বেকার কথা // শুভ্র ঘোষ

2

‘কারখানাতে খেত-খামারে

শোক-অশোক পায়ে ঠেলে

যারা জীবনের গান গায়

মানি শ্রমিক তাদের কয়’।

নমস্কার আমি চন্দ্র। পুরো নাম চন্দ্র গুপ্ত। আমার বর্তমান ঠিকানা বাসস্ট্যান্ড আর নিজের বাড়ি। জীবিকায় আমি সর্বহারা ভিখারী। উপরে শুরুতে যেই ছন্দটি পড়লেন ওটি আমারই লেখা। তবে সেটি কোনো ঘরে বসে লেখা নয়, বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে লেখা।

কেন?

একটা কথা বলি শুনুন, আপনারা সেই ১৮৮৬ সাল থেকে ‘মে দিবস’ নিয়ে নানান ইতিহাস পড়ে শুনে এসেছেন। আজ আমার ইতিহাস পড়ে দেখুন কেমন লাগে। ভয় নেই, অল্প কথায় সেরে দেব। এমনিতেও সাধারন মানুষের কোনো ইতিহাস হয় না। তার উপর সে যদি সর্বহারা শ্রমিক হয়ে থাকে, তাহলে তো তার অবস্থা যুদ্ধে আত্ম বলিদানকারী সেই সৈনিকদের মতন হয়; যাদের কাঁধে ভর করে যুদ্ধ জিতে রাজা নিজের রাজ্য বাড়ায়। নাম কামায়। কিন্তু যুদ্ধ শেষে নিজে বিরিয়ানী খেলেও, সেই সৈনিকদের শুখা রুটি খাওয়ায়।

যাজ্ঞে যাক,আসল কথায় আসা যাক। মানে বেকার কথা। এখন আমি প্রতিদিন সকালে, আগে যেখান থেকে বাসে চেপে কারখানায় যেতাম। কাজ চলে যাওয়ার পরও পূর্ব অভ্যাস বশত আজো সেই বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে দাঁড়াই। না, সেই আমার বাস এখন আর আগের মত আমার জন্য দাঁড়ায় না। তবে ঐ মানুষ অভ্যেসের দাস আর স্মৃতির ক্রীতদাস। তাই হয়ত…

তা প্রতিদিন যে দৃশ্য চোখে পড়ে তা হল, কোনো কোনো আপিসের নির্দিষ্ট সুসজ্জিত এয়ার কুলার বাস সেই আপিসের, কর্মকর্তা কর্মচারীকে নিজের পেটের ভিতর বসিয়ে তাদের কর্মস্থলে পৌছে দিচ্ছে। কালো কাঁচের আড়ালে ভিতর অস্পষ্ট লাগে। বাইরে থেকে আন্দাজো করা যায় না। দূর থেকে দেখে মনে হয় তাদের স্ট্যাটাসটাই আলাদা। অনেক উঁচুতে।

এই দৃশ্য প্রতিদিন আমাকে, সত্যজিত রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’ ছবিটির কথা মনে করায়। সেই যে সেখানে দেখিয়েছিল কত শ্রমিককে কোমরে দড়ি বেঁধে কাজে নিয়ে যাচ্ছে। এখানে পার্থক্য দড়ির বদলে বাস। এভাবে কত মানুষকে নামী কোম্পানীর অসৎ মালিকেরা শুধু চালাকি করে, মোহ মায়াতে ডুবিয়ে, টুপি পড়িয়ে নিজের কাজ হাসিল করিয়ে নিচ্ছে। দশ লক্ষ টাকার কাজ করিয়ে, দশ হাজার টাকা মাইনে দিচ্ছে। কিন্তু এখানে কেউ কিচ্ছু বলে না। কারন হয়ত ঐ স্ট্যটাসের মায়া।

যাইহোক, আমার কথায় আসা যাক। তখন আমি ‘হংস-পৃষ্ঠ’ নামক একটি ব্যাগ তৈরী করার কারখানাতে চাকরী করতাম।

ভালো কর্মচারী হিসেবে কারখানাতে অামার খ্যাতি ভালোই ছিল। সম্মানও পেতাম অনেকের চেয়ে বেশি। সেখানে আমার মালিক যিনি ছিলেন, সেই সাহেবের মনে হত যে অন্য কর্মচারীরা তাকে যথেষ্ট সম্মান করে না। কারন তারা সবসময় কোনো না কোনো দাবী করেই চলেছে।

তাই তিনি একদিন ভাবলেন যে, কর্মচারীদদের সাথে গম্ভীর ব্যাবহার করা শুরু করবেন। ফলে তারা ভয়ে তাদের মালিককে আরো বেশি  সম্মান  করবেন। আমাদের মালিক এইদিক থেকে এককথার মানুষ ছিলেন। যা কথা তাই কাজ ,সে দিন দুপুরে টিফিন বিরতি শেষে, কোনো এক দরকারে মালিকের ঘরে গিয়ে দেখি, তিন চার জন সহকর্মী চুরির আসামীদের মত ভয়ে কাবু হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। নীরব হয়ে তারা মালিকের গালিগালাজ শুনছে।

তাদের করুণ মুখের দিকে তাঁকিয়ে আমার মনে মায়া জাগল। তাই মালিকের কাছে গিয়ে ওদের হয়ে বললাম, ‘স্যার! অনেক হয়েছে, ছেড়ে দিন এবারের মত’। তা দেখলাম আমাদের মালিক আমার সম্মানে তাদেরকে সেদিনের মত ক্ষমা করে দিলেন। ওরা ঘর থেকে চলে যাওয়ার পর, তিনি আমাকে বললেন, ‘ চন্দ্র বাবু তুমি বোঝো না কেন? এসব ছোটলোকদের ভয় না দেখালে , শাস্তি না দিলে তারা সম্মান করবে না,মনে রাখবে না, দাবী-দাওয়া নিয়ে বিদ্রোহ করবে। ফলে কারখানা চালানো সম্ভব হব না।

মালিক সাহেব যখন হাত মুখ নাড়িয়ে বেঁকিয়ে কথা বলছিলেন, তখন দেখলাম যে তার বামহাতের একটা শুকানো কাটা দাগ। জানতে চাইলাম, ‘আচ্ছা স্যার আপনার হাতে এই কাটা দাগ কিসের’? আমার প্রশ্নের জবাবে  মালিক বললেন, এই দাগ তারই পোষা কুকুরের কামড়ের। তিনি কুকুরটাকে একদিন বাড়িতে খেতে দিচ্ছিলেন। হঠাৎ কুকুরটি তার হাতে কামড় বসিয়ে দিয়েছে। আমি সমবেদনা জানিয়ে বললাম,’ ঈশশ্! আচ্ছা স্যার আপনাকে যে কুকুরটা কামড় দিয়েছিল তার কথা আপনার এখনো মনে আছে’?

মালিক আমার দিকে বিচক্ষণ দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে থেকে বললেন, ‘হ্যাঁ মনে আছে তো, কুকুরটা স্বাস্থ্যবান ছিল’। এরপর আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা স্যার আপনি ঐ কুকুরটাকে সম্মান করেন’? তিনি হো হো করে হেসে বললেন,  ‘কি সব আবোল তাবোল বলছ চন্দ্র গুপ্ত ! কুকুরকে আবার মানুষ সম্মান করে না কি’? আমিও হেসে  বললাম, ‘ঠিক বলেছেন , মানুষ দুষ্টু স্বভাবের  কুকুরদের  ভয় পায়,মনে রাখে কিন্তু সম্মান করে না’।

ব্যাস! আর যাই কোথায়। আবেগে ভেসে গিয়ে শ্রমিক পক্ষের হয়ে বলতে গিয়ে, সেই কারখানাতে আমার চাকরী জীবনের বেগ সেইদিনই থেমে গিয়েছিল। তারপর থেকেই রোজ এই বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে বসে এইসব দেখি আর নিজের মনে কথা বুনি। যেমন কয়েকটি আরো লিখেছি।পড়ুন …

১)শ্রমিকের স্বেদ-সিক্ত শরীরের রক্তে উর্বর শিল্প আজ।

বিশ্ব দরবারে দেশের মাথায় ওঠে হরেক তাজ।

মালিক পক্ষের অবহেলায়

শ্রমিকের শ্রম থাকে হেলায়

নেই ভ্রুক্ষেপ কারো শ্রমিকের হয়ে কথা বলবে আজ।

২)শিশুশ্রমিকের ব্যবহার কখনো কি শেষ হবে না?

মানবতা কি ওদের হয়ে কোনো পন্থা ই না?

স্বর্ণ শৈশবের মুখে ঝামা

অসহ্য এই কষ্টনামা

চল না আজ শপথ নিই সবাই শিশুশ্রমিক আর রাখব না।

৩) গ্রহের টানে আসে বাণ

শূণ্যে মেলায় নয়ন জল

পান্তা ফুরায় নুন আনতে শ্রমিক-চাষা কেঁদে মরে’।

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: