মহাশূন্যে জুরান — সিদ্ধার্থ সিংহ – পর্ব – ২০

sandarticle
— আরে বুরবক। আমি জানব না? তা হলে কে জানবে?
থতমত খেয়ে ইমলি বললেন, আমার ভুল হয়ে গেছে বাবা। আমাকে ক্ষমা করে দিন। আসলে সকাল থেকে ছেলেকে পাচ্ছি না তো… তাই আমার মাথার ঠিক নেই। কী বলতে কী বলে ফেলেছি।
— ঠিক আছে, ঠিক আছে, দাঁড়া। কী নাম যেন তোর ছেলের?
— জুরান।
— জুরান! এ রকম নাম যেন বাপের জন্মে শোনেননি, এমন মুখ করে খাটের উপরে পাতা মাদুরের তলা থেকে একটা কাগজের টুকরো বার করে, হাত দিয়ে লেখার ভঙ্গিমা করে উনি বললেন, পেন আছে?
আমতা আমতা করতে লাগলেন ইমলি, না মানে… আসলে…
— বুঝেছি। বলেই, উঠে গিয়ে দড়িতে ঝুলতে থাকা ফতুয়ার পকেট থেকে একটা কলম বার করে ইমলির দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, নে, ওটার মধ্যে ওর পুরো নাম, জন্ম তারিখ, গোত্র, গায়ের রং, শরীরের বিশেষ কোনও চিহ্ন থাকলে সেটা কোথায় আছে, লিখে দে।
কলমটা নিতে নিতে নিজেকে আর সামলাতে না-পেরে ইমলি বলে উঠলেন, ওকে পাব তো বাবা?
— আরে বুরবক, আমার কাজে কোনও সন্দেহ থাকলে দরজা খোলা আছে, অন্য কোথাও যেতে পারিস।
— না বাবা, না। আমি সে কথা বলিনি।
আরও গম্ভীর হয়ে উনি বললেন, যা লিখতে বলেছি, লিখে দে।
কাগজের টুকরোটার উপরে ইমলি তাঁর ছেলের নাম-ধাম লিখতে লাগলেন। লেখাটা যখন শেষের দিকে তান্ত্রিক তখন বললেন, শোন, তোকে একটা বশীকরণ করতে হবে। না। সাধারণ বশীকরণ বা বিশেষ বশীকরণ করলে হবে না। তোকে একেবারে পুরশ্চরণসিদ্ধ বশীকরণ করতে হবে।
উদ্বিগ্ন গলায় ইমলি বললেন, কেন বাবা? বশীকরণ কেন?
— কারণ, তোর ছেলে যাদের কাছে আছে, তাদের বশীভূত না-করে তোর ছেলেকে ওখান থেকে আনা যাবে না।
— কেন বাবা?
বিরক্ত হয়ে উনি বললেন, যা বলছি শোন। অত প্রশ্ন করিস না।
— না, মানে, আমি বলছিলাম কী, বশীকরণ না-করলে হবে না, না?
উনি লাল টকটকে চোখ তুলে বললেন, না।
— ঠিক আছে বাবা, আপনি যখন বলছেন, তখন তা-ই হবে। কিন্তু কত পড়বে বাবা?
দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে উনি বললেন, আট হাজার ধরে রাখ।
চোখ কপালে তুলে ইমলি বললেন, আট… হাজার… টাকা…!
— এ কাজ তো খালি হাতে হয় না। অনেক জিনিসপত্র লাগে… আট হাজার টাকা বললাম। এ বার বাজার বুঝে… একটু কম-বেশিও হতে পারে।
— না মানে, আট হাজার টাকা তো…
গলা চড়িয়ে উনি বললেন, শোন, বশীকরণ করা অত সহজ কাজ না। বাজার ঘুরে আয়। বহু লোক তো বশীকরণ করে। ক’জনেরটায় কাজ হয় বল তো। অত সহজ না। তিথি, নক্ষত্র, বার, সময়, সব হিসেব কষে এই কাজ করতে হয়। শনিবার সূর্য ওঠার আগে সপ্তমী কিংবা তৃতীয়া অথবা ত্রয়োদশী, আর তা না হলে অষ্টমী বা নবমী, তবে সব চেয়ে ভাল হয়, যদি মাহেন্দ্র মণ্ডল আর বারুণী মণ্ডলের মধ্যবর্তী সময়ে করা যায়।
তবে এটাও মনে রাখতে হবে, শুধু দিনক্ষণ দেখলেই হবে না। দেখতে হবে, যা যা লাগার, সব কিছু ঠিকঠাক মতো ব্যবহার করা হচ্ছে কি না। একেবারে নিখুঁত ভাবে গুণে গুণে সঠিক বার মন্ত্র জপ করা হচ্ছে কি না। আনুষঙ্গিক সমস্ত ক্রিয়াকলাপ নিপুণ ভাবে করা হচ্ছে কি না। শুধু তাই-ই নয়, এর পাশাপাশি দেখতে হবে, কাজটা যে করছে, সে কোন পদ্ধতিতে করছে। তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঠিক ভাবে মন্ত্র উচ্চারণ করছে কি না।
অবাক হয়ে ইমলি বললেন, উচ্চারণ! মন্ত্র যে রকম ভাবে লেখা থাকে, সে রকম ভাবেই তো উত্তারণ করবে, নাকি? এর মধ্যে আবার উচ্চারণের আলাদা কোনও কায়দা আছে নাকি?
— থাকবে না? তোমাদের কাছে এখন যেটা সব চেয়ে আধুনিক যন্ত্র— সেই কমপিউটার যাতে অন্য কেউ খুলতে না-পারে, সে জন্য তো তোমরা চোখের মণি, হাতের আঙুলের স্পর্শ কিংবা পাঁচমিশালি কোনও সংখ্যা অথবা উদ্ভট কোনও শব্দ দিয়ে লক করে রাখো। এমনকী, নিজে খুলতে গিয়ে ভুল করেও যদি অন্য কোনও পাশওয়ার্ড দিয়ে দাও, তা হলে কি সেটা ওপেন হয়? হয় না তো? ঠিক তেমনি। মন্ত্রের ক্ষেত্রেও তাই। কিন্তু এই মন্ত্রটন্ত্র যেহেতু বহু যুগ আগেকার পদ্ধতি, তাই এখনকার মতো গোপনীয়তা এতটা আঁটোসাঁটো ছিল না।
তবে হ্যাঁ, উচ্চরণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতা নিয়েছিলেন তখনকার লোকেরা। ফলে এখনও সে যুগের ভাষার মতো খানিকটা সংস্কৃত ঘেঁষা উচ্চরণ না-হলে কোনও মন্ত্রই জীবন্ত হয়ে ওঠে না। আর মন্ত্র জীবন্ত না-হলে সেই মন্ত্র কোনও কাজও করতে পারে না। তাই মন্ত্রকে প্রাণদান করার জন্য ঠিক মতো উচ্চারণ করাটা অত্যন্ত জরুরি। আর তার থেকেও বড় কথা, কাজটা কে করছে। যোগ্য লোক না হলেই মুশকিল।
কারণ, অনেকে জানেই না, মন্ত্রের সংখ্যা গোনার জন্য সোনা, রুপো, মণি, মুক্তো, পলা, রুদ্রাক্ষ বা স্ফটিক নয়, সব থেকে ভাল হল আঙুলের কড় গোনা। তবে পর পর কড় গুনে গেলেই হবে না। তারও আবার অনেক নিয়ম আছে। সব সময় মাঝের দুই কড়ই গুণতে হবে। গোনার জন্য নীচের কড় কিংবা আঙুলের ডগা ধরলেই সঙ্গে সঙ্গে সেই মন্ত্র নিষ্ফলা হয়ে যাবে। অনেকে তো এটাও জানে না যে, মন্ত্রের সেতু হচ্ছে— ওঁ। জপের সময় প্রতিবার মন্ত্র উচ্চারণের আগে ‘ওঁ’ বলে নিতে হয়। না-হলে সারা রাত ধরে মন্ত্র উচ্চারণ করলেও সেটা আর মালার মতো গাঁথা হয়ে ওঠে না। প্রত্যেকটা মন্ত্রই ছেঁড়া মালার পুঁতির মতো টপ টপ করে পড়ে যায়। ফলে ওটা কোনও কাজেই আসে না।
সে কথা শুনেও ইমলি বিড়বিড় করে বললেন, কিন্তু আট হাজার টাকা…
— তা হলে তুই করে নে। আমি তোকে মন্ত্র বলে দিচ্ছি। লেখ— ওঁ ঝাং ঝাং ঝাং হাং হাং হাং হেং হেং। এই মন্ত্র পাঁচশো বার জপ করলেই শুধু মানুষ নয়, অসুর, দেবতা, যক্ষ, নাগ, রাক্ষস, স্থাবর এবং জঙ্ঘম— সবাইকে বশীভূত করা যায়।
অবাক চোখে ইমলি বললেন, পাঁচশো বার?
— ও, পাঁচশো বার পারবি না? আরও সহজ চাই? ঠিক আছে, লেখ— ওঁ চামুণ্ডে জয় জয় স্তম্ভয় স্তম্ভয় মোহয় মোহয় সর্ব্ব সত্ত্বান নমঃ স্বাহা। এই মন্ত্র ফুলে পড়ে যার হাতে দিবি, সেই তোর বশ হয়ে যাবে।
— মন্ত্রটা কী বললেন?
— ও। এটা বড় লাগছে? ছোটও আছে। লেখ— ওঁ নমঃ কটবিকট-ঘোররূপিনী স্বাহা। এই মন্ত্র জপ করে যার নাম উল্লেখ করে সাত গ্রাস ভাত খাবি, তাকেই তুই বশে রাখতে পারবি।
— মন্ত্রগুলি খুব কঠিন… ঠিক মতো উচ্চারণ…
কয়েক মুহূর্ত কী একটা ভেবে নিয়ে উনি বললেন, তা হলে একটা কাজ কর। তোকে মন্ত্র পড়তে হবে না। বটগাছ বেয়ে ওঠা যে কোনও একটা পরগাছা রোহিনী নক্ষত্রে ছিঁড়ে হাতের তালুতে পেষ। তা হলেই হবে। আর যদি পরগাছাওয়ালা কোনও বটগাছ না পাস, তা হলে মৃগশিরা নক্ষত্রে যজ্ঞডুমুরের মূল তুলে হাতে বেঁধে নে। তার পর যাকে ছুঁবি, দেখবি, সেই তোর বশীভূত হয়ে যাবে। যদি যজ্ঞডুমুরের গাছ না পাস, তবে অশ্বিনী নক্ষত্রে পলাশ গাছের মূল তুলে কড়েয় বেঁধে নিলেও হবে।
— এতে কাজ হবে?
— হবে। তবে শুধু ওগুলো করলেই হবে না। অনেক নিয়মকানুন, পদ্ধতি আছে। সেগুলি ঠিকঠাক মতো মেনে করতে হবে।
আগ্রহ সহকারে ইমলি জানতে চাইলেন, যেমন?
— যেমন, প্রথমত শিকড়-বাকড়ের জন্য আগে গাছটাকে ভাল করে চিনতে হবে। তার পর সেটা তোলার ক্ষেত্রে সব সময় গোটা গাছটাকে এক টানে উপড়ে নিতে হবে। তাই কাজের জন্য বড় গাছ নয়, সব সময় চারা গাছ বাছাই বাঞ্ছনীয়। তার আগে মন্ত্র পড়ে গাছটাকে কিন্তু বন্দনা করে নিতে হবে।
— সেটা আবার কী মন্ত্র?
বিরক্তি মেশানো স্বরে উনি এ বার বললেন, সব মন্ত্র কি একদিনেই শিখে নিবি রে বেটি? এটা শিখতে আমার সারা জীবন লেগে গেছে।
মিন মিন করে ইমলি বললেন, আসলে, আমার পক্ষে আট হাজার টাকা…
— তা হলে যেখানে কমে হবে, সেখানে যা।
— না বাবা, আমি আর অন্য কোথাও যাব না। আপনার কাছে যখন এসেছি, আপনিই করে দেবেন। শুধু টাকাটা যদি একটু কম করেন…
— তুই কি ভাবছিস এই সব করে আমি টাকা নিই? একদম না। এই সব কাজ করতে গেলে অনেক কিছু লাগে। সোনাভষ্ম যেমন লাগে, তেমনি তামা, পেতল, কাঁসাও লাগে। লাগে পেরেক। নানান গাছের কাঁটা। আলতা-কুমকুমও। বাসনই লাগে একগাদা। কত রকমের পদ রান্না করতে হয় জানিস? ঠিক আছে, তোকে টাকা দিতে হবে না। আমি ফর্দ লিখে দিচ্ছি, তুই শুধু সেগুলি এনে দে। ব্যস। তা হলেও হবে।
— তাতে কত পড়বে? আন্দাজ…
উনি বললেন, ওই যে বললাম, আট হাজার… তবে তোরা কিনতে গেলে কিঞ্চিত বেশিই পড়বে। দ্যাখ, কী করবি। তোর ব্যাপার। ভেবে দ্যাখ।
— না বাবা, ভাবার কিছু নেই। আপনি করুন। যত কষ্টই হোক আমি ওই আট হাজারই দেব। তবে একটা কথা। আমার ছেলে যেন সুস্থ শরীরে খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসে।
— আসবে রে বাবা, আসবে। দে, টাকাটা দে।
কাঁচুমাচু মুখ করে ইমলি বললেন, এখন তো টাকাটা আমার সঙ্গে নেই। আমার বাড়ি কাছেই। আমি এক্ষুনি গিয়ে নিয়ে আসছি। আপনি ততক্ষণে কাজটা শুরু করে দিন।
— কতক্ষণ লাগবে?
— ঘণ্টাখানেক। খুব বেশি হলে দেড় ঘণ্টা।
উনি বললেন, ঠিক আছে, যা। নিয়ে আয়। আমার কাছে যা জিনিসপত্র কেনা আছে, তাই দিয়েই আপাতত কাজটা শুরু করে দিচ্ছি। এ তো আর এক-আধ ঘণ্টার কাজ না। সারা দিন লেগে যাবে। তবে তুই যদি বেশি দেরি করিস, আমি কিন্তু সব পণ্ড করে দেব।
আঁতকে উঠে ইমলি বললেন, না বাবা, না। আপনি করুন। আমি এই যাব আর আসব।
— ঠিক আছে, যা বেটি, যা। তোর মঙ্গল হবে।
তান্ত্রিকের মুখে ‘মঙ্গল’ শব্দটা শুনেই ওঁর মনে পড়ে গেল, না। আজ মঙ্গলবার নয়। শনিবার। এই দিনেই তো বশীকরণ করার মোক্ষম দিন। উনিই তো বললেন। তা হলে! না। আর দেরি করা ঠিক হবে না। এক্ষুনি তাঁকে বাড়ি গিয়ে টাকাটা নিয়ে আসতে হবে। টাকার জন্য চিন্তা করলে হবে না। ছেলে আগে, না টাকা আগে?
মাঝে মাঝেই টাকা গুনতে দেখে তাঁর স্বামী তাঁকে কত বার বলেছেন, যেটুকু জমিয়েছ, ব্যাঙ্কে রেখে দাও। অন্তত কিছু সুদ তো পাবে। শুধু শুধু ঘরে রেখে দিয়ে কী লাভ, ডিম পাড়বে?
তবু তিনি রাখেননি। ভাগ্যিস রাখেননি। না-হলে এই বিপদের সময়… হ্যাঁ, একটু একটু করে আলমারির মধ্যে তিনি যা জমিয়েছেন, তাতে আট হাজার কেন, গুনলে, তার থেকে অনেক বেশিই হবে। আজ যদি হারিয়ে না-গিয়ে, ওর বড় কোনও অসুখ-বিসুখ হত, আমি কি হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে পারতাম? ওকে নার্সিংহোমে ভর্তি করাতাম না? আর নার্সিংহোমে ভর্তি করাতে গেলে তো এর থেকেও অনেক অনেক অনেক বেশি টাকা ক্যাশ কাউন্টারে গিয়ে আগে জমা দিতে হত।
তাই নয় কি? ওঁরা কি কোনও কথা শুনত? নাকি কোনও কাকুতি-মিনতিতে ওঁদের মন গলত? তার পর বাকি খরচা তো আছেই। আমি কি তখন নার্সিংহোমের লোকেদের সঙ্গে এই ভাবে দরদস্তুর করতে পারতাম? না, করা যেত? সে তুলনায় এই টাকা তো কিছুই না। তাই চাটাই ছেড়ে ঝটপট করে উঠে ছেলের নাম-ধাম লেখা কাগজটা কোনও রকমে তান্ত্রিকের হাতে দিয়েই পড়ি কি মড়ি করে বাড়ির দিকে ছুটতে লাগলেন ইমলি। পিছন ফিরে আর তাকালেন না।
কুড়ি
হঠাত্‌ মহাশূন্যের দিকে চোখ যেতেই আঁতকে উঠল জুরান। উজ্জ্বল হলদে রঙের মশারির মতো থলেটা যে ভাবে তাদের দিকে ধেয়ে আসছে, যদি ওই গতিতেই এখানে আছড়ে পড়ে, তা হলে আর দেখতে হবে না। যেটার উপরে তারা আছে, সেটা ভেদ করে কতটা গভীরে যে ঢুকে যাবে, কে জানে! আর ওটা যদি সত্যি সত্যিই ওই ভাবে ঢুকে যায়, তা হলে ওটার ভিতরে পদ্মাসন হয়ে বসে থাকা তার বাবার যে কী হাল হবে, তা সহজেই অনুমান করতে পারছে সে।
তাকে যখন আপাদমস্তক চিকেন রোলের মতো মুড়ে কে বা কারা হু হু করে আকাশের ভিতর দিয়ে ছুটে যাচ্ছিল, তখন প্রচণ্ড এক ভয়ে ডুকরে উঠতেই তার শরীরটাও বুঝি থরথর করে কেঁপে উঠেছিল। সেই কাঁপা দেখে, যে বা যারা তাকে নিয়ে যাচ্ছিল, তারা বোধহয় ভেবেছিল, ওর নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে বলেই, ও এ রকম হাঁসফাঁস করছে। তাই মোড়কটাকে হয়তো একটু আলগা করেছিল। আর তাতেই মোড়কের তলা দিয়ে সুরুত্‌ করে গলে গিয়েছিল সে।
পড়ছিল তো পড়ছিলই। পড়ছিল তো পড়ছিলই। মাটি ছুঁতে যখন আর কয়েক মুহূর্ত বাকি, ঠিক তখনই সাঁ… আ… আ… আ… করে এসে যে-একচিলতে সাদা ধবধবে মেঘটা একেবারে চিলের মতো ছোঁ মেরে তাকে তুলে নিয়ে এসেছিল, সেটা বাড়তে বাড়তে কখন যে এত বড় হয়ে গেছে, ও বুঝতেই পারেনি। এখনও বুঝতে পারছে না, এটা কঠিন-নিরেট, নাকি পৃথিবী থেকে আকাশের বুকে যে মেঘকে ভেসে বেড়াতে দেখা যায়, সেই মেঘের মতোই বায়বীয়, নরম, তুলতুলে!
আগেকার দিনে পৃথিবী থেকে পাঠানো কোনও যান যখন সব চেয়ে কাছের গ্রহ চাঁদে অনুসন্ধান চালিয়ে ফিরে আসত, তখন সরাসরি মাটিতে নয়, সমুদ্রের গভীরতা যেখানে সব চেয়ে বেশি, সেখানেই ল্যান্ড করত। কারণ, ওই সব দ্রুতগতি যানের প্রচণ্ড গতি কিছুতেই ঠিক মতো নিয়ন্ত্রণ করা যেত না। ফলে শেষের দিকেও যা স্পিড থাকত, তাতে তা মাটিতে নামার পক্ষে ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক। তাই যথেষ্ট ঝুঁকি থাকলেও, তুলনামূলক ভাবে অনেকটা নিরাপদ এবং একমাত্র পথ ছিল, শেষ অবধি যতটা গতি থাকে, সেটাকে সমুদ্রের ভিতর দিয়ে যতটা পারা যায় নিয়ে গিয়ে জলের চাপের নানান স্তরে কমিয়ে একেবারে শূন্যে নিয়ে আসা।
কিন্তু ওটাকে দেখে তো মনে হচ্ছে না যে, ওটার মধ্যে গতি নিয়ন্ত্রণ কিংবা গতির মুখ পরিবর্তনের কোনও কলকব্জা আছে! আর যদি থাকেও, এখানে তো আশপাশে সে রকম কোনও গভীর জলাশয় আছে বলে মনে হচ্ছে না। তবে? তবে কি পৃথিবী থেকে ছাড়া অন্যান্য যানের মতোই ওই হলদে রঙের মশারি-থলেটা, তারা যে-মেঘটার উপরে আছে, তাকে ঘিরে চক্কর মেরে মেরে নিজের গতিটাকে একেবারে কমিয়ে তার পরে নামবে?
জুরানের মনে হল, সেটাই স্বাভাবিক। তার পরেই তার ভ্রু কুঁচকে গেল। মনে পড়ে গেল, ভারতের বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক মহিলা মহাকাশচারী কল্পনা চাওলার কথা। যিনি একটানা একত্রিশ দিন চোদ্দো ঘণ্টা চুয়ান্ন মিনিট মহাশূন্যে সফর করেছিলেন। পারি দিয়েছিলেন একশো চার মিলিয়ন কিলোমিটার। শুধু পৃথিবীকেই চক্কর মেরেছিলেন প্রায় দুশো বাহান্ন বার।
তার পর পৃথিবীর মাটি ছোঁয়ার জন্য মহাশূন্য থেকে যখন প্রতি ঘণ্টায় কুড়ি হাজার কিলোমিটার বেগে, অর্থাত্‌ শব্দের চেয়ে প্রায় আঠারো গুণ বেশি গতিতে ফিরে আসছিলেন ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারে। ঠিক তখনই, পৃথিবী থেকে মাত্র দু’লক্ষ সাত হাজার ফুট উঁচুতে, হঠাত্‌ শুরু হয় যান্ত্রিক গোলযোগ। ফলে যানের গতি আর নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। বায়ুর সঙ্গে প্রবল ঘর্ষণে তার বায়ুদূত ‘স্পেস স্যাটেল কলম্বিয়া ফ্লাইট এস টি এস— ১০৭’-এ মুহূর্তের মধ্যে আগুন ধরে যায়। ঘড়িতে তখন সকাল আটটা তেপ্পান্ন মিনিট। তার পরেই নর্থ সেন্ট্রাল টেক্সাসের আকাশে ভয়াবহ বিস্ফোরণ। টুকরো টুকরো হয়ে যায় গোটা যানটি। দিনটা ছিল, দু’হাজার তিন সালের পয়লা ফেব্রুয়ারি।
সে কথা শুনে তখন তার মনে হয়েছিল, ওটা নিছকই একটা দুর্ঘটনা। কিংবা অসাবধানতাবশত হয়েছে। অথবা অন্য কোনও কিছু। কিন্তু এখানে আসার পর, সব দেখেশুনে, সময়ের সঙ্গে এতক্ষণ কাটিয়ে তার এখন, এই মুহূর্তে কেমন যেন একটা সন্দেহ হচ্ছে, এর পিছনে অন্য কোনও গ্রহবাসীদের হাত নেই তো!
হতে পারে। কিছুই অসম্ভব নয়। মহাকাশে থাকার সময় তিনি হয়তো আশপাশের অন্য কোনও গ্রহবাসীদের একেবারেই নিজস্ব অত্যন্ত গোপন এমন কিছু দেখে ফেলেছিলেন, এমন কিছু জেনে ফেলেছিলেন, যা তাঁর নিজেরও বিশ্বাস হয়নি। ওই রিপোর্ট পাঠালে পৃথিবীর মানুষ আদৌ তাঁর কথা বিশ্বাস করবে কি না, সে নিয়ে নিজেরই হয়তো যথেষ্ট সংশয় ছিল। তাই তখন তিনি হয়তো মুখ বন্ধ করে ছিলেন। হয়তো ভেবেছিলেন, পৃথিবীর মাটিতে পা দিয়ে রয়েসয়ে, আস্তে আস্তে, একটু একটু করে সইয়ে তার পরে সবাইকে ব্যাপারটা জানাবেন। দরকার হলে গোটা একটা বই-ই লিখে ফেলবেন।
কিন্তু তাঁর মনে মনে ভাবা ওই পরিকল্পনাটা হয়তো ওই গ্রহবাসীরা কোনও ভাবে আঁচ করতে পেরেছিল। তাই তাঁকে চুপ করানোর জন্য আকাশের বুকেই চিরতরে স্তব্ধ করে দিয়েছে। যা তদন্ত করে বার করা আমাদের মতো সামান্য একটি গ্রহের নগণ্য কিছু মানুষের পক্ষে কখনওই সম্ভব নয়।
তাই যদি হয়, তা হলে তো এখানে আসার পথে তার বাবাও নিশ্চয়ই অনেক কিছু দেখেছেন। অনেক কিছু জেনেছেন। কল্পনা চাওলার মতো আগে থেকে মনে মনে না-ভাবলেও, তিনিও তো পৃথিবীতে ফিরে গিয়ে এই সব কথা বলে দিতে পারেন! এটা ভেবে, ওরা আবার তার বাবাকে শেষ করে দেবে না তো! সেও যে এর মধ্যে অনেক কিছু জেনে ফেলেছে। তবে!
এ তো মহাবিপদ। কিন্তু এই বিপদ থেকে কে উদ্ধার করবে তাদের! কে! ঈশ্বর! না। সে কোনও গ্রহবাসীকে ঈশ্বর বলে মানতে রাজি নয়। কারণ, যতই জ্ঞান থাকুক, যতই করায়ত্ব থাকুক নানান কৌশল, যতই করিৎকর্মা হোক তারা, তবু ওর মনে হয়, একটা-দুটো গ্রহ নয়, সমস্ত গ্রহের সবাই মিলে হাত লাগালেও, এত কোটি কোটি গ্রহ-তারা তৈরি করা কিছুতেই সম্ভব নয়। তৈরি করলেও, অত ভারী ভারী গ্রহ-তারাকে মহাশূন্যে এই ভাবে ভাসিয়ে রাখা কখনওই সম্ভব নয়। সম্ভব নয় বনবন করে ঘুরতে থাকা, এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় এলোমেলো ভাবে উন্মাদের মতো ছুটতে থাকা গ্রহ-তারাদের অবশ্যম্ভাবী সংঘর্ষ এড়ানো।
আমেরিকায় যে সাতটি বিল্ডিং নিয়ে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার গড়ে উঠেছিল। তার মধ্যে পাঁচটি বিল্ডিং তুলনামূলক ভাবে ছোট হলেও, বাকি দুটির উচ্চতা ছিল প্রায় আকাশ ছোঁয়া। একটা একশো ন’তলা। আর একটা একশো দশ তলা। পরে যে দুটো বিল্ডিং উগ্রপন্থীদের বিমান-হানায় ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
সে-ই টুইন্স টাওয়ারের প্রধান আর্কিটেকচার, মিনরু ইয়ামাসাকি যখন দিন-রাত এক করে ভাবছেন, অত বড় বিল্ডিংকে দাঁড় করাতে গেলে কতটা ভিত করা দরকার, যতটা দরকার, ততটাই বা তিনি করবেন কী করে! হিসেব-নিকেষ করতে গিয়ে তিনি যখন আর কোনও কুল-কিনারা পাচ্ছেন না, একেবারে নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দেওয়ার মতো অবস্থা।
 তখন হঠাত্‌ একদিন তিনি স্বপ্নে দেখলেন, একটা চোখ-ঝলসানো আলোর কুণ্ডলির ভিতর থেকে এক জ্যোতির্ময় পুরুষ বেরিয়ে এসে তাঁকে বলছেন, ওরে পাগল, তুই একটা বাড়ি করতে গিয়ে তার ভিত কতটা করবি, সেটা নিয়ে এত আকাশ-পাতাল ভাবছিস? গোটা পৃথিবীটাই তো শূন্যে ভাসছে রে… কী ভাবে ভাসছে, সেটা একবার ভাল করে ভাব, দেখবি, একটা না-একটা রাস্তা ঠিকই পেয়ে যাবি।
উনি পেয়েছিলেন। তাই একটা নয়, ও রকম দু’-দুটি আকাশচুম্বী অট্টালিকা এত সহজেই মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল এই পৃথিবীর বুকে। আসলে, যুগ যুগ ধরে চলে আসা ওই কথাটাই ঠিক। একেবারে একশো ভাগ ঠিক— ‘ঠাকুর চাইলে হয়, না-চাইলে নয়।’
ঠাকুর যদি চান, তা হলে তার বাবাও নিরাপদে এখানে এসে নামবেন। তার সামনে এসে দাঁড়াবেন। দাঁড়াবেনই। হাজার চেষ্টা করলেও কোনও গ্রহবাসী কিচ্ছু করতে পারবে না।
জুরান যখন এ সব ভাবছে, ঠিক তখনই, ওই মশারি-থলেটা ঝুপ করে তার সামনে এসে, একদম ঠাকুমা-পিসিঠাকুমাদের ডালের বড়ি দেওয়ার মতো আলতো করে কী যেন একটা থুপ করে নামিয়েই মুহূর্তের মধ্যে কোথায় মিলিয়ে গেল। জুরান বড় বড় চোখ করে দেখল, না, সে ভুল দেখছে না। তার সামনে তার বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। হ্যাঁ, তার বাবাই।
চলবে   ………..
ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: