মহাশূন্যে জুরান — সিদ্ধার্থ সিংহ – পর্ব – ১৭

মৎস্যকন্যা বলল, আসলে, তোমাকে সে দিন নির্ঘাৎ মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে পেরে আমি যে আনন্দ পেয়েছিলাম, তৃপ্তি পেয়েছিলাম, সে জন্য আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ।
— আমাকে বাঁচিয়ে আপনি আমার কাছে কৃতজ্ঞ? কোথায় আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকব, তা নয়, এ তো আপনি পুরো উল্টো কথা বলছেন!
— উল্টো কথা নয়। মনে রাখবে, তুমি যদি কখনও কারও উপকার করো, তা হলে সেই উপকার পেয়ে সে যতটা না খুশি হবে, উপকার করতে পেরে তার চেয়ে অনেক অনেক অনেক গুণ বেশি তৃপ্তি পাবে তুমি। সে সময় তোমাকে জলের উপরে পৌঁছে দিয়ে আমি শুধু তোমাকেই বাঁচাইনি, নিজেও মনে মনে বেঁচেছি। একটা ভাল কাজ করতে পারার আনন্দই আলাদা। সেটা যে না-পেয়েছে সে বুঝতেই পারবে না। তাই ও রকম একটা ভাল কাজ করার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ। আর সেই কৃতজ্ঞতা থেকেই কী করে যেন তোমার প্রতি আমার তৈরি হয়ে গেছে একটা দুর্বলতা। যা আমি কিছুতেই অস্বীকার করতে পারি না।
তিতিরের মুখ দিয়ে অস্ফুটে বেরিয়ে এল, সে কি?
— হ্যাঁ। শুধু আমি নই, এটা সবার ক্ষেত্রেই হয়। যেমন দেখবে, গাড়ির তলায় চাপা পড়তে থাকা কোনও বিড়াল বা কুকুরছানাকে কেউ যদি বাঁচায়, সেই ছানার প্রতি তার একটা টান জন্মে যায়। সে যখন ফের ওই রাস্তা দিয়ে যায়, সে এ দিকে ও দিকে তাকিয়ে দেখে, বাচ্চাটা ঠিক আছে তো! এটাই নিয়ম।
— তাই?
— একদম তা-ই। জানবে, কেউ ভালবেসে কাউকে পৃথিবীতে নিয়ে এলে, সে যেমন তার বাবা কিংবা মা হয়, ঠিক তেমনি নির্ঘাৎ মৃত্যুর মুখ থেকে বাঁচিয়ে যে তাকে আর একবার নতুন জীবন দেয়, রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও, সেও তার আর এক বাবা অথবা মা হয়ে ওঠে। সুতরাং যে বাঁচে এবং বাঁচায়, কী করে যেন তাদের মধ্যে একটা আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। যে সম্পর্ক, তুমি জানো না-দেখে তোমার তরফ থেকে হয়নি। কিন্তু আমি ওই ঘটনার সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছি দেখে, আমার দিক থেকে হয়েছে। বলতে পারো, এটা এক তরফাই হয়েছে। এ বার বুঝতে পেরেছ তো, আমি কে?
— হ্যাঁ। পেরেছি। সে দিন আমাকে ওই ভাবে জীবন ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আপনাকে কী বলে যে কৃতজ্ঞতা জানাব… কিন্তু আজ হঠাৎ আপনি আমার কাছে এলেন কেন?
মৎস্যকন্যা বলল, জানতে। তোমার মন এত ছটফট করছে কেন, তা জানতে। কী হয়েছে তোমার?
— না। সে রকম কিছু না। মানে…
— আমার কাছে কিছু লুকিয়ো না। কী হয়েছে বলো। তুমি বলতে দেরি করলে, সমস্যাটা হয়তো ততক্ষণে নাগালের বাইরে চলে যাবে। তখন হাজার চেষ্টা করেও আর কোনও সুরাহা করা যাবে না। বলো…
আমতা আমতা করে তিতার বললেন, আসলে হয়েছে কি, আমার ছেলে… মানে জুরান… ওকে সকাল থেকে পাওয়া যাচ্ছে না।
— সে কী! আশপাশে খুঁজেছ? যেখানে যেখানে ও যায় বা যেতে পারে…
— সব খোঁজা হয়ে গেছে। এখন কী করব কিছুই বুঝতে পারছি না।
মত্‌স্যকন্যা বলল, না বোঝার কিছু নেই। ওকে যখন পাওয়া যাচ্ছে না। তখন খুঁজে বের করতে হবে। কিন্তু…
— কিন্তু কী?
— ওর ব্যবহার করা আধোয়া কোনও জামা-প্যান্ট-গেঞ্জি বা অন্য কোনও কিছু আছে কি?
অবাক হয়ে তিতার বললেন, আধোয়া! দাঁড়ান দেখছি। বলেই, জুরানের ঘরে গিয়ে এ দিকে এ দিকে তাকাতে লাগলেন। তার পর বিড়বিড় করে বললেন, কিছুই তো দেখছি না…
সেটা শুনে পিছন থেকে মৎস্যকন্যা বলে উঠল, কিচ্ছু নেই?
থমথমে মুখে তিতার বললেন, না। দেখছি না তো…
— ওটা কী!
— ওটা তো বালিশ।
বিছানার দিকে আঙুল তুলে মৎস্যকন্যা বলল, না না, ওটা?
তিতার বললেন, ওটা তো বালিশের ঢাকনা।
— ও কি এখানে শোয়?
— হ্যাঁ। ও এখানেই শোয়।
মত্‌স্যকন্যা জিজ্ঞেস করল, ও কি ওই ঢাকনাটায় মাথা দিয়ে শুয়েছিল?
— তাই-ই তো মনে হয়। ও যখন এখানে শুয়েছিল, তখন নিশ্চয়ই বালিশের উপরে থাকা ওই ঢাকনাটায় মাথা দিয়ে শুয়েছিল।
— দাও। তা হলে ওটাতেই হবে। দাও।
খাটের উপর থেকে বালিশের ঢাকনাটা মত্‌স্যকন্যার হাতে দিতেই তিতার দেখলেন, সে সেটা নাকের কাছে ধরে চোখ বন্ধ করে খুব গভীর ভাবে পর পর তিন বার তিনটে বড় বড় শ্বাস নিল। তার পর ঘরের ভিতরে, ঘরের বাইরে, এ দিকে ও দিকে, ডায়নিং স্পেসে এবং জানালার কাছে, যেখানে যেখানে ওর মনে হল, সর্বত্র গিয়ে জোরে জোরে বড় বড় শ্বাস নিয়ে তিতারের দিকে তাকিয়ে বলল, ও এখানে নেই।
উদ্বিগ্ন হয়ে তিতার জানতে চাইলেন, তা হলে কোথায়?
— অনেক দূর থেকে খুব ক্ষীণ ভাবে এই গন্ধটা হঠাত্‌ হঠাত্‌ ভেসে আসছে। তার মানে দূরে, অনেক দূরে কোথাও আছে।
— যত দূরেই হোক আমি সেখানে যাব। আপনি আমাকে নিয়ে চলুন।
— যাবে? তা হলে একটা কাজ করো।
আশার আলো দেখতে পেয়ে তিতারের চোখ চকচক করে উঠল। বললেন, কী?
মত্‌স্যকন্যা বলল, তিন বার বলো তুঁ মুঁ ছুঁ… তুঁ মুঁ ছুঁ… তুঁ মুঁ ছুঁ…
— এর মানে?
— মানে জেনে তোমার লাভ নেই। ও সব পরে জানবে। এখন এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করা যাবে না। প্রতিটা মুহূর্তে ওরা এখন দূরে, দূরে, আরও দূরে চলে যাচ্ছে। এর পর হয়তো ওদের কাছে পৌঁছনোর একমাত্র সূত্র, এই গন্ধটাও ফিকে হতে হতে একেবারে হারিয়ে যাবে। তখন আর কোনও উপায় থাকবে না। তাই বলছি, এখন মন দিয়ে আমার কথা শোনো, তুমি যদি সত্যি সত্যিই আমার সঙ্গে তোমার ছেলের কাছে যেতে চাও, তা হলে আর সময় নষ্ট কোরো না। তাড়াতাড়ি বলো, তুঁ মুঁ ছুঁ… তুঁ মুঁ ছুঁ… তুঁ মুঁ ছুঁ… কারণ, এই ভাষায় না বললে তুমি আমার সঙ্গে কিছুতেই যেতে পারবে না।
তিন বার ওটা বলতেই তিতারের গোটা শরীর আস্তে আস্তে কেমন যেন ধোঁয়া-ধোঁয়া হয়ে গেল। আর সেটা হতেই তিতারের জামা-কাপড়গুলো শরীর থেকে আলগা হয়ে খসে পড়ল মেঝের ওপরে। সঙ্গে সঙ্গে মত্‌স্যকন্যাটাও ধূসর ধোঁয়ার একটা কুণ্ডলি হয়ে তিতারের ধোঁয়াটার সঙ্গে মিশে গেল। তার পর বাঁই বাঁই করে কয়েক বার চক্কর মেরেই জানালা দিয়ে সাঁ… করে সোজা উঠে গেল উপরে। মুহূর্তের মধ্যে মেঘ ভেদ করে কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। কেউ আর দেখতে পেল না।
 
ষোলো 
তিতার সামনে থাকলে ইমলি তাঁকে জিজ্ঞেস করতে পারতেন, ছেলের জন্য এত উদ্বিগ্ন হলেও, এত খোঁজাখুঁজি করলেও, এ ক্ষেত্রে যেটা করা সব চেয়ে বেশি জরুরি, ও সেটা করছে না কেন? কেন থানায় যাচ্ছে না! এই অবস্থায় তাঁদের ঠিক কী করা উচিত, সেটা কেন কারও সঙ্গে আলোচনা করছে না! এমনকী, এই কথা কাউকে সে জানাতে পর্যন্ত চাইছে না কেন! কেন! কেন! কেন!
তা হলে কি ও বিশ্বাস করে, অপহরণের পর যে-ভাবে সে ফিরে এসেছিল, তার ছেলেও ঠিক সে ভাবেই ফিরে আসবে! হতে পারে। আর সে জন্যই বুঝি হাত-পা গুটিয়ে চুপচাপ বসে আছে। বলা যায় না, এখন হয়তো বাড়িতে গিয়ে বিছানার উপরে টানটান হয়ে শুয়ে আছে! বহু মানুষ দেখেছি, কিন্তু এ রকম মানুষ আর একটাও দেখিনি।
আজ যদি জুরান সত্যিই না ফেরে, শেষ পর্যন্ত ওর কিডন্যাপ হওয়ার কথাটা যদি জানাজানি হয়ে যায়, তা হলে লোকে কী বলবে! বলবে না, ছেলে হারিয়ে গেছে, অথচ আপনারা একটা মিসিং ডায়েরিও করেননি! এটা তো প্রাথমিক কাজ। যারা পড়ালেখা জানে না, তারাও এটা করে। আর আপনারা…
নাঃ। আমি এ কথা শুনতে রাজি নই। আমি বরং বাড়ি যাই। গিয়ে দেখি, ও কী করছে। যদি দেখি, সত্যিই ও শুয়ে আছে, তা হলে আজকে আর মুখ বুজে থাকব না। তাতে যদি আশপাশের ফ্ল্যাটের লোকেরা আমার গলা শোনে, তো শুনবে। বিড়বিড় করতে করতে লেডিস পার্ক থেকে বেরিয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়ালেন তিনি।
ইমলি যখন ছোট ছিলেন, তখন ছেলেধরার কথা খুব শোনা যেত। ছেলেধরারা নাকি রাস্তাঘাট, এমনকী বাড়ির সামনে খেলতে থাকা ছোট ছোট বাচ্চাদের পর্যন্ত লজেন্স বা গ্যাসবেলুন দেওয়ার লোভ দেখিয়ে, ভুলিয়ে-ভালিয়ে নিয়ে যেত। শুধু তা-ই নয়, কার মুখে যেন শুনেছিলেন, কোনও কোনও ছেলেধরার কাছে নাকি এক ধরনের জাদু রুমাল থাকত। সেই রুমাল বার করে কোনও বাচ্চার মুখের সামনে একবার নাড়ালেই সেই বাচ্চা নাকি মোহগ্রস্ত হয়ে তার পিছু পিছু চলে যেত। শোনা যেত, তাদের নাকি খোঁড়া করে বা অন্ধ করে কিংবা পঙ্গু করে সক্কালবেলায় রাস্তার ধারে বসিয়ে দিয়ে আসত। নিয়ে আসত সন্ধ্যাবেলায়। সারা দিন ওদের দিয়ে ভিক্ষে করাত।
আবার একদম পুঁচকে বাচ্চাদের নাকি মাটির হাঁড়িতে ভরে দিনের পর দিন রেখে দিত। ওই ভাবে রাখার জন্য তাদের শরীর বনসাইয়ের মতো বেঢপ আকৃতির বিতিকিচ্ছিরি আদল নিত। আর সে জন্য নাকি দয়াপরবশ হয়ে অন্ধ, কালা, খোঁড়াদের থেকেও লোকেরা তাদের বেশি ভিক্ষে দিত। কোনও বাচ্চা যদি এ সব কাজ করতে না চাইত, তা হলে তাকে এমন মারধর করা হত, এত অত্যাচার করা হত যে, ওদের কথা না-শুনে আর কোনও উপায় থাকত না। তাদের মধ্যে যারা দেখতে-শুনতে একটু ভাল কিংবা হাতে-হাতে কাজ করতে পটু, তাদের কাউকে কাউকে চালান করে দিত বিদেশে। তারা সেখানে দাসী-বাঁদী হয়ে বাকিটা জীবন কাটিয়ে দিত।
তখনকার দিনে কাগজ কুড়ুনিওয়ালাদের পিঠে মস্ত বড় ঝোলা থাকায় অনেকেই তাদের ছেলেধরা ভাবত। ইমলিও যে ভাবতেন না, তা নয়। তাঁর ধারণা ছিল, বাচ্চা পেলেই ওই লোকগুলি তাদের ঝোলার মধ্যে টপাটপ ভরে নিয়ে চোখের নিমেষে উধাও হয়ে যায়। তাই নিজেকে তো বটেই, অন্য বাচ্চাদেরও ছেলেধরার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য ওদের দেখলেই তিনি কুকুর লেলিয়ে দিতেন।
কেবল তিনিই নন, তাঁর মতো অন্য বাচ্চারাও এটা করত। আর বছরের পর বছর ধরে সেটা করত বলেই, কুকুরদের মনের মধ্যেও ওটা এত গভীর রেখাপাত করেছিল যে, বংশপরম্পরায় তা সঞ্চারিত হয়ে এসেছে এখনকার কুকুরদের মধ্যেও। তাই আজও, কাগজ কুড়ুনিওয়ালা হোক চাই না হোক, পিঠে বড় কোনও বোঁচকা, এমনকী, সঙ্গে ঢাউস কোনও ব্যাগ থাকলেও তারা ঘেউ ঘেউ করে ওদের পিছনে-পিছনে ছুটে যায়।
শুধু ওদেরই নয়, এমনি বোঁচকা-বুঁচকি নিয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে থাকা, ময়লা-আধ ময়লা জামাকাপড় পরা পাগলা বা পাগলাগোছের লোকদেরও তখনকার দিনে ছেলেধরা বলে সন্দেহ করা হত। সন্দেহ করা হত, কোনও এলাকায় উদ্দেশ্যহীন ভাবে এমনিই ঘুরঘুর করতে থাকা অপরিচিত ব্যক্তিদেরও। কখনও সখনও তাদের ধরে দল বেঁধে গণধোলাইও দেওয়া হত।
ভাবা হত, যারা বাচ্চাদের তুলে নিয়ে যায়, তারা অনেক কিছু জানে। অনেক কিছু করতে পারে। তাই তখনকার দিনে কোনও বাচ্চা হঠাত্‌ করে নিরুদ্দেশ হয়ে গেলে তার বাবা-মায়েরা থানা-পুলিশ করার আগে ছুটে যেতেন কোনও গুনিনের কাছে। তারাই বাচ্চার নাম, গোত্র, জন্মলগ্ন হিসেব কষে জানিয়ে দিত, বাচ্চাটি ভাল আছে না খারাপ আছে। দূরে আছে না কাছে আছে। কোনও দিন ফিরে আসার আদৌ কোনও সম্ভাবনা আছে না নেই। নাকি একেবারেই গুম হয়ে গেছে। এবং অবাক কাণ্ড, যারা হারিয়ে যেত, পাঁচ-দশ বছর পর, কখনও কখনও বিশ বছর বাদেও তাদের দূর সম্পর্কের কোনও আত্মীয় হঠাত্‌ করে এসে খবর দিত, তাঁদের ছেলেকে নাকি সে দেখেছে। বাড়িতে ফিরিয়ে আনার অনেক চেষ্টাও করেছে। কিন্তু সে নাকি কিছুতেই রাজি হয়নি। সে বলেছে, আমি এখানে খুব ভাল আছি।
— কিন্তু কোথায় দেখা গেছে তাকে? এই প্রশ্নের তখন গতে-বাঁধা একটাই উত্তর ছিল। হয় গঙ্গাসাগর নয় বম্বে। তখনকার বেশির ভাগ লোকেরাই মনে করত, যে হারিয়ে গেছে সে নিশ্চয়ই একদিন না-একদিন ফিরে আসবে। আর কোনও বাচ্চা যদি পরীক্ষার ফল খারাপ হওয়ার পরে কিংবা মা-বাবার কাছে কোনও কারণে উত্তম-মধ্যম মার অথবা মারাত্মক কোনও বকুনি খাওয়ার পরে আচমকা উধাও হয়ে যেত, তখন ধরেই নেওয়া হত, বাচ্চাটি হয় সাধু হয়ে গেছে নয়তো বন্বে পাড়ি দিয়েছে। অধিকাংশ লোকই তখন মনে করত, একবার বম্বে গেলেই সবাই সিনেমার নায়ক হয়ে যায়।
তাই বাচ্চা হারানো অনেক মা-বাবাই পরবর্তিকালে সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের মধ্যে তাঁদের সন্তানদের আদল খুঁজে বেড়াতেন। সামান্যতম মিল বা কাকতালীয় ভাবে মিলে যাওয়া কোনও তিল বা কাটা দাগ অথবা অন্য কোনও চিহ্ন দেখে তারা ভেবেই নিতেন, এ-ই তাঁর হারানো ছেলে কিংবা মেয়ে।
কখনও সখনও ছুটেও যেতেন সেখানে। বারবার তাকে মনে করাবার চেষ্টা করতেন ছেলেবেলাকার কথা। এবং শেষ অবধি যথারীতি খালি হাতে ফিরে এসে নিজেদের সান্ত্বনা দিতেন, ও যতই অস্বীকার করুক, না-চেনার ভান করুক, আমি তো চিনতে পেরেছি। চোখের দেখা তো দেখেছি। যাক বাবা, ও আমাদের কাছে আসুক না-আসুক, ও যে ভাল আছে, সেটাই অনেক। যেখানেই থাকুক, ঠাকুর যেন ওকে ভাল রাখে। সুখে রাখে।
ইমলি একবার শুনেছিলেন, তাঁদের অঞ্চলের হারিয়ে যাওয়া একটা বাচ্চার ক্ষেত্রে নাকি কোন গুনিন একবার বলেছিল— আছে। তবে আর বেশি দিন থাকবে না। নিঃসন্তান এক দম্পতি মা কালীর কাছে মানত করেছিল, আমাদের পুত্র সন্তান হলে আমি তোমাকে নরবলি দিয়ে পুজো দেব। এত বছর পর, এই কিছু দিন আগে তাদের একটা ছেলে হয়েছে। হওয়ার পর থেকেই খুব ভুগছে। তাই তাদের ধারণা হয়েছে, মা কালীর কাছে করা মানত যত দিন না তারা পূরণ করছে, তাদের ছেলে কিছুতেই সুস্থ হবে না। তাই বিপুল টাকা দিয়ে ছেলেধরার কাছ থেকে ওরা তোদের ছেলেকে কিনে নিয়েছে। এবং এই অমাবস্যার রাতেই তারা তাকে মা কালীর সামনে উত্‌সর্গ করবে।
ছেলেবেলায় এ রকম কথা আরও অনেক শুনেছিলেন ইমলি। শুনেছিলেন, আগেকার দিনে নাকি নিঃসম্তান রাজা-রাজরারা, এমনকী, জমিদাররা পর্যন্ত শেষ বয়সে তাঁদের ধন-সম্পত্তি, সোনাদানা, হিরে-জহরত, টাকা-পয়সা মাটির নীচে গুপ্তঘর বানিয়ে তার মধ্যে রেখে দিতেন। তার সঙ্গে সেখানে রেখে আসতেন এমন একটা নিখুঁত বালক, যার শরীরে কোথাও কোনও কাটাচেরা নেই। আসার সময় বাইরে থেকে দরজা আটকে দিতেন। কিংবা বড় কোনও পাথর দিয়ে আটকে দিতেন গুহার সেই মুখ। যাতে সে আর বেরোতে না পারে। তাঁরা বিশ্বাস করতেন, ছেলেটা একসময় আলো, বাতাস-হীন ওই ঘরে না খেয়ে-দেয়ে দমবন্ধ হয়ে মারা যাবে। মারা যাবার পর সাপ হয়ে তাঁদের ওই সম্পত্তি পাহারা দেবে। যত দিন না তিনি আবার জন্মগ্রহণ করে পৃথিবীতে আসছেন কিংবা তাঁর কোনও বংশধর সেই সম্পত্তি উদ্ধার করছে, তত দিন। সে যুগে এটাকে বলা হত— যক্ষ করে রাখা।
এখন সময় পাল্টেছে। এ সব কথা আর শোনা যায় না। কিন্তু শোনা যায় না বলেই যে ও সব একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে, সে কথা কি হলপ করে বলা যায়! কেউ যে তলে-তলে এ সব করে না, সে কথাও কি খুব জোর দিয়ে বলা যায়! না। বলা যায় না।
আমরা বিশ্বাস করি আর না-করি, এখনও কিন্তু বহু গুনিন আছে। বহু ওঝা আছে। তারা তুকতাক-ফুঁকফাকও করে। এখনও গ্রামের দিকে কারও বাড়িতে টাকা-পয়সা খোয়া গেলে বাড়ির সবাইকে চালপোড়া খাওয়ানো হয়। লোকে বলে, ওই মন্ত্রপূত চালপোড়া মুখে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নাকি যে চুরি করেছে, তার রক্তবমি শুরু হয়ে যায়, যতক্ষণ না সে স্বীকার করে সে চুরি করেছে, ততক্ষণ থামে না।
মন্ত্রের গুণ না থাকলে এটা হত! এখনও কারও বাড়িতে কোনও কিছু হারালে বাটি-ঘটি চালান দেওয়া হয়। যে পথ দিয়ে চোর সেটা নিয়ে গেছে, সেই পথ দিয়েই মন্ত্রপড়া বাটিটা এঁকেবেঁকে গিয়ে, চোর যেখানেই থাকুক না কেন, পুকুরের মধ্যে এক গলা জলে দাঁড়িয়ে থাকলেও, সেটা গিয়ে চোরের গায়ে একেবারে চুম্বকের মতো সেঁটে যায়। যতক্ষণ না সবার সামনে কবুল করে সে নিয়েছে, ততক্ষণ সেটা তার গায়েই আটকে থাকে।
কাউকে সাপে কাটলে এখনও গ্রামের দিকের লোকেরা রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেয়ে ওঝার কাছে নিয়ে যাওয়াটাকেই শ্রেয় মনে করেন। ওঝাই তুকতাক করে দংশন করা সাপটাকে নাকি ফের ওখানে নিয়ে আসে। ছোবল খাওয়া ব্যক্তির শরীর থেকে বিষ তুলে নিতে বাধ্য করে। এবং নির্ঘাত্‌ মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে একটা জীবন।

চলবে   ………..