মহাশূন্যে জুরান — সিদ্ধার্থ সিংহ – পর্ব – ১৮

কাউকে ভূতে ধরলেও নানা ঝাড়-ফুঁক করে ওঝারা ঠিক তার কাঁধ থেকে ভূত নামিয়ে দেয়। এগুলি কি এমনি এমনি হয়? যে যা-ই বলুক। বলুক, ও সব ভাঁওতা। ভেলকি। ঠগবাজদের কারবার। আরে বাবা, কোনও কাজ না-হলে যুগ যুগ ধরে এত লোককে কি গুটিকতক ওঝা বা গুনিন দিনের পর দিন বোকা বানিয়ে আসতে পারে! কিছুতেই পারে না। অন্তত আমি বিশ্বাস করি না।
নিশ্চয়ই কিছু একটা আছে! আমার তো মনে হয়, মন্ত্র আছে। মন্ত্রের গুণও আছে। আছেই। কিন্তু কিছু কিছু অজ্ঞ, অনভিজ্ঞ গুনিনের ভুলভাল উচ্চারণ এবং প্রয়োগের ভুলত্রুটির জন্যই ঠিক মতো কাজ হয় না। তাই কেউ কেউ হয়তো ও সবের উপর থেকে আস্থা হারিয়েছেন। বিশ্বাস হারিয়েছেন। ভরসা করতে শুরু করেছেন পুলিশের ওপরে। কিন্তু পুলিশও কি সব সময় সব কিছু ঠিকঠাক মতো উদ্ধার করে দিতে পারেন! শনাক্ত করতে পারেন যথার্থ অপরাধীকে! তবে!
না। পুলিশ নয়। জুরানকে সত্যিই যদি আজ না পাওয়া যায়, তা হলে পুলিশের কাছে যাওয়ার আগে তাঁকে একবার ভাল কোনও গুনিনের কাছে যেতে হবে। যিনি গুনে বলে দিতে পারবেন, তাঁর ছেলে এখন কোথায় আছে, কেমন আছে। এবং তার থেকেও বড় কথা, কত দিনের মধ্যে ফিরে আসবে। কিন্তু সে রকম কোনও গুনিন কি এখানে একজনও আছেন! থাকলে কোথায়, এখন সবার আগে তাঁকে এটা জানতে হবে। জানতেই হবে।
সতেরো
জুরান হঠাৎ দেখল, তাদের পাশ থেকে চিক চিক করতে করতে একটা আলো, আলোর চেয়েও দ্রুত গতিতে তিরিক করে চলে গেল। একটা নয়, দুটো নয়, পর পর অনেকগুলো। এ রকম জিনিস জুরান আগে কখনও দেখেনি। তাই কৌতূহলবশত জিজ্ঞেস করল, এগুলো কী?
নির্বিকার ভাবে সময়-কণা বলল, ছবি।
জুরান অবাক। ছবি?
— হ্যাঁ, ছবি।
— কোথায়? আমি তো কোনও ছবি দেখতে পেলাম না।
সময়-কণা বলল, সেটাই তো স্বাভাবিক। ওগুলো খালি চোখে দেখা যায় না।
— তা হলে?
— ওগুলো স্যাটেলাইটের মাধ্যমে কপি করে অ্যালিউয়েশনের পর্দায় ফেলে দেখতে হয়।
তাজ্জব হয়ে গেল জুরান। ও মা! তাই নাকি? কারা পাঠাচ্ছে এগুলো?
ফের ধীরস্থির ভাবে সময়-কণা বলল, প্যারাকুলা গ্রহ।
— প্যারাকুলা গ্রহ! এ রকম কোনও গ্রহের নাম তো আমি শুনিনি।
— শোনোনি মানে? তোমার কি শোনার কথা ছিল নাকি? তুমি ক’টা গ্রহের কথা জানো? তুমি কেন, এখানে না-এলে তোমার পরের সাতাশতম প্রজন্মও ওই গ্রহের নাম জানতে পারবে না। শুধু নামটা কানে শুনতে পারত আঠাশতম প্রজন্ম। আর তার ছবি দেখতে দেখতে পেরিয়ে যেত আরও দু’দুটো প্রজন্ম।
জুরান হতবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ওটা কি অনেক দূরে?
— দ্যাখো, এই ‘অনেক’, ‘কিছু’, ‘অল্প’— এগুলো বড় ভেক কথা। এগুলোর কোনও মানে হয় না। লোক ভেদে, সময় ভেদে এই শব্দগুলো পাল্টে যায়। তা তোমার কাছে ‘অনেক’ মানে কতটা, সেটা তো আমি জানি না। তবে বলতে পারি, তোমাদের পৃথিবীর হিসেব অনুযায়ী এই ছবিগুলো ভেসে আসছে চার হাজার সাতশো একানব্বই আলোকবর্ষ দূর থেকে।
জুরানের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। আলোকবর্ষ! আলোকবর্ষ মানে তো এক বছরে আলো যত দূরে যায়, ততটা। সেটাই তো কল্পনার বাইরে। সেখানে চার হাজার… সাতশো… একানব্বই… আলোকবর্ষ!
— হ্যাঁ। শুধু প্যারাকুলাই নয়, প্যারাকুলার মতো আরও অনেক গ্রহই এই ভাবে তাদের গ্রহের ছবি নিয়মিত মহাশূন্যে পাঠিয়ে যাচ্ছে।
— কিন্তু কেন?
খুব ঠান্ডা গলায় সময়-কণা বলল, কারণ, সমস্ত গ্রহই চায় অন্য গ্রহকে তাদের অস্তিত্বের কথা জানাতে। তোমাদের গ্রহের পাশ থেকেও এ রকম বহু বহু ছবি ভেসে গেছে। এখনও যাচ্ছে।
— কোথায়! আমি তো তা শুনিনি।
— শুনবে কী করে? ওই ছবি ধরা তো দূরের কথা, ওই ছবি যাওয়ার সংকেত পাওয়ার মতো যন্ত্রও যে তোমরা এখনও তৈরি করতে পারোনি। যারা সেটা পেরেছে, তারা ওই ছবিগুলোকে ঠিক ধরে নেয়। তার পর সেটা নিয়ে গবেষণা করে। পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করে বার করে, কোন গ্রহ থেকে ওটা এসেছে। সেই গ্রহটা কত দূরে। সেই গ্রহের অধিবাসীরা কতটা উন্নত। তাদের ক্ষমতা কতটা। তারা কী করতে পারে। তাদের মানসিকতা কেমন। তাদের কথা যে তারা জানতে পেরেছে, সেটা তাদের জানানো উচিত হবে কি না। তার পর সেই ভাবে তারা এগোয়।
সময়-কণা অনেক কিছু বলে যাচ্ছে। কিন্তু জুরানের কানে তা আদৌ ঢুকছে না। সে তখন তার পৃথিবীর কথা ভাবছে। তাই বিড়বিড় করে সে বলল, আমি তো শুনেছিলাম, আমাদের পৃথিবীও নাকি গাছপালা, নদী-নালা, পাহাড়, জীবজন্তু, মানুষের ছবি তুলে এই ভাবেই মহাশূন্যে নিয়মিত পাঠাচ্ছে।
— সেটা তো এই সে দিনের কথা। কিন্তু তোমাদের চেয়েও লক্ষ লক্ষ বছর আগে থেকেই বহু গ্রহ এ সব পাঠাচ্ছে।
— তাই! আচ্ছা, এগুলো যে আমাদের পৃথিবীর পাঠানো ওই ছবিগুলো নয়, আপনি সেটা বুঝলেন কী করে?
— কারণ তেইশ।
নড়েচড়ে বসল জুরান। তেইশ! সেটা আবার কী?
— ওটাই হল প্যারাকুলার কোড।
— কোড!
সময়-কণা জোর দিয়েই বলল, হ্যাঁ কোড। যেমন তোমাদের পৃথিবীর কোড তিন।
— তিন?
— হ্যাঁ, তিন। কারণ, তোমাদের পৃথিবীর সৃষ্টি রহস্যের পেছনে আছে তিন। যেমন দেখবে, তোমাদের ইজিপ্টে পিরামিড তৈরি হয়েছে পর পর তিনটি। তার প্রত্যেকটার আদলও ত্রিকোণা। মানে তিনটে কোণ। তোমরা যে ঈশ্বরের উপাসনা করো, তোমাদের ধারণা, সেই দেবতাদেরও চোখ তিনটি। মানুষের মতো দু’পাশে দুটো। আর একটা কপালের ঠিক মধ্যিখানে। এবং সেই তিনটি চোখ বরাবর তিনটি সরল রেখা টানলে দেখা যাবে, সেখানেও তৈরি হয়েছে একটি ত্রিভূজ।
শিবের হাতে যে ত্রিশূল থাকে, সেই ত্রিশূলের নামের মধ্যেও কিন্তু ‘তিন’ শব্দটা লুকিয়ে আছে। যিশুখ্রিস্টের দু’পাশে ছড়ানো হাতের শেষ প্রান্ত দুটি থেকে জোড়া লাগা দু’পায়ের বুড়ো আঙুল অবধি যদি কল্পনা করো, দেখবে, সেটাও একটা ত্রিকোণ আকার নেবে। শুধু তাই নয়, তোমাদের প্রধান ঈশ্বরও একজন দুজন নয়, পাক্কা তিন জন। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর। শুধু তোমাদের দেশেই নয় বা তোমাদের ধর্মেই নয়, পৃথিবীর সর্বত্রই ওই তিন বা ত্রিকোণ বিরাজ করছে। তোমরাই ভাগ করেছ তিনটি স্তর— স্বর্গ, মর্ত, পাতাল। তোমরা যে চলমান প্রাণীরা পৃথিবীতে থাকো, তাদের আবাসস্থলও কিন্তু তিন রকম— জল, স্থল এবং অন্তরীক্ষ।
আবার খেয়াল করে দ্যাখো, তোমরা থাকো পৃথিবীতে ঠিকই, কিন্তু বাঁচার জন্য লাগে আরও দু’দুটো গ্রহের সাহায্য। যেমন সূর্যের রোদ না হলে গাছ বাঁচবে না। গাছ না বাঁচলে তোমরা শ্বাস নিয়ে যে নাইট্রোজেন ছাড়ো, সেটা আর অক্সিজেনে পরিণত হবে না। ফলে তোমাদের বাঁচার জন্য যেটা ন্যুনতম প্রয়োজন, সেই অক্সিজেনের অভাবেই তোমরা মারা যাবে। ঠিক তেমনি আর একটি গ্রহ হল চাঁদ। চাঁদ না-হলে তোমাদের পৃথিবীর অনেক কিছুই থমকে যাবে। নদীতে জোয়ার হবে না। ভাঁটা হবে না। পৃথিবীর ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাবে। সুতরাং বুঝতেই পারছ, পৃথিবীর যে দিকেই তাকাও না কেন, সে দিকেই দেখবে, এই চাঁদ, সূর্য আর পৃথিবীর মতোই সব জায়গাতেই তিনের একটা জট রয়েছে। আবার দ্যাখো, পৃথিবীর জলাশয়ও কিন্তু স্থলের তুলনায় তিন গুণ।
জুরান চমকে উঠে বলল, হ্যাঁ, তাই তো! এই ভাবে তো কখনও ভাবিনি।
— তোমরা যে কথায় কথায় দিব্যি কাটো, সেটাও কিন্তু ওই তিন বার— সত্যি সত্যি সত্যি। তিন সত্যি।
— হ্যাঁ, তাই তো!
— সে জন্যই পৃথিবীকে আমরা তিন হিসেবে ধার্য করেছি। আর প্যারাকুলাকে তেইশ।
— প্যারাকুলাকে তেইশ কেন?
মুচকি হেসে সময়-কণা বলল, তোমাদের যেমন সব কিছুতেই তিন, ওদেরও তেমনি সব কিছুতেই তেইশ। এই যে পর পর ছবিগুলো গেল, সেটাও কিন্তু তেইশখানারই একটা লট।
— ও,,, তাই বুঝি? আমি তো গুনিনি। আচ্ছা, সব গ্রহকেই কি আপনারা সংখ্যা দিয়ে চিহ্নিত করেন?
— না না। একদম না। কোনও কোনও গ্রহকে সংখ্যা দিয়ে। কোনও কোনও গ্রহকে শুধু নামে। আবার কোনও কোনও গ্রহকে বিশেষ কোনও রঙে।
ভ্রু কোঁচকালো জুরান, রঙে!
— হ্যাঁ রঙে। এই মহাশূন্যে এমন অনেক গ্রহ আছে যেখানে সব কিছুরই রং এক।
— সে কী! এ রকম আবার হয় নাকি? গাছপালা, জীবজন্তু, লোকজন— সব। সব এক রং?
— সব গ্রহেই যে তোমাদের পৃথিবীর মতো গাছপালা, জীবজন্তু, লোকজন আছে, কে বলল? এমন অনেক গ্রহ আছে, যেগুলো শুধুই আগুনের। একেবারে লাল টকটকে।
— তা হলে সেটাকে আগুনের পিণ্ড বলুন। ওটাকে গ্রহ বলার কোনও মানেই হয় না।
জুরানের এ রকম কথা শুনে একটু থতমত খেয়ে গেল সময়-কণা। বলল, কেন?
যুক্তি দেখানোর চেষ্টা করল জুরান। কারণ, ওখানে তো কোনও প্রাণ নেই।
— কে বলল প্রাণ নেই?
বিস্ময় ভরা চোখে জুরান বলল, আগুনের মধ্যে প্রাণ থাকবে কী করে?
— যে ভাবে বায়ুর মধ্যে তোমরা আছ। তুমি যেমন ভাবছ, আগুনের লেলিহান শিখার মধ্যে প্রাণ থাকবে কী করে, ঠিক তেমনি আগুনের মধ্যে যারা আছে, তারাও তো ভাবতে পারে, বায়ুর সমুদ্রের মধ্যে প্রাণ থাকবে কী করে? হাবুডুবু খাবে না! ডুবে যাবে না? যতই সাঁতার জানুক, চোখ-মুখ দিয়ে বায়ু ঢুকে দম-বন্ধ হয়ে কি ওরা মরে যাবে না?
— সে কী! এ রকম আবার কেউ ভাবতে পারে নাকি!
— তোমরা যদি ভাবতে পারো আগুনের মধ্যে কোনও প্রাণ বাস করতে পারে না, তা হলে ওরাও তো এটা ভাবতে পারে। তাই নয় কী?
— হ্যাঁ, ঠিকই তো! তা হলে তো পৃথিবীর লোকদের এক্ষুনি এটা জানিয়ে দেওয়া দরকার।
— কোনটা?
— যেটা আপনি বলছেন, সেটা। এটা জানতে পারলে ওরা হয়তো আবার নতুন করে ভাবনা-চিন্তা শুরু করবে। আপনি হয়তো জানেন না, আমাদের পৃথিবীর লোকেরা মঙ্গল গ্রহে যান পাঠিয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে, ওখানে জল আছে কি না জানার জন্য।
— জানি। কিন্তু কেন যে তোমরা জলের খোঁজ করছ কে জানে!
— কারণ, আমাদের পৃথিবীর লোকেদের ধারণা, জল না-থাকলে প্রাণও থাকতে পারে না। জলই আসল। প্রাণীরা তুচ্ছাতিতুচ্ছ, এক্কেবারে ছোট্টও হতে পারে। এত ছোট যে অত্যাধুনিক মেশিনেও সেগুলো ধরা নাও পড়তে পারে। কিন্তু জল? জলাশয় তো বড় হবেই। আর সেই জলাশয় যদি খুঁজে পাওয়া যায়, তা হলে ব্যয়সাপেক্ষ হলেও, সেখানে প্রাণের অস্তিত্ব আছে কি না, তার জন্য তল্লাশি চালানো যেতেই পারে। কারণ, যেখানে জল আছে, সেখানে নাকি প্রাণেরও একটা সম্ভাবনা আছে।
— তোমাদের এই ধারণাটাই তো ভুল। পৃথিবীতে জল ছাড়া কিচ্ছু ভাবা যায় না ঠিকই, কিন্তু তাই বলে মঙ্গল গ্রহেও যে জলই সব, সেটা কে বলল? সেখানে তো জলের বদলে অন্য কিছুও হতে পারে। এটা তোমাদের বিজ্ঞানী বা গবেষকদের মাথাতেই এল না! আগুনের পিণ্ডে যদি প্রাণ থাকতে পারে, মহাশূন্যে যদি প্রাণ ভেসে বেড়াতে পারে, মঙ্গল গ্রহে প্রাণ থাকবে না!
চকচক করে উঠল জুরানের চোখ। আছে?
বেশ জোরের সঙ্গেই সময়-কণা বলল, আলবাত আছে। তবে তার আগে জানতে হবে প্রাণ বলতে তোমরা কি বোঝো?
— প্রাণ বলতে? প্রাণ মানে, যে জন্মায়, যে মরে, যে শ্বাসপ্রশ্বাস নেয়, খায়, ঘুমোয় এবং বংশ বিস্তার করে, সেটাই প্রাণ।
— না। এখানেও তোমাদের ভুল। তুমি যেগুলোর কথা বলতে চাইছ, আমি সেটা বুঝতে পেরেছি। ওগুলো হচ্ছে আধার। যার মধ্যে প্রাণ থাকে, তোমরা সেটাকেই প্রাণ মনে করো। একটা বাটিতে যদি দুধ থাকে, তোমরা কি দুধটাকেই বাটি বলবে? প্রাণ যে আসলে কী, তোমরা সেটাই জানো না।
আমরা জানি না! জুরান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, তা হলে সেটা কী?
এক মুহূর্ত থমকে, যেটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল, তার থেকে একেবারে একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে সময়-কণা বলে উঠল, বাব্বা! এত টান!
— টান?
— ছেলের উপরে বাবার।
— মানে?
চোখের ইশারায় সময়-কণা বলল, ওই দ্যাখো।
বলতে না-বলতেই জুরানের চোখের সামনে ভেসে উঠল গাঢ় বেগুনি রঙের একটা আলোর পর্দা। আর সেই পর্দার দিকে তাকাতেই ও দেখতে পেল, উজ্জ্বল হলদে রঙের অতি সূক্ষ্ম মশারির মতো একটা আলোর জালের মধ্যে পদ্মাসন হয়ে বসে আছেন তার বাবা। আর সেই জালটা মহাশূন্য ভেদ করে প্রচণ্ড গতিতে তাদের দিকে ধেয়ে আসছে। এত জোরে ধেয়ে আসছে যে, মনে হচ্ছে, এক্ষুনি তাদের ছুঁয়ে ফেলবে। এক্ষুনি।
আঠারো 
তিতার অবাক হয়ে গেলেন। এ কী রে বাবা! এ কী ম্যাজিক জানে, না কি! ছিল মৎস্যকন্যা। হয়ে গেল ধোঁয়া। এখন আবার মশারির থলে হয়ে তার মধ্যে তাঁকে পুরে হু হু করে উপরে উঠছে তো উঠছেই। সেই থেকে ঠায় এক ভাবে বসে যেতে যেতে তিনি একেবারে হাঁপিয়ে উঠেছেন। একটু উঠে দাঁড়িয়ে যে আড়মোড়া ভেঙে নেবেন তারও উপায় নেই।

অথচ এ! কোথাও দু’দণ্ড দাঁড়িয়ে এতটুকু বিশ্রাম পর্যন্ত নেয়নি। কী দম রে বাবা! তার কীর্তিকলাপ দেখে এ বার কেমন যেন একটু সন্দেহ-সন্দেহ ঠেকছে তাঁর। এর কথা শুনে এই ভাবে বেরিয়ে পড়া তাঁর বোধহয় ঠিক হয়নি! সে তাঁকে তাঁর ছেলের কাছেই নিয়ে যাচ্ছে তো! কিন্তু কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তাঁকে! তিনি তো ভেবেছিলেন তাঁকে বুঝি অন্য কোনও রাজ্য কিংবা তাঁর দেশের লাগোয়া আশপাশের কাছাকাছি কোনও দেশে নিয়ে যাবে। কিন্তু দেশ-টেশ নয়, তাঁকে তো মনে হচ্ছে পৃথিবীর বাইরে অন্য কোথাও নিয়ে যাচ্ছে।

উপরে তাকাতেই মশারির ভেতর থেকে তিনি দেখতে পেলেন, পৃথিবীটা ছোট হতে হতে একেবারে একটা বিন্দু হয়ে তাঁর চোখের সামনেই হুস করে কেমন যেন মিলিয়ে গেল। মৃত্যুর পর মানুষ যখন পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়, শুধু দেহটা পড়ে থাকে নীচে, সে কি যেতে যেতে দূর থেকে এ ভাবেই পৃথিবীটাকে মিলিয়ে যেতে দেখে! তার মানে! তবে কি তিনিও এখন পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চিরদিনের জন্য চলে যাচ্ছেন! তাঁর কি মৃত্যু হয়েছে!
চলবে   ………..
ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: