মহাশূন্যে জুরান — সিদ্ধার্থ সিংহ – পর্ব – ১৪

মহাশূন্যে জুরান সিদ্ধার্থ সিংহ
— না। সব গ্রহে কী করে হবে? বহু গ্রহই আছে যেগুলো বয়সের ভারে বা অন্যান্য নানান কারণে এখন মৃত…
জুরান অবাক। মৃত? তার মানে যে গ্রহগুলোর কথা বলছ, সেগুলো আগে জীবিত ছিল?
— না। সেই গ্রহগুলো জীবিত ছিল না। জীবিত বলছি মানে, ওই গ্রহগুলো এক সময় জীবন ধারণের উপযোগী ছিল।
— তা হলে ওগুলো নষ্ট হল কী করে?
সময়-কণা বলল, বললাম না, নানান কারণে। যেমন ধরো তোমাদের পৃথিবী। এখন ওটা জীবন ধারণের পক্ষে উপযোগী দেখে তোমরা আছ। যখন ধীরে ধীরে সূর্যের তেজ কমে আসবে। হিমালয় আরও দ্রুত বেগে গলতে শুরু করবে, যখন বড় ধরনের কোনও প্রলয় ঘটবে, প্রতিষেধক আবিষ্কারের আগেই মুহুর্মুহু একের পর এক কঠিন রোগ আছড়ে পড়বে, তখন ওই পৃথিবীও আর বাসযোগ্য থাকবে না। দেখতে দেখতে মৃত গ্রহে পরিণত হবে।
— আমরা তখন কোথায় যাব?
— তত দিনে যদি তেমন কোনও ব্যবস্থা করতে পারো, তা হলে আশপাশের কোনও গ্রহে গিয়ে ঠাঁই নেবে। আর তা না হলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
জুরান বিস্মিত হয়ে বলল, এত বড় একটা কথা তুমি এত অবলীলায় নির্বিকার ভাবে বলতে পারলে?
— ছোট কথা না-বড় কথা, সে সব ভেবে তো আমি কিছু বলি না। যা সত্যি তা-ই বলি। তবে হ্যাঁ, শুধু মানুষ নয়, পৃথিবীতে যত প্রাণী আছে, তোমাদের ওই গ্রহে টিকে থাকার জন্য তাদের কিন্তু জন্মাবার সঙ্গে সঙ্গেই যথেষ্ট পরিমাণে সরঞ্জাম দিয়ে দেওয়া হয়েছে।
— সরঞ্জাম?
— হ্যাঁ, সরঞ্জাম। শুধু একটা করেই নয়, যেগুলো অত্যন্ত জরুরি, একটা দিলে, সেটা খোয়াবার সঙ্গে সঙ্গেই যাতে তারা বিপাকে না পড়ে, যাতে একদম কাবু হয়ে না যায়, যাতে লড়াই করে টিকে থাকাটা মুশকিল হয়ে না-দাঁড়ায়, সে জন্য সেই সব জিনিস একটা নয়, একসঙ্গে দুটো করে, কাউকে কাউকে তো চারটে, ছ’টা, এমনকী আটটা করেও দেওয়া হয়েছে।
— কী? কী দুটো, চারটে, ছ’টা, আটটা করে দেওয়া হয়েছে?

সময়-কণা বলল, কেন? পা। এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় যাওয়ার জন্য মানুষকে যেমন দুটো করে পা দেওয়া হয়েছে, আরশোলাকে দেওয়া হয়েছে ছ’টা করে, আবার দ্যাখো, মাকড়সারকে পা দেওয়া হয়েছে আটটা করে। একটা ফুটো অকেজো হয়ে গেলে নিশ্বাস নিতে অসুবিধে হতে পারে দেখে, মানুষের নাকে দু’-দু’খানা ফুটো করে দেওয়া হয়েছে। একটা চোখ নষ্ট হয়ে গেলে কারও সামনে যাতে গোটা দুনিয়াটাই অন্ধকার হয়ে না-যায়, সে জন্য মানুষকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে দুটো করে চোখ। এমনকী, কিডনিও দেওয়া হয়েছে দুটো করে।
জুরান বলল, কিন্তু সবাই তো আর দুটো করে নিয়ে জন্মায় না। কারও কারও দুটো পা-ই থাকে না। কেউ কেউ জন্মের সময়ই খুইয়ে আসে দুটো চোখ। কেউ কেউ তো আবার এমন হতভাগ্য যে, নিজের সমস্যার কথা জানানোর মতো বুলি নিয়েও জন্মায় না। যারা বোবা, তাদের ক্ষেত্রে কী বলবেন? লড়াই করে টিকে থাকার জন্য তারা যথেষ্ট সরঞ্জাম পেয়েছে?
— সে ক্ষেত্রেও বলব, পেয়েছে। যার একটা পা নেই, সে যাতে লাঠি নিয়ে চলতে পারে, সে ক্ষমতা জন্ম থেকেই তাকে দিয়ে দেওয়া হয়।
— কিন্তু যার দুটো পা-ই নেই?
— তাকে এমন একটা মন দিয়ে দেওয়া হয় যে, দু’পা নিয়ে জন্মেও কেউ যেখানে সহজে যেতে পারে না, সেখানে ওরা অনায়াসেই মনে মনে পৌঁছে যেতে পারে।
— যাদের দুটো চোখ নেই?
সময়-কণা বলল, তাদের ভিতরের দৃষ্টি এত প্রখর করে দেওয়া হয় যে, মানুষ যা দু’চোখ দিয়েও দেখতে পায় না, ওরা সেটা বদ্ধঘরে বসেও খুব সহজেই দেখতে পায়।

— আর যারা কথা বলতে পারে না, বোবা?
— তাদের শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রতিটি রন্ধ এত সুন্দর করে তাদের মনের প্রত্যেকটা কথা, যাকে বলতে চায়, তার কাছে এমন ভাবে পৌঁছে দেয় যে, যে শোনে, তাকে একবারও বলতে হয় না, ‘অ্যাঁ?’
— কিন্তু অন্যের কথা তো সে শুনতে পায় না…
— হ্যাঁ, বোবারা অন্যের কথা শুনতে পায় না ঠিকই, কারণ, বোবাদের কান সাধারণত অকেজোই হয়। কিন্তু তাতে তাদের কোনও অসুবিধে হয় না। কান কাজ না-করলেও, ওদের শরীরের সব ক’টা রোমকূপ তুখোড় ভাবে কাজ করে।
আসলে জন্মগত ভাবে কারও কোনও অঙ্গ অকর্মণ্য হলে খুব স্বাভাবিক ভাবেই অন্য অঙ্গগুলি এত প্রবল হয়ে ওঠে যে, সেই অঙ্গের খামতিটা বাকি অঙ্গগুলো ঠিকই পুষিয়ে দেয়। ফলে আপাত দৃষ্টিতে সমস্যা মনে হলেও, আসলে কারওরই সে রকম কোনও সমস্যা হয় না।
জুরান বলল, সে নয় ঠিক আছে। কিন্তু যেখানে তারা থাকবে, সেই গ্রহটাই যদি বাসের অযোগ্য হয়ে যায়, একটা মৃত মাটির পিণ্ডে পরিণত হয়, তখন?
— তার অনেক আগেই একের পর এক কোনও না কোনও বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটিয়ে ওখানকার প্রাণীদের ঠিক তুলে নেওয়া হবে।
— তুলে নেওয়া হবে মানে? কোথায় নেওয়া হবে?
— এর উত্তর আমি দিতে পারব না।
— তা হলে কে দেবে?
সময়-কণা বলল, অন্য আর এক সময়-কণা।
— তত দিনে যদি সেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ সামাল দেওয়ার মতো কোনও কিছু আবিষ্কার করে ফেলে আমাদের গ্রহবাসীরা?
— তা হলে তার খেসারত স্বরূপ সেই প্রাকৃতিক দুর্যোগের থেকেও আরও আরও আরও অনেক বড় ধরনের কোনও সমস্যার মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত হতে হবে তাদের।
— কেন?
— কারণ, প্রকৃতির বিরুদ্ধে কিচ্ছু করা যাবে না। তার বিরুদ্ধে কিছু করতে যাওয়া মানেই নিজের পতন আরও দ্রুত ডেকে আনা।
জুরান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, কেন?
— কারণ, কোর্টের জজ দেখেছ? মানে বিচারক?
— হ্যাঁ।
— আমরা, এই সময়-কণারা হচ্ছি সেই সর্বোচ্চ বিচারক। আমরা শুধু রায় দিই। আর সেই রায় কার্যকর করে প্রকৃতি। ফলে…

— তাই?
— তা না হলে আর বলছি কী? তোমাকে একটু বুঝিয়ে বলি। যেমন ধরো, একটু বৃষ্টি কিংবা রোদ। এগুলো যখন যে ভাবে আসবে, মানুষের তো সেটা সে ভাবেই গায়ে মাখা উচিত, না কী? কিন্তু মানুষ কী করল? তারা চড়া রোদের সময় গাছের ছায়ায় গিয়ে লুকোতে লাগল। ঝড়বৃষ্টির সময় পাহাড়ের গুহায় ঢুকে গা বাঁচাতে লাগল।
প্রকৃতি থেকে নিজেদের আলাদা করে নিল বলেই তো এখন একটু বৃষ্টিতে ভিজলেই মানুষের ঠান্ডা লাগে। সর্দি-কাশি হয়। জ্বর হয়। সামান্য একটু রোদে থাকলেই তাদের চাঁদি ফেটে যায়। শরীর অস্থির-অস্থির করে। গা থেকে দরদর করে অনবরত ঘাম বেরিয়ে শরীরটাকে কাবু করে দেয়।— কিন্তু ঝড়বৃষ্টিতে ভিজলে তো জামা-কাপড় ভিজে যাবে। 

সময়-কণা একটু মুচকি হেসে বলল, কে তোমাদের জামা-কাপড় পরতে বলেছে? শুনতে যতই অদ্ভুত লাগুক না কেন, জেনে রাখো, জামা-কাপড় পরো দেখেই তোমরা ধীরে ধীরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম একটু একটু করে ক্রমশ খাটো থেকে আরও খাটো হয়ে যাচ্ছ।— জামা-কাপড় পরি দেখে? 

— হ্যাঁ। যত পাতলাই হোক, যত হালকাই হোক, পোশাক পরা মানেই তো শরীরটাকে বন্দি করে রাখা। আবদ্ধ করে রাখা। তার বাড়ার স্বাভাবিক গতিকে আটতে দেওয়া। তাই নয় কী? যেমন ধরো, বড় জাতের কোনও গাছ, যেমন বট কিংবা অশ্বত্থ— ও রকম কোনও চারাকেও যদি ছোট্ট একটা টবের মধ্যে বসিয়ে রাখো, দেখবে, সে তার বাবা-মা-দাদু-দিদার মতো তরতর করে আর বাড়তে পারবে না। কয়েক বিঘত বেড়েই তার বাড়ার গতি একেবারে শ্লথ হয়ে যাবে।
জুরানের মনে পড়ে গেল, সে একবার তার বাবার সঙ্গে পার্কে গিয়ে পুষ্প প্রদর্শনী দেখেছিল। সেখানে সে এই রকমই এক ধরনের বামন গাছ দেখেছিল। তাকে কী যেন বলে! কী যেন বলে! হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে। মনে পড়েছে। বনসাই। সে বলল, বনসাই?
সময়-কণা বলল, হ্যাঁ, ঠিক তাই। অনন্তকাল ধরে বংশ পরম্পরায় পোশাক পরে পরে মানুষ ঠিক ওই রকম ভাবেই একটু একটু করে বনসাইয়ের মতো ছোট হয়ে যাচ্ছে।
— আগে কি মানুষ অনেক বড় হত?
— সেটা জানার জন্য খুব বেশি আগে যেতে হবে না। দেড়শো-দু’শো বছর আগে গিয়েই দেখো না…
— কী করে যাব?— আরে, ধুর বোকা। দূরে কোথাও যেতে হবে না। তোমাদের গ্রহে তো পুরনো পোশাক, আসবাবপত্র, আগেকার বিখ্যাত রাজরাজাদের ব্যবহার করা জিনিস সংরক্ষণ করে রাখা হয়। হয় না? 

— হ্যাঁ, হয় তো…— তা হলে? তেমন কোনও মিউজিয়ামে গিয়ে দেখো, তাঁদের পোশাকগুলো কত বড় বড় ছিল। কোমরে ঝুলিয়ে রাখা যে তলোয়ার যুদ্ধের সময় ওঁরা বনবন করে ঘোরাতেন, তার একটা এখনকার সব চেয়ে লম্বা মানুষের পাশে রাখলেও, তাঁর মাথা ছাড়িয়ে যাবে। যে বর্ম বুকে পরে তাঁরা লড়তেন, তার একটার মধ্যে এখনকার তিন জন লোক অনায়াসে ঢুকে যাবেন। যে খাটে তাঁরা ঘুমোতেন, সেটা যেন খাট নয়, প্রশস্ত কোনও মঞ্চের পাটাতন। এখনকার কেউ সে খাটে শুলে তাকে একেবারে লিলিপুট বলে মনে হবে। ফলে বুঝতেই পারছ, মাত্র দু’-তিনশো বছরেই মানুষ কত ছোট হয়ে গেছে। 

— এটা কি মানুষ বুঝতে পারছে না?
— না। পারছে না। পারলে মানুষ কখনও জুতো পায়ে দিত না।জুরান অবাক। জুতো? জুতো না পরলে তো পায়ে ধুলো লাগবে। ময়লা লাগবে। অসুখ করবে। 

— যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তাঁকে কি তোমরা খুব বোকা মনে করো নাকি? ধুলো-ময়লা লাগলে যদি ক্ষতিই হত, তা হলে মানুষের পা-দুটো জুতোর মতো শক্ত কোনও কিছু দিয়ে মুড়ে অথবা গরু-ঘোড়ার মতো ক্ষুর-জাতীয় কিছু একটা লাগিয়ে, তবেই পৃথিবীতে পাঠাতেন। বুঝেছ? তা কি তিনি করেছেন?— না। 

সময়-কণা বেশ জোর দিয়েই বলল, তা হলে? জেনো রাখো, মানুষ জুতো পরছে দেখেই কিন্তু মানুষের সঙ্গে মাটির আর কোনও সরাসরি সম্পর্ক থাকছে না। সামান্য হলেও দূরত্ব তৈরি হয়েছে। যদি এই দূরত্ব তৈরি না-হত, মানুষ যদি খালি পায়েই মাটিতে হেঁটে বেড়াত, তা হলে মাটির রস পায়ের পাতা দিয়ে শরীরে ঢুকে মানুষের রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা আরও অনেক বাড়িয়ে দিত। কথায় কথায় মানুষকে আর অত ভুগতে হত না। মুঠো মুঠো ওষুধও খেতে হত না।
— আমার মা তো মাঝে মাঝেই ঘুমের ওষুধ খায়।সময়-কণা বলল, সে তো খাবেই। খেতেই হবে। মাটির সঙ্গে সম্পর্ক না-রাখলে শুধু ঘুম কেন? বেশি দিন জেগে থাকাও যাবে না। 

— মানে?
— মানে, মাটির সঙ্গে সম্পর্ক না-রাখলে মাটিও তোমার সঙ্গে আর কোনও সম্পর্ক রাখবে না। তোমাকে খুব তাড়াতাড়ি পর করে দেবে। তার কাছ থেকে অনেক অনেক অনেক দূরে পাঠিয়ে দেবে।
ভয় পেয়ে গেল জুরান। তাই?
— হ্যাঁ, তাই।— তা হলে তো মাকে গিয়ে এটা বলতে হবে। 

— শুধু মাকে নয়, বাবাকে নয়, বন্ধুবান্ধবকেই নয়, সবাইকে। সবাইকে বলতে হবে এই কথা। তারা যদি তোমার কথা শোনে তো ভাল। না হলে…
— না হলে?
সময়-কণা বলল, সামনে সমূহ বিপদ। কেউ তোমাদের বাঁচাতে পারবে না, কেউ না। অন্যান্য আরও অনেক গ্রহের মতো তোমাদের পৃথিবীটাও অচিরেই একটা মরা গ্রহে পরিণত হবে। হবেই। তোমরা কি সেটা চাও?
কথাটা শুনে ভয়াবহ এক আতঙ্কে জুরানের শরীরের রোমগুলো কাঁটা দিয়ে উঠল।

বারো 

তিতার সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে উপরে উঠে গেলেন। দেখলেন, তাঁদের ফ্ল্যাটের দরজা হাট করে খোলা। বুঝতে পারলেন, ছেলের খোঁজ নেওয়ার জন্য উনি যখন হুড়মুড় করে নীচে নামছিলেন, তখন তাঁর পিছু পিছু তাঁর বউও নীচে নেমে এসেছিলেন। তার মানে, তাঁর বউ তখন ছেলের জন্য এতটাই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন যে, বেরোবার সময় দরজাটা যে টেনে দিতে হয়, সেটাও ভুলে গিয়েছিলেন। অবশ্য এখানে দরজা খোলা রেখে গেলেও কোনও ভয় নেই। কারণ, এ বাড়িতে হুটহাট করে কেউ ঢোকেন না। এমনকী, সেল্‌সগার্ল-বয়রাও না। মেন গেটের সামনে নোটিশ টাঙিয়ে দেওয়া আছে। তার পরেও যদি কেউ ঢোকেন, তার জন্য তো সব সময় কেয়ারটেকার ছেলেটা নীচেই বসে থাকে। আর এ বাড়ির কেউই নক না-করে সচরাচর কারও ফ্ল্যাটে ঢোকেন না। সুতরাং ভাবনার কিছু নেই।

উনিও কিছু ভাবলেন না। হাট করে খোলা দরজা দিয়ে সোজা ঢুকে পড়লেন ভিতরে। আর চৌকাঠ ডিঙোতে না-ডিঙোতেই তিতারের নাকে ভেসে এল কেমন একটা গন্ধ। গন্ধটা তাঁর খুব চেনা। যেন জন্ম-জন্মান্তর ধরে চেনেন। কিন্তু এটা যে কীসের গন্ধ সেটা ঠিক বুঝতে পারলেন না। তাঁর মনে হল, এটা ছাতিম ফুলের গন্ধ! তার পরেই মনে হল, না না, এটা বকুল ফুলের গন্ধ! আবার পরমুহূর্তেই মনে হল, এটা আসলে অনেক দিন বন্ধ হয়ে পড়ে থাকা টিনের মুখ খুলতেই বেরিয়ে আসা খেজুর গুড়ের গন্ধ! তাই কী! নাকি ভরদুপুরে দমকা হওয়ার সঙ্গে হঠাত্‌ হঠাত্‌ ভেসে আসা ছোটবেলার সেই মন কেমন করা গন্ধ!

তিতার ঠিক বুঝতে পারলেন না। তাই চোখ বন্ধ করে এই গন্ধটা তিনি কোথায় পেয়েছিলেন, সেটা মনে করার চেষ্টা করতে লাগলেন। হঠাৎ তাঁর মনে পড়ে গেল, তাঁদের গ্রামে একবার খুব মারাত্মক বর্ষা হয়েছিল। নদী উপচে জল ঢুকে পড়েছিল গ্রামে। ডুবিয়ে একাকার করে দিয়েছিল খাল-বিল-পুকুর। মাঠ-ঘাট, চাষের জমি। এমনকী রাস্তা-ঘাট, এ বাড়ি ও বাড়ির দাওয়াও।

সে জল কিছুতেই নামছিল না। তখন গ্রামের লোকেরা যে-যার বাড়ির সামনে দিয়ে নালা কেটে কেটে সেই জল বার করে দেওয়ার পথ করে দিয়েছিলেন। সেই পথটাকে জুড়ে দিয়েছিলেন, তার চেয়েও চওড়া করে কাটা মেঠো রাস্তার বড় নালায়। আর সেই নালায় চার দিক থেকে আসা বৃষ্টির উপচে পড়া প্রবল জলের তোড় যাতে সহজে বেরিয়ে যেতে পারে, সে জন্য গ্রামের ধার ঘেঁষে সবাই মিলে কেটেছিলেন আধ-মানুষ গভীর চার-পাঁচ হাত চওড়া নৌকোর খোলের মতো একটা নালা।

অমন প্রবল বর্ষা নাকি গত পাঁচ দশকের মধ্যে সেই একবারই হয়েছিল। কিন্তু আবার যদি কোনও দিন এ রকম বীভৎস্য বৃষ্টি হয়, তাই জল নেমে যাওয়ার পরেও সেই নালাগুলি কেউ আর বোজাননি। সেই নালা দিয়ে বর্ষাকালে যখন জলের ধারা বয়ে যেত, কচিকাঁচা ছেলেরা সেখানে হুটোপুটি করে স্নান করত। গামছা দিয়ে কুঁচোমাছ ধরত। কেউ কেউ আবার জালও ফেলত। সন্ধ্যার পরে পেতে রাখত আঁটু। সারা রাত ধরে পড়া মাছ, পর দিন খুব সকালে এসে নিয়ে যেত।

কিন্তু বর্ষাকাল চলে গেলেই সেই নালা শুকিয়ে যেত। তখন সেই নালার কোল জুড়ে সোনালি রঙের এক অদ্ভুত ধরনের ছোট ছোট লতানো গাছ হত। তাতে খুব ছোট্ট ছোট্ট জংলা ফুল ফুটত। বনকুলের চেয়েও ছোট ছোট এক রকমের ফল হত। কিন্তু সন্ধ্যা হওয়ার আগেই দেখা যেত, সেই সাদা-সাপটা ফ্যাকাশে ফুলগুলি ময়ূরের পেখমের রং মেখে কচুরিপানার ফুলের মতো ক্রমশ রঙিন থেকে আরও রঙিন হয়ে উঠছে। দিনের আলো যত কমত, ওই ফুলগুলি থেকে যেন ততই আলো ঠিকড়ে ঠিকড়ে বেরোত। ইশারা করে পথচলতি লোকজনকে ডাকত। আর দিনের বেলায় যে ফলগুলি মুখে দিলেই কাঁচা-তিতকুটে-কষ্টি লাগত, সেই ফলগুলিও তখন তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একটু একটু করে সুগন্ধী আর সুস্বাদু হয়ে উঠত। এটা বোধহয় সেই গন্ধ!

তখনও গ্রামে বিদ্যুৎ আসেনি। রাত্রিবেলায় ওই নালার দিকে তাকালে মনে হত, সেই নালায় বুঝি আকাশ থেকে নেমে এসেছে লক্ষ লক্ষ তারা। খুশিতে ডগমগ করছে। খুনসুটি করতে করতে এ ওর গায়ে ঢলে ঢলে পড়ছে। তাদের খুশিতে চারিদিক ঝিকমিক করত। সেই আলো নালার দু’দিকের রাস্তাকেও আলোকিত করে দিত। অথচ সকালের আলো ফুটতে না-ফুটতেই সব ভো ভা। আবার সব আগের মতো। ফুলগুলি হয়ে যেত ফ্যাকাশে আর মন-মরা। আর ফলগুলি হয়ে উঠত মুখে দেওয়া যায় না এমন তিতকুটে, কাঁচা-কষ্টি।

তাই দিনের বেলায় সেই ফলের দিকে কেউ ফিরে না তাকালেও, সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে সেই ফলের জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে যেত। শুধু তাঁদের গ্রামের লোকেরাই নয়, আশপাশের গ্রামের লোকেরাও টর্চ নিয়ে, হ্যারিকেন নিয়ে দলে দলে এসে বিকেল থেকে ওত পেতে বসে থাকতেন। শুধু তো ফল খাওয়া নয়, এমন বিরল আলোর দৃশ্য চাক্ষুষ করাটাও ছিল তাঁদের কাছে বড় ভাগ্যের ব্যাপার।

কিন্তু সন্ধ্যা নামার পর কেউই খুব বেশিক্ষণ ওখানে থাকতেন না। কারণ, ওই ফুলের অলৌকিক বাহার আর মন-মাতানো গন্ধই শুধু নয়, ওই ফলের অপূর্ব স্বাদ কেবল মানুষকেই নয়, মোহগ্রস্ত করে কাছে টানত পোকামাকড়, পিঁপড়ে, ঝিঁঝিপোকা থেকে শুরু করে বিষধর সাপ এবং নাম না-জানা নানান কীটপতঙ্গকেও।

ফলে যাঁরা আশপাশ বা দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকে আসতেন, তাঁরা কেউই কোনও ঝুঁকি নিতে চাইতেন না। ওই তল্লাটে নালার আশপাশের সব কিছু ফুলের আলোয় স্পষ্ট দেখা গেলেও, ওই নালার পাশ থেকে একটু সরলেই তো ঘুটঘুটে অন্ধকার। তখন সম্বল বলতে হঠাত্‌ হঠাত্‌ বিগড়ে যাওয়া টর্চের আলো, আর তা না হলে, চিমনির উপরে ঘনঘন আছড়ে পড়া দমকা বাতাসে দপ্‌ দপ্‌ করতে থাকা হ্যারিকেনের নিবু-নিবু আবছা আলো-আঁধার।

ওই নালায় এত ফল হত যে, যে-যতই নিক না কেন, কখনও ফুরোত না। তাই ওই সব লোকেরা চলে যাওয়ার পরেই স্থানীয় গ্রামবাসীরা ফল তুলতে যেতেন। কিন্তু সেই ফল বেশি করে এনে বাড়িতে রাখা যেত না। পর দিন খাবে বলে, প্রথম প্রথম অনেকেই গাদা গাদা করে তুলে আনতেন। কিন্তু সকাল হলেই দেখা যেত, ফল কোথায়! সর্ষের দানার মতো সেই ফলগুলোর শুধু গুঁড়ি গুঁড়ি দানা পড়ে আছে। তাই যাঁরা যেটুকু তুলতেন, সে রাতেই বাড়ির সবাই মিলে সেটুকু খেয়ে ফেলতেন।

অমাবস্যার ঘুটঘুটে রাতে আকাশের বুকে কোটি কোটি তারাকে জ্বলজ্বল করতে দেখেছেন তিতার। হ্যারিকেন নিভিয়ে দেওয়ার পর দেখেছেন, ঘর-বার জুড়ে শত শত জোনাকিকে উড়তে। কিন্তু ওই নালার লক্ষ লক্ষ বিন্দু বিন্দু রং-বেরঙের উজ্জ্বল ফুলগুলোকে দেখে তিনি আর চোখ ফেরাতে পারতেন না। মনে হত, তাঁকে যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। বলছে, আয়, কাছে আয়। কাছে আয়। 

ওদের সেই ডাক এমন অমোঘ যে, উনি নিজেকে আর ধরে রাখতে পারতেন না। বাবা-কাকারা শত ফল এনে দিলেও, নিজের হাতে একটা ফল তোলার জন্য যেন ছটফট করতেন।টর্চ নিতে গেলে যদি কেউ দেখে ফেলে! সন্দেহ করে! জানাজানি হয়ে যায়! তাই এক রাতে আর থাকতে না-পেরে টর্চ-ফর্চ না-নিয়েই ঘরের খিল খুলে চুপিচুপি উনি বেরিয়ে পড়েছিলেন। হাঁটা দিয়েছিলেন সেই আধ-মানুষ গভীর, চার-পাঁচ হাত চওড়া নালাটার দিকে। তখন কত রাত হবে কে জানে! উপরে ঝকমক করছে তারা। চার দিকে উড়ে বেড়াচ্ছে বারবার জ্বলতে-নিভতে থাকা হাজার হাজার জোনাকি। আর সেই নালায়? মনে হচ্ছে, সারা নালা জুড়ে লক্ষ লক্ষ টুনি লাইট জ্বলছে। তার কোনওটার রং লাল। কোনওটার নীল। আবার কোনওটার রং সবুজ। এমনকী, যে রং তিনি কখনও দেখেননি, জানেনই না ও-রকম রং আদৌ পৃথিবীতে আছে কি না, সেই রংও। এবং অবাক কাণ্ড, আলোগুলো এত উজ্জ্বল, অথচ কত মায়াবী। কত মনোরম। মনে হত, এগুলোর দিকে তাকিয়ে তাকিয়েই সারা জীবন কাটিয়ে দেওয়া যায়।

কতক্ষণ উনি মুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ওঁর মনে নেই। চোখই ফেরাতে পারছিলেন না। যখন দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পা ব্যথায় টনটন করছে, উনি তখন ধীরে ধীরে পা ফেলে অতি সন্তর্পণে নালাটার একদম ধারে গিয়ে আলতো করে বসে পড়লেন। তার পর একটু ঝুঁকে যে-ই একটা ফল তুলতে গেছেন, শুধু সেই ফলের ডালটাই নয়, আশপাশের সব ক’টা লতানো ডাল যেন মুহূর্তের মধ্যে তাঁর হাতটাকে সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলল।

ভয়ে চিত্‌কার করতে গিয়ে উনি দেখলেন, তাঁর গলা দিয়ে কোনও স্বর বেরোচ্ছে না। গায়ের সমস্ত শক্তিও যেন কোনও এক মন্ত্রবলে কেউ কেড়ে নিয়েছে। তবু উনি হাতটা ছাড়াবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলেন। আর ছাড়াবার জন্য উনি যত টানাটানি করতে লাগলেন, ডালপালাগুলো ততই যেন তরতর করে বেড়ে তাঁর হাত, গলা, মুখ, বুক, পেট, কোমর, হাঁটু, এমনকী, পায়ের পাতাকেও ছেঁকে ধরল। দম বন্ধ হয়ে আসার জোগাড় হল তাঁর। তার মধ্যেই উনি টের পেলেন, ওই নালার মধ্যে দিয়ে তাঁকে কেউ হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

ধপ্‌ করে আছাড় খেয়ে পড়তেই পেঁচিয়ে থাকা ডালপালাগুলো তাঁকে ছেড়ে নিজেরাই গুটিয়ে সুড়সুড় করে ছোট হতে হতে একেবারে ছোট্ট এক-একটা চারাগাছ হয়ে গেল। তার পর দূরে সরে গিয়ে চুপটি করে দাঁড়িয়ে রইল। যেন কারও নির্দেশেই তারা এই কাজ করেছে। আর সেই নির্দেশ যিনি দিয়েছেন, সেই কর্তা যেন তাদের সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। তাই তাকে কুর্নিশ করে বলছে, এই যে, একে নিয়ে এসেছি হুজুর। এ বার যা করার, আপনি করুন।

কিন্তু কাকে বলছে এরা! কাকে? সামনে তাকাতেই তিতার দেখেছিলেন, লতানো নয়, ক’হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে একটা মাঝারি মাপের শক্তপোক্ত, সুঠাম গাছ। নীচের দিকে ছড়িয়ে রয়েছে অজস্র শিকড়-বাকড়। সেগুলো কেঁচোর মতো শুধু কিলবিল কিলবিল করছে। তার উপরে খানিকটা কাণ্ড মতো।
গাছেদের যেমন হয়। সেই কাণ্ডের উপর দিকের দুটো ডাল তেড়ছা ভাবে দু’দিকে উঠে গেছে। যেন চৈতন্যদেব দু’হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছেন। আর একদম উপরে কাণ্ডটা যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে সাঁইবাবার ঝাঁকড়া চুলের মতো এক মাথা ছোট ছোট অজস্র পাতা। পাতাগুলি থেকে বিন্দু বিন্দু আলোর রশ্মি তীক্ষ্ণ বেগে তার গায়ে আছড়ে পড়ছে।

এ রকম কোনও গাছ উনি জীবনে কখনও দেখেননি। তাই তিনি হতবাক হয়ে গাছটাকে দেখতে লাগলেন। বুঝতে পারলেন, গাছটার কোনও শিকড়ই মাটি ভেদ করে নীচে ঢোকেনি। ঢুকলে গাছটা তাঁর দিকে এ ভাবে গুটি গুটি করে এগিয়ে আসতে পারত না। গাছটাকে এগিয়ে আসতে দেখেই তিনি ভয়ে সিঁটিয়ে গেলেন।

এর আগে ছোটবেলায় তিনি তাঁর স্কুলের পাঠ্যবইতে পড়েছেন, পৃথিবীতে অনেক রকমের গাছ আছে। আছে কলস উদ্ভিদ। যারা দেখতে খানিকটা কলসির মতো। ঢাকনা খুলে অপেক্ষা করে। ওখান থেকে বেরোনো সুগন্ধের টানে যে-ই কোনও পোকামাকড় বা মাছি-টাছি এসে তার মধ্যে ঢোকে, অমনি ঝপ করে ঢাকনাটা বন্ধ করে দেয়। তার পর তার রক্ত-মাংস খেয়ে শুধু ছিবড়েগুলো বাইরে ফেলে দেয়।

আছে রাক্ষুসি গাছ। যারা তাদের ডালপালা মাটিতে বিছিয়ে রেখে নির্বিকার ভাবে বসে থাকে। কখন কোন শিকার পড়ে, তার জন্য। যে-ই কেউ সেটা ডিঙিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়, সঙ্গে সঙ্গে ডালপালা দিয়ে তাকে নিমেষের মধ্যে জাপটে ধরে। যতক্ষণ না সে শেষ হয়ে যাচ্ছে, ততক্ষণ তাকে ছাড়ে না।
চলবে   ………..
ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: