মহাশূন্যে জুরান — সিদ্ধার্থ সিংহ – পর্ব – ১৩

মহাশূন্যে জুরান সিদ্ধার্থ সিংহ
— তা তো জানি না মানে? কী আজেবাজে কথা বলছ। আমার মাথা খারাপ করে দিয়ো না তো… যা হোক একটা কিছু করো।
— কী করব?

ইমলি বললেন, কী করা উচিত, নিজে বুঝতে না-পারলে অন্য কারও সঙ্গে কথা বলো। আলোচনা করো। নিশ্চয়ই একটা পথ বেরোবে। আমি তো আমার ছেলেকে এ ভাবে হারিয়ে যেতে দিতে পারি না। বলতে বলতে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন তিনি।

— কিন্তু কার সঙ্গে আলোচনা করব!

কান্না মেশানো গলাতেই ইমলি বললেন, সেটাও কি আমাকে বলে দিতে হবে? সত্যি, তোমাকে দিয়ে না কিস্যু হবে না। ধ্যাত্‌, তোমার দ্বারায় যখন হবে না, দেখি, আমি কী করতে পারি। বলেই, বড় বড় পা ফেলে হাঁটা দিলেন তিনি।

পিছন থেকে ‘শোনো, শোনো, কী হলো? কোথায় যাচ্ছে? শুনবে তো…’ তিতার যতই ডাকতে লাগলেন, ইমলি যেন ততই পা চালাতে লাগলেন দ্রুত। নিমেষের মধ্যে গেট থেকে বেরিয়ে গেলেন। স্বামীর কথায় একবারের জন্যও কর্ণপাত করলেন না।

তিতারের পা দুটো কেমন যেন অবশ হয়ে গেল। আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। ধপাস করে কেয়ারটেকারের খাটিয়ার উপরে বসে পড়লেন তিনি। কার সঙ্গে আলোচনা করা যায়! কার সঙ্গে! তখনই তাঁর মনে হল, তিনি যা সন্দেহ করছেন, সেটা যদি সত্যিই হয়, তা হলে অন্য কেউ নয়, তাঁর এখন একজনের সঙ্গেই সবার আগে কথা বলা উচিত। আর তিনি হলেন— তিনি নিজেই।
দশ
 
কোনও দিকে ইমলির হুঁশ নেই। উদ্‌ভ্রান্তের মতো যেতে যেতে এ দিকে ও দিকে তাকাচ্ছেন আর বড় বড় পা ফেলে হাঁটছেন। ছেলেটা তো এ ভাবে কোনও দিন কোথাও যায়নি। হঠাত্‌ ওর কী হল! কাউকে কিছু না বলে! তার উপরে ওর বাবা যে কী বলেন! কোনও মাথা-মুণ্ডু নেই। এদের সঙ্গে থাকলে আমি পাগল হয়ে যাব। একবার ওকে পাই, তার পর দেখাচ্ছি মজা। কিন্তু ছেলেটা যে কোথায় গেল! রাস্তার মধ্যে যাঁদের দেখতে পাচ্ছেন, তাঁরা হয় প্রাতর্ভ্রমণে বেরিয়েছেন নয়তো সকালের শিফ্‌টে যোগ দেওয়ার জন্য কল-কারখানার দিকে যাচ্ছেন। তাঁদের বেশির ভাগই বয়স্ক মানুষ। এঁদের আবার কারও ছেলে হারায়নি তো! বলা যায় না, তাঁর মতো এঁরাও হয়তো কেউ ছেলে খুঁজতে বেরিয়েছেন! আবার এমনও হতে পারে, যে বাবা-মায়েরা বাচ্চাদের খোঁজ করতে বেরিয়েছেন, হয়তো দেখা যাবে, তাঁদের সেই বাচ্চারা সবাই মিলে একসঙ্গে দল বেঁধে কোথাও গেছে। কিন্তু কোথায়! কোথায় যেতে পারে ও! কোথায়!

হঠাত্‌ তাঁর মনে পড়ে গেল, সামনেই একটা লেডিস পার্ক আছে। নামে মহিলাদের জন্য হলেও আসলে ওটা ফ্যামিলি পার্ক। বাচ্চারা তো বটেই, সঙ্গে কোনও মহিলা না থাকলে, শুধুমাত্র একটা বাচ্চা সঙ্গে থাকলেই বাচ্চাদের বাবা-কাকা-মামারাও অনায়াসে ঢুকে পড়তে পারেন। কেউ কোনও আপত্তি করেন না।

অন্য সাত জনের সঙ্গে ওঁরা যখন কো-অপারেটিভ ফ্ল্যাট করে এখানে উঠে এলেন, তার দু’দিন পরেই এই পার্কটির সন্ধান পেয়েছিলেন জুরানের বাবা। ছেলে-বউকে নিয়ে একদিন বিকেলে এসেওছিলেন। ঢোকামাত্র চোখ জুড়িয়ে গিয়েছিল তিন জনেরই। কী সুন্দর করে সাজানো। ছোট ছোট ঘাস সমান করে ছাঁটা। মনে হয় কেউ যেন সবুজ গালিচা বিছিয়ে রেখেছে। দেখলেই বোঝা যায়, এ দিকে সে দিকে জাল দিয়ে ঘেরা লোহার খাঁচার ভিতরে লতানো ঝাঁকড়া গাছ বেড়ে উঠলেই, তার বাড়তি ডালপালাগুলো একেবারে নিয়ম করে এমন ভাবে ছেঁটে দেওয়া হয়, যাতে কোনওটাকে মনে হয় হাতি যেতে যেতে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে শুঁড় দোলাচ্ছে। কোনওটাকে মনে হয় হরিণছানা, আবার কোনওটাকে মনে হয় প্রাগৈতিহাসিক যুগের ডাইনোসর।

কোথাও চোখ-ধাঁধানো সার সার জিনিয়া ফুল ফুটে আছে, তো কোথাও ডানা মেলা রং-বেরঙের প্রজাপতির মতো দেখতে থোকা থোকা ফুল। কোথাও আবার অন্যত্র পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য রেডি করে রাখা আছে ছোট ছোট দোপাটি ফুলের চারা-সমেত শত শত টব। তার মধ্যে কয়েকটা আবার বিশেষ ভাবে তৈরি করা হয়েছে চার-ছ’আঙুল মাপের ছোট ছোট ফুল-ধরা টগর গাছের চারা। গোটা পার্ক জুড়ে এখানে সেখানে কত রকমের পাতাবাহারি গাছ।

এ দিকে স্লিপ তো ও দিকে ঢেকুচকুচ। সে দিকে সিমেন্ট দিয়ে বানানো কচ্ছপের পিঠের মতো একটা ঢিপি। তার মাঝখান থেকে নেমে গেছে সরু সিঁড়ি। সেটা দিয়ে নামলে কোথায় গিয়ে যে বেরোবে, তার কোনও ঠিক-ঠিকানা নেই। কারণ, ওটা থেকে অনেকগুলো ছোট-বড় সুড়ঙ্গ-পথ ছড়িয়ে গেছে এ দিকে সে দিকে। তার খানিকটা দূরেই পর পর তিনটে দোলনা। যত ভিড় যেন ওখানেই। বাচ্চারা লাইন দিয়ে থাকে। দোলনা চড়ার জন্য বাচ্চাদের যত না উত্‌সাহ, বাচ্চাদের চড়ানোর জন্য তাদের বাবা-মায়েদের আগ্রহ যেন তার চতুর্গুণ।

আগে ওঁরা যেখানে থাকতেন, জুরানের দাদুর বাড়ির ওখানে এ রকম কোনও পার্ক ছিল না। জুরান তাই অবাক হয়ে গিয়েছিল। সে যে কোনও দিন দোলনা চড়েনি, তা নয়। তাদের বাড়ির পাশেই একটা প্রকাণ্ড বটগাছ ছিল। তার থেকে পাশাপাশি নেমে আসা মাটি ছুঁই ছুঁই ঝুড়ি বেঁধে তাতে বসে ওরা কত দোল খেয়েছে। কিংবা গরমের ছুটিতে ভরদুপুরে আমবাগানে গিয়ে বড় কোনও গাছের শক্ত ডালের দু’দিকে দড়ি বেঁধে বন্ধুরা সব দল বেঁধে দোল খেয়েছে। কিন্তু এ রকম লোহার চেনে ঝোলানো কাঠের পিঁড়ির উপরে বসে কখনও দোল খায়নি সে। তাই ওতে চড়ার জন্য ভীষণ বায়না ধরেছিল।

সে দিন আট-ন’জনের পিছনে লাইনও দিয়েছিল। কিন্তু এক-একটা বাচ্চা এতক্ষণ ধরে দোল খাচ্ছিল যে, দেখতে দেখতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছিল। অথচ যে চড়ছে, সে চড়ছে তো চড়ছেই। লাইনে যে আরও অনেকে দাঁড়িয়ে আছে, সে দিকে ভ্রূক্ষেপই নেই। যারা লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল, তাদের থেকেও তাদের বাবা-মায়েরা বারবার করে তাড়া লাগালেও ছেলেকে দোলনা থেকে নামিয়ে নেওয়ার কোনও নামই করছিলেন না ওই দোলনায় চড়া বাচ্চাগুলির অভিভাবকেরা। উল্টে বাচ্চাকে পিছন থেকে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে তাঁরা দোল দিয়ে যাচ্ছিলেন।

না। সে দিন জুরান আর দোলনা চড়তে পারেনি। কারণ, যতই বাচ্চাদের বাবারা থাকুন, যতই পার্ক জুড়ে দু’হাত দূরে দূরে হ্যালোজেন লাইট লাগিয়ে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা থাকুক, যতই আশপাশে প্রচুর বাড়িঘর থাকুক, যেহেতু ওটার নাম ‘লেডিস পার্ক’, তাই নিরাপত্তার কারণে সন্ধ্যা ছ’টা বাজার পাঁচ-সাত মিনিট আগে থেকেই পার্কের রক্ষীরা বাঁশি বাজাতে শুরু করে দেন। এবং ছ’টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে গোটা পার্ক খালি করে দু’দিকের মূল ফটকে ইয়া বড় বড় তালা ঝুলিয়ে দেন।

এ দিকে স্লিপে চড়লেও, ঢেকুচকুচে উঠলেও, যেহেতু অতক্ষণ লাইন দিয়েও দোলনা চড়তে পারেনি, ছেলের মুখ একেবারে কালো হয়ে এতটুকু হয়ে গিয়েছিল। তাই তার মা বলেছিলেন, দুঃখ করিস না। ওই দ্যাখ, গেটের সামনে কী লেখা আছে, সকাল সাড়ে পাঁচটায় এটা খুলে যায়। অত সকালে নিশ্চয়ই কোনও বাচ্চা আসে না। এলেও, এত বাচ্চা তো নয়ই। তাই ভাবছি, তোর যখন ওই দোলনায় চড়ার এতই শখ, তখন, কাল খুব সকালে তোর বাবাকে দিয়ে তোকে এখানে পাঠিয়ে দেব। যতক্ষণ খুশি তুই চড়বি, কেমন? এ বার চল, বেলুন নিবি?

পার্কের গেটের বাইরেই ছিল বেলুনওয়ালা, ঝালমুড়িওয়ালা, হজমিওয়ালা, ফুচকাওয়ালা থেকে শুরু করে আইসক্রিমওয়ালাও। জুরান বলেছিল, না। বেলুন নেব না। আমি আইসক্রিম খাব। যেই না ওকে আইসক্রিম কিনে দেওয়া হয়েছে, অমনি মুখে দিয়েই সঙ্গে সঙ্গে বলে, আমি বেলুন নেব।
ছেলের কীর্তি দেখে মুখ টিপে হেসে ফেলেছিলেন বাবা-মা দুজনেই।

পর দিন সকালে পার্ক থেকে ফিরে এসে জুরান কী খুশি। পার্কে নাকি শুধু বুড়োবুড়িদেরই ভিড়। কোথাও হাত-পা ছুড়ে কেউ শরীরচর্চা করছেন। কোথাও আবার পুরো পার্ক ঘিরে পিচ-রাস্তার ধার ঘেঁষে ক’হাত পর পর বেঞ্চে বসে বুড়োদের দল কেবল গল্পই করে যাচ্ছেন। কেউ কেউ দ্রুত পা চালিয়ে শুধু একটার পর একটা চক্করই মেরে যাচ্ছেন গোটা পার্ক।

না। কোনও বাচ্চাই নাকি ছিল না। সারা রাত শিশির পড়ে পড়ে ভিজে চুপচুপে হয়ে ছিল স্লিপ। প্রথম বার স্লিপ খেয়ে নেমে আসতেই প্যান্টের পিছন দিকে চাপ চাপ দাগ লেগে গিয়েছিল। তাই বাবা বলেছিলেন, এ মা, তোর মা দেখলে দেবে। চল, আর স্লিপ খেতে হবে না। দোলনা চড়বি চল।

কিন্তু দোলনার দিকে যাবার আগেই, সামনেই ও পেয়ে গিয়েছিল সিমেন্ট দিয়ে বানানো কচ্ছপের পিঠের মতো সেই ঢিপিটা। তার মাঝখান থেকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে প্রতিবারই একেবারে নতুন এক-একটা সুড়ঙ্গের পথ দিয়ে বেরিয়ে আসার মজাই আলাদা। যত বারই ঢোকো না কেন, একবার এই মুখ দিয়ে তো একবার সেই মুখ দিয়ে বেরোনো। কোনওটা কাছে তো কোনওটা দূরে। যেন নতুন নতুন রাস্তা আবিষ্কার করা।

গত কাল ও এত বার ওটার মধ্যে ঢুকেছিল যে, রাত্রে শুয়ে শুয়ে ওর মনে হয়েছিল, তা হলে কি পৃথিবীটাও ওই রকম! এখনও কেউ খুঁজে পাননি বলে প্লেনে করে আগরতলায় যান। ট্রেনে করে দিল্লি-মুম্বই যান। লঞ্চে করে এ পার ও পার হন নদী। এমনও তো হতে পারে, তাদের এই ফ্ল্যাট-বাড়ির গা ঘেঁষেই এমন একটা চোরা-রাস্তা আছে, যেটা দিয়ে ক’পা এগোলেই একেবারে দাদুর বাড়ির দোরগোড়ায় পৌঁছে যাওয়া যাবে। কিংবা সোজা চলে যাওয়া যাবে গত বার গরমের ছুটিতে ওরা যেখানে ঘুরতে গিয়েছিল, সেই দার্জিলিংয়ে, অথবা হুট করে সবাই গিয়ে উঠবে পুরীর সেই সমুদ্রের পাড়ে!

হতেই পারে! তবে তার জন্য তাকে সেই শর্ট কাট পথটাকে আবিষ্কার করতে হবে। খুঁজে বার করতে হবে। সেটা খোঁজার জন্য মগজটাকে একটু ঝালিয়ে নেওয়া উচিত। আর সেটা করতে পারে একমাত্র কচ্ছপের পিঠের মতো এই অভিনব গোলকধাঁধা পথটাই।

ও তাই ওটায় ওঠার জন্য পা রাখতেই জুতোটা পিছলে গিয়েছিল। একবার, দু’বার, তিন বার। রাস্তা দিয়ে আসার সময় বুঝি শিশিরে ভিজে থাকার জন্য জুতোর তলায় পুরু করে মাটি লেগে গিয়েছিল। কচ্ছপের পিঠেও নিশ্চয়ই সারা রাত ধরে শিশির পড়ে ছিল, ফলে পিছলে পিছলে যাচ্ছিল। দু’-তিন বারেই কচ্ছপের পিঠটা কেমন যেন কাদা কাদা হয়ে গিয়েছিল। এর পর উঠতে গেলে, কিংবা একটু উঠলেই হয়তো ওই কাদার জন্যই পা পিছলে একদম নীচে পড়ে যাবে। তাই ওর বাবা বলেছিলেন, না রে, এটায় আর উঠিস না। দেখছিস না, কেমন পিছল হয়ে গেছে। জোর করে উঠতে গেলে নির্ঘাৎ একটা অঘটন ঘটবে। তার চেয়ে বরং চল, ও দিকে যাই। দোলনাটা একদম খালি পড়ে আছে।

ওর বাবা প্রথমে হাত দিয়ে দোলনার বসার জায়গাটা মুছে তার পর পকেট থেকে রুমাল বার করে দু’-তিন বার মুছতেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল পিঁড়িটা। জুরান তাতে উঠে বসতেই পিছন থেকে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে দোল দিচ্ছিলেন ওর বাবা।

জুরান খুব আনন্দ পেয়েছিল সে দিন। বলেছিল, রোজ সকালে যাবে। কিন্তু রোজ রোজ যাওয়া তো আর সম্ভব নয়। মাঝে মাঝে যেত। তবে হ্যাঁ, নানান কাজের চাপে ওর বাবা অবশ্য বেশ কিছু দিন ওকে ওই পার্কে নিয়ে যেতে পারেননি। তবে কি… ও আবার ওখানে যায়নি তো! ও যা ছেলে সব পারে। ও নিশ্চয়ই ওখানে গেছে!

ইমলি আরও জোরে জোরে পা চালিয়ে পার্কটার একেবারে সামনে এসে পড়লেন। না। গেটের মুখে কোনও বেলুনওয়ালা, ফুচকাওয়ালা, ঝালমুড়িওয়ালা কিংবা আইসক্রিমওয়ালাও নেই। বোঝা যাচ্ছে, গেট খুলে গেছে বহুক্ষণ আগেই। উনি ঢুকে পড়লেন ভিতরে।

উনি জানেন, তাঁর ছেলে কোথায় থাকতে পারে। তাই অন্য কোথাও উঁকিঝুঁকি না-মেরে উনি সোজা পা বাড়ালেন দোলনাগুলোর দিকে। দূর থেকেই দেখতে পেলেন একটা দোলনা খুব জোরে জোরে একবার ও দিকের শেষ প্রান্ত ছুঁয়ে এ দিকের শেষ প্রান্তে চলে আসছে। আবার এ দিকের শেষ প্রান্ত ছুঁয়ে ও দিকের শেষ প্রান্ত ছোঁয়ার জন্য উঠে যাচ্ছে। যে ভাবে উঠছে, এর পর আর একটু উঠলেই, যে পাইপটার সঙ্গে দোলনাটার চেন বাঁধা আছে, তার মাথার উপরে উঠে যাবে। আর একবার ওখানে উঠলেই, আর রক্ষে নেই। আছাড় খেয়ে দোলনাটা দুম করে পড়ে যাবে। আর পড়লেই কেলেঙ্কারি কাণ্ড! ছেলেটার কি সে দিকে কোনও হুঁশ নেই! আরে, কী হচ্ছে কী? স্পিড কমা। স্পিড কমা। পড়ে যাবি যে!

বলতে বলতে আরও একটু কাছে যেতেই বুঝতে পারলেন, উনি বললে কী হবে, তাঁর কথা বোধহয় ও শুনতেই পাচ্ছে না। দোলনা চড়ার আনন্দে ও এতটাই মশগুল হয়ে আছে যে, ওর মা যে ওর খোঁজ করতে করতে এখানে চলে এসেছে, সেটাও বুঝি ও দেখতে পায়নি। ও যেন দোলনার গতি আরও বাড়ানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। ইমলির চোখ তখন আর কোথাও নয়, তাঁর চোখ তখন, দোলনায় বসে একবার এ দিকে আর একবার ও দিক করতে থাকা তাঁর ছেলের দিকে।

দোলনাটা যেই নীচের দিকে নেমেছে, ইমলি অমনি দেখলেন, ও একা নয়, ওটায় দোল খাওয়ার জন্য এই সাতসকালেই লাইন দিয়ে পর পর দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য ছেলে। সেই লাইনটা এঁকেবেঁকে কোথায় গিয়ে যে শেষ হয়েছে কে জানে! এদের কি কারও কোনও স্কুল-টুল নেই! নাকি আজ কোনও ছুটির দিন! কী বার আজ! না। আজ তো রবিবার নয়। তবে! তার থেকেও বড় কথা এখানে এতগুলো বাচ্চা, অথচ একজন বাবা-মাও নেই! এটা কী করে হয়! এরা কি একা একা এসেছে! এরা কারা! সবাই তো মনে হয় জুরানেরই বয়সি!

মুখগুলি আরও ভাল করে দেখতে গিয়েই অবাক হয়ে গেলেন ইমলি। না। জুরানের মতো দেখতে নয়, যে ছেলেটা লাইনের প্রথমে দাঁড়িয়ে আছে, সে-ই জুরান। তার পরে যে দাঁড়িয়ে আছে, সেও জুরান। তার পরে যে সেও জুরান। এটা কী করে হয়!

খানিক আগে ঘুম থেকে উঠেছেন বলে ভুলভাল দেখছেন না তো! খুব ভাল করে চোখ কচলে আবারও তাকালেন তিনি। এ বার দেখলেন, না। শুধু লাইনের ওই তিন জনই নয়, ওই লাইনে যত জন দাঁড়িয়ে আছে, তারা প্রত্যেকেই জুরান। এমনকী, যে ছেলেটা দোলনায় বসে দোল খাচ্ছে, সেও জুরান।
ইমলি বুঝতে পারলেন না, কী ঘটছে! তাঁর মাথা বনবন করে ঘুরতে লাগল। চোখের সামনে চার দিক অন্ধকার হয়ে এল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি ধপ্‌ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।

এগারো 
 
জুরান যখন পৃথিবীর ওই ছোট্ট রেপ্লিকাটার এ দিকে, সে দিকে, উপরে, নীচে তাকাচ্ছিল আর ভাবছিল, এটা পৃথিবীর অবিকল একটা অণু সংস্করণ ঠিকই, কিন্তু সেটাকে পৃথিবীর মতো আরও হুবহু করে তোলার জন্য তার চারপাশ ঘিরে অন্তত বেশ কিছুটা জায়গা জুড়ে একটু আকাশ থাকলে ভাল হত। ক’টা তারা থাকলে ভাল হত। ছেঁড়া-ফাটা কিছু মেঘ আশপাশে ভেসে বেরালে ভাল হত। ঠিক তখনই স্তব্ধতা ভেঙে সময়-কণা বলল, কী খুঁজছ? মেঘ? তারা? আকাশ?

কথাটা শুনে চমকে উঠল জুরান। তার মনের কথা বন্ধুবান্ধব তো নয়ই, এমনকী তার বাবা-মাও অনেক ক্ষেত্রে বুঝতে পারেন না। কিন্তু এই সময়-কণা যে কী করে একেবারে নির্ভুল ভাবে তার মনের কথা ঠিক টের পেয়ে যায়, সে জানে না। তাই সে হালকা চালে উপর-নীচে মাথা দুলিয়ে বোঝাতে চাইল, হ্যাঁ।
সময়-কণা বলল, শোনো, আকাশ বলে কিচ্ছু হয় না। তোমরা যাকে আকাশ মনে করো, সেটা আসলে নীচ থেকে উপর পর্যন্ত পর পর অনেকগুলো বায়ুর স্তর। যেটাকে মেঘ ভাবো, সেটা আসলে সূর্যের তাপে পৃথিবীর নদী-নালা থেকে উবে যাওয়া বাষ্পপিণ্ড। আর যেগুলোকে বালি-কণার চেয়েও ছোট ছোট তারা ভাবো, সেগুলো এক-একটা হয়-পৃথিবীর মতো বড় কিংবা তার কাছাকাছি অথবা তার চেয়েও অনেক অনেক বড় গ্রহ।

— আচ্ছা, ওখানেও কি আমাদের মতো মানুষ আছে?

সময়-কণা বলল, মানুষ বলতে তোমরা যা বোঝো, তা নেই ঠিকই, কিন্তু মানুষ যার জন্য বহাল তবিয়তে মানুষ হিসেবে বিশ্বে বাস করে, সেই ‘প্রাণ’ নামক অমূল্য ধনটাকে নিয়ে বহু প্রাণীই কিন্তু ওই সব গ্রহ-তারায় শুধু বসবাসই করছে না, প্রতিনিয়ত তাদের বংশও বাড়িয়ে চলেছে।

— সব গ্রহেই?
চলবে   ………..
ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: