ভুল – অসীম কুমার চট্টোপাধ্যায় ( ভবঘুরে )

প্রথম থেকেই পৌরসভা বিরোধিতা করে এসেছে। গলির ভেতর পাঁচতলা ফ্লাট তৈরির অনুমিত দেওয়া অসম্ভব। এক পাশের নর্দমা ধরে রাস্তার পরিধি মাত্র ১০ ফুটের সামান্য বেশি। কোনো অবস্থাতেই তিন তলার বেশি হবে না। ইঞ্জিনিয়ার সত্য সাধন ঘোষ সরাসরি জানিয়ে দিলেন প্রমোটার নিতাই পালকে।
কিন্তু স্যার , নিতাই অনুনয়ের সুরে বলে , তিনতলার ওপর যে আমার কনস্ট্রাকশন লিন্টন পর্যন্ত কমপ্লিট।
তাতে আমি কী করবো ? আমি তো কত বার আপনাকে মিউনিসিপাল রুল মেনে কাজ করতে বলেছি। সরি , আমার কিছু করার নেই।
তাহলে ওটা ভেঙে ফেলবো ?
এখনই ভাঙতে হবে না। আমি দেখছি। এখন ওভাবেই থাক।
আপনাকে যে কী বলে ধন্যবাদ জানাবো। স্যার, এটা আপনার।
দিয়েছেন তো আগে.। আবার কেন?
কী আর এমন দিয়েছি, স্যার ? ইচ্ছা আছে ,এর পরে ঘটক বাড়ির পুকুরটা বুজিয়ে ফেলতে পারলে একটা বড় প্রজেক্ট হবে। তখন স্যার,আপনার জন্য একটা মারুতি অল্টো ধরাই আছে। না বললে শুনবো না।
ঠিক আছে ,ঠিক আছে , সে সব হবে খন
বাইরে বেরিয়ে এসে একটা সিগারেট ধরলো নিতাই। বন্ধু গোপাল বাইরে গাড়িতে অপেক্ষা করছিল। নিতাই ফিরে আসতে জিজ্ঞেস করলো গোপাল : কী বললো ?
শালা , হাঙরের বাচ্চা। হা করেই আছে। যতই দাও না কেন শালাদের ভুখ মিটবে না।
আপাতত চার তলার কাজ বন্ধ রাখতে হবে। কিছু একটা করবে তো বলল। দেখা যাক.। তিন তলা পর্যন্ত কমপ্লিট করে পজেশন দিয়ে দিই।
তখনও বিল্ডিংয়ের কাজ অনেক বাকি। এই অঞ্চলে তখন সবে মাত্র প্রোমোটারি রাজ্ শুরু হয়েছে। পার্টির নিচু তলার ক্যাডারদের একটা বড় অংশ ঝুঁকে পড়েছে প্রোমোটারিতে । আর একদল মেজাজে চালাচ্ছে সিন্ডিকেট । সলিড বিজনেস । প্রচুর ক্যাশ । উঁচু তলার নেতারা কমিশন নিচ্ছে দু হাত পেতে। ভাইয়ে ভাইয়ে বিভেদ বাদিয়ে , ভয় দেখিয়ে ,মেরে ধরে, জমি অধিগ্রহনের পথ সুগম করতে মাঠে নেমে পড়েছে এই নেতাদের পোষা গুন্ডা বাহিনী । চরম অরাজকতা । কেউ দেখার নেই । কেউ বলার নেই। কার কাছে মানুষ বিচার চাইবে ? আর, কেই বা করবে বিচার ? একের পর এক বাড়ি ,জমি দখল করে গড়ে উঠছে ফ্ল্যাট বাড়ি । কে যেন মজা করে বলেছে ,ফ্ল্যাট নগরী ।
দেখতে দেখতে আট -দশ টা ফ্যামিলি এসে গেল । খুব দ্রুত গতিতে চলতে লাগলো কাজ। দশটা ফ্যামিলির মধ্যে ছয়টা ফ্যামিলির ছয় মাথা করে নিল গোপন বেঠক। সিদ্ধান্ত নিল এই বিল্ডিংয়ের সমস্ত পরিবারকে যারা এসেছে এবং যারা আগামীদিন আসবে তাদের কথা মেনে চলতে হবে । প্রতিবাদ করলেই কড়া ব্যবস্থা। কিন্তু প্রতিবাদ করবে কে ? অধিকাংশই রিটায়ার্ড পার্সন। বয়স হয়ে গেছে। এই বয়সে আর লড়াই -ঝগড়া পোষায় না। চুপচাপ মেনে নিল সবাই । সমস্ত ফ্ল্যাট বিক্রি করে হাত ধুয়ে সরে পড়লো প্রমোটার ।
সবকটা ফ্ল্যাটেই এসে গেছে লোক। আর সব লোকই মেনে নিয়েছে ওই ছয় মাতব্বরদের । একটু ভুল হয়ে গেল। সবাই না। একজন ছিল একটু ঘাড় ত্যাড়া। অরুণদ্বয়। অরুণদ্বয় চক্রবর্তী। পেশায় সাংবাদিক । ক্রীড়া সাংবাদিক। অত্যন্ত জনপ্রিয় এক বাংলা দৈনিক পত্রিকার ক্রীড়া সাংবাদিক। একসময় কলকাতা মাঠে চুটিয়ে খেলেছেন। সাথে সাথে করেছেন সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশুনো। এরপর হঠাৎই খেলা ছেড়ে পুরো মাত্রায় সাংবাদিক। প্রেম করে বিয়ে। স্ত্রী মালবিকা সংস্কৃতে এম এ। চাকরি করেন কলকাতার হাতিবাগানের কাছে একটি স্কুলে। একটি মেয়ে। স্কটিশচার্চ কলেজে পড়ে।
গন্ডগোলের সূত্রপাত কেয়ার টেকার কে দিয়ে ওই ছয় মাতব্বরের পারিবারিক কাজ করানো। আপত্তি করেছিল অরুণদ্বয়। বলেছিল , যদি আপনাদের ব্যক্তিগত কাজ কেয়ারটেকারকে দিয়ে করানো বন্ধ না করেন, তাহলে আমার ঘরের যাবতীয় কাজ ওকে দিয়ে যাব. সাথে অবশ্য পারিশ্রমিকও দেব। যেটা আপনারা দেন না। ভালোই হবে। আমরা দুজনেই বেরিয়ে যাই। এই বাজারে পরের টাকায় মানে একদম বিনি পয়সায় খিদমদকারীর লোক পাওয়া তো দুর্লভ ব্যাপার। ধন্যবাদ আমার চোখ খুলে দেওয়ার জন্য। বাধ্য হয়ে ওরা মেনে নিল। সাময়িক ভাবে। কিন্তু আক্রোশটা থাকলো চাপা।
ভুল করলেন নলিনীবাবু। একজন রিটায়ার্ড সরকারি কর্মচারী। তার ঘরের দরজার বাইরের দেওয়ালে বসালেন একটা লেটার বক্স। যদিও বাইরের দিক ,ওটা অন্য্ একজনের ঘরের দেওয়াল। সে অবশ্য ওই ছয় জনের কেউ নয়। না হলোই বা। তাদের অনুমতি ছাড়া এত বড় অন্যায় করার সাহস সে কথা থেকে পায় ? আবার গোপন বৈঠক।
ক বাবু : কিছু একটা করতেই হবে.।
খ বাবু : আমাদের না জানিয়ে লেটার বক্স লাগানো।
গ বাবু : কার মদতে এই সব ?
ঘ বাবু : বুঝতে পারছেন না , একজনই তো আছে।
ক বাবু : কে ?
ঘ বাবু : কেন, অরুণদ্বয় চক্রবর্তী।
গ বাবু : কী করা যায় বলুন তো ?
খ বাবু : উপড়ে ফেলবো । তেন্ডাই -মেন্ডাই করলে সোজা দু-ঘা ।
ক বাবু : বয়স্ক মানুষ । গায়ে হাত তোলা কী ঠিক হবে ?
খ বাবু : আরে , গায়ে হাত না তুলি ভয় তো দেখতে পারবো। ওতেই কাজ হবে।
সেদিন ছিল শুক্রবার। ঠিক হলো রোববার সকাল দশটায় শুরু হবে অপারেশন । সে সময় অরুণদ্বয় বাড়িতে ছিল না। বারাসাতে গেছিল একটা কাজে। ওই ছয়জন এবং আরো চারটে ফ্যামিলিকে যুক্ত করে রেরে করে ছুটে গেল লেটার বক্স তুলতে। শাবল ,ছেনি ,বাটালি ,স্ক্রুড্রাইভার । একেবারে অস্ত্র সস্ত্রে সজ্জিত । প্রথমে দরজায় দমাদম শব্দ । তারপর চিৎকার। হৈচৈ । নলিনীবাবু দরজা খুলতেই ঝাঁপিয়ে পড়লো সবাই। এই মারে তো সেই মারে। উঠিয়ে ফেলল লেটার বক্স। হাতুড়ির ঘায়ে দিল দু টুকরো করে। যুদ্ধ জয়ের আনন্দে লাফাতে লাফাতে চলে গেল যে যার ঘরে। সন্ধ্যে বেলায় বাড়ি ফিরে অরুণদ্বয় সব শুনলো স্ত্রী মালবিকার কাছে। ছুটে গেল নলিনীবাবুর ঘরে সমবেদনা জানাতে ।
এদের অসভ্যতামি বেড়েই যেতে লাগলো ক্রমান্বয়ে। আর এক ভদ্রলোকের ছেলে স্কুল থেকে এসে তার সাইকেলটা কেন গেটের সামনে রেখেছে -এই অজুহাতে পাশের নোংরা আবর্জনাময় জমিতে ছুঁড়ে ফেলে দিল সাইকেলটা। অন্য্ একজন প্রতিবাদ করায় তাকে মারতে উদ্যত হলো কোমরের বেল্ট দিয়ে। কিন্তু কোনো ভাবেই বসে আনতে পারছে না অরুণদ্বয়কে। এরা তো উপলক্ষ মাত্র। আসল শত্রু তো একজনই। এবার চক্রান্ত হলো বিল্ডিং কমিটির সেক্রেটারি করা হবে অরুণদ্বয়কে। যে ভাবেই হোক তাকে ফাঁসাতে হবে।
গোপনে আঁতাত করা হলো পার্টির লোকাল নেতাদের সাথে। সর্বসমক্ষে তাকে চোর প্রতিপন্ন করাই একমাত্র উদ্দেশ্য। জমে উঠলো নাটক। কিন্তু বাগে আনা গেল না। এমন মিষ্টি কথার জালে জড়িয়ে ফেলল তাবৎ নেতাদের যে উল্টে তারাই ছয় কর্মকর্তার বিরোধী হয়ে গেল । ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠলো অরুণদ্বয়ের সাথে আর এরা ছয়জন এবং বাকি সাঙ্গ পাঙ্গ হয়ে গেল শত্রু। চরম লজ্বার। সর্বসমক্ষে একদল বাইরের মানুষের সামনে এই ভাবে অপমান । মানতে পারছে না। মাথা নিচু করে পার্টির নির্দেশ নিল মেনে। এর দুদিন বাদেই আবার বসলো ক বাবুর ঘরে। শুধু ছয়জন। গভীর ষড়যন্ত্র। কোনোমতেই যেন পাঁচ কান না হয়। শেষ চেষ্টা। আর মুখে নয়। এবার ফিজিক্যাল।
ক বাবু : তাহলে , কী করবেন ঠিক করেছেন ?
খ বাবু : গুন্ডা দিয়ে মার্ খাওয়াবো। পার্টির কিছু চরম পন্থী ছেলে মানে গুন্ডা বাহিনীর সাথে আমার কথা হয়েছে। তবে একটু খরচ আছে | ব্যাপারটা যাতে ওপর তলার কানে না যায় সেটা দেখতে হবে।
গ বাবু : কত চাইছে ?
খ বাবু : হাজার দুয়েক।
ঘ বাবু : হয়ে যাবে। আপনি কথা বলুন।
ক বাবু : একটু সাবধানে। ব্যাটার আবার পরিচিতি একটু বেশি। এখন তো আবার সেদিনের পর থেকে পার্টির কাছের লোক। প্রিয়পাত্র।
গ বাবু : একটু নয়। অনেক খানি।
খ বাবু : তাহলে ?
ঘ বাবু : তাহলে আবার কী ? এই চরম অপমানের বদলা আমরা নেবই। একটা কড়া দাওয়াই না দেওয়া পর্যন্ত শান্তিতে ঘুমাতে পারছি না।
কথামত মাঠে নেমে পড়লেন খ বাবু। পরিচিত একজন কে দিয়ে ওদের ডেকে পাঠালেন। মুন্নার চায়ের দোকানে। রাতের দিকে নটার পর থেকে ফাঁকাই থাকে দোকান। বাইরের লোকের আগমন নেই বললেই চলে. । তাছাড়া সবাই জানে যে এইসময়টা জি -ইউ -এন -ডি -এ -দের । খ বাবু বুঝিয়ে বললেন পুরো ব্যাপারটা। খুব সাবধানে করতে হবে। যাতে কেউ বুঝতে না পারে যে এটা আমরাই করিয়েছি ।
জি : আপনি কিছু ভাববেন না।
ইউ : আমাদের টাকাটা কত জানেন তো ?
খ বাবু : জানি। দু হাজার।
এন : সঙ্গে এনেছেন ?
খ বাবু : হ্যা। এই নাও।
ডি : কিন্তু ওকে আমরা চিনবো কী ভাবে ?
খ বাবু : আমি দূর থেকে জি কে দেখিয়ে দেব।
এ : ঠিক আছে। ওকে দেখিয়ে দেবার তিন দিনের মধ্যে কাজ হয়ে যাবে।
দিনটা ছিল শনিবার। অরুণদ্বয়ের ছুটি। বাড়িতেই ছিল। ল্যাপটপে বসে চলছিল লেখালেখির কাজ। ওদিকে মুন্নার চায়ের দোকানে এক এক করে এসে গেল ওরা। সঙ্গে দুটো অস্ত্র নিয়েছে। তবে খুব প্রয়োজন না হলে বের করবে না। খ বাবুর সাথে কথা যখন হয়েছিল পটলা তখন ছিল না। পটলা এই বাহিনীর লিডার। অসম্ভব ডাকা বুকো। নেতাদের খুব স্নেহের। প্রচুর অ্যাকশন করা ছেলে। জি ওর ডান হাত। ওর অবর্তমানে কেস নেয়। তবে দলে শেষ কথা বলে পটলা। ও জানেই না যে আজকে ওর দল একটা অপারেশনে যাবে। কাটোয়াতে পটলার মাসির বাড়ি। মাসতুতো বোনের বিয়েতে গিয়েছিল সাতদিন আগে। মাসির কোনো ছেলে নেই। সবকাজ পটলাকেই সামলাতে হয়েছে। ফিরেছে কালকে রাত্রে। এখন চায়ের দোকানে এসে শুনলো সব ঘটনা। দুহাজার টাকা সুপারি দিয়েছে। রাত্রি বেলা জমিয়ে মদ আর মাংস হয়ে যাবে। পটলা খুব খুশি। মাসে এরকম সুপারি গোটা চারেক এলে মন্দ হয় না। শালা , পার্টি যখন মাথার ওপরে আছে তখন ভয় কিসের। পটলা জানতে চাইলো ,
মাল টা কে ?
জি : চল ,দেখিয়ে দেব।
পটলা : লোকাল , না দূরের কেউ ?
ইউ : লোকাল।
পটলা : কী, মেয়ে ছেলে কেস ?
এন : ওসব না।
পটলা : অন্য দলের ? পার্টির বিরুদ্ধে কথা বললেই শালার বুকে দানা ভরে দেব।
জি : না না , অন্য দলের না । এ শালা ,পার্টির নেতাদের প্রিয়পাত্র।
পটলা : তাহলে ,জমি নিয়ে ক্যাচাল না দাদা গিরি ?
ডি : আরে , নীলুদের পাড়ায় যে নতুন ফ্ল্যাটটা হয়েছে না , ওই ফ্ল্যাটের কেস।
পটলা : যাকগে , তা মালটার নাম কী ?
এ : সাংবাদিক। এই জি , মাল্টার নামটা কী যেন ?
জি : অরুণদ্বয়।
পটলা : চক্রবর্তী ?
জি : তুই চিনিস ,মালটাকে ?
এই পঁচিশ বছর বয়সে অনেক কিছু দেখে ফেলেছে পটলা। সব শালা শুয়োরের বাচ্চা। কাজের সময় কাজী ,কাজ ফুরালে পাজী। সংসারের অবস্থা ভালো না। হঠাৎ বাবা মারা যাওয়াতে মা আর ছোটো বোনটাকে নিয়ে একদম অথৈ সাগরে। কোথায় আত্মীয় ,কোথায় বন্ধুবান্ধব । পার্টির নেতাদের অনেক করে ধরেছিল । প্রথমে পাত্তা দেয় নি । পরে এক জনের সুপারিশে পার্টির অ্যাকশন স্কোয়াডে নাম লিখিয়েছে । বার তিনেক জেলের ভাত খাওয়া হয়ে গেছে । মনে আছে সেবার বাড়িওয়ালা -ভাড়াটে কেস হ্যান্ডেল করতে গিয়ে ফেঁসে গেছিল। ভাড়াটে মালটা এম এল এ সাহেবের কি রকম দূর সম্পর্কের আত্মীয় । উল্টে পটলা কেই পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল । ঠিক সেই সময় এল ফোন টা | মা অসুস্থ । এক্ষুনি হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। পুলিশ কে সে কথা বলতেই বাটামের দুটো বাড়ি কষিয়ে মারলো। মুখে বলল , এতো শুধু টেলার । আসল গল্পতো সেলে ঢুকিয়ে হবে । কেঁদে ফেলেছিল পটলা। মার্ খেয়ে নয়। অসুস্থ মা আর ছোট বোনটার কথা ভেবে। রাখে কৃষ্ণ ,মারে কে ? সেই মুহূর্তে এক সাংবাদিক ভদ্রলোকের আগমন। দারগা বাবুর অত্যন্ত পরিচিত। খাতিরের লোক। প্রয়োজনীয় কাজ সেরে চলে যাচ্ছিল। নজর পড়ল পটলের ওপর। জানতে চাইল ও কাঁদছে কেন । সব শুনে বলল :
যদি কিছু মনে না করেন আমি ওর গ্যারান্টার হচ্ছি। বলুন কী করতে হবে ? তারপর ………..? বাকিটা ইতিহাস।
পটলা : আমার মায়ের সুস্থ হওয়া ,ওষুধের খরচ মেটানো , বোনের পরীক্ষার ফিস দেওয়া এবং আমার চাকরি – সবই ওই এক জনের কৃপায়। আমার ভগবান অরুণদ্বয় চক্রবর্তী।
একটা কথা সবাই কান খুলে শোন্ । তোরা যার কথা বলছিস সে আমার গুরু। মারা তো দূরের কথা , ওর দিকে তাকালে আমি তার চোখ উপড়ে ফেলবো। শোন্ , যে শালা , সুপারি দিয়েছে তাকে ক্যালা। তোরা না পারিস আমাকে দেখিয়ে দে ,আমি শালার বাপের নাম ভুলিয়ে দেব। ও জানে না কার সাথে পাঙ্গা নিতে গেছে। মার্ ওকে খেতেই হবে। শালার এত বড় সাহস অরুণদ্বয় স্যারকে মারার সুপারি দিচ্ছে। ও শালার গুষ্টির সষ্টি পুজো না করে ছাড়বো না।
জি : তাহলে ,টাকাটার কী হবে ?
পটলা : কী আবার ,ফিস্ট হবে। ওর টাকায় মাল খেয়ে ওকেই উদুম ক্যালাবো।
এরপর কী হয়েছিল জানা নেই। চির ধরলো ছয় মাতব্বরের বন্ধুত্বে। কার জন্য , কী জন্য সেটা অস্পষ্ট। সময়ের সাথে সাথে শান্ত হতে লাগল উষ্নতা। বিল্ডিংয়ে মৃত্যুও হয়ে গেল দুজনের। হিংসার বাতাবরণ কমে এসেছে অনেকটাই। ভেতরে কে কী বলে জানা নেই কিন্তু বাহ্যিক ভাবে সকলে সমীহ করে অরুণদ্বয়কে । এ ভাবেই অতিবাহিত হলো আরো কিছু বছর। সাংঘাতিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লেন খ বাবু। অনেকে বলে অত্যাধিক মদ্য পান তার অসুস্থতার একমাত্র কারন। আড়ালে আবডালে বলাবলি করে অন্যের ক্ষতি করতে গেলে নিজের ঘর ই পোড়ে। একদিন খুব ভোরে মালবিকার ডাকে ঘুম ভেঙে যায় অরুণদ্বয়ের। খ বাবুকে নার্সিংহোমে ভর্তি করা হয়েছে। অবস্থা সিরিয়াস। হাত মুখ ধুয়ে পোশাকটা পাল্টে ছুটলো অরুণদ্বয় নার্সিংহোমে । অধিকাংশই তার পরিচিত। ম্যানেজার কৌশিক বাবু তখনো এসে পৌঁছান নি। খ বাবু আই সি ইউ তে ভর্তি। দরজার বাইরে করিডরে উনার স্ত্রী আর মেয়ে। অরুণদ্বয়কে দেখে মা ,মেয়ে দুজনেই হতবাক। কাছে এগিয়ে এল অরুণদ্বয়। সবটা শুনে বলল :
চিন্তা করার কোনো কারন নেই। সব রকম ব্যবস্থা হয়ে যাবে। প্রয়োজনে আরো ভালো নার্সিং হোমে ট্রান্সফার করে দেব। আপনারা বাড়ি যান। পরে বেলায় আবার আসবেন। আমি আছি। নিশ্চিন্ত হয়ে যান। বোকার মত কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থেকে চলে গেল ওরা। নয়টার সময় এলেন ম্যানেজার কৌশিক বাবু। অরুণদ্বয়কে ডেকে পাঠালেন ওনার চেম্বারে। কথা দিলেন সব রকম সহযোগিতার।
ফিরে এসে খ বাবুর স্ত্রীকে সব কিছু বুঝিয়ে দিলেন। নিজের ফোন নাম্বার দিয়ে বললেন ,প্রয়োজন হলেই ফোন করতে। এতটুকু দ্বিধা যেন না করেন। উনার ফোন নাম্বারটাও নিজের সেল ফোনে সেভ করে রাখলেন। এরপর স্নান খাওয়া করে বেরিয়ে গেলেন অফিসে। বেলা আড়াইটে নাগাদ ফোনটা বেজে উঠলো। বৌদির ফোন। মানে খ বাবুর স্ত্রীর। ট্রান্সফার করতে হবে অন্য নার্সিংহোমে। অ্যাম্বুলেন্স জোগাড় করতে হবে। অরুণদ্বয় বাইপাসের ধারে একটা নামি হসপিটালে যোগাযোগ করল। ওখানকার সুপার নীলমনি গুহ তার অত্যন্ত পরিচিত। তাছাড়া কার্ডিওলজিস্ট দেবশঙ্কর ঘোষ দস্তিদার ওখানে আছে । দুজনকেই ফোন করে পুরো ব্যাপারটা জানালো অরুণদ্বয়। সুপার পেসেন্ট নিয়ে যেতে বললেন। দেবশঙ্কর মিটিংয়ে আছে। মিটিং শেষে রিং ব্যাক করবে। এরপর বন্ধু সৌগতকে ফোন করলো একটা অ্যাম্বুলেন্সর জন্য। ভাগ্য ভালো ।
অ্যাম্বুলেন্স টা এদিকেই ফিরছিল। ড্রাইভারের ফোন নাম্বার নিয়ে দ্রুত যোগাযোগ করে আসতে বলে দিল এই নার্সিং হোমে। টাকা পয়সা মিটিয়ে সই সাবুদ করে বেরতে বেরতেই বিকেল চারটে। ওরা আসার আগেই অরুণদ্বয় পৌঁছে গেল বাইপাশের ধারে হসপিটালে। খ বাবুর এক ভাই এসেছেন চন্দননগর থেকে। মিটিং থেকে বেরিয়ে দেবশঙ্কর ফোন করলো অরুণদ্বয়কে। ইতি মধ্যে পৌঁছে গেল অ্যাম্বুলেন্স । ভর্তি হয়ে গেল। সমস্ত ফর্মালিটিস মিটতে আরো আধঘন্টা। সবাইকে নিয়ে ক্যান্টিনে গেল অরুণদ্বয়। কফি আর কেক। বৌদি কেক খেলেন না। শুধু কফি। দেবশঙ্কর বলল রাতে থাকার দরকার নেই। সেরকম প্রয়োজন হলে ফোন করা দেবে হসপিটাল থেকে। অগত্যা বাড়ি ফেরা। অরুণদ্বয়ের গাড়িতেই ফিরে এল সবাই।
দিন তিনেকের মধ্যেই সুস্থ হয়ে উঠলেন খ বাবু। এর মাঝে আর সময় পায় নি অরুণদ্বয়। কাজের খুব চাপ। সামনে এই পি এল। দম ফেলার সময় নেই। এরই মাঝে খবর পেলেন খ বাবু বাড়ি ফিরে এসেছেন। এখন ভালো আছেন। তবে কমপ্লিট বেড রেস্ট। রাত্রি বেলায় অফিস থেকে এসে অরুণদ্বয় ছুটলো একবার দেখে আসতে। ডোর বেল টিপতেই বৌদি দরজা খুলে দিলেন।
জিজ্ঞেস করলো অরুণদ্বয় , দাদা কেমন আছেন ?
বৌদি : অনেকটা ভালো।
এই কদিন একদম সময় করে উঠতে পারি নি। কাজের চাপে বাড়ি ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে যেত। তবে খবর নিতাম। যেই শুনলাম আজকে এসেছেন ,তাই দৌড়ে এলাম দেখা করতে। এই ক’দিন আসতে পারিনি বলে ক্ষমা চাইছি।
ছি ছি ,একই বলছেন ! আপনি যা করেছেন ,নিজের লোকও তা করে না। আপনার কাছে ঋণী হয়ে থাকলাম।
কি উল্টো পাল্টা বলছেন, বৌদি। শুনুন , যে জন্য আরো আসা । অফিসের কাজে দু-এক দিনের মধ্যে আমায় দিল্লি যেতে হবে। তবে বেশি দিন না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরে আসবো। একটা কথা। অন্য্ ভাবে নেবেন না। ছোট ভাই হিসাবে বলছি। প্রচুর খরচ হয়ে গেল আপনার। আমি কি সাহায্যের হাত একটু বাড়াতে পারি ? আমার মনে হলো এই সময় টাকা পয়সার খুব প্রয়োজন। এতটুকু দ্বিধা না করে বড় দিদি হিসাবে বলবেন।
কেঁদে ফেললেন বৌদি। না ভাই, এই যে তুমি বললে এটাই বা কে বলে। এখনই টাকার দরকার নেই। তবে লাগলে অবশ্যই বলবো।
থ্যাংক ইউ বৌদি। এবার চলুন ,দাদাকে দেখে আসি।
দাদা কি ঘুমাচ্ছেন ?
না ভাই.। জেগে আছি। শরীরটা খুব দুর্বল। সম্পূর্ণ বেড রেস্ট নিতে বলেছেন ডাক্তারবাবু।
কোনো চিন্তা নেই। সুস্থ হয়ে যাবেন।
একটা কথা বলি আপনাকে ,অরুণদ্বয় বাবু ?
হ্যা, বলুন।
আপনার বৌদির কাছ থেকে আমি সবই শুনেছি। আমার জন্য আপনি যা করেছেন আমার কোনো আত্মীয় তা করে নি। আর এই আমি আপনার সাথে কী দূর ব্যবহারই না করেছি। আপনাকে মারার ষড়যন্ত্র পর্যন্ত করেছিলাম। ভগবান আমাকে শাস্তি দিয়েছেন। আমাকে মার্জনা করুন।
কান্নায় ভেঙে পড়লেন খ বাবু। চাদরের তলা থেকে দুটো শীর্ন হাত অরুণদ্বয়ের সামনে জোড় করে ক্ষীণ কন্ঠে বললেন :
আমি ভুল করেছিলাম। মানুষ চিনতে আমার বড্ড ভুল হয়েছিল। এই ভুলের ক্ষমা নেই। তবে আপনার মত বড় মনের মানুষ নিশ্চয়ই আমার মত অধমকে ক্ষমা করবেন।
দুচোখের কোল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগলো জলের ধারা। কাঁপা হাত দুটো দিয়ে ঢেকে ফেললেন মুখ |
কী সব বলছেন আবোল তাবোল ? আরে ধুর , আমার ওসব কিছু মনে নেই। একসাথে থাকতে গেলে কত গন্ডগোল হয়। এতকিছু মনে রাখলে বাঁচবো কী করে ? একদম সব ভুলে যান। ভালো থাকবেন। আমি আসছি।
ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: