ভৌতিক গল্প – রাহুল মন্ডল

রক্ত করবী 

মূল নর্মদা মন্দির থেকে দক্ষিণ দিকে প্রায় চার কিমি দূরত্বে আছে ধূনিপানি। গাড়ি করে আমরা এগোলাম। নখটির জঙ্গলে এসে নামলাম।আসলে ধূনিপানি আর ভৃগুকমন্ডলু যেতে নখটির জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে বেশ খানিকটা হাঁটতে হয়। আমরা কোন রকমের গাড়ি চালিয়ে যেতে লাগলাম,  জঙ্গলের রাস্তা তাই গাইড জরুরি, নাহলে পথ হারানোর সম্ভাবনা প্রবল।

জঙ্গলের রাস্তা অতি মনোরম, এডভাঞ্চারাস তো বটেই। বিশ্বাস করুন, এই যে এখন গভীর গর্তের পাশ দিয়ে যাবার সময় আপনার গা টা অল্পস্বল্প ছমছম করছিলো,  আমি আর তিন বন্ধু বেরিয়েছি ভারত ভ্রমণে তাও আবার বাইকে করে, আমার সাথে ছিল পৃথ্বীশ আর রাঘব, বেরোবার সময় অনেকে টোকা দিয়েছিল তিন জোনা যাস না হয় চারজন না হলে দুজনে যা,

কিন্তু আমাদের তখন তাজা রক্ত, সবে কলেজ পাস করেছি  বাইক টাও নতুন, কে কার কথা শোনে,  পেন্ড্রা রোডের ধারে একটা পেট্রোল পাম্পে আমরা থামলাম, যে ছেলেটা তেল দিচ্ছিল সে বলল, স্যার দুপুর 1 টা বাজে, ওই দিকটাতে গাইড  ছাড়া যাবেন  না অনেক বড় জঙ্গল তো, আমরা আগেই অনেকটা খাবার তুলে নিয়েছি,  ছোট মাটি katar যন্ত্র তাছাড়াও ধারালো ছুরি, সবকিছুই আমাদের সঙ্গে আছে, রাঘব হেসে বলল,

আমরা তিনজনে তিনজনের গাইড, আমরা গাড়ি স্টার্ট করলাম, তারপরের ঘটনা আপনাদের বলেছি, আমরা কোন একটা গভীরখাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছি, একদল ছেলে হয়তো মধু নিয়ে ফিরছিল, তাদের জিজ্ঞাসা করলাম আশেপাশে কোন বাজার আছে নাকি, খাবারের দোকান??

তারা বলল আজ্ঞে সাত কিলোমিটার আগেই আছে, কিন্তু আপনারা তো ভিনদেশী মনে হচ্ছে, পৌষ মাস একটু পরে সন্ধে নামবে, এরাতো ধরে একদম সোজা চলে যান কোন দিকে দেখবেন না ডাকলেও তাকাবেন না, তোরা চলে গেল, আমরা গাড়ি স্টার্ট করে সোজা চললাম, 17 কিলোমিটার কেন কুড়ি কিলোমিটার হয়ে গেল না কোন বাজার না লোকজন জঙ্গলের জঙ্গল,

এদিকে পশ্চিমের আকাশে সূর্য একদম ম্লান হয়ে আলো দিতে শুরু করেছে, চুপ করে সন্ধ্যা নেমে গেল, কি বলল ভাই জঙ্গলের রাস্তা হিংস্র পশু থাকতে পারে, আমার একটু ভয় ভয় করছিল, বললাম, একটু এগিয়ে চল দেখি, যদি কোন বাজার দোকানপাট না পাই, একটা খালি জায়গা দেখে তাবু  খাটাবো তারপর কাল সকালে দেখা যাবে,

কিন্তু চাঁদ তো দেখতে পাচ্ছিনা আজ বোধ হয় অমাবস্যা, আমরা জঙ্গলের রাস্তা ধরে সোজা এগিয়ে চললাম, দের থেকে দু কিলোমিটার গিয়ে দেখলাম একটা সাদা রঙের বাড়ি, আমাদের মনে একটা ক্ষীণ আশার সঞ্চার হলো, আমি বললাম বাড়িতে কেউ যদি নাও থাকে কোন জায়গা পরিষ্কার করে রাত্রে থেকে যাব, একদম কাছে গিয়ে দেখলাম একটা ঘরে খিন আলো জ্বলছে, আমরা তো কোন পথ হারাবার ভয়ে পরিশ্রান্ত,

গাড়ি থেকে নেমে সজোরে দরজা ধাক্কা দিলাম, চার-পাঁচবার ধাক্কা দেবার পরেও কোন উত্তর দিল না, তারপর দরজাটা একটু সজোরে ঠিলতেই ক্যাচ।..  করে দরজাটা খুলে গেল,  খুব ধীরে ধীরে ভেতরে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম , কেউ আছেন??

কিছুক্ষণ পর এক মাঝবয়সী মহিলা বাইরে এল, অবাক দৃষ্টিতে তাকালো  আমাদের দিকে, চাউনি  এক ভয়ঙ্কর হায়নার মত, আমি বললাম ম্যাডাম আমরা জঙ্গলে হয়তো রাস্তা ভুল করেছি, অমরকন্টক রাস্তাটা বলে দিতে পারবেন? একটু থেমে উত্তর এল, এতরাত্রে ওই রাস্তা দিয়ে যেতে হবে না, রাতটা  এখানে কাটিয়ে নেন, জায়গা টা  সম্পুর্ণ অন্ধকার, শুধু একটা গলা শুনতে পেলাম, এত মিষ্টি গলা আগে কোনদিন শুনিনি আমরা, মেয়েটি বললো ভিতরে আসুন,

গায়ে মোটা জ্যাকেট আমি টুপি থাকা সত্ত্বেও, উত্তরের বাতাস আমাদের শরীরে তীরের মত ফুট ছিল, প্রচন্ড ঠান্ডায় আমাদের শরীর যেন নড়তেই চাইছিলো না,    আমরা আমাদের গাড়ি গুলো একটু ঠিক জায়গা তে রাখার জন্য গেলাম, গাড়ি গুলো ঠিক করে স্ট্যান্ড করতেই পিছন দিকে একদল হায়না কেঁদে উঠলো, যদিও এটাকে আমরা হায়নার হাসি বলি,

কিন্তু সেই হাসির মধ্যে এত ভয়ংকরতা ছিল আমরা সকলে  আঁতকে  উঠলাম, আশপাশের হাড় হিম করা আর বাতাসে জঙ্গলে পাতার  ঠোকাঠুকির আওয়াজ, আর হায়নার হাসিতে আশেপাশের পরিবেশ আরো দুর্বিষহ হয়ে উঠল, এখানটা নিকষ অন্ধকার, প্রকৃতি যেন পৃথিবীর সব কালি এলাকাতে লেপন করেছে, অন্ধকারে কালো কাপড়ে চোখ ঢেকে  দিলে যেমন হয় তার থেকেও বেশি গাঢ়  এই অন্ধকার,

মেয়েটি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে, আমাদের দিকে তাকালো, আমরা ইতস্তত করছি দেখে বলল, কি হয়েছে ভেতরে আসুন এখানে কারেন্ট নেই, তবে কেরোসিনের আলো আছে, রাঘব জিজ্ঞাসা করল, বাড়িতে আর কেউ থাকে না?? মেয়েটি উত্তর দিল আগে ভেতরে আসুন তারপর কথা হবে, আমরা মন মহিতের মতো ভেতরে গেলাম,

মেয়েটি  বলল আমার কাছে বেশি ঘর নেই, এই ঘরটাতে দুজনকে মানিয়ে নিতে হবে, আর একজন পাশের ঘরটাতে থাকবেন, আপনারা বিশ্রাম  করুন আমি চা করে আনি, আমাদের মধ্যে রাঘাব একটু ভীতু ছিল, তাই দুজনাতে ঠিক করল এক ঘরে থাকবে আর আমি অন্য ঘরে, এই ঘর টা  বেশ গুছানো, বেশি জিনিস নেই একটা খাট,

একটা কাঠের স্ট্যান্ডের উপরে একটা ফুলদানি, একটা আয়না, আর কিছু নিত্যনৈমিত্তিক সরঞ্জাম, এই ঘরটায় একটা মোমবাতি জ্বলছিলো, আরেকটা স্ট্যান্ডে একটা নিভানো মোমবাতি ছিল, এই ঘরটাতে মোমবাতির আলো পড়ে যেন আরো  মৃদুমন্দ হয়ে গেছিল,

আমি সিগারেট খাই তাই আমার কাছে লাইটার  ছিল, সেটা দিয়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে পাশের ঘরটাই গেলাম যেটা সেই মেয়েটা দেখিয়ে  গেছিল, তিনটে মাত্র ঘর আর কাউকে কিন্তু দেখতে পেলাম না,হঠাৎ  একটা আওয়াজে স্তম্ভনতা  ফিরল, দেখলাম মেয়েটি তিন কাপ চা আর বাটার টোস্ট নিয়ে ঘরের দিকে আসছে, আমায় দেখে বলল চাটা খেয়ে নিন তারপর সব দেখাচ্ছি,

প্রচন্ড খিদে পেয়েছিল ক্ষুধার্থ হায়নার মত খাবারে হাত লাগালাম, মেয়েটি  অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমাদের দিকে দেখল, আমরা কিছু বলার আগেই আমাদের বলল, আমি করবী..  বহু বছর এখানে আছি, রাত্রে রুটি খান তো?? কিছু উত্তর দেওয়ার আগে একদল খেকশিয়াল একসঙ্গে ভয়ঙ্করভাবে ডেকে উঠল, কি বিশ্রী তাদের ডাক,

মেয়েটি হেসে বলল এটা নতুন শিকার পেয়েছে বোধহয়, জঙ্গলে এখন খাবার অনেক কমে গেছে, তাই শিকার পেলে আনন্দেতে  এভাবে ডেকে ওঠে.. আমি বললাম এই জঙ্গলে এই বাড়িতে আপনি একাই থাকেন? মেয়েটি হেসে বলল না, আরো তিনজন থাকে, তারা খাবার আনতে গেছে রাত্রেই ফিরে আসবে, আমাদের কেমন অদ্ভুত লাগছিল কিন্তু আমরা নিরুপায়, রাঘব হেসে বলল করবি খুব সুন্দর নাম তো,

মোমবাতির আলোয় আলোয় মেয়েটির  অপরূপ সৌন্দর্য,  তার সৌন্দর্য যেন জোসনা রাতে নদীর স্বচ্ছ জলে প্রতিফলন প্রতিফলিত হওয়া জোসনার আলোর মত সুন্দর, আমি বললাম আমরা তিনজন পুরুষ, অচেনা আপনি একা ভয় লাগছে না আপনার?? মেয়েটি কোন উত্তর দিল না, শুধু নিষ্ঠুরভাবে একবার তাকাল যেন পৃথিবীর সব রকম ক্রূর তা তাঁর চোখে আমরা দেখলাম, আমরা আর কথা বাড়ালাম না,

মেয়েটি বলল, আপনারা ক্লান্ত, ওদের ফিরতে রাত হবে, মাংস আছে, মাংস রুটি চলবে তো?? রাঘব হেসে বলল দৌড়াবে, মেয়েটি চলে গেল, আমরা এই বিষয়ে আর গল্প করার সাহস পেলাম না, এটা যদি চোর ডাকাত হয় সে ভয়  আমাদের ছিল না, কারণ মোবাইল ছাড়া আর কিছুই নেই আমাদের কাছে, কিছু টাকা খুব গুনলে  হাজার দেড়েক হবে, আরে জঙ্গলের আশেপাশে এটিএম আছে বলে মনে হয় না যে তুলে নিয়ে গিয়ে টাকা বার করাবে,

আমরা কিছুক্ষণ গল্প করতে করতে ঘন্টা দুই কেটে গেল, হঠাৎ একটা আওয়াজে আমরা চুপ হয়ে গেলাম, করবী  বলল, খাবার তৈরি হয়ে গেছে খেয়ে   নিন, আমরা কেউ অমত করলাম না, খেয়ে-দেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম যে যার ঘরে, ঘুমটা একটু  এসেছিল, কোন একটা গোঙানির শব্দে ঘুম ভেঙে গেল, দরজা খুলে দেখলাম পাশের ঘর থেকে শব্দটা আসছে,

কৌতূহলবশত একটু এগিয়ে গেলাম, কারোর জ্বর টর এলো না তো?  দরজাটা খুলতেই আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম, দেখলাম করবি আর করবি নেই ওর সঙ্গে আরো তিনটে বাদুড়, করবি তো চোখ ঠিকরে যেন আগুন বেরোচ্ছে, একটা অনুমানিক তিন  মাসের বাচ্চা ছেলের  মাথাটা ছিবিয়ে  খাচ্ছে সে, তার থুতনি বেয়ে  কাঁচা রক্তের স্রোত, 

আশেপাশের হয়না আর শিয়াল গুলো ভয়ঙ্কর ভাবে কাদিছে, বাদুর গুলো আমার দুই বন্ধুর আশেপাশে পাকে পাকে ঘুরছে, আমি আর্তনাদ করে উঠলাম, আমার চলছে না পা, কোন রকমের দরজা খোলার চেষ্টা করলাম, কিন্তু হাত উঠছে না, আমি উন্মাদের  মত চেষ্টা করতে লাগলাম, অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না, তবুও দৌঁড়াতে লাগলাম,

চোখের সামনে একটা আলো পড়লো, তারপর কিছুতে  যেন সজোরে ধাক্কা খেয়ে আমি উলটে পড়লাম, তারপর চোখ খুলতেই দেখি আমার সামনে আপনি বসে আছেন, রাঘব রা কোথায়? ইস্পেক্টর অফ পুলিশ  হেসে বলল, দুই বন্ধুকে খুন করে গল্প শোনাচ্ছেন, ওরা খুন হয়েছে?

দেখুন দুই বন্ধুকে আপনি খুন করে পালাবার সময় জঙ্গলে আমাদের ফরেস্টের গাড়ি আপনাকে উদ্ধার করে, দয়া করে সত্যিটা বলুন না হলে কিন্তু কপালে কষ্ট আছে আপনার, হঠাৎ পিছন থেকে একজন বলে উঠলো উনি সত্যি বলছেন, পেছনে তাকিয়ে দেখলাম একজন গেরুয়া বসন পড়া দেখে সন্ন্যাসী মতো লোক লাগলো, অফিসার জিজ্ঞেস করল আপনি, উত্তর দিলেন আমি সচ্চিদানন্দ কৃপাগিরি,

উনাকে যেখান  থেকে উদ্ধার করেছেন তার পাঁচ কিলোমিটার দূরে যে গ্রাম টা  আছে সেখানেই আমার আশ্রম, কালকে রাত্রে চিৎকার শুনে আমি বুঝতে পেরেছিলাম কিছু একটা হচ্ছে কেউ বিপদে পড়েছে, রাত্রে একা বের হবার সাহস হয়নি, তাই ভোরের আলো ফুট তেই  খুঁজতে বের হলাম খবর নিয়ে দেখলাম এনাকে  উদ্ধার করে নিয়ে এসেছেন আপনারা, ওরা যেখানে খুন হয়েছে সেই ভাঙ্গা বাড়িতে করবি নামে এক পিশাচিনী থাকে,

আজ থেকে প্রায় 100 বছর আগে এক শয়তান তান্ত্রিক ওকে বস করেছিলেন, তারপর সুযোগ বুঝে সেই পিশাচিনী ওই তান্ত্রিক  হত্যা করে ওখানে থেকে গেছে, পিশাচ বশে রাখা খুব কঠিন কাজ, একটু অসাবধান হলেই মৃত্যু অনিবার্য, কাল ছিল আমাবশ্যা তার সঙ্গে দগ্ধাযোগ এই যোগ  শয়তানদেরকে সবথেকে শুভ সময়, ঈশ্বরের অশেষ কৃপায় তুমি বেঁচে গেছো,

তোমার গলায় যে কালভৈরব কবচ আছে, তার জন্য ওই পিশাচিনী তোমাকে স্পর্শ করতে পারেনি, এ কবজ অতি উত্তম তান্ত্রিক ছাড়া তৈরি করতে পারেন না, রক্তকরবী মূল ভেজানো জল দিয়ে এই কবজ শোধন করতে হয়, জ্যোতিষ শাস্ত্রে অধম, ত্র্যস্পর্শ ও মল-মাস বিশেষ প্রণিধানযোগ্য।

একদিনে অর্থাৎ এক দিবা-রাত্রে দুই তিথির অমত্ম হলে ঐ দিনকে অবম বলে। একদিনে তিন তিথি অবস্থান করলে ঐ দিনকে ত্র্যস্পর্শ বলে। যে মাসে দুইটি অমাবশ্যা হয় ঐ মাসকে মল-মাস বলে। কালকে সব গুলো ছিল,  সন্ন্যাসী বলল তুমি বেঁচে আছো এটাই অনেক, এই কবজ তুমি কোনদিন খুলবে না,

পুলিশ অফিসার কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,  দৌড়ানোর সময় গাছে ধাক্কা লেগে তোমার দাম কাধে  একটু চোট লেগেছে তাছাড়া আর কিছু হয়নি, কিন্তু দুটো খুন হয়েছে তদন্তে অবশ্যই আপনাকে  সাহায্য করতে হবে,

কাল চোরাকারবারীদের পিছু নিতে নিতে ফরেস্টের অফিসার ওইদিকে যাবার সময় তোমাকে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করে, তার সঙ্গে দুজন ছেলে মৃত অবস্থায় পায় ওদের শরীরের সমস্ত রক্ত যেন কেউ চুষে  নিয়েছে..

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: