মহাশূন্যে জুরান — সিদ্ধার্থ সিংহ – পর্ব – ১১

মহাশূন্যে জুরান সিদ্ধার্থ সিংহ
তরুণকাকু বলেছিলেন, কেন হবে না? প্রত্যেক দিন কত লোক সমুদ্রে স্নান করে বল তো… তার ওয়ান পার্সেন্ট লোকও যদি হিসি করে, এই হাজার হাজার বছরে কত হিসি সমুদ্রে মিশেছে একবার ভেবে দ্যাখ তো…জুরানের পাশে পাশে হাঁটতে থাকা আর একটি ছেলে সঙ্গে সঙ্গে বলেছিল, ও… তার মানে, আগে এত জল ছিল না। অত পেচ্ছাপের জন্যই সমুদ্রের জল এত বেড়েছে…

তরুণকাকু বলেছিলেন, না না, তা নয়। হিসেব মতো তো বাড়ারই কথা। বাড়তও নিশ্চয়ই। কিন্তু যতটা বাড়ার কথা সেটা তো সূর্যের তাপে বাষ্প হয়ে উড়ে যায়।সে কথা শুনে অন্য আর একটি ছেলে বলেছিল, বাষ্প হয়ে উড়ে গেলেও, সেটা তো বৃষ্টি হয়ে নীচেই নেমে আসে, নাকি?

তখন উনি বলেছিলেন, সমুদ্র থেকে উবে গেলেও বৃষ্টি হয়ে সব সময় তো আর সমুদ্রেই পড়ে না। অন্য জায়গাতেও পড়ে। ফলে সেই সব প্লাস-মাইনাস করে দেখা যায়, সমুদ্রে প্রথমে যতটা জল ছিল, একটু-আধটু হেরফের হলেও মোটামুটি সমুদ্রের জল ওই একই আছে।জুরান জিজ্ঞেস করল, সে নয় ঠিক আছে। কিন্তু এখন কেন ঢেউ হয় সেটা তো বললে না?

তরুণকাকু তখন বলেছিলেন, এখন মানে এখন নয়, ওই সময় থেকেই ঢেউ হওয়া শুরু হয়।
— কিন্তু কেন?— কারণ, সমুদ্র যখন দেখল, ডাঙার লোকেরা তার গায়ে হিসি করছে, তখন— তার তো হাত নেই, তাই হাত দিয়ে কাউকে ঠেলে সরাতে পারবে না দেখে সে নিজেই ফুঁসে উঠে, ঢেউ তুলে ধাক্কা দিয়ে লোককে ঠেলে সরাতে চাইল। কিন্তু সবাই তো আর তার বারণ করার কৌশল বুঝত না। ফলে আগের মতোই সাগরে যেত। স্নান করত। তাই হাজার ঠেলেও সাগর যখন কাউকে আটকাতে পারল না, তখন এক-আধ জনকে সেই ঢেউ দিয়েই সে টেনে নিয়ে যেতে লাগল অনেক গভীরে। জলে চুবিয়ে-চুবিয়ে মেরে ফেলতে লাগল। যাঁরা বেশি জলে নামতে ভয় পান, তাঁদের জন্য সমুদ্র সৈকতেই চোরাবালির ফাঁদ পেতে জীবন্ত সমাধি দিতে লাগল।

লক্ষ্য একটাই— অন্যের মৃত্যু দেখে মানুষ যাতে সতর্ক হয়। জলে আর না-নামে। নামলেও যাতে আগের মতো আর দাপাদাপি না-করে। করলেও, ভুল করেও যেন হিসি না-করে। কিন্তু মানুষ থামেনি। ‘ও মরেছে তো আমার কী’ ভেবে, মানুষ ফের সমুদ্রে নেমেছে। হুটোপাটি করে স্নান করেছে এবং হিসি পেলে আগের মতোই যথারীতি সমুদ্রেই হিসি করেছে।— আচ্ছা, লোকে তো দিনের বেলায় সমুদ্রে স্নান করে। তাদের ঠেলে সরানোর জন্য সমুদ্র তখন না-হয় ঢেউ তোলে। কিন্তু রাত্রিবেলায়? সমুদ্র কি তখন পড়ে-পড়ে খালি ঘুমোয়, নাকি তখনও ঢেউ তোলে?

— এ মা! কেন তুলবে না? আসলে এত দিন ধরে ঢেউ তুলতে তুলতে ওটা তো ওর একটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে।
অন্য ছেলেটি জিজ্ঞেস করেছিল, ঢেউ তুলতে তুলতে ও হাঁপিয়ে যায় না? ক্লান্ত হয় না?
তরুণকাকু বলেছিলেন, কেন হবে? তুই কি নিশ্বাস নিতে নিতে ক্লান্ত হোস? হাঁপিয়ে উঠিস?
— না।— তা হলে? সমুদ্রও সে রকম। ঢেউ তোলাটা ওর কাছে এখন নিশ্বাস নেওয়ার মতোই খুব স্বাভাবিক সহজাত একটা ব্যাপার হয়ে গেছে। ওটার জন্য ওকে আর ভাবনা-চিন্তা করতে হয় না। অটোমেটিক্যালি হয়ে যায়।

জুরান অবাক হয়ে গিয়েছিল। পর দিন যখন বাবাকে ও তরুণকাকুর কথাগুলো বলেছিল, তখন ওর বাবা ওকে বলেছিলেন, তরুণ ওই রকমই। ও যে কখন কী বলে, ও নিজেও জানে না। তুই কি ওর ওই কথাগুলি আবার বিশ্বাস করেছিস নাকি?

জুরান তো তরুণকাকুর কথাই বিশ্বাস করে বসেছিল। তাই কী উত্তর দেবে ভেবে পাচ্ছিল না। তখন ওর বাবাই ওকে বলেছিলেন, শোন, সমুদ্রের জল কেন নোনতা হয় জানিস? অনেকগুলো কারণ থাকলেও মূল কারণ হল— সমুদ্রের তলার আগ্নেয়গিরি আছে। সেই আগ্নেয়গিরিতে যখন উদ্গিরণ হয়, তখন তার উত্তাপে সমুদ্রতলের পাথরগুলি গরম হয়ে ওঠে। তখন সমুদ্রের জলের সঙ্গে সেই উত্তপ্ত পাথরের একটা বিক্রিয়া ঘটে। আর তার ফলেই সমুদ্রের জল লবণাক্ত হয়…

জুরান যখন তার সামনে থাকা পৃথিবীর ওই রেপ্লিকাটায় সমুদ্রের ঢেউ দেখতে দেখতে এই সব সাত-পাঁচ ভাবছে, আর মনে মনে হাসছে, ঠিক তখনই সমস্ত নিস্তবদ্ধতা ভেঙে সময়-কণা বলল, কী হল, ওটার দিকে ওই ভাবে তাকিয়ে আছ কেন? কী ভাবছ?
থতমত খেয়ে জুরান বলল, কই? কিছু না তো…
 
আট 
 
সময়-কণা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল জুরানের দিকে। সেই দৃষ্টি জুরানের শরীর ভেদ করে ঢুকে গেল ওর মনের মধ্যে। আর মনের ভিতরে সেঁধিয়ে যেতেই সময়-কণা বুঝতে পারল, তার কাছে এড়িয়ে গেলেও আসলে ও কী ভাবছিল। কেউ মিথ্যে বলছে কি না তা দেখার জন্য পৃথিবীর মানুষ লাই ডিটেকটর মেশিন ব্যবহার করে। সত্যি কথা জেনেও কেউ মিথ্যে বললে শরীরের মধ্যে রক্তচাপ বেড়ে যায়। হার্টবিট বেড়ে যায়। সে সব বিশ্লেষণ করে মুহূর্তের মধ্যেই সেই মেশিন জানিয়ে দেয়, সে মিথ্যে বলছে, না সত্যি। কিন্তু ধুরন্ধর কোনও মানুষ যদি প্রচুর অনুশীলনের মধ্যে দিয়ে নিজেকে তাপ-উত্তাপহীন রাখার কৌশল কব্জা করতে পারে, তখন সেই মেশিনও তার কাছে হার মানে। ভুলভাল সংকেত দেয়।
কিন্তু সময়-কণাদের দৃষ্টিকে ফাঁকি দেওয়া শুধু পৃথিবী কেন, এই মহাশূন্যের কোনও গ্রহবাসীর পক্ষেই সম্ভব নয়। তাই চট করে সময়-কণা ধরে ফেলল জুরান কী ভাবছিল। ও ভাবছিল— সামনের এই রেপ্লিকাটার মধ্যে শুধু পৃথিবীর চেহারাটাই ধরা আছে। কিন্তু পৃথিবীর সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে যারা জড়িত, যাদের বাদ দিয়ে পৃথিবীকে কল্পনাই করা যায় না, তারা কোথায়? কোথায় মাথার উপরে থাকা সেই বিশাল আকাশ? কোথায় রাত্রিবেলায় আকাশের বুকে ঝিকমিক করা সেই কোটি কোটি তারা? যে সাতটি তারা মালার মতো পর পর নিজেদের গেঁথে বিশাল একটা জিজ্ঞাসা চিহ্ন হয়ে সবাইকে প্রশ্ন করে, কোথায় ওরা? ওরাও তো একদিন এই পৃথিবীতেই ছিল, নাকি?

অনেক দিন আগে, জুরান যখন আরও ছোট, তার জন্মদিনে কে যেন একটা বই উপহার দিয়েছিল তাকে। তার মধ্যে ছিল বিশ্বের প্রায় সব ক’টি দেশেরই উপকথা আর রূপকথা। সেখানে একটি গল্প পড়েছিল সে। এখনও মনের মধ্যে মাঝে মাঝেই উঁকি মারে ব্রহ্মদেশের সেই গল্পটা। সেই গল্পে একটা মালি ছিল। সে কাজ করত রাজার বাগানে।
বাগানটা ভারী সুন্দর। নানান গাছগাছালিতে ভরা। ফুলে-ফুলে ছাওয়া। বাগানটা রাজার এত প্রিয় ছিল যে রানিকে নিয়ে মাঝে মাঝেই তিনি বিকেলের দিকে ঘুরতে আসতেন। তাই বাগানটাকে সব সময় পরিপাটি করে সাজিয়ে রাখার জন্য প্রায় সারাক্ষণই বাগানের পিছনে পড়ে থাকত সে। কখনও গাছের গোড়ার মাটি আলগা করে দিত। কখনও সার দিত। কখনও গাছগুলোকে স্নান করিয়ে দিত, তো কখনও অবাঞ্ছিত ডালপালা ছেঁটে দৃষ্টিনন্দন করে তুলত গাছগুলোকে। কখনও আবার নতুন নতুন চারা পুঁতত।

গাছপালা নিয়ে দিন-রাত এতই ব্যস্ত থাকত যে, বাড়ি যাবারই ফুরসত পেত না সে। বাগানের এক কোণেই পড়ে থাকত। নিজের বলতে থাকার মধ্যে ছিল তার একটা বউ। আর একটা মুরগি। আর সেই মুরগির ছ’-ছ’টি ছানা। তার কোনও ছেলেপুলে ছিল না। তাই মুরগিগুলোকে সে খুব ভালবাসত। মনে করত, ওই মুরগিটাই তার মেয়ে আর ছানাগুলো তার নাতি-নাতনি।
বিষয়-সম্পত্তি না থাকলেও তার মনে কোনও খেদ ছিল না। বেশ সুন্দর ভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল তার। হঠাত্‌ একদিন এক বৌদ্ধ পুরোহিত এসে হাজির হলেন তার বাগানের সামনে। দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, আমি অনেক দূর থেকে হাঁটতে হাঁটতে আসছি। আমি ক্লান্ত। ক্ষুধার্ত। তৃষ্ণার্ত। মাথা গুঁজবার জন্য একটুখানি ঠাঁই চাই।

মালি আর মালিবউ গরিব হতে পারে, কিন্তু তা বলে বাড়িতে কোনও অতিথি এলে তাঁকে ফিরিয়ে দেবে, এটা হতে পারে না। অতিথি তো দেবতার মতো। তা ছাড়া ইনি একজন পুরোহিত। তাই ওরা দুজনে তাঁকে অত্যন্ত আপ্যায়ন করে ভিতরে নিয়ে গেল। ঘরে যা ছিল খেতে দিল। গাছ থেকে ডাব পেড়ে দিল। ঘরের এক চিলতে খাটটি ছেড়ে দিল বিশ্রাম করার জন্য।

আদর-যত্নের কোনও ত্রুটি রাখতে চায় না তারা। আপ্রাণ চেষ্টা করছে। দেখে মনে হচ্ছে অতিথিও যথেষ্ট সন্তুষ্ট। কিন্তু কথা হচ্ছে, এই সন্তুষ্টির কারণে উনি যদি আজকের রাতটা এখানে থেকে যান, তা হলে!
পরের দিনের কথা ভাবতেই আঁতকে উঠল তারা। মাথায় হাত পড়ে গেল। চাট্টি চাল ছাড়া ঘরে যে আর কিচ্ছু নেই। নিজেরা না-হয় সেটাই একটু ফুটিয়ে ফেনা-ভাত খেয়ে কাটিয়ে দিতে পারে, কিন্তু অতিথির পাতে তো আর তা দেওয়া যায় না। অন্য দেশের পুরোহিত হলে না হয় বাগানের ফলমূল দিয়ে খাবার থালা সাজিয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু এ যে ব্রহ্মদেশের পুরোহিত! আমিষ ছাড়া খেতেই পারেন না। কী করা যায়! বাজারও বেশি দূরে নয়, মাছ-মাংস-তরি-তরকারি আনা যায় ঠিকই, কিন্তু সেগুলি যে কিনবে, টাকা কোথায়! পকেট যে একদম খালি!

স্বামী যখন এই সব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে একেবারে দিশেহারা, ঠিক তখনই মালিবউ বলে উঠল, পেয়েছি, পেয়েছি, একটা উপায় পেয়েছি।
— উপায়? কী উপায়? মালি কৌতূহলী চোখে বউয়ের দিকে তাকাতেই বউ বলল, আমাদের মুরগি আছে না?
— মুরগি?

— হ্যাঁ, মুরগি। গরম গরম ভাত আর মুরগির মাংস করলে কেমন হয়?
মুরগিটাকে খুব ভালবাসত মালি। তাই বউয়ের কথা শুনে শিউড়ে উঠল সে। বলল, এ কী বলছ তুমি?
— কেন? কী হয়েছে? মুরগিটাকে যদি কাটিও, মুরগির ছানাগুলো তো আছে। দেখবে, ক’দিন পরে ওরাও বড় হয়ে যাবে। ডিম দেবে।
— সে ঠিক আছে। কিন্তু তা বলে সেই ছোট্ট বেলা থেকে এত দিন ধরে যাকে নিজের হাতে খাইয়ে-দাইয়ে আদর-যত্ন করে বড় করেছি, সেই মুরগিটাকে কেটে ফেলব! না। আমি পারব না। কিছুতেই পারব না। কান্না ভেজা গলায় ফুঁপিয়ে উঠল মালি।

স্বামীকে দুর্বল হয়ে পড়তে দেখে কঠিন গলায় বউ বলল, ঠিক আছে। তোমাকে কিছু করতে হবে না। যা করার আমি করব।
— মুরগিটাকে তুমি কেটে ফেলবে! আর থাকতে পারল না মালি। ডুকরে কেঁদে উঠল। তার মনে হল, তার বুকের ভিতরটা কেউ বুঝি হামানদিস্তে দিয়ে মেরে মেরে ভেঙে-গুঁড়িয়ে দিচ্ছে।

— হ্যাঁ, কাটব। কারণ, অতিথি হল নারায়ণ। নারায়ণ সেবা সবার আগে। তুমি আমাকে বাধা দিয়ো না।
মালি আর তার বউ যখন দাওয়ায় বসে এই কথাগুলো বলছিল, মুরগিটা তখন উঠোনে খুঁটে খুঁটে খাবার খাচ্ছিল। জন্ম থেকেই এ বাড়িতে আছে সে। সেই জন্য ওদের দুজনের কথাই খুব ভাল ভাবে বুঝতে পারে। সে বুঝতে পারল, আজই তার শেষ রাত। অগত্যা বাচ্চাদের কাছে ডেকে নিয়ে সে বলল, একটা কথা বলি, মন দিয়ে শোন। কান্নাকাটি করিস না।
‘কান্নাকাটি করিস না’ শুনেই এক অজানা আতঙ্কে বাচ্চাগুলির বুক ধকধক করতে লাগল। এ ওর মুখের দিকে চাওয়াচাউয়ি করতে লাগল। তার পর উন্মুখ হয়ে তারা জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে মা? কী হয়েছে?
খুব ধীরে-সুস্থে শান্ত গলায় মুরগি বলল, আজই আমার শেষ রাত। কাল সকালেই আমি এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাব।
— কেন মা? কেন? মুরগির বাচ্চাগুলো একসঙ্গে কাতর গলায় জিজ্ঞেস করল।

মুরগি বলল, দেখিসনি, এ বাড়িতে একজন অতিথি এসেছেন? তাঁকে খাওয়ানোর মতো ঘরে কিছু নেই। তাই আমাকে কাল সকালে কেটে রান্না করে তাঁকে খেতে দেওয়া হবে। তোরা লক্ষ্মীসোনা হয়ে থাকবি। কেউ কারও সঙ্গে ঝগড়া-ঝাঁটি করবি না। আর তোরা যদি ভাল হয়ে না-থাকিস, তা হলে আমি কিন্তু মরেও শান্তি পাব না।
ছানাগুলো মায়ের কথা শুনবে কি! তারা কেঁদেই আকুল। তখন ওদের মা ওদের অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে শান্ত করে বলল, তোরা এত কাঁদছিস কেন? জন্মালে তো মরতেই হবে। আমি তো আর চিরকাল থাকব না। আমাকে একদিন না-একদিন মরতেই হবে। না-হয় দু’দিন আগেই মারা গেলাম। তাও, এটা তো আমার সৌভাগ্য যে, একটা ভাল কাজের জন্য আমি জীবন দিচ্ছি। অতিথি সেবার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করছি, এটা কি চাট্টিখানি কথা!

ছানাগুলো কাঁদতে কাঁদতে বলল, তুমিই যদি মরে যাও, আমরা কার কাছে থাকব? তোমাকে ছাড়া আমরাও আর বাঁচতে চাই না। তুমি মরলে, আমরাও তোমার সঙ্গে মরব।

ওদের মা ওদের অনেক বোঝাবার চেষ্টা করল, কিন্তু সে কথায় ওরা কান দিল বলে মনে হল না।
পর দিন খুব ভোরে মুরগিটার ঘরে গিয়ে মালিবউ উঁকি মেরে দেখল, মুরগি তার ছ’টি ছানাকে তার পাখনা দিয়ে গভীর মমতায় আগলে নিয়ে অঘোরে ঘুমোচ্ছে। সেই দৃশ্য দেখে মালিবউয়ের খুব মায়া হল। কিন্তু কী করবে সে! ঘরে যে কিছু নেই। অথচ অতিথি সেবা বড় সেবা। সেটা না করলেই নয়। তাই হাত কাঁপলেও, মন না-চাইলেও, খুব সন্তর্পণে বাচ্চাদের কাছ থেকে আলতো করে মুরগিটাকে তুলে আনল সে। নিজেই ছাল-চামড়া ছাড়িয়ে, কেটেকুটে সাফ করল। তার পর মশলা দিয়ে খুব ভাল করে কষিয়ে মাখল। উঠোনের এক ধারে তিন ঝিঁকের উনোনে, যেখানে রোজ তাদের রান্না হয়, সেখানে কাঠটাট দিয়ে আগুন ধরাল। তাতে চাপিয়ে দিল কড়াই। কড়াইয়ের জল ফুটতেই ঝোল করার জন্য তার মধ্যে ফেলে দিতে লাগল সেগুলি।
মালিবউ খেয়াল করেনি, মুরগিটাকে আস্তে করে তুলে আনার সময় ছ’টি ছানারই ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। তারা যখন আড়াল-আবডাল থেকে দেখল, তাদের মাকে কেটে টুকরো টুকরো করে কড়াইয়ের গরম জলের মধ্যে মালিবউ ফেলে দিচ্ছে, তখন তারা আর স্থির থাকতে পারল না। কাঁদতে কাঁদতে একসঙ্গে ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে ওই কড়াইটার মধ্যে তারা দল বেঁধে ঝপঝপ করে ঝাঁপ দিল।
এ রকম যে হতে পারে, মালি বা মালিবউ, কেউই তা কল্পনা করতে পারেনি। শুধু মরগি নয়, মুরগির সঙ্গে সঙ্গে তার বাচ্চাগুলোকেও এই ভাবে খুইয়ে হু হু করে উঠল তাদের বুক। দুঃখে বুক ফেটে যেতে লাগল। তবু তারা মুখে কোনও রা করল না। কোনও রকমে নিজেদের সামলে নিল। তার পর মায়ের সঙ্গে ছানাগুলিকেও একটা বড় জামবাটি করে অতিথির সামনে পরিবেশন করল মালিবউ। বড় তৃপ্তি করে খেলেন তিনি।

খাওয়াদাওয়া সেরে সেই বৌদ্ধ পুরোহিত যখন যাবার জন্য উঠোনে এসে দাঁড়ালেন, তাঁকে বিদায় জানানোর জন্য মালি আর মালিবউও সেখানে উপস্থিত। তারা তাঁকে বিদায় জানাতে না-জানাতেই একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটে গেল তাদের চোখের সামনে। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই অবাক হয়ে দেখল, না। হেঁটে নয়, সেই অতিথি হঠাৎ হুস করে সোজা উপরে উঠে গেলেন। তিনি যখন উঠছেন, তাঁর শরীর থেকে ঠিকরে বেরোতে লাগল শ্বেতশুভ্র উজ্জ্বল এক আলোক ছটা। মালি আর তার বউ দুজনেই সে দিকে তাকিয়ে রইল। দেখল, সেই বৌদ্ধ পুরোহিত কেমন ছোট হতে হতে মহাশূন্যে একেবারে মিলিয়ে গেলেন।
স্বামী-স্ত্রী বুঝতে পারল, যিনি তাদের বাড়িতে অতিথি হয়ে এসেছিলেন, তিনি কোনও সাধারণ মানুষ নন, হয় কোনও দেবতা, আর তা না হলে কোনও সিদ্ধপুরুষ।

সে দিন রাতেই তারা টের পেল, তাদের অনুমান মিথ্যে নয়। স্বপ্নেই তারা জানতে পারল, স্বয়ং দেবতাই ছদ্মবেশে পৃথিবীতে এসেছিলেন মানুষের মন পরীক্ষা করার জন্য। অতিথি সেবায় সন্তুষ্ট হয়ে তিনি তাদের আশীর্বাদ করলেন। সেই আশীর্বাদে স্বামী-স্ত্রীর যাবতীয় দুঃখ-কষ্ট দূর হয়ে গেল।
অন্য দিকে মুরগি আর তার ছ’টি ছানার উপরেও দেবতা যারপরনাই প্রসন্ন হলেন। তাঁর বরে পরের জন্মে তাদের জন্ম হল দেবলোকে। আকাশের অনেকখানি জায়গা নিয়ে তারা থাকতে শুরু করল। দেবলোকে জন্মগ্রহণ করে তারা অমর হয়ে গেল। তাই আজও রাত্রিবেলায় আকাশের দিকে তাকালে দেখতে পাওয়া যায় বিন্দু বিন্দু আলোর ছটা দিয়ে তৈরি একটা বিশাল জিজ্ঞাসা চিহ্ন। না। ওগুলো কিন্তু আলোর ছটা নয়। আসলে সাত-সাতটি তারা। যাকে পৃথিবীর মানুষ জনেরা বলে— সপ্তর্ষিমণ্ডল। ব্রহ্মদেশের লোককথায় নাকি ওই সাতটি তারাই হল, সেই মুরগি আর তার ছ’-ছ’টি ছানা।
চলবে   ………..
ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: