ভাঙা গড়ার আলাপনে : তমসা চক্রবর্তী

।। ১ ।।

জ্যৈষ্ঠ মাসের কাঠফাটা রোদ্দুর আর গায়ে লাগা শুকনো গরম হাওয়া থেকে কোনমতে নিজেকে বাঁচিয়ে দীপ বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরালো। যোধপুর পার্ক বাসস্যান্ডের ঠিক পাশেই বিরাজমান এক বিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছ। গাছটাকে দূর থেকে দেখলে মনে হয় কাঠফাটা রোদের সবটুকু উত্তাপ গায়ে মেখে রক্তিম ফুলের গোছাগুলো যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে শহরবাসিকে।

একমনে কৃষ্ণচূড়া গাছটার সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে দীপের সম্বিৎ ফিরল আঙুলের ফাঁকে হালকা তাপের ছোঁয়ায়। তাকিয়ে দেখলো সিগারেটটা পুড়তে পুড়তে শেষের পথে। সিগারেটটা ফেলে দীপ ঘড়ির দিকে তাকালো একবার।আজ ও একটু তাড়াতাড়িই পৌঁছে গেছে।এই গরমে রাস্তা ঘাট পুরো ফাঁকা,তাই জ্যাম ছিল না।সময়টা এখন কি করে কাটাবে ভাবতে ভাবতে সামনের দিকে তাকাতেই চমকে উঠলো দীপ।

সামনের দিক থেকে নীল শাড়িতে খোলা চুলে হনহন করে এগিয়ে আসা মেয়েটা কি!ও কি ঠিক দেখছে! নাহ্, এত বছর পরও নিধিকে চিনতে ওর কোনো ভুল হলো না। একই রকম রয়ে গেছে নিধি, একটুও বদলায়নি। সেই কাজল চোখে,হালকা প্রসাধনীতে আজও লাস্যময়ী নিধি। রাস্তা থেকে চোখ তুলে সামনে তাকিয়ে নিধিও খেয়াল করেছে দীপকে। আলতো পায়ে এগিয়ে এলো দীপের দিকে। এই ফাঁকা বাস স্টপে কৃষ্ণচূড়ার নিচে মুহুর্তের চোখাচোখিতে নির্বাক হয়ে রইল দু’জনেই। বেশ কয়েক বছর পরের এই হঠাৎ দেখায় যেন থমকে গেছে দুটো মন। একটু ইতস্তত করে দীপই প্রথম বলে উঠলো,”হাই”,

-“হাই”, কুশল বিনিময়েই নিধির অস্বস্তি টের পেল দীপ। তাও কৌতূহলী মনকে সামলাতে না পেরে প্রশ্ন করল,

-“তুমি এখানে”?

হাতের পার্সটা এদিক ওদিক করতে করতেই নিধি উত্তর দেয়,

-“একটা প্রেজেন্টেশন আছে দুটো থেকে তাই। তুমি”!!

-“আমারও একটা ক্লায়েন্ট মিটিং আছে দুটো থেকে।একটু তাড়াতাড়িই পৌঁছে গেছি”, দীপের উত্তরে নিধি একটু আলগা হেসে বলল,

-“আমিও একটু তাড়াতাড়ি পৌঁছে গেছি আজ।আসলে রাস্তা পুরো ফাঁকা আজ।তাই..”,নিধির কথার রেশ টেনেই দীপ একটু ইতস্তত করেও জিজ্ঞেস করল,

-“ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, পাশেই একটা ভালো কফিশপ আছে।আমরা ওখানে কিছুক্ষন বসতে পারি”,

-“না না, এখানেই ঠিক আছি”,নিধি একটু দোনোমনা করে বলে।

-“প্লিজ,এই রোদ্দুরে এখানে দাঁড়িয়ে থেকো না।লু লেগে গেলে আবার তোমার নাক থেকে ব্লিডিং শুরু হবে”, এত বছর পর দীপের মুখ থেকে এই কথাটা শুনে মূহুর্তের জন্য থমকে গেল নিধি। যদিও পর মূহুর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে একটু শুকনো হেসে বলে,

-“ওকে,চলো”। বহু বছর পর আবার দুজনে একসাথে পা মিলিয়ে এগিয়ে চললো রক্তিম কৃষ্ণচূড়া গাছটাকে পিছনে ফেলে।

।। ২ ।।

-“হ্যালো বাপি,কি করছো”?ডাইনিং টেবিলে বসে ব্রেকফাস্ট সারতে সারতেই মোবাইলে অসময়ে নিধির নামটা দেখে একটু ভয়ে ভয়েই ফোনটা রিসিভ করলেন রজ্ঞিত বাবু।

-“কি রে মামমাম,আজ এই অসময়ে ফোন করলি যে”!

-“অসময়ে!! তোমাকে ফোন করার আবার নির্দিষ্ট সময় আছে নাকি বাপি”!! নিধির মশকরায় রঞ্জিত বাবু একটু হেসে বলেন,

-“ধুর, আমার মেয়ে আমাকে দিনক্ষন দেখে ফোন করবে নাকি!!আসলে এই সময় তো তোর অফিস বেরোনোর তাড়া থাকে তাই জিজ্ঞেস করলাম।তা আজ অফিস যাসনি, ছুটি নিয়েছিস নাকি”!!

-“হ্যাঁগো বাপি, আজ ছুটি নিয়েছি।

-“কেন রে? শরীর টরীর ঠিক আছে তো”!!বাপির প্রশ্নে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিধি উত্তর দেয়,

-“হ্যাঁ বাপি, শরীর একদম ঠিক আছে।আসলে আমি ভাবছিলাম, চাকরিটা ছেড়ে দেব”!

আচমকা মেয়ের মুখে চাকরি ছাড়ার কথা শুনে চমকে উঠলেন রঞ্জিত বাবু। কিছুটা উত্তেজিত হয়েই বললেন,

-“চাকরি ছেড়ে দিবি মানে! খামোখা এখন চাকরি ছাড়তে যাবি কেন”?

ফোনের অন্য প্রান্তে নিধিকে নিশ্চুপ দেখে রঞ্জিত বাবু এবার একটু নরম সুরে প্রশ্ন করলেন,

-“কি হয়েছে মামমাম! অফিসে কি কোনো প্রবলেম হয়েছে”!!

-“না বাপি, অফিসে কোনো প্রবলেম হয়নি”, নিধির এমন ঠান্ডা উত্তরে রঞ্জিত বাবু কিছু না বুঝতে পেরে অস্থির হয়ে উঠলেন। প্রশ্ন করলেন,

-“তাহলে কি এমন হল যে তুই চাকরি ছাড়তে চাইছিস”!

-“জানো বাপি,আমি সংসার, অফিস সব একসাথে সামলে উঠতে পারছি না। অফিস করে সংসার সামলানোটা খুব হেকটিক হয়ে যাচ্ছে গো আমার জন্য। তাই ভাবছিলাম চাকরিটা ছেড়েই দেবো”,যতটা সম্ভব নিজের হতাশাটা লুকিয়ে বাবাকে বোঝানোর চেষ্টা করলো নিধি।

-“লক্ষ লক্ষ মেয়ে সংসার আর অফিস একসাথে সামলাচ্ছে। অফিস করে সংসার সামলাতে পারছো না বলে চাকরি ছেড়ে দেওয়াটা কিন্তু কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয় মামমাম”, মেয়ের বোকার মত কথা শুনে এবার রেগে গেলেন রঞ্জিত বাবু।

-“তুমি বুঝতে পারছো না বাবা, আমি সত্যি পেরে উঠছি না। সকালে ঘুম ভাঙ্গার পর থেকে এত কাজ। তারপর কোনমতে খেয়েদেয়ে অফিস ছোটো। সেখানে সারাদিন গাধার মত খাটো, মিটিং করো,টিম হ্যান্ডেল করো। তারপর রাতে বাড়িতে এসে আবার সংসারের বাকি কাজ কর্ম সেরে যখন রাতে শুতে যাই তখন পরের দিনের কাজের টেনশনে আর ঘুম হয়না।এভাবে কাঁহাতক পারা যায় বল বাপি”!জমানো কষ্টগুলো গলার কাছে এসে আটকে রইল। রঞ্জিত বাবুও মেয়ের অবস্থাটা বুঝতে পেরে বলেন,

-“তোরা একটা ফুলটাইম লোক রাখছিস না কেন?তাহলে তো তোর কিছুটা হেল্প হয়”!

-“প্রথমত বিশ্বাসী লোক পাওয়া যে সল্টলেকে কি দুস্কর সেটা তো জানোই।আর দ্বিতীয়ত, বাজেট ও একটা ম্যাটার বাপি। তুমি তো জানো আমাদের বিয়ের জাস্ট আগেই দীপ বাড়িটা রেনোভেট করিয়েছিল।তার জন্য একটা ব্যাঙ্ক লোন আছে,প্লাস অফিস,গাড়ি, সংসার সবকিছুরই তো রেকারিং খরচ আছে। এরমধ্যে একটা ফুল টাইম মেড রাখা এখন জাস্ট ইম্পসিবল বাপি”, একমাত্র মেয়ের অসহায়তা অনুভব করে রঞ্জিত বাবু একটা শেষ চেষ্টা করে দেখলেন,

-“তাহলে তো তোর সংসারের জন্য এই মুহূর্তে তোর চাকরি করাটাও ভীষন জরুরী। তুই এত লেখাপড়া করেছিস, আর্কিটেক্ট হয়েছিস,এত ভালো চাকরি করছিস,এটাই তো তোর কাছে সবথেকে ভালো সময় সংসারটাকে সাপোর্ট করার জন্য। আমি বলি কি তুই আর দীপ, সংসারের কাজগুলো দুজনে ভাগাভাগি করে নে।দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে”। বাবার কথা শুনে আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিধি বলে,

-“সেটা হলে তো কথাই ছিল না! তোমার জামাই বাড়ির কাজ কর্ম কিছুই জানে না”, নিধির কথায় এবার রঞ্জিত বাবু বেশ উত্তেজিত হয়ে বললেন,

-“পারে না মানেটা কি! মায়ের পেট থেকে পড়েই কি কেউ সব শিখে যায় নাকি!পারে না তো শিখে নিক।আমি কি আমার মেয়েকে ছোট বেলা থেকে শুধু সংসারের কাজ শিখিয়েছি নাকি! দীপ ও যেমন পড়াশোনা করেছে তুইও করেছিস, তোরা দুজনেই আজ প্রতিষ্ঠিত।তাহলে তুই যদি সংসারের কাজ করতে পারিস তবে দীপ কেন পারবে না? তুই চাইলে এই বিষয়ে আমি দীপের সাথে কথা বলতে পারি”, বাবার কথায় আঁতকে উঠে নিধি বলে,

-“না না, তুমি ওর সাথে এই বিষয়ে কোনো কথা বলতে যেও না বাপি,তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে।আমি চেষ্টা করছি সব সামলে নিতে,দেখি কতটা সফল হতে পারি। তুমি চিন্তা করো না বাপি, যাই করি না কেন তোমাকে জানিয়েই করব। এখন রাখছি বাপি”,

-“ভালো থাকিস মামমাম”,

-“হুম, তোমরাও সাবধানে থেকো”,বাবার সাথে কথা বলে বিষন্ন মনে ফোনটা রেখে বিছানায় শরীরটাকে এলিয়ে দিলো নিধি।

।। ৩ ।।

দীপের সাথে ডিভোর্সটা হয়েই গেল নিধির। অনেক চেষ্টা করেছিল নিধি, কিন্তু দীপের উদাসীনতা শেষ করে দিল ওদের সম্পর্কটা । শেষ পর্যন্ত কোর্ট পেপারে দুটো সই ওদের দুবছরের সম্পর্কটায় ইতি টেনে দিল।

কোর্টের বাইরে এসে দীপের মা হাঁফ ছেড়ে বললেন,

-“যাক বাবা, সবকিছু নির্বিঘ্নেই মিটে গেল”, কেউ কিছু বলার আগেই দীপ খুব ঠাণ্ডা গলায় ঠোঁটের কোনো বিদ্রূপের হাসিটা ঝুলিয়ে বলল,

-“ঠিকই বলেছো মা,নির্বিঘ্নেই মিটে গেল সব।নিধিকে বিয়ে করার জন্য তো এর থেকে অনেক বেশি হ্যাপা পোহাতে হয়েছিল।আগে জানলে বিয়ে না করে প্রথমেই ডিভোর্সটা নিয়ে নিতাম।যাকগে বাদ দাও ওসব কথা। এবার বলতো মা, এখন নিশ্চয়ই তুমি খুব খুশি হয়েছো”! যে ছেলে কোনদিনও মায়ের সাথে গলা তুলে কথা বলেনি তার মুখে এহেন তীর্যক মন্তব্য শুনে দীপের মা সোনালী দেবী হতভম্ব হয়ে দীপকে কিছু বলতে গেলে দীপ মাকে সেই সুযোগ না দিয়েই হনহন করে হেঁটে বেরিয়ে গেল কোর্ট চত্বর থেকে।

বেশ কিছুক্ষণ উদভ্রান্তের মত হাঁটার পর সামনে একটা বাচ্চদের পার্কের বেঞ্চে এসে বসল দীপ।পার্কটা বেশ ফাঁকা আজ। মনে হয় গত কয়েকদিন বৃষ্টি হওয়ায় জন্য বাচ্চাগুলো গৃহবন্দি।এই রকমই একটা জায়গা খুঁজছিল আজ দীপ,শহরের মধ্যে কিন্তু শহরের কোলাহল থেকে অনেক দূরে , একদম শান্ত। বেঞ্চে মাথাটা হেলিয়ে দিতেই চোখটা বুজে এলো দীপের আর বন্ধ চোখের ক্যানভাসে ভেসে উঠতে থাকলো দুঃস্বপ্নের দিনগুলো। 

কলেজ লাইফ থেকে প্রেম দীপ আর নিধির।পাশ করার পর নিধি যখন একটা কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে চাকরিতে ঢোকে, দীপ তখন নিজের একটা ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনের বিজনেস শুরু করে।দুজনেই নিজেদের কাজের জগতে প্রচন্ড ব্যস্ত থাকলেও প্রেমে কোনো ভাটা পড়েনি ওদের। দিনের শেষে একবার দেখা না হলে হাঁসফাঁস করত ওরা।

কিছু না হলে দীপের বাইকে অফিস থেকে দিনান্তে বাড়ি ফেরাটাই ছিল ওদের সম্পর্কের অক্সিজেন।যদিও দীপ প্রথম থেকেই জানতো ওর বাড়ির লোকজন নিধিকে কোনদিনই পছন্দ করতো না।একে তো কাস্ট আলাদা তার উপর আবার চাকরি করা মেয়ে। দীপের বাবা মা ওর জন্য একটা শান্ত, সুশীল, ঘরোয়া বৌ আশা করেছিলেন। সেখানে ছেলে খুঁজে পেতে নিয়ে এল নিধির মত একটা স্মার্ট, উচ্চ শিক্ষিত, চাকুরীরত মেয়ে। দীপের বাবা মা প্রথমে রাজি না থাকলেও ,শেষ পর্যন্ত ছেলের জেদের কাছে হার মেনে ছিলেন। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে দুবাড়ির মতে বিয়েটা হয়েছিল ওদের।

অশান্তির সুত্রপাত তারপর থেকেই।বাড়ির বৌ সারাদিন অফিস নিয়ে ব্যস্ত থাকলে সংসার সামলাবে কে! বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলেকে শেষে কাজের লোকের হাতের রান্না খেতে হবে!তাতো হতে দেওয়া যাবে না। তাই দীপের মা বিধান দিয়েছিলেন,’চাকরি করতে হয় কর বাপু,আমি মানা করবো না। কিন্তু সংসার সামলে করতে হবে চাকরি। আমার ছেলের সবরকমের খেয়াল এখন থেকে তোমাকেই রাখতে হবে। রান্না বান্না কাজের লোককে দিয়ে করালে চলবে না’। যদিও নিধি আস্তে আস্তে সব কিছুই সামলে নিয়েছিল।

 কিন্তু বাধ সাধল দীপের মা। বিয়ের আগেও যে মা বাবার অসুবিধার কথা ভেবে কোলাঘাট থেকে পনেরো দিনে একবার ছেলের কাছে আসত, সেই মা হঠাৎ করেই একদিন দুদিন অন্তরই ওদের সাথে এসে থাকতে শুরু করে দিলো।আর তার সাথেই শুরু হল সংসারের কাজ শেখানোর নামে নিধির ওপর মানসিক অত্যাচার।নিধির সব কাজে খুঁত বের করে ওকে প্রতি পদে পদে অপদস্থ করাটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল ওনার। কয়েক বার সংসারের কাজে হাতে হাতে নিধিকে সাহায্য করতে গিয়েছিল দীপ।

কিন্তু তাতে হিতে বিপরীতই হয়েছে।মা আরও বেশি করে নিধিকে অপদস্থ করেছে। নিধিকে বারবার শুনতে হয়েছে,’আমাদের বাড়ির ছেলেরা মেয়ে মানুষের মত সংসারের কাজ করে না’,’বাড়ি থেকে কি কোনো কাজই শিখে আসোনি নাকি’, ‘লজ্জা করে না,ছেলেটা আমার সারাদিন খাটাখাটনি করে ফিরলে বেহায়ার মত তাকে দিয়ে কাজ করাতে’, আরো না জানি কত কিছুই শুনতে হয়েছে নিধিকে।অথচ একবারও ওর মা ভাবেনি যে নিধিও সারাদিন খাটাখাটনি করে অফিসে, ওরও কষ্ট হয়। 

বাড়ির চাপে একটা সময় তো নিধি চাকরিটাই ছেড়ে দিতে চেয়েছিল। কোনমতে নিধির বেস্ট ফ্রেন্ড গুঞ্জাকে দিয়ে কনভিন্স করিয়ে ওকে চাকরি ছাড়া থেকে বিরত করতে পেরেছিল দীপ। কিন্তু যত দিন এগোচ্ছিল ততই দীপ উপলব্ধি করতে পারছিল শাশুড়ি বৌমার এই রোজনামচা আস্তে আস্তে রান্নাঘর পেরিয়ে ওদের বেডরুমের ভিতরেও ঢুকে পরেছে।দীপ বুঝতো নিধির যন্ত্রনাটা, শুধু কিছু করতে পারত না।

অন্যদিকে নিধির প্রতি পদক্ষেপে মনে হতে শুরু করেছিল যে দীপ সংসারের সব ব্যাপারে নীরব থেকে ওর মাকেই সাপোর্ট করছে।একটা সময় এসে দীপের ও মনে হয়েছিল যে মায়ের এই অহেতুক অশান্তিগুলো বন্ধ হওয়া দরকার।

ওদের ফার্স্ট অ্যানিভারসারির মাসখানেক আগে নিধিকে একবার দিন দশেকের জন্য মুম্বাই যেতে হয়েছিল, অফিসের একটা ট্রেনিংয়ে।তাই নিয়ে বাড়িতে তুলকালাম হলেও দীপের মধ্যস্থতায় শেষপর্যন্ত নিধি যেতে পেরেছিল ট্রেনিংয়ে। যদিও এই নিয়ে মা প্রচুর অশান্তি করেছিল নিধির যাওয়ার পরেও।সেদিন নিধির অনুপস্থিতিতে দীপও নিজের সব ক্ষোভ উগরে দিয়েছিল মায়ের উপর।

আর সেই সন্ধ্যেতেই কালো অন্ধকার নেমে এসেছিল ওর জীবনে,যখন দীপের বাবা ঘরের মধ্যে নিজের স্ত্রীকে স্লিপিং পিলস্ খেয়ে পড়ে থাকতে দেখেন। হাসপাতালে মায়ের জ্ঞান ফেরার পর বাবা দীপকে তীব্র ভৎসনায় জর্জরিত করে বলেছিলো, ‘লজ্জা করলো না তোর! বৌয়ের প্ররচনায় মাকে মেন্টাল টরচার করে মেরে ফেলতে চাইছিলি”! বাবার কথায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল দীপ।এরপর আর এক মূহুর্ত সময় নষ্ট করেনি ওর আর নিধির সম্পর্কটার ভবিষ্যতটা পরিকল্পনা করতে।

তাই নিধি ফিরে আসার পর থেকেই মায়ের থেকেও বেশি কষ্ট দীপ দিয়েছিল নিধিকে।প্রতি পদে ওকে বুঝিয়েছে নাই ও একজন ভালো বৌমা নাই একজন ভালো স্ত্রী।রাতে ক্লান্ত নিধিকে যখন অপদস্থ করার জন্য ইচ্ছে করে বিছানায় নিজের কাছে টানতে চাইতো,তখন মাঝে মাঝে নিধি ওর বুকে মাথা রেখে কেঁদে উঠতো।

কিন্তু অন্ধকার ঘরে নিধির অলক্ষ্যে নিজের চোখের নোনতা জল মুছে ওকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতো দীপ। মধ্যরাতে যখন নিজের রুমে ফিরে ঘুমন্ত নিধির মুখটা দেখতো দীপ, তখন নীরবেই চোখের জল ফেলতো। বুঝতে পারতো মানসিক ভাবে ভেঙে পড়ছে নিধি, দূরত্ব বাড়ছে ওদের মধ্যে। 

কিন্তু নিধির ধৈর্যের বাঁধ ভাঙলো যেদিন নিজের জম্মদিনে ওর বাবা-মাকে বাড়িতে ইনভাইট করতে দীপের মা সেটা নিয়েও অশান্তি করলেন আগের দিন।রাতে শাশুড়ির সাথে একচোট ঝামেলার পরেও কিন্তু পরের দিন নিধির জম্মদিনটা সকাল থেকে মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ভাবে কেটে গেছিল।

কিন্তু অদৃষ্টের পরিহাস! সারাদিনের ক্লান্তি, জৈষ্ঠ্য মাসের গরম আর রান্নাঘরের আগুনের তাপে খেতে বসার ঠিক আগেই নিধির নাক থেকে ব্লিডিং শুরু হয়।দীপ জানতো বেশি গরমে নিধির এই সমস্যা হয়।তাই তাড়াতাড়ি বরফ জল এনে দিয়ে ওকে নাক দিয়ে টানতে বলে। কিছুক্ষন পর নিধি একটু সুস্থ হলেই দীপের মা, নিধির বাবা মায়ের সামনেই নিধিকে ভৎর্সনা করতে শুরু করে দেন,’বাবাহ্, তুমি তো দেখছি ননীর পুতুল।

সংসারের এটুকু কাজ করতে গিয়েই নাক দিয়ে রক্ত বের করে ফেললে।সত্যি কাজ না করার জন্য মানুষ কত নাটকই না করে’! সেদিন মেয়েকে ওই ভাবে অপমানিত হতে দেখে সাংঘাতিক রেগে গিয়েছিলেন নিধির বাবা। সঙ্গে সঙ্গে নিধিকে নিয়ে চলে যেতে চাইলেন নিজের সাথে।

দীপের মা এক কথায় রাজি হয়ে গেলেও নিধির করুন চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে দীপ বুঝেছিল নিধি সেদিন বাড়ে বাড়ে চেয়েছিল দীপ একবার আটকে দিক ওকে। কিন্তু নিজের চোখের নোনা জলকে অনেক কষ্টে শাসন করে দীপ সেদিন নীরবে এই নরক থেকে মুক্তি দিয়েছিল ওর ভালোবাসাকে, ওর নিধিকে।

নাহ্,দু’জনের কেউই কোনো দোষারোপের নোংরামি চায়নি বিচ্ছেদ প্রক্রিয়ায়। প্রথমে মিউচ্যুয়াল ডিভোর্সের জন্য অ্যাপ্লাই করে, তারপর ছ’মাসের সেপারেশন।সব নিয়ম মেনে শেষ পর্যন্ত ওরা ইতি টানল সম্পর্কটায়।

রাতে যখন দীপ বাড়ি ফিরে এলো সোনালী দেবী ওকে দেখেই কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরলো ওকে,

-“এই ভাবে কাউকে কিছু না বলে, ফোন অফ করে দিয়ে সারাদিন কেউ গায়েব হয়ে যায়”!

জীবনে প্রথমবার মায়ের ভালোবাসায় দমবন্ধ হয়ে এলো দীপের।এক ঝটকায় মাকে সরিয়ে দিয়ে নিজেকে মায়ের ভালোবাসার অত্যাচার  থেকে মুক্ত করল দীপ। তারপরেই মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,

-“প্লিজ মা, বন্ধ করো এই চিন্তা করার ন্যাকামিটা”।

-“দীপ..”! সোনালী দেবীর হতভম্ব গলার স্বরে দীপ আবারও বলতে থাকলো,

-“তুমি নিধির সাথে দিনের পর দিন যে ব্যবহারটা করে গেছো, প্রথমে ভাবতাম সেটা আমার প্রতি তোমার ভালোবাসা। কিন্তু পরে বুঝেছিলাম পুরোটাই ছিল তোমার ইনসিকিউরিটি আর কুৎসিত মানসিকতা। ভেবো না যে আমি নিধিকে নিয়ে আলাদা থাকতে পারতাম না,ইনফ্যাক্ট আলাদা থাকবো ভেবেও ছিলাম। কিন্তু ঠিক তখনই তুমি সুইসাইডের নাটকটা করে আমার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলে যে নোংরামির এই খেলায় তুমি কতটা নিচে নামতে পারো”!! ছেলের কথা শুনে স্তভিত গলায় সোনালী দেবী বললেন,

-“দীপ! কি বলছিস তুই!!আমি সুইসাইডের নাটক করেছিলাম!একথা তুই….”,মাকে মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে দীপ আবার বলতে শুরু করল,

-“”আমি এখনো শেষ করিনি মা। গেস হোয়াট!ওই নার্সিংহোমটা যেমন বাবার বন্ধু অলোক কাকুর কর্মস্থল,ঠিক তেমনি ছিল আমার ছোট বেলার বন্ধু রুমকির ও কর্মস্থল। আমি রুমকির থেকে সব খবরই পেয়েছিলাম মা। তুমি ক’টা স্লিপিং পিলস্ খেয়েছিলে,কি ট্রিটমেন্ট হয়েছিল সব খবর পেয়েছিলাম।তাই তুমি প্লিজ আমার মুখ খুলিও না।আমি সেদিনই বুঝেছিলাম,নিধিকে নিয়ে আলাদা হতেই গেলেই তুমি আবার একই নাটক শুরু করবে।

আর নিধির কপালে জুটবে তোমায় মানসিক টরচার করে সুইসাইডের প্ররোচনা দেওয়ার তকমা। আমার নিধি উপর উপর যতই শক্ত হোক না কেন মা, আসলে খুব নরম মনের মেয়ে তো!এই অ্যালিগেশনটা সহ্য করতে পারতো না।  নিজেকে দোষী ভাবতে ভাবতে পাগল হয়ে যেত মেয়েটা।

তাই আমি ঠিক করেছিলাম তোমাদের এই চক্রান্তটা কিছুতেই সাকসেসফুল হতে দেবো না।তাই নিধিকে আমার জীবন থেকে, তোমাদের এই নরক থেকে মুক্তি দিলাম আজ। এখন  থেকে আমার একমাত্র সঙ্গী নিধি বিহীন এই দুর্বিসহ জীবনের যন্ত্রনা আর একাকীত্ব।

আর একটা কথা মা,যে বাবা মা ছেলের সংসার ভাঙার চক্রান্ত করতে পারে, তাদের থাকা বা না থাকাটা আমার কাছে আজ বড়ই অর্থহীন। তাই আজকের পর তোমরাও আমার সাথে কোনো রকম সম্পর্ক রাখার চেষ্টা করো না প্লিজ”। 

নিজের কথা শেষ করেই বাবা-মাকে অপমানে ঝলসে দিয়ে দীপ কিছু নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে সেদিনই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। 

।। ৪।।

পায়ে পায়ে চলতে চলতে বাসস্ট্যান্ড থেকে কফিশপ পর্যন্ত পুরো রাস্তাটাই দুজনে প্রায় নীরবে পেরিয়ে ‘আবার বৈঠকে’ এসে বসলো দীপ আর নিধি। গোটা কফিশপটা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে দেখতে আলতো হেসে নিধি বললো,

-“জায়গাটা বেশ সুন্দর তো,প্রায়ই আসো এখানে”!

অনেক বছর পর নিধিকে আবার এত কাছে পেয়ে ওকে অপলকে দেখতে থাকা দীপের সম্বিৎ ফিরল নিধির ডাকে।

-“এদিকে ক্লায়েন্ট মিটিং থাকলে এখানেই বসি। এখানকার অ্যামবিয়েন্সটা আমার বেশ পছন্দের,তাই আর কি”!

পরের কিছুটা সময় কাটলো শুধুই নীরবতার অস্থিরতায়। এতগুলো বছর মনের গোপন কুঠুরিতে লুকিয়ে থাকা অব্যক্ত কথাগুলো আজ সব বাধা পেরিয়ে ডানা মেলতে চাইলেও শব্দের অভাবে বারংবার ব্যর্থ হচ্ছে। শুধুই ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলে চলেছে দু’জনে। মনে হচ্ছে দুজনের ঠোঁটে যেন কেউ কয়েক ফোঁটা আঠা লাগিয়ে দিয়েছে। নীরবতা ভঙ্গ হলো ওয়েটার ছেলেটির ডাকে।

-“স্যার, আপনাদের অর্ডারটা”,

-“ম্যাডামের জন্য একটা দার্জিলিং টি আর আমার জন্য একটা কোল্ড কফি।আর তারসাথে একটা..”, দীপকে মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে নিধি দীপের উদ্দেশ্য বলল ,

-“আমার জন্যেও কোল্ড কফি বলো প্লিজ”,

-“কিন্তু তোমার তো কোল্ড কফি ভালো লাগতো না”, দীপের কথার উত্তরে নিধি একটু থেমে থেমে বলল,

-“এখন ভালো লাগে”।

নিধির কথায় দীপ শেষ পর্যন্ত দুটো কোল্ড কফি অর্ডার করে। ততক্ষনে নিজেকে একটু গুছিয়ে নিয়েছে নিধি। যথাসম্ভব স্বাভাবিক গলায় প্রশ্ন করল,

-“এতদিন পরেও আমার পছন্দগুলো মনে রেখেছো দীপ”!! 

ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটিয়ে দীপ উত্তর দেয়,

-“ভোলার ব্যর্থ চেষ্টায় বেশী করে মনে রয়ে গেছে”,

দীপের উত্তরে নিধির মলিন মুখটা একবার উজ্জ্বল হয়ে উঠলেও পরমুহূর্তেই না জানি কোন আতঙ্কে আবার অন্ধকারে তলিয়ে গেল। দীপ আরোও একবার ভালো করে দেখলো নিধিকে। মনের ভাব প্রকাশ করতে না পেরে বড়ই অস্থির হয়ে উঠেছে ও। কখনো নিজের শাড়ির আঁচলটা ঠিক করছে তো কখনো বা টেবিলে রাখা মোবাইলটা তুলে দেখছে।এরই মধ্যে দীপের ফোনটা টুং টুং শব্দে আজকের মিটিং স্থগিতের বার্তা দিলো। নিধির অস্থিরতার ক্ষনিক অবসান ঘটিয়ে ওয়েটার ছেলেটি কফির ট্রে হাতে ওদের সামনে এসে উপস্থিত হলো।

নিধি কফি কাপে আলতো ঠোঁট ছোঁয়াতেই দীপ একটু ইতস্তত করেও বলে উঠলো,

-“আজ তোমাকে ভীষন সুন্দর লাগছে নিধি”,

দীপের এই আকস্মিক প্রশংসায় কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পরে নিধি।তবে সেদিকে বিশেষ নজর না দিয়েই দীপ বলতে থাকে,

-“তুমি বরাবরই সুন্দর নিধি। কিন্তু আগে তো সচরাচর শাড়ি পরতে না,তাই হয়তো কখনো সেভাবে বলা হয়ে ওঠেনি। শাড়ি বিশেষ করে নীল শাড়ি বরাবরই তোমার সৌন্দর্যে এক অন্য মাত্রা এনে দেয় জানো। অবশ্য তুমি নিজের জায়গায় ঠিকই ছিলে। সত্যি, শাড়ি সামলে এতো কাজকর্ম কঠিন হয়ে ওঠে। তা এখনও নিশ্চই আগের মতই জিন্স আর কুর্তিই ভরসা”! দীপের কথায় একটা ভালো লাগার আবেশ নিধির গাল দুটো ছুঁয়ে দিলো। কাঁপা ঠোঁটে দীপকে বলল,

“এখন বেশিরভাগ সময় শাড়ি পরতেই ভালো লাগে। গত তিন বছরে কখন যে শাড়ি সামলে সব কাজ করতে শিখে গেলাম নিজেরই মনে নেই”। কথার মাঝেই একঝলক দীপের দিকে তাকিয়ে নিধি বুঝতে পারলো,দীপ ঠিক আগের মতোই একদৃষ্টে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। দীপের মায়াবী চোখের হাতছানি থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে নিধি আবার বলল,

-“তুমিও বেশ রোগা হয়েছ। রেগুলার জিম করছো বুঝি”! হালকা উদাস হাসিতে দীপ উত্তর দেয়,

-“নাহ্, সকাল সকাল উঠে জিমে যাওয়ার অভ্যাসটা আর তৈরি হল কই! তবে নিয়মিত বাবা রামদেবের সাথে যোগাভ্যেস করছি”। একটু থামলো দীপ। হয়তো নিজেকে গুছিয়ে নিলো একটু। তারপর অস্ফুট স্বরে বলল,

-“তুমি ঠিকই বলতে জানো,যোগা রিয়েলি ওয়ার্কস্”, দীপের গলার বিষন্নতা ছুঁয়ে গেল নিধিকে। কিন্তু ক্ষনিকের এই ভালো লাগার আবেশকে ছাপিয়ে পুরানো অপমানের তীব্র জ্বালায় নিধির বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। দীপের চোখে চোখ রেখে বলল,

-“আমার সবটাই হয়তো ভুল ছিল দীপ। নাহলে  কি..”আস্তে আস্তে অভিমানের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে নিধির কথায়। নিজের কথার কোনো প্রত্যুত্তর না পেয়ে রাগে নিধির কপালের শিরাগুলো দপদপিয়ে উঠলো। হিংস্র গলায় প্রশ্ন করল দীপকে,

-“এখন নিশ্চয়ই রোজ সকালে মায়ের হাতের সরষে দিয়ে মাছের ঝোল আর ভাত খেয়েই অফিস যাও! নাকি মায়ের পছন্দের মিষ্টি বৌ রোজ টিফিন প্যাক করে দুপুরে নিজের হাতে খাইয়ে আসে”!

নিধির সব অভিমান, অভিযোগ এতক্ষণ মাথা পেতে শুনতে থাকা দীপ আস্তে আস্তে মুখ তুলে চোখ রাখলো নিধির চোখে। দীপের চোখের কোনে জমে থাকা জলীয়বাষ্প নিধির বুকে আজও শেলের মত আঘাত করে উঠল। কিন্তু দুর্বলতার অভিব্যক্তি গোপন করে আজ নির্বিকার রইল নিধি।

-“বরাবর চাইতাম আমাদের একটা পুতুল পুতুল সংসার হবে। যেখানে আমরা দুজনে অপটু হাতে কিন্তু গভীর ভালোবাসায় সবুজ পর্দা আর নীল দেওয়ালে গড়ে তুলবো আমাদের ছোট্ট ভালো-বাসা। সেখানে আমি ভিজে টাওয়াল বিছানায় ছুঁড়ে ফেললে তুমি ধমক দিয়ে উঠবে আর তোমার নুন পোড়া রান্না খেয়েও আমি হাসি মুখে প্রশংসা করে করে যাব।

রাতের তুমুল ঝগড়ার শেষে তুমি ঠোঁট ফুলিয়ে বসে থাকবে আর আমি রাতের শিশিরের মতো তোমার ঠোঁট ছুঁয়ে মানভঞ্জনের খেলায় মেতে উঠবো। তারপর তোমার রাগ কমলে একে অপরের উষ্ণ আবেশে ভাসতে থাকবো”। একটু থামলো দীপ। তারপর দীর্ঘশ্বাস গোপনের ব্যার্থ চেষ্টা করে আবার বলতে থাকলো,

-“কিন্তু চাওয়া আর পাওয়ার সুক্ষ পার্থক্যটা তখন বুঝতাম না জানো। বুঝলাম সংসার ভাঙার পর। তাই এখনও পুরানো প্রেমকে আগলে রেখেই নতুন সংসারে মজে আছি। যেখানে আছে ভালোবাসার জন্য অফুরন্ত সময়।

আছে সকালের ব্রেকফাস্টে কিছু মৌন খুনসুঁটি, আছে রান্নাঘরে সকাল সন্ধ্যে হাত পোড়ানো, আছে ডালে নুন বেশি হয়ে গেলে ভালোবাসার ঠোঁটের মৌন বিদ্রূপ আর রাতের বিছানায় ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিলে কপালে ভালোবাসার অদৃশ্য স্পর্শ। ভালোই কাটছে আমার আর একাকীত্বের পুতুল পুতুল সংসার জানো। নাই আছে কোনো অভিযোগ আর নাই আছে কোনো অভিমান।আছে শুধু প্রথম প্রেমের স্মৃতি আর একাকীত্বের যন্ত্রনা”।

স্তব্ধ হয়ে দীপের কথা শুনতে থাকা নিধি দাঁত দিয়ে নিজের ঠোঁট কামড়িয়ে চোখের জলকে শাসন করে ইতস্তত মনে অগোছালো প্রশ্ন করে ওঠে,

-“তুমি এখনো, একাকীত্ব,মানে…”,আলগা হাসিতে হাতের ইশারায় নিধিকে থামিয়ে দিয়ে দীপ বলল,

-“উত্তেজনায় এখনো গুছিয়ে কথা বলতে শিখলে না দেখছি! শুধু আমায় প্রশ্ন না করে একটু নিজেকেও তো জিজ্ঞেস করতে পারো নিধি। নিজের বুকে হাত রেখে বলোতো,কেন গুটিয়ে রেখেছ নিজেকে এতগুলো বছর! কেন তোমার মতো প্রানচঞ্চল একটা মেয়ে এমন শান্ত নদী হয়ে উঠেছে নিধি, কেন”!

দীর্ঘশ্বাস গোপনের মিথ্যে চেষ্টা করে নিধি সজল চোখে বলতে থাকলো,

-“বিচ্ছেদ তুমি চেয়েছিলে দীপ,আমি শুধুই তোমার চাওয়াটার সম্মান করেছি মাত্র। অসহায় কান্না বয়ে নিয়ে সবই করেছি বেঁচে থাকার জন্য। কখনো অব্যক্ত কষ্টগুলো ব্যক্ত করিনি কারুর সামনে।

তোমার নীরবতা আমাকে প্রতিদিন ক্ষতবিক্ষত করেছে দীপ, কিন্তু তাও এতগুলো বছর আমি আশায় বুক বেঁধে ছিলাম, ভেবেছিলাম তুমি ঠিক আসবে একদিন ভালোবাসার অধিকার দাবি করতে। কিন্তু তিন বছরের সেই প্রতীক্ষার অবসান আর ঘটলো কই”! 

নিধির অনুযোগের ভাষা দীপের ঠোঁটের সব আদ্রতা শুষে নিচ্ছিলো। দীপ নিজের শুষ্ক ঠোঁট দুটোকে জিভ দিয়ে ভিজিয়ে নিয়ে অতি কষ্টে বলল,

-“কিভাবে আসতাম তোমার সামনে নিধি! দীর্ঘদিন তোমায় যে নির্মম আঘাত আমি করেছি তার জ্বালা যে প্রতিনিয়ত আমাকে দংশন করে চলেছে নিধি। অনেকবার ভেবেছি ছুটে যাই তোমার কাছে। বলি তোমায়, একবার সব ভুলে,ক্ষমা করে আবার কি আমার কাছে ফিরে আসা যায় না! তোমায় ছাড়া আমার অস্তিত্বের হিসেবের খাতাটা যে শুধুই শূন্যতায় ডুবে আছে। কিন্তু পারিনি, তোমার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে।

ভয় পেতাম যদি একইভাবে তুমিও প্রত্যাখান করো আমায়। তার থেকে তোমার স্মৃতিটুকুই না হয় থাক আমার কাছে। কিন্তু আজ যে আর পারছি না, দীর্ঘদিনের অভিনয়ে আমি বড় ক্লান্ত হয়ে পরেছি। পুরানো স্মৃতিগুলো যে আমায় রোজ বড্ড তাড়া করে বেড়ায় নিধি”। উত্তেজনায় তিরতির করে কেঁপে ওঠা ঠোঁটে নিধি আবারও ঘিরে ধরলো দীপকে,

-“সব ভয়,সব চাওয়া,সব সিদ্ধান্ত শুধুই কেন তোমার হবে দীপ! আমার ভালোবাসা কি এতই মূল্যহীন! আমিও যে এতগুলো বছর শুধুই তোমায় নিয়েই কাটিয়ে দিলাম তার কি কোনো মূল্য নেই দীপ। আমার ভালোবাসা তো আপেক্ষিক ছিল না, এটুকুও কি তুমি বুঝলে না দীপ”!

আজ বহুদিন পর দুজনের মনের কোণে জমতে থাকা কালো মেঘটা এক দমকা হাওয়ায় আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে। নিধির হাতের তালুতে হালকা চাপ দিতেই ভালো লাগার আবেশে কেঁপে উঠল নিধি। দীপ শান্ত গলায় বলল,

-“অপেক্ষা হয়ত সম্পর্কের গভীরতা বাড়ায় নিধি। কিন্তু এবার কি এই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আমরা আবার এক হতে পারি না!পারি না কি আবার হাতে হাত রেখে পায়ে পায়ে পা মিলিয়ে একসাথে পথ চলতে! অনেক তো ভাবলাম সবার কথা। কিন্তু সেই ভাবনা, দুজনের যাবতীয় ত্যাগ আমাদের ঝুলিকে শুধুই শূন্যতায় পরিপূর্ণ করেছে।

আজ থেকে না হয় আমরা শুধু নিজেদের কথাই ভাববো। চল না আবার শুরু করি নিজেদের পুতুল পুতুল সংসার। কথা দিলাম আমাদের দুজনের মাঝে কাউকে আস্তে দেবো না কোনদিন।আর একবার কি আমায় ভরসা করা যায় না নিধি”!

দীপের কথায় এক নতুন স্বপ্নের হাতছানিতে ভেসে যেতে থাকা নিধি দীপের হাতটা শক্ত করে ধরে আলগোছে বলল,

-“এমন করে প্রোপোজ করলে তো চলবে না দীপ। কলেজের মতো দীপ স্টাইলে প্রোপজ করো। তাহলে এখনি পাড়ি দেব তোমার সাথে অজানার ঠিকানায়”।

-“আর তোমার মিটিং”!

ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে খুটখুট করতে করতে নিধি বলল,

-“মিটিং ক্যানসেল”।

ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল দীপের। মনেমনে নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে নিধির হাতে হাত রেখে বলে উঠল,

“ফিরে এসো পুরোনো ছন্দে

 আজ পায়ে পায়ে হাঁটব ছায়াপথ,

 উপসংহারে তুমিই যে হৃদ স্পন্দ

 হাতে হাত রেখে নিলাম শপথ”।।

ফুঁপিয়ে কেঁদে আরো শক্ত করে দীপের হাতটা জড়িয়ে ধরলো নিধি…কাঁপা গলায় দীপ, নিধিকে প্রশ্ন করে,

– “বলছি ডিভোর্সের পর নিজের বউকেই যদি না ছাড়তে চাই তাহলে কি আবার নতুন করে বিয়ে করতে হবে?

-“আইন তো তাই বলে। তবে রেজিস্ট্রি করতে গেলে কিন্তু একমাসের নোটিশ দিয়ে অপেক্ষা করতে হবে। অপেক্ষা আমাদের পিছু এতো সহজে ছাড়বে না”, দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে উঠলো নিধি।

দীপ আলতো হাতে নিধির চোখের কোনটা মুছে দিয়ে বলল

-“নিজের বউয়ের সাথে না হয় একটা মাস লিভ টুগেদারই করলাম। আশা করি তুমি আপত্তি করবে না..!

কফিশপ থেকে বেরিয়ে একটা উবের বুক করল দীপ। আজই রেজিস্ট্রি অফিসের কাজটা মিটিয়ে নিধিকে নিয়ে ফিরতে হবে ওদের নিজের সংসারে সব অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে।।

সমাপ্ত

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: