মনির জন্মদিন : অনন্যা ঘোষ

‘মনি’ নদীর বাঁধ ভেঙে গেছে আজ ভোর রাতে l একদিন এই নদী-ই ছিল গ্রামবাসীর চোখের মনি l আজ থেকে ঠিক আঠারো বছর আগে ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে হত দরিদ্র সুবল ও মালতির কোল আলো করে এক ফুট -ফুটে কন্যা সন্তান জন্ম নেয় l আদর করে সুবল মেয়ের নাম দেয় মনি l

আজ মনির জন্মদিন, কিন্তু সে দিকে খেয়াল নেই কারো l কি করে খেয়াল থাকবে? ‘আমফান’ ওদের ঘর দোর ভেঙ্গে দিয়েছে l গ্রামের আর সকলের সাথে ওরাও ঠাই নিয়েছে গ্রামের স্কুল বাড়িতে l ভোরের আলো তখনও ফোটেনি,কারা যেন হাহাকার করে উঠল… ” গেলো গেলো… সব শেষ হয়ে গেলো… এবার বোধহয় নদীর বাঁধ টাও ভেঙে যাবে l

” সবাই ছুটলো,প্রাণপণ চেষ্টা করলো,কিন্তু শেষ রক্ষা হোলো না,বাঁধ ভেঙে গেলো,নদীর নোনা জল ঢুকে গেলো গ্রামে,ঝড়ে ভেঙে যাওয়া খড়ের চাল ভেসে গেলো নদীর জলের স্রোতে,মনির চোখের জলও বাঁধ মানছে না… যত দূর চোখ যায়, তত দূর ভেসে যেতে দেখলো খড়ের চাল-টা …পাথরের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো সে l

হঠাৎ হুঁস ফিরলো গ্রামবাসির হাহাকার -এ l কে যে কাকে সান্তনা দেয়…. নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলে “বাবা দেখো সব ঠিক হয়ে যাবে, ক’দিন পর জল নেমে গেলে আমরা তিন জনে হাতে- হাত লাগিয়ে একটা ছিটে বেড়ার ঘর বানিয়ে নেবো, মা তুমি চিন্তা করো না,তোমার মনে নেই…. সেবার ‘আয়লায় ‘ আমাদের ঘর উড়ে গিয়েছিল, সেবারের মত এবারেও সব ঠিক হয়ে যাবেl” ‘আয়লা’ যে বছর হয় তখন মনির বয়স সাত-আট l হত দরিদ্র বাবা-মা মেয়ের মুখে এক মুঠো ভাতও তুলে দিতে পারছিলো না l

এমন সময় মালতির পাড়াতুতো দিদি ছায়া এসে বলে, কলকাতায় একটা বাড়িতে ওদের ছোট্ট ছেলেকে দেখাশোনার জন্য একটা বাচ্ছা মেয়ে খুঁজছে “মনি কে পাঠাবি ? আমি তো আছি, মনির সব খোঁজ খবর আমি রাখবো l” ছায়ার ভরসায় বুকে পাথর চাপা দিয়ে সুজয় আর মালতি মনিকে কলকাতায় কাজে পাঠাতে রাজি হয়, মেয়ে টা অন্তত খেয়ে পরে তো বাঁচবে l এই প্রথম মা-বাবা কে ছেড়ে থাকবে মনি, খুব কষ্ট হচ্ছে ওর l

মনে মনে একটু আনন্দও হচ্ছে, এই প্রথম রেলগাড়ি চাপবে,কলকাতায় যাবে,পেট ভোরে দুটো ভাত খেতে পাবে l কলকাতায় এসে দমদম-এ যে বাড়িতে কাজে ঢুকলো মনি,তাদের বাড়িতে একটা এক বছরের বাচ্ছা ছেলেকে দেখাশোনো করা মনির কাজ, ওই বাড়ির কাকু-কাকিমা খুব ভালো,মনি কে ওরা নিজের মেয়ের মতোই ভালোবাসতো, কাকিমা যখন বাপের বাড়ি যেত তখন ওকেও বাড়িতে ওর বাবা -মা র কাছে যেতে দিত l মাস-মাইনে টা সুবলের ব্যাঙ্ক একাউন্টে মাসের চার -পাঁচ তারিখের মধ্যে পাঠিয়ে দিত l

সাত বছর ছিল ওদের বাড়ি, তারপর কাকুর চাকরির বদলি হয়ে যায় ব্যাঙ্গালোর এ, ওরা মনি কেও যেতে বলেছিলো ওদের সাথে কিন্তু মনি যেতে চায়নি ওতো দূর l এখন মনি দমদম-এই একটা ঘর ভাড়া নিয়েছে l সকালবেলায় মনি পাঁচটা বাড়িতে কাজ করে, আর সন্ধ্যার সময় একটা খাবারের দোকানে রুটি করে, মাসের শেষে যা আয় হয়, খাওয়া – পরা -ঘর ভাড়া দিয়ে যা বাঁচে বাবা কে পাঠায় l সুজয় সুন্দরবন থেকে মধু সংগ্রহ করে বিক্রি করে আর মালতি নদীতে মাছ ধরে বাজারে নিয়ে যায় l

কলকাতায় ‘করোনা’ ছেয়ে গেল l সব বাড়ি গুলো থেকেই হাতে মাস-মাইনের ধরিয়ে দিয়ে বলল, “এখন আর আসতে হবে না, তোমার মোবাইল নম্বর টা তো আছে, দরকার হলে ডেকে নেবো l” লকডাউন এর জন্য খাবারের দোকান টাও বন্ধ হয়ে গেলো, রুটির কাজটাও গেলো মনির, অগত্যা রায়দিঘির বাড়ি ফিরে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই… কলকাতায় বসে বসে তো আর ঘর ভাড়া গোনা সম্ভব নয় l

অনেক দিন পর, এতো গুলো দিন বাবা-মা র সাথে থাকতে পেরে মনির ভালোই লাগছিলো, কোন ছোটবেলা থেকে একা একা থাকে কলকাতায়, স্বপ্ন ছিল এবারের জন্মদিনটা অন্তত লকডাউন এর দৌলতে বাড়িতে মা-বাবার সাথে পালন করবে কিন্তু গোদের ওপর বিষফোঁড়া ‘আমফান’ ওদের সাধের বাড়িটাও ভেঙে দিলো l

ভাঙা বাড়িটা সোজা করার মতো টাকা পয়সাও ওদের হাতে এখন নেই l সেই ভাঙা বাড়িটাও আজ ভেসে চলে গেলো বাঁধ ভাঙা ‘মনি’ নদীর অতল জলে…সঙ্গে ভেসে গেল মনির দেখা জন্মদিন পালনের ছোট্ট স্বপ্ন টা l

এখন ওরা স্কুল বাড়িতেই থাকে , আজ ভোর হওয়ার অনেক আগেই মনির ঘুম ভেঙে গেছে, ছুটেছে নদীর দিকে ,পূব দিকটা আসতে আসতে আলো হচ্ছে, সূর্যের নরম লাল আলোটা পড়ছে মনির চোখে মুখে…আজ সে অনেক আত্মবিশ্বাসী, ভোরের আলোয় আবার নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছে মনি l

Published by Story And Article

Word Finder

One thought on “মনির জন্মদিন : অনন্যা ঘোষ

  1. খুব সুন্দর লেখা তোর দিদি , তুই এইটা কে পেশা হিসাবে নিতে পারিস তাহলে আমার খুব ভালো একটা লেখিকা পাবো

Leave a Reply

%d bloggers like this: