মহাশূন্যে জুরান — সিদ্ধার্থ সিংহ – পর্ব – ১০

মহাশূন্যে জুরান সিদ্ধার্থ সিংহ
— আসলে মানুষ যার সঙ্গে পেরে ওঠে না। যার ক্ষমতা মানুষের থেকে সামান্য হলেও একটু বেশি। তার যদি ভাল করার ক্ষমতা থাকে, তা হলে মানুষ তাকে দেবতা বলে। আর খারাপ করার ক্ষমতা যার বেশি থাকে, তাকেই মানুষ দানব বলে।
— যেমন?

— যেমন মানুষ যখন ডারউইনের তত্ত্ব অনুযায়ী বনমানুষ থেকে ক্রমশ মানুষ হয়ে উঠছিল, তখন লোকজন অনেক কম ছিল। চার দিক আরও ফাঁকা-ফাঁকা ছিল। সে-সময় মাঝে মাঝেই ঝোড়ো হাওয়া আছড়ে পড়ে সব কিছু উড়িয়ে নিয়ে যেত, ধুপধাপ করে ফেলে দিত গাছপালা, তাতে চাপা পড়ে মারা যেত বহু লোক।
তখন, সেই ঝড় যাতে আর তাণ্ডব না-চালায়, ক্ষতি না-করে, তাকে শান্ত করার জন্য মানুষ তাকে পুজো করে খুশি করার চেষ্টা করত। হাওয়ার আর এক নাম পবন। তাই তাকে পবন দেবতা হিসেবে গণ্য করত। গাছে গাছে ঘষা লেগে জঙ্গলে দাবানল ছড়িয়ে পড়লে আগুনের যতটা কাছে যাওয়া যায়, ততটা গিয়ে, আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ মাথা কুটত। যাতে আগুন নিজেকে আস্তে আস্তে গুটিয়ে নেয়। তার এই অসীম শক্তির জন্যই মানুষ তাকে অগ্নি দেবতা বলত।
জুরান বলল, দেবতা কেন? সে তো ক্ষতি করত। জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দিত। আগুনকে তো তা হলে দানব বলা উচিত।

— না। কারণ, আগুন যতটা ক্ষতি করে, তার চেয়ে অনেক অনেক অনেক বেশি উপকার করে। মানুষ যে দিন আগুনকে কব্জা করতে শিখেছিল, সে দিনই সে এক ধাপে এক হাজার বছর এগিয়ে গিয়েছিল। মানুষের কাছে আগুন হল সব চেয়ে বড় আশীর্বাদ। তাই সে দানব নয়, মানুষের কাছে সে দেবতা।
যেমন জলে ডুবে অনেকে মারা গেলেও, বহু নৌকো মাঝপথে ডুবে গেলেও, জলকে কেউ দোষী সাব্যস্ত করে না। মানুষের কাছে, জলই জীবন। তাই সুনামি ঘটলেও, প্লাবন ঘটলেও, গ্রামের পর গ্রাম, শহরের পর শহর ভাসিয়ে দিলেও, সমুদ্র কিন্তু মানুষের কাছে দেবতাই। দেবতার থেকে আরও এককাঠি উপরে, আরও কাছের হল— নদী। গঙ্গা তো মানুষের কাছে শুধু দেবী নয়, মা-ও।
এই ভাবেই, মানুষ যখন যার সঙ্গে পেরে ওঠেনি কিংবা যে শক্তির অন্তত একটুখানি করুণা পেতে চেয়েছে, অথবা মনেপ্রাণে চেয়েছে সে যাতে আর কোনও ক্ষতি না-করে, তখনই তার শরণাপন্ন হয়েছে। তার মন জয় করার জন্য বাচ্চা ভোলানোর মতো লাল ফুল দিয়েছে। নীল ফুল দিয়েছে। নিজে পোকা ধরা ফল খেলেও কিংবা সন্তানকে দিলেও, তাকে কিন্তু বেছে বেছে নিখুঁত ফলই দিয়েছে। তার চার পাশে সুগন্ধ ছড়িয়ে দিয়েছে। তাকে পুজো করেছে।

দেব বা দেবী বলে আখ্যা দিয়েছে। আর এ ভাবেই, এক-এক করে কখনও শিক্ষার দেবী সরস্বতী, যন্ত্রপাতির দেবতা বিশ্বকর্মা, ধনসম্পদের দেবী লক্ষ্মী, শক্তির দেবী কালীর মতো তেত্রিশ কোটি দেবদেবীর সৃষ্টি হয়েছে। আর সেই দেবদেবীর সৃষ্টিকর্তা ‘মানুষের সৃষ্টিকর্তা মানুষ’-এর মতো কিন্তু কোনও দেবদেবী নয়।

যে যতই বলুক, শিবের মেয়ে মনসা কিংবা দুর্গার ছেলে গণেশ অথবা এর মেয়ে ও, তার ছেলে সে— ওগুলো সব বাজে কথা। তাদের সৃষ্টিকর্তা কিন্তু কোনও দেবদেবী নয়, ওই মানুষই। তারা যেমন দেবদেবী সৃষ্টি করেছে, মনে মনে কল্পনা করে সেই দেবদেবীদের ছেলেমেয়েদেরও তারাই সৃষ্টি করেছে। নতুন নতুন আদল দিয়েছে।

দ্যাখো না, ওইটুকু একটা গ্রহ, তাতেই একই দেবতা এক এক জায়গায় এক এক রকম। শুধু চেহারাতেই নয়। চলন-বলন থেকে শুরু করে তাদের নামটাও আলাদা। তারা রক্ত-মাংসের কেউ হলে সেটা কী হত? তোমার নাম তো জুরান। তুমি যেখানে থাকো, সেখান থেকে তুমি যদি অন্য কোথাও যাও, সেখানকার লোকেরা কি তোমাকে অন্য নামে ডাকবে?
— না।
সময়-কণা বলল, তোমাকে যেমন দেখতে, তুমি যদি অন্য কোথাও যাও, তোমাকে কি অন্য রকম দেখতে হয়ে যাবে?
জুরান বলল, না।

— তা হলে? সত্যিই যদি দেবতা বলে কেউ থাকত, তা হলে অন্যদের কথা না-হয় বাদই দিলাম, শুধুমাত্র হিন্দুদেরই তেত্রিশ কোটি দেবতার অন্তত একজনের সঙ্গেও কি তোমার দেখা হত না? তোমার না-হোক তোমার বাবার? কিংবা তার বাবার? পারলে একবার জিজ্ঞেস করে দেখো তো, তাঁরা কেউ কোনও দিন কোনও ঈশ্বরকে দেখেছেন কি না…
জুরান বলল, বাবাকে জিজ্ঞেস করতে যাব কেন? আমিই তো দেখেছি।
— তুমি দেখছ?
— হ্যাঁ।
সময়-কণা বলল, কোথায়?

— কেন? ছবিতে।
— এ তো দেখছি মহাবিপদ। আরে বাবা, আমি কোনও ছবির কথা বলছি না। বলছি, স্বচক্ষে কোনও জ্যান্ত দেবতাকে দেখেছ কি?
জুরান বলল, না।
— তুমি যেমন দেখোনি, তোমাদের বিশ্বের কেউই দেখেনি।
— অনেকে যে বলে এ দেখেছে, ও দেখেছে, সে দেখেছে…
— ওগুলো সব বাজে কথা। ওটা ইলিউশন। যেমন প্রবল তেষ্টার সময় খাঁ খাঁ মরুভূমির এখানে সেখানে অনেকে জলাশয় দেখতে পায়, তেমনি ওরাও ওই জলাশয়ের মতোই দেবতা-দর্শন করে। আসলে দেবতা বা দানব বলে কিছু নেই। যা আছে, সেটা তোমাদের ওই গ্রহের জীবকুলের মধ্যেই আছে।
জুরান জিজ্ঞেস করল, সেটা কী?
— ওই দেবতা আর দানব।

— তাই নাকি? কার মধ্যে কোনটা আছে?
সময়-কণা বোঝাবার চেষ্টা করল, আলাদা করে কেউ কারও মধ্যে নয়। সবার মধ্যেই ওই দুটো আছে। যেমন ধরো, মানুষ যখন কাউকে থাপ্পড় মারে, তখন সে দানব। যখন অন্যকে বিপদে পড়তে দেখে মনে মনে হাসে, তখন সে দানব। আবার মানুষ যখন তার চেয়ে কমজোরি জীব— হাঁস, মুরগি, মাছ কিংবা পাঁঠার মাংস খাচ্ছে, তখন সে দানব। কারণ, সে তার এক প্রতিবেশীকে হত্যা করছে। একটা প্রাণকে ধ্বংস করছে।
— কিন্তু কেউ যদি নিরামিষাশি হয়? শুধু শাকসবজি বা ফলমূল খায়?
— সে তো আরও বড় দানব। শুধু দানবই নয়, নৃশংসও।
আঁতকে উঠল জুরান, অ্যাঁ! সে কী?

— অ্যাঁ নয়, হ্যাঁ। কারণ, দু’পেয়েই হোক আর চার পেয়েই হোক, তাদের ছুটে পালাবার ক্ষমতা আছে। জাল কিংবা ছিপ ফেললেও মাছও তার কবল থেকে ঠিক পালিয়ে যেতে পারে। কিন্তু যাদের একচুল নড়ারই ক্ষমতা নেই, যারা সব সময় আমৃত্যু শুধু মানুষেরই সেবা করে, মানুষ যাতে বুক ভরে শ্বাস নিতে পারে, তার ব্যবস্থা করে, যে মাটির উপর মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে, বৃষ্টির জলে সে মাটি যাতে ধুয়ে ধুয়ে নদীতে চলে না যায়, শিকড়বাকড় দিয়ে আঁকড়ে ধরে রাখে, কোথায় মানুষ তাদের সেবাযত্ন করবে, তা নয়, উল্টে তাদের খেয়ে সাবাড় করছে। তাদের ছানাপোনাদের পর্যন্ত আলোর মুখ দেখতে দিচ্ছে না। মাটিতে পড়ার আগেই ফল অবস্থাতেই খেয়ে নিচ্ছে। এটা তো আরও বড় গর্হিত কাজ। আর এটা যখন কোনও মানুষ করে, তখন সে আর মানুষ থাকে না। হয়ে ওঠে পুরোদস্তুর একটা দানব।
— তা হলে ঈশ্বর কখন হয়?
সময়-কণা বলল, যখন সে ভাল কাজ করে। বাসা থেকে পড়ে যাওয়া কোনও পাখির ছানাকে তুলে এনে কোনও মানুষ যখন সেবা করে কিংবা কোনও মা যখন কোনও বাচ্চাকে দুধ খাওয়ায় অথবা শুকনো খটখটে জায়গায় দিশেহারা কোনও শামুককে তুলে মানুষ যখন স্যাঁতসেঁতে কোনও জায়গায় পৌঁছে দেয়, তখন সে আর মানুষ থাকে না। ভগবান হয়ে ওঠে।

জুরান জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, মানুষই যখন দানব, আবার ঈশ্বরও, এই দুটোই যখন মানুষের মধ্যে একসঙ্গে আছে, তা হলে কি ধরে নেব পৃথিবীর মধ্যে মানুষই সব চেয়ে শ্রেষ্ঠ জীব?
— এটা আবার তোমাকে কে বলল?
— না। সবাই তো এটা বলে… তাই…
সময়-কণা বলল, একদমই নয়। ‘মানুষই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব’— এটা কিন্তু মানুষই বলছে। অন্য কোনও জীব বলছে কি?
— না।
— তা হলে?
— কোনও প্রতিপক্ষকে সঙ্গে না-নিয়ে তোমার ক্লাব যদি মাঠে গিয়ে খোলা বারপোস্ট লক্ষ করে একের পর এক গোল দিয়ে যায়, সেই গোলের সংখ্যা যতই হোক না-কেন, তোমাদের ক্লাবের সবাই মিলে চিত্‌কার করে যতই বলুক না কেন, আমরা জয়ী। আমরাই সেরা। তোমাদের কি সত্যিকারের শ্রেষ্ঠ বলা যাবে?
জুরান বলল, না।

— তবে? ঠিক তেমনি, তোমরা মানুষরাই মানুষকে শ্রেষ্ঠ বলছ। একবারও অন্য জীবের দিকে তাকিয়ে দেখেছ কি? তারা কী করে, ওই পৃথিবীতে তাদের অবদান কতখানি, একবারও তলিয়ে দেখেছ কি? তার থেকেও বড় কথা, পৃথিবীতে যত জীব আছে, তার ক’জনের হদিশ পেয়েছ তোমরা? যাদের পেয়েছ, তাদের সম্পর্কেই বা কতটুকু জানো তোমরা? জানলে বুঝতে পারতে। তখন আর এ রকম কথা উচ্চারণও করতে না। লজ্জায় তোমাদের মাথা মাটির সঙ্গে মিশে যেত। বুঝেছ?
জুরান কী বলবে বুঝতে পারল না। কিছু একটা বলতে গিয়েও কেমন যেন তোতলাতে লাগল।
সাত
 
জুরানের হঠাৎ মনে হল, কতগুলো শীতল ছায়া যেন তার চার পাশে ঘুরঘুর করছে। ফিসফিস করে নিজেদের মধ্যে কী সব বলাবলি করছে। কান খাড়া করে সেগুলো শোনার চেষ্টা করল সে। দেখল, পৃথিবী থেকে এত দূরে, একেবারে অন্য একটা অজানা জায়গায় এসেও সে কিন্তু তাদের ভাষা বেশ বুঝতে পারছে। কিন্তু এরা কারা?

ও শুনেছিল, মানুষ মরে গেলে মৃত-মানুষের ছেলেমেয়ে কিংবা নিকট কোনও আত্মীয় গয়ায় গিয়ে পিণ্ড দিয়ে আসে। পিণ্ড দেওয়ার সময় শুধু সেই মৃত-মানুষই নয়, যাদের পিণ্ড কেউ দেয়নি, দেওয়ারও কেউ নেই, সেই সব অতৃপ্ত আত্মারাও নাকি শীতল ছায়া হয়ে পিণ্ড নেওয়ার জন্য হাত পাতে। এরাও তো শীতল ছায়া। তা হলে কি এরা সব মৃত! অশরীরী আত্মা! হতে পারে। শুধু মানুষ নয়, এদের মধ্যে হয়তো সাপ, ব্যাঙ, পেঁচাও আছে। বেঁচে থাকার সময় যে যার ভাষাতে কথা বললেও মৃত্যুর পরে বুঝি সব ভাষাই এক হয়ে যায়। মানুষের ভাষা, পাখির ভাষা, মাছের ভাষা, সব— সব। তা না হলে এদের ভাষা সে বুঝতে পারছে কী করে!

তার মানে মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে কিংবা তাদের ধারণা অনুযায়ী, মৃত্যুর পরে টানা তিন দিন মায়ায় পড়ে আপনজনদের আশপাশে ঘোরাঘুরি ক’রে, কিছু একটা বলতে চেয়েও, বলতে না-পেরে অবশেষে এখানে চলে আসে!

এটা কি স্বর্গ! স্বর্গ তো সব সময় উপরেই হয়! কিন্তু এটা যে পৃথিবীর উপরের দিকে সেটা কে বলল! পৃথিবীতে কি কোনও মার্কিং করা আছে। ছবিতে যেমন মানুষের মাথা দেখে বোঝা যায়, এটা উপরের দিক। ছোট্ট একটা চারাগাছের ছবি দেখলেও বোঝা যায় কোনটা উপরের দিক আর কোনটা নীচের দিক। কিন্তু শুধুমাত্র ফুটবলের একটা ছবি দেখে কি বোঝার কোনও উপায় আছে কোনটা কোন দিক! পৃথিবীটাও তো ফুটবলের মতোই গোল। তা হলে বুঝব কেমন করে এটা স্বর্গ না নরক! মহাশূন্যের কি কোনও উপর-নীচ হয়!

— কেন হবে না? ভাবলেই হয়…
কথাটা আচমকা শুনে ঘোর কাটল জুরানের। বুঝতে পারল, সময়-কণার সঙ্গে কথা বলতে বলতে একটু অন্য মনস্ক হয়ে গিয়েছিল। এতক্ষণ ধরে আকাশ-পাতাল কত কী ভাবছিল সে। খানিক আগে সময়-কণার সঙ্গে কী নিয়ে কথা হচ্ছিল, ওর আর মনেই পড়ল না। তাই সময়-কণা যখন বলল, ‘কেন হবে না? ভাবলেই হয়…’ তখন তার পরিপ্রেক্ষিতে নিজের মনেই জুরান বলল, ভাবলেই হয়!

— হ্যাঁ, ভাবলেই হয়। যেমন পৃথিবীতে পৃথক কোনও দিক না-থাকলেও তোমরা তোমাদের মতো করে উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম — চার-চারটে দিক ভেবে নিয়েছ, খানিকটা সে রকম। এটাকে যদি উপর ভাবো, উপর। নীচ ভাবলে, নীচ।

— না। সে উপর-নীচের কথা বলছি না। বলছি, এটা কি স্বর্গ, না নরক?
জুরানের কথা শুনে হো হো করে হেসে উঠল সময়-কণা। সেই হাসিটার মধ্যে দিয়ে সে যে কী বোঝাতে চাইল, জুরান বুঝতে পারল না। তবে আন্দাজ করল, এ নিয়ে যদি সে ফের প্রশ্ন করে, তা হলে হয়তো আগের মতোই সময়-কণা বলবে, স্বর্গ বা নরক বলে আসলে কিছু হয় না। মৃত্যুর পরে মানুষ যেখানে আনন্দে থাকে, সুখে থাকে, ভাল থাকে, যেখান থেকে আর কোথাও যেতে চায় না, সেটাই স্বর্গ। আর যেখানে থাকলে কষ্ট হয়, কষ্ট করে থাকতে হয়, দম বন্ধ হয়ে আসে। মনে হয়, কবে যে এখান থেকে রেহাই পাব, সেটাই নরক। আচ্ছা, সত্যিই কি স্বর্গ বা নরক বলে কিছু হয়!
জুরান মনে মনে এটা ভাবতেই সময়-কণা বলল, হয় হয়…
— তা হলে সেটা কোথায়?
— যেখানে আলো আছে, প্রশান্তি আছে, সেটা পৃথিবীতেই হোক কিংবা অন্য কোনও গ্রহে, অথবা মহাশূন্যে— সেটাই স্বর্গ। আর যেখানে কেবলই অন্ধকার, ঘুটঘুটে অন্ধকার, যেখানে আলোর রেশটুকুও পৌঁছয় না, সেটা যেখানেই হোক না কেন, সেটাই নরক।
— আমরা এই মুহূর্তে যেখানে আছি, এটা কি স্বর্গ, না নরক?

— দুটোই। একই জায়গা লোকভেদে কারও কাছে স্বর্গ, কারও কাছে নরক হয়ে যায়। দাঁড়াও, তোমাকে একটা জিনিস দেখাই। ওই দ্যাখো, সামনে তাকাও।

জুরান তাকাল। দেখল, সামনে একটা বিশাল গ্লোব। সত্যিই বিশাল বড়। এতক্ষণ তো সে এটা দেখেনি! কোত্থেকে এল! ভূগোল পড়ার জন্য তার বাবা সব থেকে বড় যে গ্লোবটা তাকে কিনে দিয়েছেন, এটা তার থেকেও বড়। তবে তার আর এটার মধ্যে বিস্তর ফারাক। ওখানে শুধু রং আর রেখাচিত্র দিয়ে দেশগুলি ভাগ করে দেখানো আছে। কিন্তু এটা প্রকৃত অর্থেই পৃথিবীরই একটা জলজ্যান্ত রেপ্লিকা। সারা গা জুড়ে কী যেন কিলবিল-কিলবিল করছে। কোনও অংশ বড় করে দেখতে চাইলে সোনামুখী সূচের চেয়েও ছুঁচোলো মাথাওয়ালা ‘পয়েন্ট-টাচ’ দিয়ে সেই জায়গাটায় ছোঁয়ালেই সঙ্গে সঙ্গে সেটা বড় হয়ে যায়। বালিকণার চেয়েও হাজার হাজার ভাগ ছোট কোনও মানুষকে দেখতে চাইলে, সেটাও মুহূর্তের মধ্যে প্রমাণ সাইজের সত্যিকারের মানুষ হয়ে ওঠে। ছলাৎ ছলাৎ করে পাড়ে আছড়ে পড়ে সমুদ্রের বিশাল বিশাল ঢেউ।

তেমনই একটা সমুদ্রের দিকে আঙুল তুলে জুরান বলল, এটা কি পুরীর সমুদ্র?
সময়-কণা বলল, না না, এটা পুরীর সমুদ্র না। এটা হল ভূমধ্যসাগর। কেন? তুমি কি কখনও পুরীতে গিয়েছিলে?
জুরান বলল, হ্যাঁ। অনেক দিন আগে। বাবা-মায়ের সঙ্গে। সমুদ্রের উল্টো দিকের একটা হোটেলে আমরা ছিলাম। সেই ঘরের ব্যালকনি থেকেই সমুদ্র দেখা যেত। আমরা প্রত্যেক দিন সকালে সূর্যোদয় দেখতে যেতাম।
— সূর্যোদয়!

— হ্যাঁ, সমুদ্রের ও পার থেকেই তো সূর্য উঠত।
সময়-কণা বলল, ধ্যাত। সূর্য আবার ওঠে নাকি?
— হ্যাঁ গো, ওঠে। পূর্ব দিক থেকে ওঠে আর পশ্চিমে ডোবে।

— ওটা তোমাদের মনে হয়। আসলে সূর্য ওঠেও না, ডোবেও না। সূর্য তার নিজের জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। পৃথিবীটাই বরং লাট্টুর মতো পাক খেতে খেতে ঘোরে। ঘুরতে ঘুরতে পৃথিবীর যে দিকটা সূর্যের দিকে বাঁক নেয়, তখন সে দিক থেকে সূর্যকে দেখে তোমাদের মনে হয়, ওই তো সূর্য উঠছে। আর চক্কর মারতে মারতে পৃথিবীর যে দিকটা সূর্যের আড়ালে চলে যেতে থাকে, তখন সে দিক থেকে তোমাদের মনে হয় সূর্য বুঝি ডুবছে।

— হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। এটা তো আমরা স্কুলের বইতে পড়েছি। কিন্তু বইমেলায় যে কে সি পাল নামে একটা লোক বলেছিলেন, আমরা এত দিন ধরে যা জেনে এসেছি, সেগুলো নাকি বেশির ভাগই ভুল। আসলে সূর্যই বছরে একবার করে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে। তিনি তো আবার বড় মুখ করে চ্যালেঞ্জও করছিলেন, তাঁর তথ্য কেউ ভুল প্রমাণ করতে পারলে তিনি তাঁকে এক কোটি টাকা দেবেন। তাঁর কথা শুনে তো আমার মাথা ঘুরে গিয়েছিল। তাই বলছিলাম কি, এর মধ্যে কোনটা ঠিক?

— সেটা অবশ্যই জানতে পারবে। তবে এক্ষুনি নয়। সেটার জন্য তোমাদের একটু অপেক্ষা করতে হবে। আমি নই। ওটা তোমাদের জানাবে অন্য একটা সময়-কণা।
জুরান জানতে চাইল, কিন্তু কবে?
— একটু ধৈর্য ধরো। সব জানতে পারবে। শুধু ওটাই নয়, এখনও তোমরা এমন অনেক কিছুকেই ধ্রুব সত্য বলে জানো, যেটা ভুল। সেগুলিও তোমাদের কাছে ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে যাবে। এক-একটা সময়-কণাই তোমাদের জানিয়ে দেবে কোনটা আসল সত্যি। পাশাপাশি এটাও জেনে রাখো, যখন যেটা জানবে, সেটা শুধু সেই সময়ের জন্যই সত্যি। চিরসত্যি বলে কিচ্ছু হয় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব কিছুই পাল্টে যায়।

— এই এত আধুনিক যুগে এসেও এই কথা বলছ?
— আধুনিক? কীসের আধুনিক? তোমাদের বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটনকে ‘জ্ঞানের সমুদ্র’ বলা হয়েছিল দেখে তিনি কি বলেছিলেন জানো? উনি বলেছিলেন, জ্ঞানের সমুদ্র তো দূরের কথা, আমি সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে সবেমাত্র নুড়ি কুড়োচ্ছি।
— সে তো বহু বছর আগে বলেছিলেন।

— বহু বছর মানে? কত বছর? ইতিহাসের ক্ষেত্রে একশো-দুশো বছর কি? দু’-পাঁচ হাজার বছরও কিচ্ছু না। আর তুমি বলছ, বহু বছর আগে? বলছ, এটা আধুনিক যুগ? আধুনিক যুগের কী দেখেছ তোমরা? সবে তো হামাগুড়ি দিচ্ছ, এর পর প্রতিনিয়ত যে কত কী আবিষ্কার হবে, তা তুমি তোমার জীবদ্দশাতেই দেখে যেতে পারবে। তোমার পরবর্তী প্রজন্মের কথা না-হয় বাদই দিলাম।
সময়-কণার কথা খুব মন দিয়ে শুনছিল জুরান। কিন্তু মাঝে মাঝেই তার চোখ চলে যাচ্ছিল সামনে বনবন করে ঘুরতে থাকা পৃথিবীর ওই রেপ্লিকাটার দিকে। সেখানে যতটা স্থল তার চেয়ে বেশি জলাশয়। সাপের মতো এঁকেবেঁকে এক দিক থেকে আর এক দিকে চলে গেছে বিশাল-বিশাল নদী। অবশেষে সাগরে গিয়ে মিশেছে। সাগরের মাঝখানটা শান্ত হলেও পাড়ে এসে বারংবার আছড়ে পড়ছে তার বড় বড় ঢেউ। সেই ঢেউ ভেঙে পড়তেই সাবান গোলা ফেনার মতো সে কী সাদা ধবধবে বুজকুড়ি।
সে যখন তার বাবা মা-সহ পাড়ার আরও অনেকের সঙ্গে লাক্সারি বাসে করে পুরী বেড়াতে গিয়েছিল, তখন তারই পাশের বাড়ির তরুণকাকু সমুদ্রের পাড় ধরে ঝিনুক কুড়োতে কুড়োতে বলেছিলেন, তোরা কি জানিস, আগে কিন্তু সমুদ্রে কোনও ঢেউ ছিল না।

তরুণকাকুর কথা শুনে ওরই বয়সি যে চার-পাঁচ জন ওর সঙ্গে ছিল, তার মধ্যে থেকে একটা ছেলে বলে উঠেছিল, তাই নাকি? তা হলে এখন হয় কেন?
তিনি বলেছিলেন, সমুদ্র কখনও চায়নি তাকে কেউ নোংরা করুক। কিন্তু মানুষ যখন মানুষ হয়ে ওঠেনি। যখন বনমানুষ ছিল কিংবা তারও আগে— তারা তখন থেকেই সমুদ্রে নামা শুরু করেছিল। সমুদ্রে গিয়েই স্নান করত। স্নান তো নয়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে রীতিমত লাফালাফি-ঝাঁপাঝাঁপি করা। আর স্নান করতে করতে হঠাত্‌ হিসি পেয়ে গেলে কেউ আর সমুদ্র থেকে উঠে, পাড়ে গিয়ে করত না। জলের মধ্যে করলে কে আর টের পাবে ভেবে, ওই সমুদ্রের মধ্যেই হিসি করে দিত।

— ও… সেই জন্যই বুঝি সাগরের জল এত নোনতা!
জুরান কথাটা বলতেই সঙ্গে সঙ্গে আর একটা ছেলে বলেছিল, না রে, সে জন্য না। আমার বাবা বলে, যে-সব মাছকে আমরা জাল ফেলে তুলে আনি, তাদের মা-বাবা, ছেলেমেয়ে, দাদু-দিদা, এমনকী নিকট আত্মীয়রাও ঠিক বুঝতে পারে, আমরা তাদের কেন ধরেছি। তাই তার শোকে তারা হাপুস নয়নে কাঁদে। আর তারা কাঁদে দেখেই তাদের চোখের নোনতা জলে গোটা সমুদ্রটাই ধীরে ধীরে এ রকম লবণাক্ত হয়ে গেছে।
সেটা শুনে তরুণকাকু বলেছিলেন, তোরা তো নিরামিষাশী, মাছ-মাংস কিছুই খাস না। তাই ওই সব বলে নিজেদের সান্ত্বনা দিস। আর বাকি লোকদেরও প্রভাবিত করতে চাস। যাতে কেউ আর মাছ না খায়…
— তা হলে কি আমি যেটা বললাম, সেই পেচ্ছাপের জন্যই? জুরান কথাটা বলতে না-বলতেই ওদের পাড়ারই অন্য আর একটা ছেলে বলে উঠেছিল, ধুস, বোকার মতো কথা বলিস না তো। ওইটুকু পেচ্ছাপে কি সমুদ্রের অত জল নোনতা হতে পারে?
চলবে   ………..

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: