মহাশূন্যে জুরান — সিদ্ধার্থ সিংহ – পর্ব – ১৫

মহাশূন্যে জুরান সিদ্ধার্থ সিংহ
এ সব তিনি বইতে পড়েছেন। কিন্তু যা তিনি পড়েননি, যা তিনি জানেন না কিংবা এই পৃথিবীতে আছে কিন্তু এখনও কেউ তার হদিশ পাননি, এ রকম গাছও তো কম নেই, তবে? এটা সে রকম কোনও গাছ নয় তো! যে গাছ শুধু মারাত্মকই নয়, ভয়ঙ্করও।
হতে পারে! হতেই পারে। কিন্তু এখান থেকে তিনি পালাবেন কী করে! এখান থেকে কি বেরোনোর কোনও পথ আছে! চার দিকেই তো মাটির দেওয়াল। কোথাও কোনও দরজা দেখা যাচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে না কোনও জানালাও। মনে হয়, এটা কোনও পাতাল ঘর! গুমঘর!
যেখানে আগেকার রাজা-বাদশারা বন্দি করে রাখতেন অন্য দেশের গুপ্তচরদের, এটা বোধহয় সে রকমই কোনও ঘর। তা হলে তো তাঁকে না খেয়েদেয়ে এখানে গুমরে গুমরে পচে মরতে হবে। বাঁচার কি সত্যিই আর কোনও উপায় নেই! তার বাবা-মা তো জানতেও পারবেন না, তাঁর ছেলের কী হয়েছে। তাঁরা তো কাঁদতে কাঁদতেই মরে যাবেন।
হায় রে… এ কী হল! বুক ফেটে যখন তাঁর কান্না বেরিয়ে আসছে, তখন দেখলেন, সেই গাছটা তার একটা ডালের নরম কচিপাতা দিয়ে তাঁর চোখের জল মুছিয়ে দিচ্ছে। আর অন্য একটা ডাল দিয়ে তাঁর মাথায়-পিঠে যেন স্নেহের হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
তবুও ভয়ে কাঠ হয়ে গেলেন তিতার। আতঙ্কে দু’হাতে গাছটাকে ধাক্কা মেরেই উল্টো দিকে দৌড়তে শুরু করলেন। কিন্তু কোথায় যাবেন তিনি! সামনেই তো দেওয়াল। কিন্তু উনি তখন চোখে আর কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছেন না। মাথাও কোনও কাজ করছে না।
এই ভয়াবহ জায়গা থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব উনি পালাতে চান। থাকুক সামনে দেওয়াল। তিনি থামবেন না। কোনও গাছের ডালপালার ফাঁসে তিলে তিলে দম বন্ধ হয়ে মরার চেয়ে কোনও দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে একেবারে মরে যাওয়া অনেক ভাল।
এই ভেবে দৌড়ে গিয়ে যে-ই তিনি দেওয়ালে আছড়ে ফেলেছেন নিজেকে, অমনি কোথায় দেওয়াল! আর কোথায় সেই ভয়ঙ্কর পরিবেশ! এ তো তাঁর বাড়ির চাতাল।
তা হলে কি ওই দেওয়াল-টেওয়াল সবই তাঁর মনের ভুল! নাকি দেওয়ালটা ছিল অন্য কোনও জগতের একটা সীমারেখা! যে-ই তিনি লাফ দিয়ে সেই সীমারেখাটাকে টপকে গিয়েছেন, তৎক্ষণাৎ ওই সীমানা পেরিয়ে তিনি চলে এসেছেন তাঁর নিজের জগতে! আশপাশে তখন সকালের আলো ফুটব ফুটব করছে। বাড়ির সকলে তখনও অঘোর ঘুমে।
না। এ কথা কাউকে বলা যাবে না। বললে শুধু বকাঝকাই নয়, তাঁর পিঠে খুব ভাল রকমেরই উত্তম-মধ্যম পড়বে। সুতরাং আর কোনও কথা নয়। কেউ টের পাওয়ার আগেই, যে-ভাবে উনি চুপিচুপি ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন, ঠিক সেই ভাবেই পা টিপে টিপে ঘরে ঢুকে চুপটি করে খিল তুলে দিয়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়েছিলেন।
শুয়ে ছিলেন ঠিকই, কিন্তু তখনও বুকের ঢিপঢিপ শব্দটা তাঁর কানের কাছে যেন হাতুড়ি পেটাচ্ছিল। আর জানালা দিয়ে আসা দমকা বাতাসের সঙ্গে বার বার তার নাকে ভেসে আসছিল ভারী অদ্ভুত একটা গন্ধ। কীসের গন্ধ এটা! কীসের!
তিতার সে দিন বুঝতে পারেননি। আজও বুঝতে পারলেন না। তবু তাঁর হঠাত্‌ মনে হল, ঘরের ভিতরে ঢোকার পর থেকেই তিনি যে গন্ধটা পাচ্ছেন, সেটা ওই গন্ধ। হঠাত্‌ হঠাত্‌ পাল্টে যাওয়া ওই গন্ধ। হ্যাঁ, এটা ওই গন্ধই।
তেরো
ইমলির যখন জ্ঞান ফিরল, চোখ মেলে দেখলেন, তাঁকে ঘিরে অনেক লোকজন দাঁড়িয়ে আছেন। কেউ কেউ পেছন থেকে উঁকিঝুঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করছেন, ব্যাপারটা কী? একদম সামনে যে লোকটা, তাঁর হাতে একটা মিনারেল ওয়াটারের অর্ধেক বোতল। সম্ভবত ওই বোতল থেকেই তাঁর চোখে-মুখে জল ছেটানো হয়েছে। তাই তাঁর সারা মুখ ভেজা।
আঁচল দিয়ে মুখ মুছে দু’হাতের চেটোয় ভর দিয়ে কোনও রকমে উঠে বসতেই সামনের সেই ভদ্রলোক জলের বোতলটা এগিয়ে দিয়ে বললেন, একটু জল খান। ভাল লাগবে।
ইমলি যখন জল খাচ্ছেন, তখন শুনতে পেলেন, কে যেন বলছেন, এত ভিড় কেন? জায়গাটা একটু ফাঁকা করে দিন না… সরে দাঁড়ান, সরে দাঁড়ান। ফাঁকা করুন। হাওয়া আসতে দিন।
ওঁর কথায়, নাকি তাঁর জ্ঞান ফিরেছে দেখে, ঠিক বোঝা গেল না, তাঁকে ঘিরে থাকা ভিড়ের মধ্যে থেকে অনেকেই গুটিগুটি পায়ে এ দিকে ও দিকে চলে যেতে লাগলেন। যাঁরা তখনও ছিলেন, তাঁদের মধ্যে থেকেই মধ্যবয়স্কা এক ভদ্রমহিলা জিজ্ঞেস করলেন, এখন কেমন বোধ করছেন?
তাঁর কথার উত্তর দেওয়ার আগেই ও পাশ থেকে আর একজন জানতে চাইলেন, কোথায় থাকেন?
তাঁর প্রশ্ন শেষ হতে না-হতেই পাশ থেকে আর একজন বলে উঠলেন, একা-একা যেতে পারবেন তো? নাকি সঙ্গে যাব?
যিনি বললেন, তাঁর মুখের দিকে তাকাতেই এ পাশ থেকে আরও একজন বললেন, হেঁটে হেঁটে কি যেতে পারবেন? একটা রিকশা ডেকে দেব?
একের পর এক প্রশ্ন। কিন্তু প্রশ্নগুলো যাঁরা করছেন, তাঁদের কথার উত্তর দেওয়া তো দূরের কথা, তাঁদের দিকে চোখ তুলে তাকাবার মতো শক্তিও যেন তাঁর নেই। কী হয়েছে তাঁর! কী হয়েছে! আশপাশে এত অচেনা লোক যখন, তা হলে কি তিনি রাস্তায়! কোথায় যাচ্ছিলেন তিনি! যেতে যেতে কি মাথা ঘুরে গিয়েছিল! কেন! বেশি রোদে হাঁটলে তাঁর এ রকম একটু-আধটু হয় ঠিকই, কিন্তু এখন তো তেমন রোদও নেই! তা হলে!
তবে কী… ছিঃ ছিঃ। রাস্তায় এ রকম ভাবে কেউ পড়ে গেলে অনেকেই ভাবেন, তার বুঝি মৃগী রোগ আছে। তাই কেউ কেউ পা থেকে চামড়ার চটি খুলে তার নাকের সামনে ধরেন। তাতেও কাজ না-হলে নাক টিপে ধরেন। দাঁতে দাঁত লেগে গেছে কি না পরীক্ষা করে দেখেন। তাঁর ক্ষেত্রে কেউ সে রকম কিছু করেননি তো! তাঁর নাকের সামনে কেউ কোনও চটি ধরে শোঁকাননি তো! এ মা! ছিঃ ছিঃ…
কিন্তু তিনি এখন কোথায়! আঁচল দিয়ে আবার মুখ-গলা-টলা মুছে শাড়ি ঠিক করতে করতে এ দিক ও দিক তাকাতেই তিনি বুঝতে পারলেন, না। রাস্তায় নয়, তিনি এখন তাঁদের বাড়ি থেকে খানিকটা দূরের সেই লেডিস পার্কে। নামে লেডিস পার্ক হলেও এখানে সকালবেলায় যত না-মহিলারা হাঁটতে আসেন, তার থেকে বেশি আসেন মধ্যবয়স্ক থেকে আধবুড়ো, বুড়ো, তস্যবুড়োরা।
আরও একটু চোখ ঘোরাতেই পাতলা হয়ে আসা জটলার ফাঁকফোকর থেকে তাঁর নজরে পড়ল, সামনের লোহার রডের সেই বড় ফ্রেমটা। যেখান থেকে পর পর ঝুলছে তিন-তিনটে দোলনা।
আর সেই দোলনাগুলো দেখেই তাঁর মনে পড়ে গেল, ছেলের কথা। তিনি অস্ফুটে ডুকরে উঠে বললেন, জুরান, আমার জুরান কোথায়!
জুরান! কে জুরান! তাঁকে ঘিরে থাকা লোকজন এ ওর মুখের দিকে চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলেন। তারই মধ্যে একজন বললেন, আপনার কাছে কি মোবাইল আছে? না-থাকলে আপনার বাড়ির কারও মোবাইল নম্বর কিংবা ল্যান্ড নম্বর বলুন, আমি ফোন করে দিচ্ছি। তাঁরা কেউ এসে আপনাকে নিয়ে যাবেন। বলেই, পকেট থেকে মোবাইল বার করতে লাগলেন।
কিন্তু সে কথায় কোনও কর্ণপাত না-করে কোনও রকমে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালেন ইমলি। দু’-একজন বলার চেষ্টা করলেন, ‘এক্ষুনি যাবেন না। আর একটু বসুন’, ‘এই ভাবে যেতে গেলে যদি আবার মাথা ঘুরে পড়ে যান…’, ‘আপনার কনুইটা তো ছড়ে গেছে দেখছি। রক্ত বেরোচ্ছে…’
কিন্তু সে সব কথায় আমল না-দিয়ে সেই জটলার ভিতর থেকে বেরিয়ে এ দিকে ও দিকে তাকাতে লাগলেন তিনি। কান্না মেশানো গলায় বিড়বিড় করে নিজের মনেই বলতে লাগলেন, আমার জুরান কোথায়! আমার জুরান!
একটু আগে তিনি দেখেছিলেন, দোলনার সামনে কতগুলো ছেলে। তারা কেউ দোল খাচ্ছে। কেউ আবার দোলনায় চড়ার জন্য পর পর লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তারা প্রত্যেকেই জুরানের বয়সি। না। থুড়ি, ওরা শুধু জুরানের বয়সিই নয়। জুরানের মতো দেখতেও। শুধু কি দেখতে! তাঁর তো তখন মনে হয়েছিল, তারা সবাই এক-একটা জুরান!
অতগুলো জুরানকে একসঙ্গে দেখেই তাঁর মাথা ঘুরে গিয়েছিল। চোখে নেমে এসেছিল অন্ধকার। গোটা শরীর কেমন যেন অবশ হয়ে গিয়েছিল। পায়ের তলার মাটি তির তির করে কেঁপে ঢেউ খেলতে শুরু করেছিল। তাই আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারেননি তিনি। মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিলেন।
না। তাঁর অতগুলো জুরান চাই না। তাঁর একটা জুরান পেলেই হবে। যে তাঁর সত্যিকারের জুরান। যাকে পেলে তাঁর বুক জুড়োবে। মন শান্ত হবে। কিন্তু ও কোথায়! কোথায় ও!
জ্ঞান ফিরেছে ঠিকই, কিন্তু এখনও তাঁর গায়ে তেমন বল নেই। মনে হচ্ছে যে কোনও সময় পড়ে যাবেন। তবু শুধুমাত্র মনের জোরে পা টেনে টেনে এগোতে লাগলেন তিনি। আর বারবার ইতিউতি দৃষ্টি ঘুরিয়ে যত দূর চোখ যায়, দেখতে লাগলেন, জুরানকে কোথাও দেখতে পাওয়া যায় কি না!
না। গোটা পার্ক তন্নতন্ন করে খুঁজেও তিনি তাঁর ছেলেকে পেলেন না। না। ঢেকুচকুচের ওখানেও না। সিমেন্টে বাঁধানো কচ্ছপের পিঠের মতো যে ঢিপিটা, যার উপর থেকে মাটির তলায় নেমে গেছে অনেকগুলো সুড়ঙ্গ-সিঁড়ি। যার মধ্যে একবার ঢুকলে কোথা দিয়ে যে বেরোবে, তার কোনও ঠিক-ঠিকানা নেই।
তার ভেতরেও ঢোকার চেষ্টা করেছিলেন ইমলি। কিন্তু পারেননি। বাচ্চাদের জন্য তৈরি করা ছোট্ট ছোট্ট সুড়ঙ্গের মধ্যে তাঁর মতো একজন পূর্ণবয়স্কা মহিলাকে ওর মধ্যে ঢোকার জন্য হাঁকপাঁক করতে দেখে প্রাতর্ভ্রমণে আসা অনেকেই উত্‌সুক হয়ে হাঁটতে হাঁটতেই ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বারবার তাঁকে দেখতে লাগলেন।
উনি জানেন, যে বাচ্চা একবার এর মধ্যে ঢোকে, সে যেখান থেকেই হামাগুড়ি দিয়ে বেরোক না কেন, ফের এখানেই ছুটে আসে। এর মধ্যে ঢুকে ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে বেরোনোর মজাই আলাদা। কয়েক বার ঢুকলেই বাচ্চাদের কেমন যেন একটা নেশা ধরে যায়।
সুতরাং তাঁর ছেলে যদি এর মধ্যে ঢুকে থাকে, তা হলে নিশ্চয়ই সে আবার এখানেই ফিরে আসবে। এটা ভেবে কষ্ট করে ভিতরে ঢোকার বৃথা চেষ্টা না-করে উনি কচ্ছপের পিঠের মতো উঁচু জায়গাটার সামনে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলেন। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁর মনে নেই।
কিন্তু প্রতিটা মুহূর্তেই মনে হচ্ছিল, মুহূর্ত নয়, প্রতেকটা মুহূর্তই যেন এক-একটা ঘণ্টা। এক-একটা প্রহর। এক-একটা দিন। তবু দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। যদি এর মধ্যে না-ঢুকে তাঁর ছেলে এই পার্কেরই অন্যত্র গিয়ে থাকে! এত বড় পার্কে কোথায় খুঁজবেন তাকে! ও দিকে খুঁজতে গেলে তাঁর ছেলে যদি এ দিকে চলে আসে, তখন! তার চেয়ে এখানে দাঁড়িয়ে থাকা অনেক ভাল।
কিন্তু কতক্ষণ দাঁড়াবেন তিনি! পাশ দিয়ে যাঁরা যাচ্ছেন, তাঁদের হাতে ঘড়ি দেখলেই উনি জানতে চাইছেন, দাদা, ক’টা বাজে?
এবং অবাক কাণ্ড, পর পর দুজনের বলা সময় শুনে তাঁর মনে হল, পরের জনের ঘড়িটা নির্ঘাত্‌ বন্ধ হয়ে গেছে। কিংবা খারাপ। তা না-হলে একজনের সময় শোনার পরে, অতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাঁর যখন ধৈর্যচ্যুতি ঘটে যাচ্ছে, উদ্বেগে ছটফট করছে ভেতরটা, তখন পরের জন যে সময় বললেন, আগের জনের বলা সময়ের সঙ্গে তার ব্যবধান মাত্র চার মিনিটের! না। এটা হতে পারে না। হতেই পারে না। যেতে যেতে দেখেছেন তো!
হয়তো ভুল দেখেছেন! আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যায়! না। আর নয়। একেবারে হতাশ হয়ে পার্ক থেকে বেরিয়ে ইমলি যখন উদ্‌ভ্রান্তের মতো ভাবছেন, এখন কোথায় যাবেন, কোথায় গেলে জুরানের দেখা পাবেন, ঠিক তখনই তাঁর মনে পড়ে গেল, জুরানের বাবার কথা।
তিতার তো বলেছিল, ওকে মনে হয় কেউ তুলে নিয়ে গেছে। তার মানে ও কিছু না-কিছু নিশ্চয়ই জানে। কিন্তু হঠাত্‌ করে ওকে তুলে নিয়ে যাবে কে? আর কেনই বা নিয়ে যাবে! বাচ্চাদের যারা অপহরণ করে, তারা তো আর এমনি এমনি করে না। তার পিছনে অনেকগুলো কারণ থাকে। আর সেই কারণগুলির প্রথম এবং প্রধান হল— টাকা।
কিন্তু আমাদের কি অত টাকা আছে! যারা এ সব কিডন্যাপ-টিডন্যাপ করে, তারা শুনেছি, আগে থেকে খোঁজখবর নিয়ে তার পরে করে। তাই যদি হয়, তা হলে তাঁদের ছেলেকে খামোকা কেউ কিডন্যাপ করতে যাবে কেন! আর যারা কিডন্যাপ করে, তারা সাধারণত স্কুলে যাতায়াতের সময় অথবা বাচ্চারা অন্য কোথাও বেড়াতে গেলে কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে পাড়ায় যখন খেলতে যায়, তখন সময় সুযোগ বুঝে আচমকা মুখ চেপে তাদের তুলে নিয়ে যায়।
তিনি আজ পর্যন্ত কারও মুখে শোনেননি, কেউ বাড়ি বয়ে এসে কারও সন্তানকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে। আর ওকে যদি কেউ কিডন্যাপই করত, তা হলে যে ওকে কিডন্যাপ করতে এসেছিল, তাকে ওই মাঝরাতে কিংবা সকালের আলো ফোটার আগে, সে যখনই হোক না কেন, তার ঘরের মধ্যে আচমকা দেখে জুরান কি একবারও চিত্‌কার করে উঠত না! একটু ধস্তাধস্তিরও আওয়াজ হত না!
এটা হয়! নাকি ওর নাকের সামনে কেউ এমন কিছু ধরেছিল, যার জন্য ও বেহুঁশ হয়ে গিয়েছিল। তার পরে কোলপাঁজা করে ওকে তুলে নিয়ে গেছে! আচ্ছা, তা-ই যদি হত, তা হলে তো এতক্ষণে মুক্তিপণের টাকা চেয়ে তারা অন্তত একবার ফোন করত! কই, কেউ তো এখনও কোনও ফোন করল না। তা হলে!
নাকি যে ওকে নিয়ে গেছে, সে তাঁদের পরিবারেরই পূর্ব পরিচিত। জুরানও তাকে খুব ভাল করে চেনে। তাই ঘরের সবাই যখন অঘোর ঘুমে ঘুমোচ্ছে, তখন তাকে তার ঘরের মধ্যে দেখেও সে এতটুকুও অবাক হয়নি। এই সুযোগটাকেই হয়তো কাজে লাগিয়েছে সেই অপহরণকারী। ভুজুংভাজুং দিয়ে, উল্টোপাল্টা বুঝিয়ে জুরানকে অত রাতেই বাড়ি থেকে বার করে নিয়ে গেছে। হয়তো বলেছে, আমরা তো সকালের আগেই ফিরে আসব।
অত চিন্তা করছ কেন? শুধু শুধু মা-বাবার কাঁচা ঘুম ভাঙিয়ে তাঁদের বিরক্ত করার কোনও মানেই হয় না। ওঁরা যদি কিছু বলেন, আমি তো আছি। তখন না-হয় আমি বলব, আমিই ওকে জোর করে নিয়ে গিয়েছিলাম। ঠিক আছে?
নাকি এমন কেউ আছে, যার সঙ্গে আমাদের খুব মধুর সম্পর্ক, অন্তত আমরা সে রকমটাই মনে করি। কিন্তু তলে তলে হয়তো সে-ই এ সব করেছে। নিজে না করলেও অন্য কাউকে টাকা খাইয়ে করেছে। শুধুমাত্র নিজের আক্রোশ মেটানোর জন্য। হ্যাঁ। হতেই পারে। কে যে কখন কী কারণে, কেমন করে হঠাত্‌ শত্রু হয়ে যায়, তা কি কেউ হলফ করে বলতে পারে! পারে না। কিন্তু তাঁদের পরিচিত এ রকম কে আছে! কে! কারা এ কাজ করতে পারে! কারা!
এ প্রশ্ন তিনি জুরানের বাবাকেও করেছিলেন। জানতে চেয়েছিলেন, কে নিয়ে গেছে তাঁর ছেলেকে? তখন উনি কথা হারিয়ে কেমন যেন আমতা আমতা করছিলেন। কিন্তু কারও নাম বলেননি। শুধু বলেছিলেন, যে আমাকে একবার নিয়ে গিয়েছিল…
কিন্তু সে কে? জিজ্ঞেস করায় জুরানের বাবা বলেছিলেন, তা তো জানি না।
এ রকম আবার হয় নাকি! তাঁকে তুলে নিয়ে গেল, অথচ তিনি জানতেই পারলেন না, যে তাঁকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল, সে কে! তার থেকেও বড় কথা, তুলেই যদি নিয়ে গেল, তা হলে তারা আবার তাঁকে সশরীরে ফেরত দিয়ে গেল কেন! টাকা-পয়সা নিয়ে কী! হতে পারে।
হতেই পারে। আর তা-ই যদি হয়, তা হলে সে কথা বলতে তাঁর বাধা কোথায়! নাকি এর পিছনে অন্য কোনও গভীর গোপন কিছু আছে! যেটা উনি বলতে চাইছেন না। বা বলতে পারছেন না। না, এই সম্ভাবনাটাকেও কিন্তু উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ভাবতে ভাবতে ইমলির হঠাৎ মনে হল, তাঁর স্বামী তাঁকে এড়িয়ে যেতে চাইছেন। চেপে যেতে চাইছেন পুরো ব্যাপারটা। হ্যাঁ, তিনি চেপেই যেতে চাইছেন। তাই এত বড় একটা ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরেও, থানা-পুলিশ তো দূরের কথা, এ নিয়ে অন্য কারও সঙ্গে তিনি কোনও আলোচনা বা পরামর্শও করতে চাইছেন না। কিন্তু কেন? কেন? কেন?
চোদ্দো
আমাদের পৃথিবীটা মরা গ্রহে পরিণত হবে! তার মানে সেখানে আর কোনও মানুষ বসবাস করতে পারবে না! তা হলে তার বাবা-মা কোথায় থাকবে! কোথায়!
বাবা-মায়ের জন্য আবারও জুরানের মনটা কেমন যেন হু হু করে উঠল। মনে হল, এক্ষুনি এক ছুট্টে সে যদি তার বাবা-মায়ের কাছে চলে যেতে পারত, তা হলে খুব ভাল হত। কিন্তু সে যাবে কী করে! যাবার কোনও উপায় আছে কি!
যে ওকে প্রায় ছোঁ মেরে এখানে তুলে নিয়ে এসেছে, সেই সময়-কণা কি তাকে ছাড়বে! সে রকম কোনও দয়া-মায়া কি তার আছে! নিশ্চয়ই নেই। কিন্তু তার যে এক্ষুনি পৃথিবীতে ফিরে যাওয়া অত্যন্ত জরুরি, সেটা বোঝালেও কি সে বুঝবে না! এতটাই অবুঝ!
তাই অনেক ভেবে-চিন্তে নতুন এক কৌশল নিল জুরান। সময়-কণাকে তার ঠোঁট নড়া দেখিয়ে-দেখিয়েই বিড়বিড় করে বলল, আমি তো এখানে এসেছি অনেকক্ষণ হয়ে গেল। এতক্ষণে বুঝি পৃথিবীতে সকাল হয়ে গেছে। আর সকাল হলেই তো আমাকে ডেকে দেওয়ার জন্য মা ঘরে আসে। মা যদি ঘরে ঢুকে দেখে আমি নেই, তা হলে যে কী হবে, কে জানে!
— কিচ্ছু হবে না…
— তুমি আমার মাকে চেনো না। তাই এ কথা বলছ।
— চিনি চিনি। আমি সব্বাইকে চিনি। আর এটাও জানি, কোনও কিছু রোজ রোজ অনায়াসে পাওয়ার চেয়ে, সেটা হঠাত্‌ করে হারিয়ে আবার আচমকা ফিরে পাওয়ার আনন্দটা অনেক অনেক অনেক বেশি।
— কিন্তু সামনেই যে আমার পরীক্ষা। সকালবেলায় আমি যে রোজ পড়তে বসি…
সময়-কণা বলল, কী পড়ো?
জুরান বলল, বই পড়ি।
— পড়ে কী হয়?
— পড়লে, পরীক্ষায় যে প্রশ্ন আসে, তার ঠিক ঠিক উত্তর দেওয়া যায়।
সময়-কণা বলল, ঠিক ঠিক উত্তর দিলে কী হয়?
— নম্বর বেশি পাওয়া যায়। খুব ভাল ভাবে পাশ করা যায়।
— পাশ করলে কী হয়?
জুরান বলল, আরও উঁচু ক্লাসে ওঠা যায়।
— কত উঁচু ক্লাসে?
— পাশ করে করে অনেক অনেক অনেক উঁচু ক্লাসে ওঠা যায়।
সময়-কণা বলল, উঠে কী হয়?
— ভাল ভাল চাকরি পাওয়া যায়। ডাক্তার হওয়া যায়। ইঞ্জিনিয়ার হওয়া যায়। উকিল হওয়া যায়…
— ও সব হয়ে কী হয়?
জুরান বলল, সমাজে একটা জায়গা পাওয়া যায়। লোকে সম্মান করে। শ্রদ্ধা করে।
— ও সব পেয়ে কী হয়?
— ও সব পেয়ে! ও সব পেয়ে… ও সব পেয়ে…
সময়-কণা বলল, ও সব পেয়ে কিচ্ছু হয় না। কিচ্ছু না। আচ্ছা, তোমার কথা মতো না-হয় ধরেই নিলাম, ও সব হলে সম্মান পাওয়া যায়, শ্রদ্ধা পাওয়া যায়। কিন্তু তুমি কি জানো, যাঁরা ও সব পান, তাঁরা কাকে সম্মান করেন? শ্রদ্ধা করেন? কার পায়ের কাছে মাথা নত করেন?
জুরান অবাক হয়ে গেল। সমাজে যাঁরা সম্মানিত, তাঁরাও মাথা নত করেন! কার কাছে?
— যাঁর কাছে মাথা নত করেন, তিনি কিন্তু কোনও পাশ-টাস করা কেউ নন। হয়তো দেখা যাবে, তিনি কোনও দিন কোনও পড়ালেখাও করেননি।
— তাই নাকি! এ রকম আবার হয় নাকি! পাশ করাও নয়? কে!
সময়-কণা বলল, একজন নন। এ রকম অনেকেই আছেন।
চলবে   ………..

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: