মহাশূন্যে জুরান — সিদ্ধার্থ সিংহ – পর্ব – ২২

জুরান এতক্ষণ ধরে সব চুপচাপ শুনছিল। এ বার বলল, এটা আপনারা তৈরি করেছেন!
— তা হলে কে করবে?
— আমরা তো জানি, এই গ্রহ-নক্ষত্র-তারা— সবই ঈশ্বরের সৃষ্টি।
খুব ধীরস্থির ভাবে সময়-কণা বলল, ঠিকই জানো। তোমাকে একটু আগে কী বললাম? তোমাদের ঈশ্বর আসলে অন্য কেউ নয়, আমরা।
তিতার প্রশ্ন করলেন, কিন্তু… এত গ্রহ-তারা আপনারা বানালেন কী করে?
— যে ভাবে তোমরা তোমাদের কল-কারখানায় হাজার হাজার বাক্স-প্যাটরা তৈরি করো। লক্ষ লক্ষ চামচ বানাও। কোটি কোটি টিপের পাতা অনায়াসে বার করো, খানিকটা সেই ভাবেই।
— সে কী! তোমাদের কাছে গ্রহ-তারা বানানোর কারখানা আছে?
— প্রায় সে রকমই বলতে পারো। আসলে, আমাদের মধ্যে কেউ একটা নতুন গ্রহ বানালেই, তার চেয়েও ভাল গ্রহ বানানোর জন্য উঠেপড়ে লেগে যায় আর এক গ্রহবাসী। সেটা তৈরি হলেই, তার চেয়েও সুন্দর, মনোরম, শান্তির গ্রহ বানানোর জন্য মেতে ওঠে অন্য আর এক গ্রহবাসী।
— অদ্ভুত তো!
সময়-কণা শান্ত গলায় বলল, না। অদ্ভুত নয়। এটা ভূত। বর্তমান। এবং ভবিষ্যৎও। অবশ্য এখন পর্যন্ত।
— তার মানে? পরে কি পাল্টাবে নাকি?
— সেটা এখন বলা যাবে না। সময় হলেই জানতে পারবে।
তিতার থমকে গেলেন। বললেন, সময়! জুরান যে বলল, আপনিই সময়।
— ও ভুল বলেনি। আমি সময় ঠিকই, তবে পুরো সময় নয়। সময়ের একটা কণামাত্র। আসলে অনেকগুলো বিন্দু-বিন্দু সময়-কণা নিয়েই তো তৈরি হয়েছে সময়। আমি সেই সময়ের শুধু একটা বিন্দু। তোমাদের শরীর থেকে বিন্দু-বিন্দু মরা চমড়া যেমন প্রতিদিন ঝড়ে যায়, আবার রোজই প্রায় তার সমপরিমাণ চামড়া নতুন করে গজায়। ফলে তোমরা টেরই পাও না, শরীরের মধ্যে কত বড় একটা কর্মকাণ্ড চলছে। ঠিক তেমনি, পূর্ণাঙ্গ সময় থেকেও প্রতি মুহূর্তে ঝড়ে ঝড়ে পড়ছে এক-একটা সময়-কণা। আর তার জায়গায় এসে জুড়ে বসছে নতুন এক-একটা সময়-কণা। যে-কণাগুলি জানে ‘পাল্টাবে কি পাল্টাবে না’ তারা এখনও আসেনি। তবে আসবে। খুব তাড়াতাড়িই আসবে। আর একটু অপেক্ষা করো, ঠিক দেখতে পাবে। পাবেই।
বাইশ
ইমলিকে হন্তদন্ত হয়ে গেট দিয়ে ঢুকতে দেখে কেয়ারটেকার ছেলেটা চট করে খাটিয়া থেকে উঠে কী যেন জিজ্ঞেস করার জন্য তড়িঘড়ি এগিয়ে গেল। কিন্তু সে দিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ করলেন না ইমলি। সিঁড়ির এক-একটা ধাপ টপকে টপকে প্রায় হরিণের মতো লাফাতে লাফাতে চার তলায় উঠে গেলেন। দরজার কাছে যেতেই তিনি দেখলেন, তাঁদের ফ্ল্যাটের দরজা হাট করে খোলা। আর সেটা দেখামাত্রই তাঁর মুখের উপরে যেন এক ঝলক বিশুদ্ধ বাতাস আছড়ে পড়ল।
সেই বিশুদ্ধ বাতাস বুক ভরে নেওয়ার জন্য, নাকি একটানা এতগুলি সিঁড়ি দুদ্দাড় করে ভেঙে ওঠার জন্য হাঁপিয়ে পড়েছিলেন বলে, ঠিক বোঝা গেল না। বড় একটা শ্বাস নিলেন তিনি। তাঁর মনে হল, যার জন্য তিনি সকাল থেকে হন্যে হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন, সেই জুরানকে কি তা হলে তাঁর স্বামী খুঁজে পেয়েছেন!
যাক বাবা, বাঁচা গেল। ঠাকুর যা করেন, ভালর জন্যই করেন। তার পরেই উপরের দিকে তাকিয়ে ঠাকুরের উদ্দেশে বারকতক প্রণামও করলেন তিনি। মনে মনে একটু গোসাও হল তাঁর। ছেলেকে নিয়ে বাড়ি এসেছেন, অথচ সেই খবরটা যে তাঁকেও জানানো দরকার, তিনিও যে চিন্তা করছেন, এ কথাটা একবারও তিতারের মনে হল না! ভারী অদ্ভুত তো!
ভাবতে ভাবতে ফ্ল্যাটের ভিতরে ঢুকে পড়লেন ইমলি। এ ঘরে ও ঘরে উঁকি মারতে লাগলেন। জুরান যে ঘরে শোয়, সে ঘরে পা রাখতেই দেখলেন, যে জামাপ্যান্ট পরে জুরানকে খোঁজার জন্য সক্কালবেলায় তাঁর সঙ্গে তিতার বেরিয়েছিলেন, সেই জামাপ্যান্টগুলো মেঝের উপরে পড়ে আছে।
এটা দেখে একটু অবাকই হলেন তিনি। তিতার যতই অন্যমনস্ক হোন না কোন, উনি তো এতটা অগোছালো নন। আজ পর্যন্ত উনি কখনও জামাপ্যান্ট খুলে খাটের উপরেই ফেলে রাখেননি, তো মেঝের উপরে! বরং ছেলে বা তিনি কখনও ভুল করে এ দিকে ও দিকে কিছু ফেলে রেখে দিলে উনি ঠিক গুছিয়ে-গাছিয়ে তুলে রাখেন। সেখানে উনি এই ভাবে জামাপ্যান্টগুলো ফেলে রেখেছেন!
একটু খটকা লাগল ঠিকই, তার পরেই তাঁর মনে হল, ছেলে এ ভাবে হঠাৎ করে উধাও হয়ে যাওয়ায় তাঁর মতো ওঁরও বুঝি আজ সব কিছু ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। হতে পারে, হতেই পারে। এটা নিশ্চয় তারই একটি।
ঠিক আছে এটা না-হয় বুঝলাম। কিন্তু কথা হচ্ছে, ওরা গেল কোথায়! ও ঘরে নেই। এ ঘরে নেই। কর্পূরের মতো হাওয়ায় উবে গেল নাকি! নাকি ওরা এখনও ফেরেইনি! তবে কি তিতার তাঁর ছেলেকে এখনও খুঁজেই পাননি! সকালে পরা ওঁর জামাপ্যান্টগুলো মেঝের উপরে এই ভাবে পড়ে থাকতে দেখে তাঁর তো মনে হচ্ছে উনি এসেছিলেন। তা হলে কি জামাপ্যান্ট পাল্টে উনি আবার ছেলেকে খুঁজতে গেছেন!
পারেও বাবা! ছেলে আগে, না পোশাক আগে! নাকি অনেক দূরে কোথাও গেছেন! এমনও তো হতে পারে, জুরানকে দূরে কোথাও একা দেখতে পেয়ে আমাদেরই কোনও আত্মীয় বা পরিচিত কেউ তিতারকে ফোন করে জানিয়েছেন, তোমার ছেলেকে এখানে দেখলাম। আর সেটা শুনেই উনি অমনি ছেলের জন্য ওখানে ছুটেছেন। জায়গাটা এত দূরে যে সকালের এই জামাপ্যান্ট পরে সেখানে যাওয়াই যায় না। হতে পারে! হতেই পারে!
না। এ সব ভেবে আর সময় নষ্ট করা যাবে না। তিতার যে ভাবে তাঁর ছেলেকে খুঁজছেন, খুঁজুন। আমিও আমার মতো করে চেষ্টা চালিয়ে যাই। যেটায় কাজ হয় হোক। মোদ্দা কথা, আমাদের ছেলেকে পেলেই হল। যে ভাবে পড়ে আছে, পড়ে থাক। গুছিয়ে রাখা তো নয়ই, এই জামাপ্যান্টগুলো তুলতে গিয়ে সামান্য সময়টুকুও নষ্ট করতে চান না তিনি। তাঁকে এক্ষুনি আলমারি থেকে আট হাজার টাকা নিয়ে ওই তান্ত্রিকের কাছে ছুটতে হবে। জুরানকে যারা আটকে রেখেছে, তাদের বশীকরণ করে, তাদের কবল থেকে ওঁদের সবেধন নীলমণি একমাত্র ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে হবে। তাঁর কাছে এটাই এখন সব চেয়ে জরুরি কাজ। সব চেয়ে জরুরি।
বড় বড় পা পেলে নিজের ঘরে গিয়ে আলমারির চাবি বার করার জন্য যেই ড্রেসিং টেবিলের দেরাজটা টান মেরেছেন, অমনি ওঁর কানের কাছে কে যেন ফিসফিস করে বলল, তুঁ মুঁ ছুঁ… তুঁ মুঁ ছুঁ… তুঁ মুঁ ছুঁ…
কে বলল কথাটা! ঝট করে পিছন ফিরে তাকালেন। দেখলেন, কেউ কোত্থাও নেই। টেনশনে থাকলে বুঝি এ রকমই হয়। নানান চিন্তা মাথার মধ্যে এসে ভিড় করে। হুটোপাটি করে। দামাল নৃত্য শুরু করে দেয়। তখন কী শুনতে লোকে যে কী শোনে, তার কোনও ঠিক-ঠিকানা থাকে না।
হ্যাঁ, এই ড্রেসিং টেবিলটা অনেক পুরনো। খুব দরকার না-হলে দেরাজটা খোলাই হয় না। বর্ষাকালে খুলতে হলে একেবারে কালঘাম ছুটে যায়। তিতারকে ডাকতে হয়। নানান রকম কারিকুরি করে, টানা-হ্যাঁচড়া করে, এটা-সেটা করে, দুজনে মিলে গায়ের জোর আর বুদ্ধি খাটিয়ে কোনও রকমে খোলেন।
অন্য সময় অবশ্য অত কিছুর দরকার হয় না। তবে আঁটোসাঁটো দেরাজটা খুলতে গেলে একটু-আধটু ক্যাঁচকুঁচ আওয়াজ হয় বইকী। কিন্তু সে আওয়াজ তো এ রকম নয়। না। তিনি ভুলই শুনেছেন। যতক্ষণ না ছেলেকে তিনি পাচ্ছেন, ততক্ষণ বোধহয় এ রকমই উদ্ভট-উদ্ভট শব্দ তিনি শুনতেই থাকবেন।
হ্যাঁ, এই তো, দেরাজটা একটু ফাঁক হয়েছে। এ বার একটু জোরে টান দিলেই যেটুকু খুলবে, তার মধ্যে দিয়ে হাত গলিয়ে একটু হাতড়ালেই চাবির গোছাটা নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে, এটা মনে করে আরও একটু জোর লাগিয়ে যেই একটা হ্যাঁচকা টান মেরেছেন, অমনি ফের তাঁর কানে ভেসে এল, তুঁ মুঁ ছুঁ… তুঁ মুঁ ছুঁ… তুঁ মুঁ ছুঁ…
না। এ বার আর পিছন ফিরে তাকালেন না ইমলি। সরাসরি ড্রেসিং টেবিলের আয়নাটার দিকে তাকালেন। আয়নাটা বেলজিয়াম কাচের। এ সব এখন আর পাওয়া যায় না। ডিজাইনটাও একেবারে আদ্যিকালের। তিতারের দাদু বা দাদুর বাবা হয়তো শখ করে কখনও কিনেছিলেন।
আয়নাটার ডান দিকে আর বাঁ দিকে দরজার পাল্লার মতো দারুণ নকশা করা সেগুন কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো আরও দু’-দুটো আয়না রয়েছে। দু’দিক দিয়ে ভেজিয়ে দিলে সামনের আয়নাটা একেবারে পুরো ঢেকে যায়। আবার খুলে দিলে পাল্লা দুটো এমন তেরচা ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে যে, ও দিকে তাকালে ঘরের প্রতিটা কোণই একদম স্পষ্ট দেখা যায়।
সেটা দেখার জন্য আয়নাটার দিকে তাকাতেই চমকে উঠলেন ইমলি। এটা কে! হ্যাঁ, তিনিই তো! তবে তিনি আজকের ইমলি নয়। আজ থেকে বহু বহু বছর আগের ইমলি। তখন তিনি এই এইটুকুনি ছিলেন। ফ্রক পরতেন। মাথার দু’দিকে দুটো বিনুনি ঝুলত। সেই বিনুনিতে শোভা পেত চুল বাঁধার ফিতে দিয়ে বানানো নানান নকশার বাহারি ফুল। কখনও লাল, কখনও সবুজ আবার কখনও বা নীল।
আজ তাঁর বিনুনিতে ঝুলছে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া ফ্যাকাশে একটা ফুল। কিন্তু ওঁর কোলে ওটা কী! একটা বিড়ালছানা না! ও মা, কী সুন্দর ফুটফুটে! পিটপিট করে তাকাচ্ছে। তাঁকেই দেখছে মনে হয়। দেখেই বড় আদর করতে ইচ্ছে করল ওঁর। আর আদর করার জন্য যেই হাত বাড়ালেন, অমনি বিড়ালছানাটা যেন মুখ ঘুরিয়ে নিল। আর সেটা দেখেই তাঁর মনে পড়ে গেল, আর একটা বিড়ালের কথা। সেও ঠিক এ ভাবেই মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল।
সে দিন রোজকার মতো বাবার সঙ্গে উনি পার্কে গিয়েছিলেন। পুরো পার্কটাই ছিল মানুষ-সমান লোহার মোটা মোটা শিক দিয়ে ঘেরা। ভিতরে কোনও যানবাহন তো নয়ই, সামান্য সাইকেল চালানোও ছিল নিষিদ্ধ। আর যেহেতু দু’দিকের গেটেই পাহারাদার থাকত। ফলে বাবা-মা কিংবা কোনও অভিভাবক ছাড়া কোনও বাচ্চাই একা বাইরে বেরোতে পারত না। তাই বাবা-মায়েরা একদম নিশ্চিন্ত থাকতেন। নিয়মিত যাতায়াত করতে করতে সবার সঙ্গে সবারই চেনাজানা হয়ে গিয়েছিল। তাই বাচ্চাদের পার্কের ভিতরে ছেড়ে দিয়ে মায়েরা যেমন ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে নিশ্চিন্তে গল্পগুজব করতেন। তেমনি বাবারাও এখানে সেখানে জটলা বেঁধে আড্ডা দিতে বসে যেতেন।
সে দিন ওঁর বাবা যখন বন্ধুদের সঙ্গে গল্পে মশগুল, তখন খেলতে খেলতে হঠাৎ তাঁর নজরে পড়ে, পার্কের এক কোণে একটা টগর গাছের তলায় দুটো ছানাকে নিয়ে শুয়ে আছে একটা মা-বিড়াল।
উনি সঙ্গে সঙ্গে সেখানে গিয়ে একটা বিড়ালছানাকে কোলে তুলে নিয়েছিলেন। আদর করতে করতে নিয়ে এসেছিলেন বন্ধুদের কাছে। তারাও সবাই মিলে বিড়ালছানাটাকে আদর করতে শুরু করেছিল। আলতো করে গায়ে হাত বোলাচ্ছিল। কেউ কেউ কোলে নিতে চাইছিল। উনি তখন বলেছিলেন, দাঁড়া, আমরা তো দোলনা চড়ি। স্লিপে চড়ি। ওকেও চড়াব। দেখবি, ও-ও খুব মজা পাবে। খুশি হবে।
ওঁর কথা শুনে অন্য বন্ধুরাও হইহই করে উঠেছিল। বলেছিল, ঠিক বলেছিস, ঠিক বলেছিস। চল চল চল। ওকে প্রথমে স্লিপে চড়াই।
সেই মতো দল বেঁধে পর পর সিঁড়ি বেয়ে উঠে যেই ওই বিড়ালছানাটাকে স্লিপের উপরে আস্তে করে শুইয়ে ওরা ছেড়ে দিয়েছিল, অমনি বিড়ালছানাটা সাঁ করে চোখের নিমেষে একেবারে নীচে।
যারা তখনও ওকে কোলে নিতে পারেনি। তাদের কেউ কেউ ওকে কোলে নেওয়ার জন্য আগে থেকেই নীচে স্লিপের মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের চোখের সামনেই ঘটে গেল সেই ঘটনাটা।
বিড়ালছানাটা এত জোরে এসে বেকায়দায় একেবারে মুখ থুবড়ে নীচে ছিটকে পড়ল যে, সঙ্গে সঙ্গে ওখানেই ঘাড় মটকে, মাত্র কয়েক বার হেঁচকি তুলেই একদম স্তব্ধ হয়ে গেল।
ওরা বিড়ালছানাটার মুখে জল দিল। গায়ে-মাথায় হাত বোলাল। কিন্তু না। ও আর নড়ল না। চড়লও না। মায়ের কাছে দিলে, একটু দুধ খেলে হয়তো বাঁচলেও বেঁচে যেতে পারে, এটা ভেবে ইমলি যখন বিড়ালছানাটাকে মা-বিড়ালটার কোলের কাছে নিয়ে গিয়ে রাখলেন, মা-বিড়ালটা তার ছানাটাকে চাটতে লাগল। মুখের কাছে মুখ ঠেকিয়ে বারবার শুঁকতে লাগল। তার পর ছলছল চোখে ইমলির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। তার চোখের কোল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
সেটা দেখে ওরই এক বন্ধু বলেছিল, তুই ওর বাচ্চাটাকে মেরে ফেলেছিস তো, ও বোধহয় সে জন্যই তোকে অভিশাপ দিচ্ছে। দেখবি, তোর যখন বাচ্চা হবে, সেও ঠিক এই ভাবে মারা যাবে।
না। কিছুতেই না। চিত্‌কার করে উঠলেন ইমলি। কোন্ ছোট বয়সে খেলার ছলে ভুল করে কী করেছি, তার জন্য এত বড় শাস্তি কিছুতেই হতে পারে না। কিছুতেই না। ওটা কোনও বয়স! আয়নার দিকে তাকাতেই উনি দেখলেন, কোথায় ছোটবেলাকার উনি! এটা তো ওঁর এখনকার ছবি। এই মুহূর্তের ছবি। তবু কোনও এক উদ্বেগে অন্যমনস্ক হয়ে প্রচণ্ড জোরে টান মারতেই খোপ থেকে পুরো দেরাজটাই প্রায় বেরিয়ে এল। আর একটু হলেই পড়ে যাচ্ছিল আর কী! সেটা কোনও রকমে সামলে ফের ঢোকানোর জন্য প্রাণপণে ঠেলাঠেলি করতে লাগলেন তিনি। কিন্তু না। পারলেন না।
 অগত্যা সেটাকে মেঝের উপরে নামিয়ে রেখে চাবির গোছাটা নিয়ে ঝটপট আলমারি খুলে টাকার ব্যাগটা বার করলেন। কিন্তু না। টাকা গুনে নেওয়ার মতো অবস্থায় তিনি নেই। গুনতে গেলে ভুলভাল হয়ে যাবে। তা ছাড়া, তাঁর হাতে আর সময়ও নেই। তিনি ওই তান্ত্রিককে বলে এসেছেন, তিনি যাবেন আর আসবেন। ফলে আর এক মুহূর্ত সময়ও নষ্ট করতে চান না তিনি। তাই টাকার পুরো ব্যাগটা নিয়েই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লেন। যাবার সময় ফ্ল্যাটের দরজাটা দড়াম করে টেনে দিয়ে গেলেন। একবার ফিরেও দেখলেন না, ক্যাচ লকটা ঠিক মতো আটকালো কি না, নাকি খুলেই রইল। তার থেকেও বড় কথা, উনি জানতেই পারলেন না, কী ভাবে বারবার ব্যর্থ হয়ে অবশেষে হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে বাধ্য হল, তাঁদের ফ্ল্যাট থেকে তাঁর পিছু পিছু ছুটে আসা সেই ফিসফিস শব্দটা— তুঁ মুঁ ছুঁ… তুঁ মুঁ ছুঁ… তুঁ মুঁ ছুঁ…
 
তেইশ
না। এই মহাশূন্যের ভবিষ্যত্‌ ‘পাল্টাবে কি পাল্টাবে না’ যে সময়-কণারা জানে, তাদের জন্য তিতার আর এক মুহূর্ত এখানে থাকতে চান না। সকাল থেকে ছেলেকে সেই যে হন্যে হয়ে ইমলি খুঁজছে, অনেকক্ষণ তার কোনও হদিশ না-পেয়ে সেই খোঁজার পাশাপাশি এতক্ষণে নিশ্চয়ই তাঁকেও খোঁজা শুরু করেছে সে। কী যে করছে ও, কে জানে! ওকে যদি এই ব্যাপারটা কোনও ভাবে একটু জানিয়ে দেওয়া যেত!
যখন খুব একটা প্রয়োজন নেই, এমনিই এ দিক ও দিকে যাই, তখনও পকেটের মধ্যে মোবাইল থাকে। আর আজ! আহা, সঙ্গে যদি মোবাইলটা থাকত! তা হলে অন্তত একটা ফোন করে ওকে জানিয়ে দিতে পারতাম যে, আমার জন্য চিন্তা কোরো না। আমি ঠিক আছি। আর জুরানের কথাও ভাবতে হবে না। ওকে খুঁজে পাওয়া গেছে।
তার পরে নিজেই নিজের আক্কেল দেখে অবাক হলেন। মোবাইল পরিষেবা যতই উন্নত হয়ে থাকুক, এখনও ক’হাত দূরের কোনও ঘুপচি ঘরে কেউ ঢুকে থাকলে তার ফোনের টাওয়ার পাওয়াই মুশকিল হয়ে যায়। অন্য রাজ্যে ফোন করতে হলে ফোন নম্বরের আগে জুড়ে দিতে হয় সেই রাজ্যের কোড নম্বর, আর ভিন্‌ দেশে ফোন করতে হলে তো কথাই নেই। যে নম্বর চাই, সেই নম্বরের আগে ওই দেশের বেশ কয়েকটি সংখ্যার বিশাল একটা কোড ডায়াল না-করলে ওই প্রান্তের ফোনে রিংই হয় না।
শুধু কি তাই? এক-একটা দেশের কোড নম্বর আবার এক-এক রকম। তাও সেটা পৃথিবী থেকে করলে। আর এটা তো পৃথিবী থেকে লক্ষ লক্ষ মাইল দূরে, একেবারে মহাশূন্যে। এখান থেকে ফোন করতে হলে ফোন নম্বরের আগে কত সংখ্যার কোড বসাতে হবে, তিনি তো জানেনই না। এমনকী, সেটা সংখ্যা, না অন্য কোনও কিছু, তাও তাঁর ধারণা নেই। তার থেকেও বড় কথা, এখান থেকে আদৌ কোনও ফোন পৃথিবীতে করা যায় কি না, তাও তাঁর জানা নেই। ফলে মোবাইল থাকলেও যে তিনি তাঁর বউয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারতেন, এমন কথা হলপ করে বলা যাবে না। তাই তাঁর দুশ্চিন্তা প্রতি মুহূর্তে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। বাড়ির জন্য মনটা ভীষণ ছটফট-ছটফট করছে।
শুধু তিতারেরই নয়, মায়ের জন্য মনটা যেন কেমন-কেমন করছে জুরানেরও। আজ পর্যন্ত কোনও দিন সে তার মাকে ছেড়ে এতক্ষণ থাকেনি। খুব দেখতে ইচ্ছে করছে মাকে।
এমনি সময় তো তার এ সব হয় না। গত বারও পঁচিশে ডিসেম্বরের দিন ভোরবেলায় বাড়ি থেকে বাবার সঙ্গে বেরিয়ে চিড়িয়াখানা, ভিক্টোরিয়া, জাদুঘর ঘুরে সেই রাত্রিবেলায় বাড়ি ফিরেছিল সে। না। মায়ের কথা তার একবারও মনে পড়েনি। শুধু কি সে দিনই? গরমের ছুটির পরে বাবার সঙ্গে কত বার জেঠুর বাড়িতে গিয়ে দিনের পর দিন সে থেকেছে। কোথায়, মায়ের জন্য তো তার এ রকম কখনও হয়নি। তা হলে আজ কেন হচ্ছে! তবে কি এখানে, এত দূরে এসেছে বলে! এই জন্যই বুঝি লোকে বলে, দূরে গেলেই বোঝা যায় কে কত আপন। না। তার আর কিচ্ছু ভাল লাগছে না। ‘আমি এখন মায়ের কাছে যাব।’ মনের মধ্যে কথাটা উঁকি মারতেই সময়-কণা বলল, কী? মায়ের জন্য মন কেমন করছে?
কথাটা শুনে মাথা নাড়াল জুরান, হ্যাঁ।
কোনও কিছু না-ভেবে তিতারও সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, আমারও।
— তোমারও! তার পর কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকার পরে সময়-কণা ফের বলল, কিন্তু তোমার মা তো বহু দিন আগেই…
— না না, আমার মায়ের জন্য না। জুরানকে দেখিয়ে বললেন, ওর মায়ের জন্য।
ফিক করে হেসে ফেলল সময়, ও, তাই বলো। ঠিক আছে তোমাদের মন যখন এখানে টিকছে না, তখন দেখছি, কী করা যায়! কারণ, আমরা যা-ই করি না কেন, কখনও কোনও গ্রহের কোনও প্রাণীর মনের বিরুদ্ধে গিয়ে কিছু করি না। মনই হল আসল।
মনে শান্তি থাকলে মারাত্মক শোককেও অনায়াসে কবজা করা যায়। মন সুস্থ থাকলে শরীরে প্রবেশ করার আগেই যে কোনও ব্যাধিকে রুখে দেওয়া যায়। তার পরেও যদি কোনও অসুখ-বিসুখ ফাঁকফোকর দিয়ে গলেও যায়, তো তাকেও সামলে নেওয়া যায়। মন ভাল থাকলে বাঁচার ইচ্ছেটাও বেড়ে যায়। আর সেই ইচ্ছের জোরেই যে কোনও প্রাণী তার কাছে ঘেঁষে আসা মৃত্যুকে একটু-একটু করে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। ফলে, না। তোমাদের মনের বিরুদ্ধে গিয়ে আমি কিচ্ছু করব না। তোমারা যা চাইবে, তাই হবে। বলো, কোথায় যেতে চাও?
তিতার বললেন, বাড়িতে।
— বাড়িতে? না ওর মায়ের কাছে?
জুরান বলল, আমার মায়ের কাছে।
— দুজন দু’জায়গায় যেতে চাইছ?
জুরান বলল, না না। দু’জায়গায় না। দুটো আলাদা আলাদা শোনালেও জায়গাটা কিন্তু একই। কারণ, মা এখন বাড়িতেই আছে।
তিতারও ওর কথায় সায় দিয়ে বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, ও এখন বাড়িতেই আছে।
— তাই? ঠিক আছে, দেখছি। বলেই, কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল সময়-কণা। তার পর বলল, না। উনি এখন বাড়িতে নেই। উনি এখন রাস্তায়। উদ্‌ভ্রান্তের মতো হাঁটছেন। না না, হাঁটছেন না। বলতে গেলে উনি প্রায় ছুটছেন।
চমকে উঠলেন তিতার, ছুটছেন! কিন্তু কীসের জন্য! ছেলের জন্য! না, তাঁর জন্য! নাকি দুজনের জন্যই! তার থেকেও বড় কথা, ইমলিকে কি সময়-কণা এখানে বসেই দেখতে পাচ্ছেন!
তিতার জানেন, আগেকার দিনের ঋষি-মুনিঋষিরা চোখ বন্ধ করে পৃথিবীর একপ্রান্তে বসে অন্যপ্রান্তে ঘটা যে কোনও ঘটনা চাক্ষুষ করতে পারতেন। তা হলে কি এই সময়-কণাও তা পারেন! নাকি এমনিই বলছেন! বুঝে উঠতে না-পেরে তিতার বললেন, আপনি কি ওর মাকে দেখতে পাচ্ছেন?
— হ্যাঁ, দেখতে পাচ্ছি।
— একটু দেখা যাবে?
— না।
জুরান বলল, আমিও দেখতে পারব না?
— না।
— তা হলে বাড়িতে নয়, মা যেখানে আছে, আমাদের সেখানেই পৌঁছে দিন।
— তাই? ঠিক আছে। এসো। সময়-কণার মুখের কথা শেষ হওয়ার আগেই ওদের চোখের সামনে ফুটে উঠল, দরজার মতো বিশাল বড় ছবি বাঁধানোর ঝা-চকচকে একটা ফ্রেম। তার নীচে চৌকাঠের মতো জায়গাটায় কয়েকটি বোতাম শুধু তিড়িক-তিড়িক করে জ্বলছে আর নিভছে। জ্বলছে আর নিভছে।
ওটা দেখে জুরান মনে মনে বলল, তার মানে এরা ম্যাজিক জানে! ও একবার ওর বাবা-মায়ের সঙ্গে কলকাতার মহাজাতি সদনে পি সি সরকারের ম্যাজিক দেখতে গিয়েছিল। সেখানে দেখেছিল, মঞ্চের উপরে সবার চোখের সামনে পি সি সরকারকে হাত-পা বেঁধে একটা লোহার সিন্দুকের মধ্যে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে তালা-চাবি আটকে দেওয়া হয়েছিল। দর্শকেরা কেউ কেউ মঞ্চে উঠে সেই তালাটা টানাটানি করে পরখ করেও দেখেছিল, সত্যিই তালাটা ঠিক মতো আটকানো হয়েছে কি না। সেই সিন্দুকের উপরে একটা পটকা রেখে তার সলতেতে আগুন ধরিয়ে যে-ই ওরা সরে গেল, অমনি বিকট শব্দ করে সেটা ফেটে উঠতেই অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে তীব্র আলোর একটা গোলক ছিটকে গিয়ে পড়ল পিছনের গেটে। যেখান থেকে লোক ঢোকে এবং বেরোয়।
সবার মতো খুব স্বাভাবিক ভাবে তার নজরও সেখানে গিয়ে পড়েছিল। জুরান দেখেছিল, দু’পাশে বসে থাকা দর্শকদের হাত নাড়াতে-নাড়াতে ঝলমলে পোশাক পরে প্রেক্ষাগৃহের মাঝখান দিয়ে হাসতে হাসতে মঞ্চের দিকে এগিয়ে আসছেন স্বয়ং পি সি সরকার।
জুরান চমকে উঠেছিল। গোটা প্রেক্ষাগৃহ তখন করতালিতে ফেটে পড়েছে। কে কী বলছে, কিচ্ছু শোনা যাচ্ছে না। জুরান তখন ওর বাবার কানের কাছে মুখ নিয়ে চুপিচুপি বলেছিল, এই জন্যই বুঝি লোকে বলে পি সি সরকার ইজ পি সি সরকার, তাই না?
ওর বাবা বলেছিলেন, এটা সে-ই পি সি সরকার নয়। উনি ছিলেন সিনিয়র। আর ইনি হচ্ছেন তাঁর ছেলে পি সি সরকার জুনিয়র। উনি ছিলেন এঁর থেকেও বড় জাদুকর।
— এর থেকেও বড়!
জুরানের আজ মনে হচ্ছে, এ নিশ্চয়ই সেই পি সি সরকারের চেয়েও অনেক অনেক অনেক বড় জাদুকর। ইচ্ছে করলেই যে-কোনও জিনিস বিন্দুমাত্র না-ছুঁয়েই চোখের পলকে অদৃশ্য করে দিতে পারেন। আবার মন চাইলেই, অনেক দূর থেকেও শুধুমাত্র চোখের ইশারায় সেটা ফের দৃশ্যমান করে দিতে পারেন। না-হলে এই দরজাটা এ ভাবে তাদের সামনে হুট করে দৃশ্যমান হল কী করে!
দরজাটা দেখে অবাক হয়ে জুরান জিজ্ঞেস করল, এটা কী?
চলবে   ………..
ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: