মহা শূন্যের সংলাপ — ফজলুল হক – পর্ব – ৬

মহা শূন্যের সংলাপ/ -- ফজলুল হক - পর্ব - ৬
নিজেকে চিনে নেবার নানা পদ্ধতি , সংখ্যাধিক্য মানুষ জানে , তবুও কোন রহস্যমায়ায় নিজেকে চিনে নেয়া কঠিন বলে মনে হয় । আমার তা মনে হয় না । জীবনের সাথে মধ্যস্ততা করা পছন্দ করি না । হোমে আসার পর থেকে এমন কিছু শিখলাম যা সিন্দুকে রাখার মতো । দিনের পর দিন , আমি আর আমি , এই নিরবিচ্ছিন্ন আমিকেই নিয়ে কেটেছে ।
পরের দিনগুলো কেমন কাটবে তেমন কিছু নয় , হোমের কড়া শাসনের তির আমার দিকে ঘুরবে কিনা ,তেমন নয় , কেবল ধর্ম নামক এক মহাশক্তির কাছে নিজেকে নত করার মধ্যে যে গ্লানি তাকে সহ্য করা আর ভেসে যাওয়া , এটা দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কি হতে পারে ? অথচ অস্বীকার করার উপায় নেই ধর্ম মানব জীবনে রহস্যময় ভূমিকা পালন করে আসছে মহাকাল ধরে ।
ধর্ম এক অতি মানবিয় নিয়ন্ত্রণ শক্তি । যাকে অস্বীকার করার উপায় নেই । একুশজনের শিশু কিশোর যুবকের আধার হয়ে ওঠা এই দলটির অথবা ছাত্রদের মধ্যে আমি একজন যে নামহীন । শূন্য । বংশপরিচয়হীন । পিতামাতাহীন ।
জারজ । ফলে আমার কী ধর্ম হবে সে বিষযে কতৃপক্ষ আলোচনার পর আলোচনা করেও সুবিধা মতো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি । তাই সকালের প্রর্থনা সভায় সন্ধ্যায় নাম গান করার সময় আমার উপস্থিতি তেমন জরুরি ছিল না । এ নিয়ে ছেলেদের মধ্যে কোনও বিরোধ ছিল না । বরং বড়দের সুপ্ত ইচ্ছাটি জেগে উঠত ।
প্রার্থনা সভায় মাঝে সাঝে অনুপোস্থিত থাকত । আনন্দও পেত । আসলে প্রার্থনা শেষে শিক্ষক যখন বলতেন বন্ধুদের প্রতি আন্তরিক হতে , তখন বিশ্বাস হত না । অর্থাৎ আবেদন স্পর্শ করত না হৃদয়ে । এইভাবে শিক্ষা আমাদের ভিতরে ঢুকতে পারেনি । কেবল ডিগ্রি আর্জন করলাম ।
আর্ন্তরিকতা বিষয়টি আরও সুক্ষ্ম । সেটি সব ছেলেদের মধ্যে ছড়িয়ে দেবার জন্য আমি ওদের নিত্য কাজের তালিকা তৈরি করি । নিজের হাতে কাজগুলি করে দি । কাপড় কাচার মতো পরিশ্রমের কাজও । কেউ জ্বরে আক্রান্ত হলে দিনরাত ওর পাশে থেকে সেবা করি । ওরা আমার শিশুসুলভ ব্যবহার বিশ্বাস করে । আমাকে সম্মান করে । আর ওরা একদিন আন্তরিক হয়ে ওঠে সবার প্রতি ।
এরপর ওরা নিয়মমাফিক নীতিবোধগুলির অংশীদার হতে পারে না, যে নিয়ম যা ব্যক্তিজীবন কে স্পর্শ করে না , যা রক্ষার জন্য বিশ্বাস না করেও করতে হয় , এতদিন হয়েছে , এখন তাদের দম বন্ধ হয়ে আসছে । যে কোনও মূল্য এই শ্বাসরোধকারী বোধ থেকে মুক্তি চায় ওরা । সত্যি সত্যি একদিন হোমের সব কিছু বদলে যায় ।
শ্রদ্ধা জানাবার পদ্ধতি ছেলদের পছন্দ মতো যা সবার বিশ্বাস যোগ্য হয়ে ওঠে । ধর্ম নামের শব্দটি ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয় । মানুষের সন্তান সবাই ,তাই কোনও ভেদাভেদ নেই শূন্য , শিশির , আফজলের মধ্যে । অলিখিত ভাবে শূন্য হয়ে ওঠে একটি শক্তির আধার ।
আমার গুণাবলীর আকর্ষণ ক্রমে বেড়ে চলছে। এটা সময়ের এক সন্ধিক্ষণ । ধৈর্য ধরে সংযত থাকা আবশ্যক । নিজের উপর দীর্ঘ পরীক্ষা নিরীক্ষার পর জানতে পারলাম আমাকে ওদের মতো হলে চলবে না । যারা বুদ্ধিমান , শক্তিধর ,তারা মহান হতে চায়,গায়ের জোরে সমাজ শাসন করতে চায় ।

হোমের একজন শিক্ষক অবসর নেবেন তিনি উদার এবং ভদ্র সহজেই নতুন কিছুকে গ্রহন করার ক্ষমতা ছিল সবার মন খারাপ

আলাদা করে আমার কথা বলার দরকার পড়ে না । কেন না আমি তাকে খুব শ্রদ্ধা করতাম । তিনিও আমাকে — । সেদিন বৃষ্টি পড়ছিল । কেন পড়ছিল জানা নেই । তখন অষাঢ়, শ্রাবণ অথবা ঐ মাসগুলো ছিল না যে মাসে বৃষ্টি হয়ে থাকে । ফলে বিদায়ি অনুষ্ঠানটি জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে করা গেল না । হল ঘরের ভিতরে মাদুর পেতে, দেয়া হল,দুটো টেবেল ও খান কতেক চেয়ার ।
সরকারি কর্মকর্তারা বিদায় পর্বের শোকানন্দ উপভোগ করবেন । বৃষ্টি জোরেই পড়ছিল । অনেকটা দেরি করে স্যাররা এলেন । এবং আমাকে খবরটা দিলেন । হোম এর সব দায়িত্ব এখন থেকে আমার । মাসিক বেতন সরকার অনুমোদিত । বুড়ো হলে পেনসন , সঙ্গে নানা রকম ভাতা । তখন থেকে স্বর্থের কোনও রকম হিসেব নিকেশ ছাড়াই সততার সাথে কাজটি করছি । আর ধীরে ধীরে হোমটি আকারে আয়তনে বড় হচ্ছে । চাত্র সংখ্যা বাড়ছে , তেমনি শিক্ষক ।
আফজল হোম ছেড়ে যায়নি অন্যদের মতো । সে থেকে গেছে । আমি তাকে রেখেছি আমার পদের ক্ষমতা বলে । ওকে যা দেয়া হয় তার থেকে ওর কাছে বেশি পাই ।
আমরা আনন্দে থাকি । সারাদিন ব্যস্ততা খুঁজে নিই । আমার শূন্যতাকে স্পর্শ করে না কেউ । শুধু আমিই বুঝতে পারি আমাকে কেউ ডাকছে । আমার চোখের গভীরে ভেসে ওঠো একটি বস্তি পাড়া । সরু গলি রাস্তা । স্যঁতসেতে বিছানা ।
অপরিচ্ছন্ন কুৎসিত মানুষগুলো ধনের উপর চড়াও হচ্ছে । রাতের ট্রেন ছেড়ে গেলে ,একজন সারা রাতের জন্যে বিছানা দখল করে । ধন অসহায়ের মতো আমার দিকে তাকিয়ে থাকে । নতুন মাসি কোন সময়ে ফাঁকা থাকে না ।

থাকলে সে বুকে চেপে ধরে । মেঝেতে মাদুর পেতে শুইয়ে দেয় , সেও পশে আমাকে জড়িয়ে শোয় , মন ছটফট করে । যেতে হবে একদিন । ধন চলে যাবার পর বাকিরা কেমন আছে জানতে ইচ্ছে করে ।

এই শহরের বিস্তর পরিবর্তন হয়েছে যেমনটা অন্যান্য শহরগুলি চওড়া রাস্তার ধারে বড় বড় মল ঝলমল করে যানবাহনের সংখ্যা অত্যাধিক পথে চলাফেরা করা দায় আফজল বলে উঠল, একটা টোটো ডাকি স্টশন অনেকটা দূর

দূর তো বটেই । অথচ মজার ব্যাপার হল একদিন পায়ে হেঁটে এখানে এসেছিলাম ।
নিয়মের ছকে বাঁধা পরিবর্তনের ঋতুচক্রের মতো রাস্তা পালটায় ।

শহরের বাড়ি ঘর , ব্যবসা বানিজ্য, কথা বলার ধরন , লেখাপড়ার পদ্ধিতি, মানুষের মূল্যবোধ সব কিছুর বদল ঘটে । যেমন স্টেশন এলাকাটি দুবছর আগেও যারা এসেছে তারা চিনতে পারবে না । আয়তনে বড় হওয়া ছাড়াও বিদ্যুৎ চালিত ট্রেন,ঘন্টায় ঘন্টায় । প্লাটফর্ম বেড়েছে । বাইরেটা দেখার মতো ।
চেকার টাইলস দিয়ে মোড়া । টোটো একদিকে ,একদিকে অটো , একটু দূরে দূরের যাত্রীদের জন্য ট্যাক্সি । আর অনতিদূরের সেই পল্লিটি ? তার ধন যেখানে থাকত । থাকত গুমটির চা চপ দোকানদার পলা কাকা । সে চায়ের দোকান নেই । একটি ঝকঝকে রেস্টুরেন্টে ভিড় ঠাঁসা ।

কয়েকটা ছেলে খদ্দেরদের সেবা করতে ব্যস্ত কাচের সোক্যাসের আড়ালে সাদা ধপধপে ফুল হাতা জামা সাদা পায়জামা , চোখে চশমা পরিহিত মালিকের মধ্যে পলা কাকাকে কোথাও খুঁজে পেলাম না ।কাছাকাছি গিয়ে বড় বড় চোখ মেলে তাকালাম চিনতে পারল না কতদিনের ব্যবধান

চিনবে কেমন করে পরিবর্তনের চাকায় সে সব স্মৃতি চাপা পড়ে গেছে । মনে রাখার দায় কারও থাকে না ।সম্পর্ক একটা অভ্যাস মাত্র ।অভ্যাসহীন নিবিড় সম্পর্কের টানও একদিন ফিকে হয়ে যায় । আর ধন এর ঝুপরির চিহ্ন দেখতে পাই না । পৌঢ় বিশাল দালান বাড়িটি এখন নেই । সুন্দরী যুবতির মতো আশপাসে অনেক বাড়ি ঘর । চোখ ফেরানো যায় না দেয়ালের রং দেখে ।

কুঁড়ে ঘরগুলি পর পর সাজানো ইঁট সিমেন্টের গাঁথনি করা এক একটি কামরায় । এগিয়ে যাই সেদিকে । পর পর দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েগুলির হাতে কানে ফোন । ইশারায় ছেনালিপনা নেই । ভাবটা এমন আসবে এসো, না আসবে এসো না । ধানাই পানাই করতে পারব না । এরা অল্প বয়স্কা সুন্দরী ।
প্রসাধনে সাধারণ গৃহবধূর মতো । ভাষার অসংযম, নিয়মিত বিশৃঙ্খল জীবনযাপনে যে চিত্র আগে ফুটে উঠতে দেখেছি আজ তা কম বলে মনে হল । পাশ দিয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে যাই । পাড়ার শেষ সীমানা ছুঁয়ে আবার ফিরে আসি । আফজল সতর্ক করে দেয় , পাড়াটা ভাল নয় শূন্য , চল আমরা এখান থেকে বেরিয়ে যাই । জোরে পা চালাও ।

এ সব সস্তা কথা বলার প্রতি আমার অনুকম্পা নেই । আমি বুঝেছি আর সারাজীবনের মতো বুঝেছি ,আমার পরিত্রাণ নে ই । যদি কোনোদিন গৌরবময় জীবনে পৌঁছেও যাই তাহলেও জারজ শব্দটির প্রতি আমাকে আত্মসমর্পণ করতে হবে । আমাকে ক্ষুদ্র শান্তির মধ্যে বেঁচে থাকতে হবে ,আদৌ সেটা শান্তি নয় ।
আদর্শের ভিতর যে সত্যকে আমি ধরবার চেষ্টা করে যাচ্ছি , আমি বুঝতে পারছি আমার পেছনে নদীর কান্না ভেসে আসছে । নদীতে কান্নার শব্দ কখনও থামে না । কয়েকবার ঘোরাফেরা করলাম । মেয়েগুলি দাঁড়িয়ে হাসছিল । ভাবলাম তারা দিতেও পারে নতুন মাসির খোঁজ । ঠিক তখন ই একজন বলে উঠল, পেটে ক্ষিদে মুখে লাজ ।

ওরা যাই বলুক সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে বললাম , নতুন মাসি ,—– তারপর তার ডাক নামটা মনে করার জন্য সময় নিয়ে বললাম , সোহাগী , হ্যাঁ হ্যাঁ সোহাগী , তোমরা কেউ চেন তাকে ? যদি চিনে থাক তবে আমাকে একবার তার কাছে নিয়ে চল , অথবা তাকে ডেকে দাও । আমি দীর্ঘ দিন ধরে তার কাছে আসার চেষ্টা করেছি , পারিনি । আজ বুকে পাথর বেঁধেছি । জানো তোমরা ? আমার ধন এখানে থাকত ।
আফজল আমার মুখের দিকে গভীর একাগ্রতা ও বিস্ময়ের সমুদ্র নিয়ে দৃষ্টি স্থির করে রেখেছে । তার বিস্ময় নিবিড় কৌতূহলের দুঃসাহস আমাকে সান্ত্বনা দিল, বলব তোমাকে বলব ,গোপন কথাটি আর গোপন রাখব না ।
মেয়েগুলির নীরবতা আমাকে গভীর শূন্যতার মধ্যে নিয়ে যায় । লাম্পট্যের দৃশ্যগুলি যেগুলি আমার কাছে অতি সাধারণ অনুভূতিহীন যৌনকলাকৌশলে অভিজ্ঞ মেয়েগুলি তা বুঝতে পারে না । তাদের নীরবতা আমাকে অপমানিত করল ।
আর খুব দ্রুত সেই অপমান থেকে বেরিয়ে এলাম , এটা আমার স্বভাব । বললাম , বল না গো তোমরা কেউ জানো ?এবার তারা সত্যিকারের ছেনালি শুরু করে , কেন আমাকে দিয়ে হবে না । একবার এসো দেখই না চোখ মেলে , যেমন চাইবে সেরকমটি আশ মিটিয়ে দিতে পারি ।
এখানে প্রেম ও পবিত্রতা বলে কিছু নেই । লাম্পট্য ছাড়া পথ এগিয়ে যাওয়া যাবে না । ভালবাসার মূল্যবান বস্তুটি এখানে অদৃশ্য । অথচ পূর্বে ভাঙা দালন বাড়িটিতে এমন ছিল না ।আফজল আমার হাত ধরে টান দেয় । পেছন থেকে এক মহিলার কন্ঠস্বর শুনি ,
কে রে রত্না ?
তোমার পুরনো বাবু গো মাসি ।
চলবে ………….

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: