মহাশূন্যে জুরান — সিদ্ধার্থ সিংহ – পর্ব – ৮

মহাশূন্যে জুরান -- সিদ্ধার্থ সিংহ -  পর্ব - ৮
— তুমি তো দেখছি কিছুই জানো না। ছাঁটা মানে, যারা তাদের জীবন থেকে শোক, দুঃখ, কষ্ট, প্রেম, লজ্জা, ক্ষোভ, অপমান, মান-অভিমানের মতো ছোট ছোট অণুভূতিগুলো ছেঁটে ফেলতে চায়, তত দিনে তো তার ব্যবস্থাও হয়ে যাবে। কয়েক মিনিটের ছোট্ট একটা অস্ত্রোপচার। অস্ত্রোপচার মানে রক্তারক্তি কাণ্ড নয়, সামান্য একটু অবশ করে, যেটা উপড়ে ফেলতে চায়, সেটাকে ছোট্ট একটা ছুরি দিয়ে বোধ থেকে চেঁছে-চেঁছে ফেলে দেওয়া। আর যারা ছুরি-চাকুকে ভয় পায়, তারা যেটা ছেঁটে ফেলতে চায়, তারা তার অ্যান্টি ডোজ— সেটা ফর টাইম বিইংও হতে পারে, নির্দিষ্ট কিছু দিনের জন্যও হতে পারে, আবার চিরস্থায়ীও হতে পারে। যে যেমনটা চায়, সেই মতো পাওয়ারের ডোজ খেয়ে নিলেই হল। তা হলেই একেবারে কেল্লা ফতে। সঙ্গে সঙ্গে সেই সব অনুভূতি একেবারে ভোঁ ভাঁ। সুতরাং ওই পদ্ধতিই তখন ব্যবহার করবে তারা। ফলে তাদের আর শোকতাপের কোনও হ্যাপাই থাকবে না।
সময়ের কথা শুনে অবাক বিস্ময়ে জুরান শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।
পাঁচ
জুরান বিজ্ঞানের গল্প পড়ে। কল্পবিজ্ঞানের গল্প পড়ে। সে রকমই একটি গল্পে সে পড়েছিল টাইম মেশিনের কথা। তাতে চড়ে নাকি একটা সময় থেকে আর একটা সময়ে চলে যাওয়া যায়।
এই ধরনের গল্পের সূত্রপাত প্রথম ঘটেছিল রামায়ণে। রৈবত নামে এক রাজা ব্রহ্মার সঙ্গে দেখা করার জন্য স্বর্গে গিয়েছিলেন। তিনি যখন ব্রহ্মার সঙ্গে দেখা করে পৃথিবীতে ফিরে আসেন, দেখেন, সব কিছু আমূল পাল্টে গেছে। তাঁর চেনাজানা যাঁরা ছিলেন, তাঁরা সবাই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। শুনে তো তিনি অবাক। এটা কী করে হয়!

ওখানে তো মাত্র কয়েক দিন ছিলেন তিনি! এর মধ্যে এত কিছু পাল্টে গেল কী করে! যাওয়ার সময় তিনি যাঁদের ছোট-ছোট দেখে গিয়েছিলেন, শুধু তাঁরাই যে মারা গেছেন, তাই-ই নয়, খোঁজ নিয়ে জানলেন, তাঁদের সন্তান-সন্ততিরাও মারা গেছেন। এখন যাঁদের দেখছেন, তাঁরা তাঁদের বংশধর ঠিকই, তবে কেউ চোদ্দোতম পুরুষ তো কেউ সতেরোতম পুরুষ। তার মানে তাঁর যাওয়া আর আসার মধ্যে পৃথিবীতে পার হয়ে গেছে অন্তত হাজারখানেক বছর!
শুধু ভারতের মহাকাব্যেই নয়, ঠিক এ রকমই অত্যন্ত প্রচলিত একটি পৌরাণিক গল্প আছে জাপানে। গল্পটির নাম— উরাসিমা তারো। পনেরো শতাব্দীর সেই গল্পে রয়েছে, জাপানের এক দরিদ্র মত্‌স্যজীবী একটি কচ্ছপকে নির্ঘাৎ মৃত্যুর কবল থেকে রক্ষা করেছিলেন। তাতে ওই দেশের ড্রাগনের দেবতা রিওজিন এতটাই সন্তুষ্ট হয়েছিলেন যে, পুরস্কার স্বরূপ তিনি তাঁকে সমুদ্রের তলায় তাঁর রাজত্ব রিউগুজো-তে আমন্ত্রণ করেন।

সেখানে তিন দিন তিন রাত কাটিয়ে সেই মত্‌স্যজীবী যখন তাঁর গ্রামের বাড়িতে ফিরে এলেন, দেখলেন, পৃথিবীতে তত দিনে তিনশো বছর পেরিয়ে গেছে।
এই ভাবে শুধু স্বর্গে বা পাতালেই নয়, পরবর্তিকালে বিভিন্ন দেশের কল্পবিজ্ঞানের নানান গল্পে বারবার ধরা পড়েছে ভিন্ন গ্রহের কথাও। অন্য গ্রহে মাত্র কয়েক দিন কাটিয়ে পৃথিবীতে এসে সেই সব গল্পের নায়ক দেখেছে, পৃথিবীর বয়স কখনও পেরিয়ে গেছে একশো বছর, কখনও আবার ন’শো বছর।

সেই সব গল্প ছোটদের ভিতরে এতটাই প্রভাব বিস্তার করত যে, মনে মনে তারা টাইম মেশিনে চড়ে চলে যেত ভবিষ্যতে। বড় হয়ে সে সব নিয়ে অনেকে আবার অনেক রকম কথাও বলেছেন। কিন্তু প্রথম যুক্তিসঙ্গত তত্ত্ব তুলে ধরেন বিশ্ববিখ্যাত বিশিষ্ট বিজ্ঞানী আইনস্টাইন। তিনি তাঁর ‘থিয়োরি অব রিলেটিভিটি’-তে বলেন E=mc -এর কথা। সেখানে ‘মাস এনার্জি ইকুইভ্যালেন্স ফর্মুলা’য় তিনি দাবি করেন, টাইম ট্র্যাভেল করা সম্ভব।

তিনি বলেন, আলোর চেয়ে বেশি গতি সম্পন্ন কোনও যান এখনও পর্যন্ত পৃথিবীতে তৈরি হয়নি। আলোর চেয়ে দ্রুত গতিতে যেতে পারে, এ রকম কোনও কিছু যদি মানুষ কোনও দিন আবিষ্কার করতে পারে, তা হলে অবশ্যই অতীতে যাওয়া যাবে।
তিনি অতীতে যাওয়ার কথা বললেও প্রফেসর স্টিফেন হকিন্স কিন্তু সেটাকে ফুত্‌কারে উড়িয়ে দিয়েছেন। বলেছেন, না। টাইম মেশিনে করে অতীতে যাওয়া সম্ভব নয়। তবে হ্যাঁ, যাওয়া যেতে পারে ভবিষ্যতে। একমাত্র ভবিষ্যতে। যেখানে সময় প্রায় স্থির হয়ে থাকে। এত আস্তে আস্তে এগোয় যে, সেটা ধর্তব্যের মধ্যেই পড়ে না।

আর সেই সময়ের ঘেরাটোপে যদি কেউ যান, তাঁর আয়ুও প্রায় ধ্রুবক হয়ে যাবে। মানে ওখানে যদি কেউ দশ দিন থাকেন, তা হলে যেহেতু তিনি ওখানে আছেন, তাই ওখানকার নিয়ম অনুযায়ী তাঁর আয়ু ওই দশ দিনই কমবে, তার চেয়ে এক ফোঁটা কম নয়, এক ফোঁটা বেশিও নয়। ওই দশ দিন পৃথিবীর হিসেবে একশো, দুশো কিংবা পাঁচশো বছর হলেও। ঠিক কত বছর, তা অবশ্য নির্ভর করবে ভবিষ্যতের কোন সময়ের আবর্তে তিনি ছিলেন, সেই সময়, স্থান, কাল, ভরের তারতম্যে।

অবশ্য আলোর নিজস্ব নিয়ম অনুযায়ী, শূন্যস্থানে আলোর গতির কথা না-হয় ছেড়েই দিচ্ছি, ওই পৃথিবীতে, এত বায়ুর স্তরের ভিতর দিয়ে বাধা পেতে পেতে গেলেও প্রতি সেকেন্ডে আলোর গতি কিন্তু ২৯৯৭৯২৪৫৯ মিটার। এর থেকে বেশি তো নয়ই, এর সঙ্গে সমানতালে পাল্লা দিতে পারে, এখনও পর্যন্ত এমন কোনও যান কিন্তু মানুষ বানাতে পারেনি। সম্ভবত আর পারবেও না। যে দিন পারবে, সে দিন যদি ওই যানে করে কেউ একটা দিন ভবিষ্যতে কাটিয়ে আবার পৃথিবীর মাটিতে ফিরে আসে, তা হলে সে দেখবে, ততক্ষণে পৃথিবীর বয়স বেড়ে গেছে একশো, দুশো বা তিনশো বছর।
ভ্রু কুঁচকে জুরান জিজ্ঞেস করল, আলোর চেয়ে দ্রুতগতি-যান কিংবা কল্পবিজ্ঞানের সেই টাইম মেশিন সত্যি সত্যিই যদি পৃথিবীর মানুষ কোনও দিন তৈরি করতে না-পারে, তা হলে কি তারা কোনও দিনই ভবিষ্যতে যেতে পারবে না?
— কেন পারবে না? ভবিষ্যতে পৌঁছনোর জন্য যে আলোর চেয়ে দ্রুতগতি যানই লাগবে, কে বলল?
— তা-হলে যাবে কী করে?
সময়-কণা বলল, পথটাকে ছোট করে নেবে।
— সেটা কী সম্ভব?
— সবই সম্ভব। শুধু একটু বুদ্ধি খরচ করতে হবে।
জুরান বলল, কিন্তু কী ভাবে?

— ধরো, এক মাইল লম্বা আর এক মাইল চওড়া একটা বিছানার চাদরের দু’প্রান্তে দুটো সন্দেশ রাখলে। এক প্রান্তের সন্দেশ যখন পিঁপড়েরা ছেঁকে ধরে অর্ধেকটা খেয়ে সাবাড় করে দিল, তখন তুমি চাইলে, অন্য প্রান্তের সন্দেশটাও ওই পিঁপড়েগুলো খাক। কিন্তু নিজের হাতে সন্দেশটা তুলে তুমি ওদের মুখের সামনে দিতে চাইছ না। পাশাপাশি তুমি জানো, ওরা ওদের সহজাত-প্রবৃত্তি দিয়ে ঠিক টের পেয়ে যাবে ওখানে একটা সন্দেশ আছে। কিন্তু ওই সন্দেশটা এত দূরে যে, ওখানে যেতে হলে ওদের প্রচুর সময় লেগে যাবে। অথচ তুমি চাইছ, ওরা তাড়াতাড়ি পৌঁছক। তা হলে তখন তুমি কী করবে?
— কী করব!
সময়-কণা বলল, সব চেয়ে সহজ উপায় যেটা, তোমার তো সেটাই করা উচিত।
জুরান বলল, সেটা কী?
সময়-কণা বলল, চাদরের তলা দিয়ে চুপিচুপি হাত ঢুকিয়ে মাঝখানটা ধরে আস্তে আস্তে চাদরটাকে মুঠোর মধ্যে গুটিয়ে নেওয়া।
— তাতে লাভ?

সময়-কণা বলল, চাদরটা মাঝখান থেকে যত গুটোবে, চাদরটা কমে যাওয়াতে ততই চাদরের দু’প্রান্ত কাছাকাছি চলে আসবে। ফলে এক মাইল নয়, আধ মাইলও নয়, এমনকী একশো মিটারও নয়, তুমি যদি চাদরটা আরও বেশি করে টেনে নিতে পারো, তা হলে দু’প্রান্তের দুই সন্দেশের দূরত্ব কমতে কমতে হয়তো কয়েক ইঞ্চিতে এসে ঠেকবে। ঠিক সে রকম, বর্তমান আর ভবিষ্যতের মাঝখানে যে অনন্ত পথ রয়েছে, সেই পথটাকে যদি এ রকম কোনও এক কৌশলে কমিয়ে আনা যায়, তা হলে ভবিষ্যতে পৌঁছনোর জন্য এখনকার ধারণা অনুযায়ী আলোর চেয়ে দ্রুতগতি-যান-এর আর দরকার হবে না। এখনকার যে রকেট আছে কিংবা অত্যন্ত সাধারণ গতির যে বিমান আছে অথবা সে রকম হলে, একটা ধ্যাড়ধেড়িয়া স্কুটারই তখন ভবিষ্যতে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট হয়ে উঠবে।

জুরান একেবারে বিস্মিত। ভাবতে লাগল, সে কী! এমনও হতে পারে! রাস্তাটা গুটিয়ে ফেলতে পারলেই কেল্লা ফতে! টাইম মেশিনের আর দরকার হবে না! একটা স্কুটার হলেই হল! বাঃ, বেশ তো… তার পরেই কী মনে হল, নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলল, সব ঠিকই আছে, কিন্তু এগুলো তো সব ভবিষ্যতের কথা। অনেকগুলো ‘যদি’র উপর দাঁড়িয়ে। এখনকার কথা তো সম্পূর্ণ আলাদা। অবশ্য সে যতই আলাদা হোক কিংবা যে যাই বলুক না কেন, এই মুহূর্তে একটা জায়গায় কিন্তু সবার মত এক। আর সেটা হল— টাইম মেশিন। না। পৃথিবীতে এখনও পর্যন্ত যা তৈরি হয়নি, কোনও দিন আদৌ তৈরি হবে কি না, যা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। হলেও, তার জীবদ্দশায় তো নয়ই, একমাত্র আলোর চেয়ে দ্রুতগামী সেই যান-এ করেই ভবিষ্যতে যাওয়া যায়।
চলবে   ………..
ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: