মনে পড়ে

মনে পড়ে
মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ
——————–
আমি তখন থ্রি-তে পড়ি।সত্তুর দশকের মাঝামাঝি ।প্রাইমারি স্কুলের জানালা গলিয়ে
মুক্তাগাছা রুমা সিনেমা হলের একটি প্রচারণা শুনি —
হেলায় সুবর্ণ সুযোগ না হারিয়ে আজি চলে আসুন রুমা সিনেমা হলের রূপালী পর্দায়—সাথে ঢোল,বাঁশি।একটা বড় প্ল্যাকার্ডে সিনেমার রঙিন পোস্টার সাঁটানো। চারপাশে লাল সবুজ হলুদ কাগজের ছোটো ছোটো নিশান ।বাদকদলের পাশে একপাল ছেলে মেয়ে ।সবাই পেছনে পেছনে ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত ।কেন পিছু নিচ্ছে জানা নেই । বাবার বকা খেতে হবে —ভয়হারা শৈশব সম্মোহিত হয়ে ছুটছে।সিনেমার নাম, কুশীলবদের নাম শিশু কিশোরদের বাড়তি কৌতুহল ।
আটানি বাজার থেকে বড়হিস্যা বাজার মোটামুটি দূর ।সন্ধ্যার হারিকেন জ্বালিয়ে বইটা খোলা হলো মাত্র ।দূরের গান ভেসে আসে রুমা সিনেমা হলের মাইকে–‘গুণ গুণ গুণ গান গাহিয়া নীল ভোমরা যায়—–মাগো মা,ওগো মা,আমারে বানাইলি তুই দিওয়ানা—‘বিক্রমপুর বাপের বাড়ি ছিলাম একদিন পদ্মার পাড় —-
কান পেতে থাকি ।শোনার চেষ্টা করি ।
কী হচ্ছে সুজন সখিতে ?
কিংবা বাহাদুরে?
রাজ্জাক-কবরী,ফারুক-কবরী,ওয়াসিম-কবরীর অভিনয় শৈলি নিয়ে ক্লাসের কিছু ছাত্র বলতে বলতে হাঁপিয়ে উঠেছে ।আমরাও হা-করে শুনতাম ।নায়ক নায়িকার নাম, চেহারা কীভাবে যেন ওরা মুখস্থ রাখে ।আমার কাছে দেয়ালের পোস্টারে সবার চেহারা একই মনে হতো।তবে আব্বা আম্মার কঠোর শাসনে সেসব মনে মনে চেপে রাখতে কষ্ট হতো ।মাইকিংয়ে শুনতাম আজকে জসিম, উজ্জ্বল, প্রবীর মিত্র, রাজ্জাক কিংবা ওয়াসিম আছে ।মানে বিশাল মারপিট হবে ।সেটা দেখার প্রচণ্ড লোভ ছিল ।কিন্তু সিনেমা হলে ঢোকা নিয়ে পরিবার, স্কুলের স্যারদের কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ ছিল ।
পরবর্তীতে সাদাকালো বিটিভিতে সিনেমা দেখানো শুরু ।সেই সুবাদে কিছু ছবি দেখেছি।নিজেদের টিভি ছিলনা ।অন্যের বাসায়।সপ্তাহে একদিন প্রদর্শনী হতো।
কাহিনী, অভিনয় দুটোই আসলে দর্শক টানতে পারতো ।নায়িকার সহজ সরল অভিনয়,পোশাক, সংলাপ।তবুও দর্শক হেসেছে, কেঁদেছে।কারো কারো জীবনের অবিচ্ছেদ্য কথাগুলো হয়তো সিনেমায় ফুটে উঠতো ।
আজ সিনেমা বলতে গেলে যা আছে এটা সবারই জানা ।সিনেমা মানেই গ্ল্যামারের নামে নগ্নতা,প্রতিবাদের নামে মেরে তক্তা বানাতে হবে, ভিলেন মানে ধর্ষক আর অস্ত্র কিংবা মাদক ব্যবসায়ী, নায়কের উত্যক্ত করন জায়েজ, এসবই তো ।
শুধু একটা কথাই সত্যি আমরা যাদের কাছে সরল বিনোদন পেয়েছি সেইদিন আর আসবেনা ।সেসব কুশীলবদের শুন্য জায়গা আর পুরণ হবেনা ।

এখন সিনেমা টিভি চ্যানেলে,মোবাইলে।আর নগ্নতা,ধর্ষণ, মাদক ব্যবসা,অস্ত্রবাজি হচ্ছে সিনেমার মূল গল্প ।কাটতি বাড়ানোর সিনেমা, পর্ণ সংযোজন আজ স্বাভাবিক ঘটনা ।স্ক্যাণ্ডাল না হলে নায়ক কিংবা নায়িকার কারো বাজার ওঠেনা ।
সুস্থ বিনোদন, সমাজ চেতনার গল্পের বাজার নেই ।সুস্থ ছবি নির্মাণে প্রণোদনা নেই, ভর্তুকি নেই ।আর পর্ণগ্রাফিকে অনলাইনের নামধারী কিছু চ্যানেল ভাইরাসের সংক্রমণের মতো নতুন প্রজন্মকে গ্রাস করে চলেছে।পুঁজিবাদী সমাজ ভালো করেই জানে কীভাবে কোন বিষয় অনলাইনে জনগনকে খাওয়াতে হবে ।

Leave a Comment

Your email address will not be published.