঘোরতর যোগাযোগ আছে। এই যে আজকে আমি যা যা সব যাযাবর-গোত্রীয় প্রশ্নের সম্মুখীন হলাম, তা তো আর কোনও Oscar-জয়ী ছবির সংলাপ নয় ! বরং বলতে হয় বরাহবার্তা। শালা পাঁচটা প্রশ্নের পর ষষ্ঠ প্রশ্ন বলে কিনা, ‘ আপনার সবচেয়ে বড় অর্জন কী ? ‘ বেকারের আবার অর্জন ! জীবনটাই শালা circus হয়ে রয়েছে আর অর্জন ! পাগল ভাত খাবি কী আঁচাবো কোথায়! এবার কী বুঝবো বল, তারা personal life সম্বন্ধে জানতে চাইছে নাকি educational life সম্পর্কে !

— হুম, সত‌্যই বড়ো বিচিত্র প্রশ্ন। কিন্তু তুই একেবারে চুপ তো থাকিসনি ;কিছু একটা তো বলেছিস !

( Cigarette-এ শেষ টানটা দিয়ে নীচের রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে আর্য। )

— এবার তো একটু গলা ভেজাতে হবে ভাই। Silk Cut-টা যেন চায়ের পিপাসাটা জাগিয়ে তুললো। চা বল আগে, তারপর কথা।

— তা মন্দ বলিসনি। আমারও একটু ইচ্ছা হচ্ছিলো। দাঁড়া…

( ছাদের দরজায় দাঁড়িয়ে বোন মঞ্জুকে চায়ের জন‌্য হাঁক দেয় অরণ‌্য। )

— Orders have been placed ! মুড়িমাখা আর চা। আরে কথায় কথায় আর offer করাই হয়নি। এবার বল, কী বললি !

— শুনবি ? বললাম আমার একমাত্র অর্জন আমি নিজে।

— বলিস কী রে ? উত্তর শুনে নিশ্চয়ই ওরা থ ?

— হ‌্যাঁ, সে আর বলতে ? তারপর তিনজনের একজন বললেন ‘আচ্ছা, আপনি এখন আসতে পারেন Mr. Mukherjee, পরশু আপনি একবার call করবেন। ‘ আমিও যেন একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম; বাপ রে বাপ, মাইরি এতো রকমের প্রশ্ন!

— এই জন‌্য বললি যাযাবর-গোত্রীয় প্রশ্ন ? তা বেশ। ভুল বলিসনি একেবারে।

( কিছুক্ষণ দুই বন্ধু চুপচাপ বসে থাকে। আর্য আর অরণ‌্য, সেই college life থেকে অন্তরঙ্গ হরি-হর আত্মা । )

— আমার কী মনে হয় জানিস ? “বেলা বোস”-কে এই চাকরীর খবরটা আর দিতে পারবো না, হবেই না শালা!

— সুচরিতা ? কেন কী বললেন madam আবার ? এবার চাকরী না হলে অন‌্য কোথাও ‘বাবা’ বিয়ে দিয়ে দেবেন ?

— অহং যথাসাধ‌্য তথাই প্রচেষ্টা করন্তি, কিন্তু ততোস‌্য result-ং ন মিলন্তি। প্রেমিকাস‌্য অশ্রুবারি আটকানোং লক্ষে মম অবস্থানং শোচণায়ৎ হবন্তি।

( জোরে হেসে ওঠে অরণ‌্য। ছাদের দরজায় দাঁড়িয়ে খিলখিল করে হেসে ওঠে বছর সতেরোর মঞ্জু-ও। )

— শালা, কী মন্ত্র বানিয়েছিস রে ! সংস্কৃতের তর্কালঙ্কাররাও তো নিজেদের অহংকার নি:সঙ্কোচে ধুলোয় লুটিয়ে দেবেন রে ! উহাদিগেরও অবস্থানং গ‌্যামাক্সিনং হয়ে যাবে ! আয়। মঞ্জু আয়, দেখে যা আর্যর কান্ড ! প্রেমিকার অশ্রুবারি ঝরার আগে আমার অশ্রুবারি ঝরছে হাসির চোটে।

( মঞ্জু হাসতে হাসতে tray-তে রাখা চা আর মুড়িমাখা ভরা দুটো বাটি নামিয়ে রাখে )

— হ‌্যাঁ শুনলাম। উফ আর্যদা, তুমি পারোও সত‌্যি  ! এবার H. S-এ সংস্কৃতের paper-এ তোমার এই শ্লোকটা লিখে দিয়ে আসবো কিনা ভাবছি ! Examiner ICU-তে চলে গেলেও যেতে পারেন।

( বলে মঞ্জু নীচে চলে যায় )

— সত‌্যি আর্য, তুই একই রকমের রয়ে গেলি, আর বদলালি না। সেই সদা-সহাস‌্য মেজাজ আর ফুরফুরে কন্ঠস্বর। আমাদের college magazine-টার editor কি আর এমনই ছিলি? এখন আর লিখিস না কেন বলতো ? দারুণ পদ‌্য লিখতিস তো !

( চায়ের পেয়ালায় চুমুক দেয় আর্য )

— হয়তো বদলে গেলেই ভালো হতো রে। নবারুণ ভট্টাচার্য‌্য-এর সেই কথাটা শুনিসনি ? “Poet-দের বেশি দিন বাঁচলেই বদনাম! Young থাকতে থাকতে টেঁসে গেলে সবাই বলে, আহা মালটা যদি বাঁতো ! ” শালা সত‌্যিই হয়তো মরে গেলে হতো বেশি ভালো ।

— হুম, তা হয়তো হতো ! কিন্তু আমি যে আর্যকে চিনি, তাকে যে চোখে হারাতাম ভায়া।

( দীর্ঘশ্বাস ফেলে আর্য  )

— তবে আমার কী বিশ্বাস জানিস আর্য, এই চাকরীটা তোর হবে । দেখিস তুই ! তুই এতো প্রতিভাবান একটা ছেলে, তোকে যারা বুঝবে না, সেগুলো সব গারল। তোকে তো আমি চিনি। কিন্তু ভাই, লেখাটা আবার শুরু কর। তোর মধ‌্যস্থ এই রসবোধটাকে, এই রুচিশীলতাটাকে enlarge কর আরও, আরও ছড়িয়ে দে।

— For the timing let the mind to be deaf and dumb ( চোখ দুটো গম্ভীর হয়ে আসে আর্যর ). দেখা যাক কী হয় । আচ্ছা আজ উঠি রে। আবার একদিন আসবো। আজ একটু ঢুঁ দিয়ে যাবো ভাবলাম, অথচ  দেড় ঘন্টা হয়ে গেলো । এবার মা চিন্তা করবে বাড়িতে। মৌ-ও বাড়িতে নেই এখন বোধ করি, রোজ library-তে যায় এই সময়ে।

— কিন্তু মুড়িটা ?

— আজ আর ইচ্ছে করছে না ভাই,  আজ থাক। চাকরীটা হলে একদিন এসে গুছিয়ে খাবো। আপাতত যাত্রা করি uncertainty-র পথে।

( একে অপরকে জড়িয়ে ধরলো আর্য আর অরণ‌্য )

— চল, টাটা। আর আমি বলে দিলাম চাকরীটা তুই পাবি।

— I hope so my brother from another mother.

( এই বলে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যায় আর্য। রাস্তায় এসে নামলে শেষবারের মতো হাত নাড়ে ও বাড়ির ছাদে দাঁড়ানো অরণ‌্যের দিকে তাকিয়ে। হাত নাড়িয়ে বিদায় জানায় ওকে। )

                       ***

ঠিক চার দিন পর একটা phone আসে অরণ‌্যর কাছে। Phone-টা এসেছিলো আর্যর বোন মৌ-এর কাছ থেকে। মৌ ভীষণ কাঁদছিলো সেদিন । চাকরীতে join করার দিন বেরোতে একটু দেরী হয়ে গিয়েছিলো আর্যর। তাড়াহুড়ো করে ভীড় ট্রেনে উঠতে গিয়েছিলো। কিন্তু ভীড় ঠেলে আর এগোনো হয় না আর্যর। Platform থেকে গাড়িটা বেরোনোর কিছু পরেই gate-এর থেকে পা ফসকে….

হাত থেকে mobile phone-টা মেঝেতে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিলো অরণ‌্যর mobile-এর tempered glass-টা।

Facebook Comments

Published by Story And Article

Word Finder

0 0 vote
Article Rating

Leave a Reply

0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x
%d bloggers like this: