মহাশূন্যে জুরান — সিদ্ধার্থ সিংহ – পর্ব – ১৬

মহাশূন্যে জুরান সিদ্ধার্থ সিংহ
— অনেকেই?
— হ্যাঁ, অনেকেই। তার মধ্যে তুমিও কারও কারও কথা জানো।
জুরান অবাক হয়ে বলল, আমি জানি?
— হ্যাঁ জানো। যেমন ধরো, তোমার বাবা-মা যাঁর ছবি লক্ষ্মীর আসনে রেখে পুজো করেন, সেই রামকৃষ্ণও তার মধ্যে একজন।
— অ্যাঁ!
সময়-কণা বলল, অ্যাঁ নয়, হ্যাঁ। কারণ কী জানো?
— কী?
— তোমরা যতই বলো, পড়াশোনা মানুষের মনের জানালা খুলে দেয়। এক ঝলক মুক্ত বাতাস বয়ে আনে। আসলে পড়াশোনা মানুষের ভাবনা-চিন্তাকে একটা গণ্ডির মধ্যে বন্দি করে দেয়। যে গণ্ডির বাইরে বেরিয়ে এসে, পড়ালেখা করা কোনও মানুষের পক্ষে নতুন ভাবে কিছু বলা সত্যিই মুশকিল।
জুরান বলল, সে কী!
— হ্যাঁ। যেমন ধরো, আমি যদি তোমাকে জিজ্ঞেস করি, দুই আর দুইয়ে কত? তুমি কী বলবে? চার। তাই তো? শুধু তুমি নও, তোমার মতো যারা পড়াশোনা করে, তারা প্রত্যেকেই এই একই কথা বলবে। অর্থাত্‌ তোমাদের সবার রা— ওই একই। কিন্তু যে ছেলেটা পড়াশোনা জানে না। কোনও দিনও বই ওল্টায়নি, সে কিন্তু তার অজ্ঞতার জন্যই অনায়াসে বলে দিতে পারে পাঁচ, নয়, বারো কিংবা তিরিশ। তাই নয় কি?
আমতা আমতা করে অস্ফুট স্বরে জুরান বলল, হ্যাঁ।
— সবার থেকে এই আলাদা করে কিছু বলাটাই হল আসল কৃতিত্ব।
— কিন্তু সেটা তো ভুল!
সময়-কণা বলল, না না। মোটেই না। তোমাদের পুঁথিগত বিদ্যার জ্ঞানে ভুল মনে হলেও, আসলে ওটা ভুল নয়। একদমই নয়। বরং খুব সহজ ভাবে অবলীলায় সত্যি কথা বলার ওটা একটা প্রস্তুতি। এই ভাবে ছোট ছোট ভুল বলতে বলতেই, ভুল করেই মানুষ একদিন সব চেয়ে বড় সত্যি কথাটা হুট করে বলে ফেলেন। আর তিনি যখন সেই কথাটা বলে ফেলেন, তার অন্তর্নিহিত মানে বুঝতে পেরে প্রচুর বই-পড়া পণ্ডিত মানুষেরাও হতবাক হয়ে যান। তাঁকে কুর্নিশ করেন। শ্রদ্ধা জানান। তাঁর ভক্ত হয়ে ওঠেন।
— কিন্তু যারা পড়াশোনা করে না, লোকে তো তাদের ‘মূর্খ’, ‘অপদার্থ’, ‘ব্যর্থ’, ‘অযোগ্য’, ‘জীবনে কিচ্ছু করতে পারবি না’, বলে!
— কিন্তু বাস্তব কী বলে?
জুরান বলল, কী?
সময়-কণা জিজ্ঞেস করল, তুমি কি জানো, বিশ্বে যত যা উন্নতি হয়েছে, যা কিছু আবিষ্কার হয়েছে, তার পিছনে কে?
— কে?
— সাহিত্য। সাহিত্যই মানুষের চোখ খুলে দেয়। মানুষের মনকে নাড়া দিয়ে যায়। মানুষকে ভাবতে শেখায়।
— তাই!
— হ্যাঁ তাই। আচ্ছা, তুমি কি জানো, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সাহিত্য কোন ভাষায় লেখা হয়েছে?
জুরান বলল, না। কোন ভাষায়?
— ফরাসি ভাষায়। সেই ভাষার জনক কাকে বলা হয় জানো?
— না। কাকে?
সময়-কণা বলল, বালজাককে। ছোটবেলায় যে-ছেলেটা পড়াশোনায় এতটাই অপদার্থ ছিলেন যে, তাঁর বাবা-মা পর্যন্ত তাঁকে কখনও তাঁদের কাছে রাখতে চাননি। পাঠিয়ে দিয়েছিলেন বহু দূরের একটা বিনে-পয়সার সরকারি আবাসিক-স্কুলে। সেই স্কুলে, ক্লাসে যারা পড়াশোনা পারত না, মানে পড়ালেখায় যারা ছিল একেবারেই কাঁচা, গণ্ডমূর্খ, সোজা বাংলায় যাকে বলে গর্দভ, তাদের গিয়ে বসতে হত স্কুলের প্রধান ফটকের সামনে রাখা ‘গাধার বেঞ্চ’-এ। যাতে সামনে দিয়ে যাতায়াত করা পথ-চলতি লোকেরা তাকে দেখতে পায়। ওই লোকজন দেখছে দেখে, তাদের যাতে একটু লজ্জা হয়। লজ্জায় পড়ে যাতে তারা পড়ালেখা করে। পড়া মুখস্থ করে।
কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে ওই দাওয়াই কাজ করলেও, তাঁর ক্ষেত্রে নাকি কোনও কাজ করেনি। সেই বেঞ্চে নাকি ওই বালজাককে যত বার বসতে হয়েছে, ওই স্কুলের আর কোনও পড়ুয়াকে নাকি অত বার বসতে হয়নি। যার জন্য খ্রিস্টমাসের দীর্ঘ ছুটির সময় সবার অভিভাবকেরা যখন তাঁদের সন্তানদের বাড়ি নিয়ে যেতেন, তখনও তাঁর বাবা-মা তাঁকে বাড়িতে নিয়ে যেতেন না। এমনকী, কেউ তাঁদের কাছে বালজাকের কথা জিজ্ঞেস করলেও, তাঁরা অতি সম্তর্পণে সে প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতেন।
যাঁর সম্পর্কে বাবা-মা তো বটেই, আত্মীয়স্বজন, এমনকী পাড়াপ্রতিবেশীরা অবধি এতটা হতাশ ছিলেন, সেই গণ্ডমূর্খ, অপদার্থ ছেলেটাই কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই লোকগুলির মাতৃভাষার শ্রেষ্ঠ লেখক হয়ে উঠলেন। হয়ে উঠলেন ফরাসি সাহিত্যের জনক।
জুরান বলল, কী করে হলেন?
— হলেন। কারণ, স্কুলের পাঠক্রম তাঁর চোখে কোনও ঠুলি পরাতে পারেনি। উনি নিজের মতো করে সব কিছু দেখেছেন। নিজের মতো করে বুঝেছেন। নিজের মতো করে ভেবেছেন। নিজের মতো করে বলেছেন। আর নিজের মতো করে লিখেছেন।
— কিন্তু উনি যদি পড়ালেখাই না-করতেন, যতটুকু পড়েছেন, সামান্য ওই শিক্ষাটুকুও যদি অর্জন না-করতেন, যদি কলম দিয়ে সাদা পাতায় আঁচড়ই না-কাটতে শিখতেন? তখন?
সময়-কণা বলল, তখন হয়তো তার চেয়েও বড় লেখক হতেন।
— না লিখেই?
— তুমি হয়তো জানো না, শুনে রাখো। এক বিশাল বড় ব্যবসায়ীর দুটি বিচ্ছু ছেলে ছিল। তারা শুধু চঞ্চলই ছিল না, ছিল ভীষণ দুষ্টুও। কখন যে কী করে বসে, এক মুহূর্ত আগেও কেউ বুঝতে পারত না। কেউ নাকি তাদের কখনও কোথাও শান্ত হয়ে দু’দণ্ড বসতে দেখেনি। তাদের দেখাশোনার জন্য কত লোক যে রাখা হয়েছিল, তার কোনও ইয়ত্তা নেই। কিন্তু কেউই ওদের অত্যাচারে দু’দিনের বেশি টিকতে পারত না।
সেই দুটো ছেলেকে তাদের বাবা-মা একদিন বিকেলবেলায় পার্কে বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিলেন। আর পার্কে ঢুকেই ছেলে দুটি চোখের পলকে কোথায় যে ছুটে গেল, আর খুঁজে পাওয়া গেল না। খুঁজতে খুঁজতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। তখন তাদের বাবা-মা হঠাত্‌ দেখলেন, সেই বিশাল পার্কের এক ধারে প্রকাণ্ড একটা গাছের তলায় ছেঁড়া-ময়লা পোশাক পরা, এক-মুখ দাড়ি-গোঁফওয়ালা পাগলাগোছের আধবুড়ো একটা লোকের সামনে ওই দুই ভাই চুপটি করে বসে আছে। মুগ্ধ হয়ে তাঁর কথা শুনছে।
বাবা-মা তো অবাক। পাগলাটা তাঁদের ছেলে দুটিকে কোনও জাদুটোনা করেনি তো! লোকটা ওদের কী বলছে! শোনার জন্য পা টিপে-টিপে ছেলেদের পিছনে গিয়ে বসে পড়েছিলেন সেই বাবা-মা।
যখন ঘোর কাটল, তখন ভোর হয়ে গেছে। ওঁরা অবাক। এমন মনোমুগ্ধকর গল্প কেউ এই ভাবে অনর্গল বলে যেতে পারে! লোকটিকে ওঁরা নিজেদের বাড়িতে নিয়ে এলেন। লোকটা তাঁদের দুই ছেলেকে প্রত্যেক দিন বিকেলবেলায় বাড়ির সামনের লনে বসে গল্প শোনাতেন। আর ওই স্বামী-স্ত্রী সেগুলি লিপিবদ্ধ করে রাখতেন। পরে যখন সেটা বই হয়ে বেরোল, গোটা পৃথিবী স্তম্ভিত হয়ে গেল। অনুবাদ হয়ে গেল বিশ্বের প্রায় সমস্ত ভাষায়। সেই বই থেকে দেশ-বিদেশ মিলিয়ে এত রয়্যালটি আসতে লাগল যে, ওই ব্যবসায়ী স্বামী-স্ত্রী তাঁদের এত দিনের অত্যন্ত লাভজনক অন্যান্য ব্যবসা গুটিয়ে একটা প্রকাশনা খুলে ফেললেন এবং সেই পাগলাগোছের লোকটার পি.এ হয়েই সারা জীবন কাটিয়ে দিলেন।
না। ওই পাগলাগোছের লোকটা লিখতে-পড়তে জানতেন না। তবু, এখনও রহস্য, রোমাঞ্চ, ভূত, অলৌকিক, কল্পবিজ্ঞান, রূপকথার কথা উঠলেই গোটা দুনিয়ার মানুষ একবাক্যে তাঁর নাম উচ্চারণ করেন।
জুরান জিজ্ঞেস করল, তাঁর নাম কী?
— তাঁর নাম! এই রে! এক্ষুনি মনে পড়ছে না। দাঁড়াও, মনে পড়লেই তোমাকে বলছি।
— তাই? কিন্তু আমি তো শুনেছিলাম, যারা পড়াশোনা করে না, কাজকর্ম করতে চায় না, একদম কুঁড়ে, তাদের জীবনে নাকি কিচ্ছু হয় না!
সময়-কণা জানতে চাইল, কে বলল?
— সবাই তো তাই-ই বলে।
— ভুল বলে। সম্পূর্ণ ভুল বলে। বরং উল্টোটাই ঠিক। যারা কুঁড়ে হয়, অলস হয়, দেখা গেছে, পৃথিবীর সব চেয়ে কঠিন কাজগুলো সহজে করার রাস্তা তারাই বার করেন।
জুরান বলল, তাই নাকি?
— হ্যাঁ। যেমন ধরো, দুটো গ্রামের মাঝখান দিয়ে একটা নদী বয়ে গেছে। এক গ্রাম থেকে আর এক গ্রামে যেতে হলে অনেকটা পথ ঘুরে যেতে হয়। তাই, যারা কুঁড়ে, যারা অতটা পথ হাঁটতে চায় না, অতি সহজে টুক করে ও পারে চলে যাবার সহজ রাস্তা তারাই প্রথম বার করেছিল।
— কী?
সময়-কণা বলল, কলার ভেলা। যার পরবর্তী ধাপ নৌকো। সেই নৌকোর দাঁড় টানতেও যাদের অনীহা ছিল, তারাই প্রথম তৈরি করেছিল সাঁকো। যাকে তোমরা ব্রিজ বলো। আসলে যারা কুঁড়ে হয়, তারা বেশি খাটতে চায় না। শর্টকাটে কাজ সারতে চায়। সহজ রাস্তা খোঁজে। আর সেটা খুঁজতে গিয়েই আবিষ্কার করে ফেলে একটার পর একটা অভিনব উপায়।
বয়সে ছোট হলেও জুরান বুঝতে পারল, সময়-কণা তাকে বোঝাবার জন্য তার লেভেলে নেমে এসে সহজ করে এই কথাগুলো বলছেন। তিনি যদি এগুলো এ ভাবে না বলতেন, তা হলে হয়তো পুরো ব্যাপারটাই তার কাছে বড্ড জটিল লাগত। লাগত বড্ড কঠিন। কিন্তু কই, তার কাছে তো তা লাগল না। এত সুন্দর করে বললেন… কিন্তু সময়-কণা যা বললেন, তা কি ঠিক বললেন? পুরোটাই ঠিক? জুরান ভাবতে লাগল, ভাবতেই লাগল।
 
পনেরো 
 
ঘর থেকে এক ছুটে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করলেন তিতার। কিন্তু তাঁর পা যেন ঘরের মেঝের সঙ্গে ফেবিকুইক দিয়ে সাঁটা। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে পা তোলার চেষ্টা করেও তিনি পা তুলতে পারলেন না।
ভীষণ ঘাবড়ে গেলেন উনি। তবে কি সারা জীবন তাঁকে এ ভাবেই দাঁড়িয়ে থাকতে হবে! যতই উনি এটা ভাবতে লাগলেন, ততই তাঁর সারা শরীর দিয়ে দরদর করে ঘাম বেরোতে লাগল। তাঁর এখন একটাই চিন্তা, সে রকম কোনও বিপদ আবার মাথাচাড়া দিয়ে সামনে এসে দাঁড়াবে না তো!
তিতারের ভ্রু কুঁচকে গেল। এ তো বড় অদ্ভুত ব্যাপার। তাঁর সেই ছেলেবেলায়, তাঁদের গ্রামে এর-তার বাড়ির আশপাশ দিয়ে সরু সরু জল নিকাশি মেঠো নালাগুলি গ্রামের একটা বড় নালায় গিয়ে মিশেছিল। বর্ষার জল শুকিয়ে যাওয়ার পরে সেই নালার কোল জুড়ে সোনালি রঙের এক ধরনের লতানো গাছ হত।
সেই গাছে বনকুলের চেয়েও ছোট ছোট এক রকমের জংলা ফুল ফুটত। কিন্তু সন্ধ্যা নামলেই সেই সাদা-সাপটা ফুলগুলি ময়ূরের পেখমের মতো রঙিন হয়ে উঠত। অদ্ভুত এক আলো ঠিকরে বেরোত সেগুলি থেকে।
একবার তাকালে আর চোখ ফেরানো যেত না। তার ছোট্ট ছোট্ট তিতকুটে ফলগুলিও দিনের আলো কমার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সুস্বাদু আর সুগন্ধী হয়ে উঠত। ঝিকমিক করতে থাকা ওই লাল নীল সবুজ ফুলগুলি দু’চোখ ভরে দেখার জন্য আরও অনেকের মতো তিনিও যখন একদিন সন্ধ্যাবেলায় ওখানে গিয়েছিলেন, দাঁড়িয়ে দেখতে দেখতে পা যখন ব্যথায় টনটন করছিল, তখন ওই নালার পাশেই বসে পরেছিলেন তিনি।
ওগুলোকে আরও ভাল করে দেখার জন্য যখন একটু ঝুঁকেছিলেন, ঠিক তখনই সোনালি রঙের ছোট ছোট লতানো গাছের ডালপালা তরতর করে বেড়ে তাঁকে আষ্টেপৃষ্ঠে পেঁচিয়ে ধরেছিল। নালার মধ্যে দিয়ে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গিয়েছিল এক অন্ধকার পাতাল কুঠুরিতে। মাঝারি মাপের শক্তপোক্ত একটা সুঠাম গাছের সামনে।
তিনি যখন প্রচণ্ড ভয় পেয়ে বাবা-মায়ের জন্য কাঁদছিলেন, তখন সেই গাছটা, যার শিকড়-বাকড় নিয়ে মাটি আঁকড়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকার কথা, সে গুটিগুটি পায়ে তাঁর দিকে এগিয়ে এসেছিল। আর তিনি? যিনি কিনা সারা দিন ছোটাছুটি করে খেলে বেড়ান, যখন যেখানে খুশি যান, তিনি কিনা ওই বিপদের সময় হাজার চেষ্টা করেও এক পা-ও নড়তে পারলেন না। কেন জানি বারবারই তাঁর মনে হচ্ছিল, পায়ের তলা দিয়ে মোট মোটা শিকড় বেরিয়ে মাটি কামড়ে আছে!
তার উপরে জানালা দিয়ে আসা দমকা বাতাসের সঙ্গে যে গন্ধটা তাঁর নাকে আজ বারবার আছড়ে পড়ছে, সেটাও তো সেই দিনেরই সেই গন্ধ। তার মানে, এখন একটা কিছু ঘটবে। কিন্তু কী! কার মুখোমুখি দাঁড় করানোর জন্য তাঁর ঘরের মেঝে এই ভাবে তাঁকে আটকে রেখেছে! কার!
ঠিক তখনই তিতার দেখলেন, এই সাত-সকালে যেখানে গোটা চরাচর জুড়ে আলো লুটোপুটি খাচ্ছে, সেখানে তাঁর ঘরের ভিতরটা হঠাত্‌ করেই কেমন যেন ছায়ায় ঢেকে যেতে লাগল। কী রকম একটা অন্ধকার-অন্ধকার মতো।
তবে কি মেঘ করেছে আকাশে! জানালার দিকে তাকাতেই তিতার দেখলেন, ধূসর রঙের ধোঁয়ার একটা কুণ্ডলি পাক খেতে খেতে ওই জানালা দিয়ে তাঁর ঘরের মধ্যে ঢুকছে। কুণ্ডলিটা ঢুকেই চোখের পলকে এক মানুষ সমান লম্বা, খানিকটা মত্‌স্যকন্যার মতো আদল নিয়ে মেঝে থেকে মাত্র ক’আঙুল উঁচুতে উঠে ভাসতে লাগল। ভাসতে ভাসতেই বলল, চ্যাঁ চুঁ ইঁয়াকো?
তিতার প্রথমে ঘাবড়ে গেলেন। তাঁর মনে হল, এ নির্ঘাত্‌ কোনও ভূত। শুধু ভূত বললে একটু কমই বলা হয়। এ একটু সাহসী ভূত। যে ভূত শুধু ভরদুপুর কিংবা ভরা-সন্ধ্যাতেই নয়, একেবারে সক্কালবেলায় মানুষের সামনে আসতেও এতটুকু ভয় পায় না।
ও যদি ভূত হয়ে মানুষকে ভয় না-পায়, তা হলে মানুষ হয়ে তিনি কেন ভূতকে ভয় পেতে যাবেন! আগে তিনি কোনও দিন ভূত দেখেননি। ভূতের সঙ্গে কখনও কোনও দিন কথাও বলেননি। ফলে ভূতের ভাষাও তিনি জানেন না। সুতরাং ‘চ্যাঁ চুঁ ইঁয়াকো’র মানে কী, তিনি তার বিন্দুবিসর্গও বুঝতে পারলেন না। তবু ও যখন কষ্ট করে এখানে এসেছে, তাঁকে কিছু বলছে, তখন সে কথার উত্তরও তো তাঁর দেওয়া উচিত, নাকি? কিন্তু তার কথা বুঝতে না পারলে তিনি বলবেনটাই বা কী! তাই তাঁর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, অ্যাঁ?
সঙ্গে সঙ্গে মত্‌স্যকন্যা বলল, চ্যাঁ চুঁ ইঁয়াকো?
এ বারও বুঝতে না-পেরে আমতা আমতা করে তিতার বললেন, আমি আপনার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না।
তাঁর কথা শেষ হওয়ার আগেই মত্‌স্যকন্যাটা তাঁর দিকে হাত দেখিয়ে, তাঁকে যেন অপেক্ষা করতে বলল। তার পর ডান হাতটা নিজের মাথার চার দিকে গোল করে তিন বার ঘোরাল। বলল, এ বার বলো…
তিতার অবাক। তিনি ভুল শুনছেন না তো! এ তো একেবারে একশো পারসেন্ট বিশুদ্ধ বাংলা ভাষা। তার মানে ও বাংলা জানে। তাই তিনি বিড়বিড় করে বললেন, কী বলব? ‘চ্যাঁ চুঁ ইঁয়াকো’র মানে কি আমি তো তা-ই জানি না।
মৎস্যকন্যা বলল, আসলে আমারই ভুল। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম ‘ভাষান্তর’টার লক খুলে দিতে। সুতরাং আমরা আমাদের মধ্যে যে ভাষায় কথা বলি, সেই ভাষাই বেরিয়ে পড়েছিল। এখন এই যে মাথাটার চার দিকে তিন বার হাত ঘুরিয়ে ‘ভাষান্তর’টা খুলে দিলাম, এখন আর কোনও চিন্তা নেই। আমি যা বলব, তা হুবহু তোমার মাতৃভাষায় অনুবাদ হয়ে তোমার কাছে পৌঁছবে। আর তুমি যা বলবে, সেটা আমার কাছে আমার ভাষায় রূপান্তর হয়ে ধরা দেবে। সে যাই হোক, আমি বলছিলাম, তুমি কেমন আছ?
তিতার মনের ভিতরে একটু সাহস এনে বললেন, আমি… আমি… আমি ভাল আছি।
— ভাল আছ মানে? আমি তো বুঝতে পারছি তুমি মনে মনে খুব ছটফট করছ। আর মুখে বলছ ভাল আছি?
— আপনি কী করে জানলেন?
— আমি জানব না!
তিতার অবাক হয়ে বললেন, আপনি কি আমাকে চেনেন?
— না চিনলে কি তোমার ভিতরের ছটফটানি দেখে আমি এখানে ছুটে আসতাম?
— কিন্তু আমি তো আপনাকে চিনতে পারছি না।
— না দেখলে চিনবে কী করে? তোমার তো আমাকে না চেনারই কথা। তবে হ্যাঁ, একটু মনে করলেই চিনতে পারবে।
— মনে করলেই! কই, আপনাকে কখনও দেখেছি বলে তো মনে পড়ছে না।
— মনে করো, মনে করো, মনে করো…
— করছি তো… কিন্তু…
মৎস্যকন্যা বলল, একটু ছোটবেলায় ফিরে যাও। ছোটবেলার কথা মনে করো। তোমার গ্রামের সেই পাঁচ মহলা বাড়ির কথা। বাড়ির পিছন দিকের সেই পুকুরটার কথা। কী? কিছু মনে পড়ছে? মনে পড়ছে, তোমরা সবাই মিলে দল বেঁধে হইহই করে সেখানে স্নান করতে যেতে। পুকুরের পার ঘেঁষে হেলে ওঠা খেজুর গাছে উঠে ঝপাং ঝপাং করে জলে ঝাঁপ দিতে। মনে পড়ছে? একবার তুমি ঝাঁপ দিতেই তোমার পা ধরে টানতে টানতে জলের অতলে নিয়ে যাচ্ছিল একজন। মনে পড়ছে?
মৎস্যকন্যা মনে করিয়ে দিতেই তিতার বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে। মনে পড়েছে। আমি যখন তার কবল থেকে নিজেকে ছাড়াবার জন্য প্রাণপণে হাত-পা ছুড়তে ছুড়তে একদম কাহিল হয়ে পড়েছি, মনে হচ্ছে আর কোনও দিনই ডাঙায় উঠতে পারব না। ঠিক তখনই, যে আমার পা ধরে জলের আরও তলায় টেনে নিয়ে যাচ্ছিল, সে ছেড়ে দিয়েছিল।
— না। সে ছাড়েনি।
তিতার অবাক, মানে?
— মানে, তখন আর একজন পিছন দিক থেকে গিয়ে খুব জোরে তার মুখ চেপে ধরেছিল। ফলে নিজে বাঁচার জন্যই সে তখন তোমাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল।
— ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল! কিন্তু আপনি এটা জানলেন কী করে?
— কারণ, আমি তখন ওখানে ছিলাম। ও ছাড়লেও তুমি তখন প্রায় অচৈতন্যের মতো হয়ে গিয়েছিলে। বলতে গেলে, তোমার তখন কোনও জ্ঞানই ছিল না। সাঁতার কাটা তো দূরের কথা। তখন আমিই তোমাকে কোলপাঁজা করে জলের উপরে তুলে দিয়েছিলাম। তুমি যখন বুক ভরে বড় বড় শ্বাস নিচ্ছিলে, আমি তখন সেখান থেকে সরে গিয়েছিলাম।
— কিন্তু কেন?
— যাতে আমার কথা তুমি ঘুণাক্ষরেও জানতে না পারো।
— সে কী! তা হলে এখন এলেন কেন?
— কারণ সেই একই। তুমি এখন বিচলিত। তোমাকে কখনও এত বিচলিত হতে আমি দেখিনি। তুমি মনে মনে ভীষণ ছটফট করছ, মানে, তুমি কোনও একটা বিপদে পড়েছ। তাই…
তিতার বললেন, তার মানে আপনি আমাকে ফলো করেন?
— বলতে পারো।
— কিন্তু কেন? আমি কি আপনার খুব কাছের কেউ?
— না। সেই হিসেবে কেউ না।
— তা হলে?
চলবে   ………..



Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: