মহা শূন্যের সংলাপ/ — ফজলুল হক – পর্ব – ৫

মহা শূন্যের সংলাপ/ -- ফজলুল হক - পর্ব - ৫
আমার ছিমছাম ভাব , নিখুঁত পরিচ্ছন্ন স্বভাবে ওদের সুপ্ত নিষ্ঠুরতা ক্রমে ধারালো হয়ে ওঠে । যুক্তি তর্কের ধার ধারে না । চেঁচায় কুৎসিত গালাগালি দেয় । যেমনটা অন্য হোমগুলিতে হয়ে থাকে । আবার এমনও হয় ওরা ক্ষমা চায় , কাছে ডেকে বসায় । পাশাপাশি ঘনিষ্ঠ হয়ে ওরা ভুলে যায় ঘৃণা বিতৃষ্ণা যত । হোমটি সরকারি সাহয্য তেমন পায় না । এল আকৃর্তির দো তলা ঈংরেজ আমলের দালান বাড়ি । চারপাশ প্রাচীর তোলা তবে সহজেই টপকে পালানো যায় । ভিতরে গোটা চারেক মহুয়া বৃক্ষ । ফুল ফুটলে মাদকতা ছড়ায় । গেটটি ছিল শক্তপোক্ত ।

দারোয়ান অবসর নেওয়ার পর ও কাজ চালিয়ে যায় । শৌচাগার ব্যবহারের উপযুক্ত না । ফলে স্বাস্থ্যহানীর সম্ভাবনা থেকে যায় । জলের ব্যবস্থ পর্যাপ্ত ছিল না ,নানা বিষয় ছাত্ররা মানিয়ে নিয়ে লেখা পড়া করত । এছাড়া উপায়ও নেই । ছাত্র সংখ্যা খাতায় বেশি দেখানোর ফলে একুশ জনের কোন রকমে চলে যায় । তবে লেখা পড়ার ব্যাপারে নজরটা একেবারে পরিচ্ছন্ন । নিন্দুকরা যতই বলুক এই একটা বিষয়ে সততা রয়েছে । ছাত্রদের বেশির ভাগ মন দিয়ে লেখাপড়া করে । ওরা স্নান ঘরটি নানা রকম অনৈতিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে নোংরাও করে ।

পরে পাকা মিথ্যাবাদীর কৃত্রিম সাবলীলতায় অভিযোগগুলি অস্বীকার করে । আমি নিজের হাতে অপরিচ্ছন্ন হোমটিকে ব্যবহার যোগ্য করে তুলতে হাত লাগাই । সহপাঠিরা হেসে ওঠে , ওদের থকে একজন বিরিয়ে আসে , তুমি একা কেন করবে , চল আমি হাত লাগাই । তার বলার মধ্যে আন্তরিকতা ছিল , মনে হল যা বলছে সত্যি বলছে । বলি এস , দাঁড়িয়ে কেন । বকিরা পরেরদিন সামিল হয়েছিল ।

হোমের কতিপয় শিক্ষক, চেষ্টার খামতি রাখেন না । তাদের শাসন মাত্রাধিক । কেউ কেউ পালিয়ে যাবার মতলব করলে ফিরে আসে ভয়ে ,কেউ নিজের ভুল বুঝতে পেরে । আমি নাছোড়বান্দার মতো সকাল বিকেল রাত দিন মাস বছর স্বভাবিক মানুষের রূপ নিয়ে কাটাব । আর চেষ্টা করে যাব একটি সুস্থ জীবনের । এবং পারব । কিছু একটা শক্তি আছে যে আমাকে সব সময় ছায়া করে রেখেছে । ছাত্র শিক্ষক উভয়েই বিশ্বাস করে আমি নতুন কিছু করতে পারি । কাকতালীয় হলেও ঘটনাটি সবাই লক্ষ্য করে । আমি হোমে আসার পর সরকারি অনুদান আসে । হোমটির আপাদমস্তক সব পালটে যায় ।

জলের জন্য সাবমার্সিবেল বসে । শৌচাগারগুলি মোজাইক টাইলসে সেজে ওঠে । স্নান ঘরে সাওয়ার বসে । বিছানা বালিশ খাট সব আসবাব বদলে ফেলে কয়েক মাসের মধ্যে । ওদের ধারণা মিরাকেলটা আমিই ঘটিয়েছি,আর ক্রমে আমি ওদের বন্ধু হয়ে উঠি ।

ওদের কেউ কেউ মেয়ে বন্ধুর সাথে দেখা করতে প্রাচীর টপকে বেরিয়ে যায় । এখন আর তেমনটি হবার উপায় নেই । সদর দরজায় চওড়া লোহার গেট আর সেখানে সর্বক্ষণের জন্য পাহারাদার থাকে । যেতে যদি হয় তবে রেজিস্টার খাতায় কারণ উল্লেখ করে নাম সহি করে যেতে হবে । কোনও রকম ফাঁকি চলবে না ।

অথচ আমার ভর্তি হবার সময় রেজিস্টারটিতে নাম লেখা হয়নি । কেউ বলতে পারেনি আমার মা বাবার নাম । যারা এসেছিল তারা আমার নামটি প্রত্যেকে আলাদা আলাদা বলেছিল । অথচ মা না থাকলে কি আমি জন্মাতে পারতাম ? এই সময়ের অনেক আগে আমি পরিচিতি লাভ করতাম ।

অনেকগুলো বছর এখানে থাকতে হত না । আমার জন্মের তারিখ সম্পর্কে নিজেকে জেরা করতে পারতাম । আমাকে যে মহান নারী তার গর্ভ থলিতে রেখে বিস্ময়াভিভূত হয়ে স্বাধীনতা উপভোগ করেছে তাকে পুরুষরা আটকাবার চেষ্টা করেছে । হীন সত্ত্বা হিসাবে বিদ্রুপ করেছে । একবার ভেবে দেখলে বোঝা যেত পুরুষদের বিস্মিত করার মতো যোগ্যতা তাদের রয়েছে । এইসব নানা নাড়াচাড়ার ভিতর রেজিস্টারে আমার নাম লেখার জায়গাটি ফাঁকা থেকে যায় । ফর্মটিতে কেবল গোল গোল শূন্য দেখতে পায় সকলে । তারপর থেকে সিনিয়ার জুনিয়র ছাত্ররা আমাকে শূ্ন্য বলে ডাকে । আমি শূন্য নামটিকে সম্মানের সাথে গ্রহন করি ।

ক্রমে শূন্য আয়তনে বাড়তে থাকে । গভীর কালো শরীরী সৌন্দর্য দৃষ্টিনন্দন হয়ে ওঠে । মনের সাথে হৃদয়ের এক নতুন সম্পর্ক গড়ে ওঠে দৃষ্টি বিমুগ্ধ সৌজন্যে । আমি সব কিছুকে সুন্দর দেখি । দেখতে পাই ,আকাশের পটভূমিতে একটি কালো বিন্দু একখন্ড মেঘের সাদা কিনারা ছুঁয়ে ফেলে । নীচে প্রাকৃতিক দৃশ্যটিও দেখার সৌভাগ্য হল । আমি প্রায় জ্ঞান হারাব আর লজ্জা পেয়ে বসল ।

বিকেলে এক ঘন্টা ছুটিতে কয়েকজন মিলে , কখনও একা একা অনতিদূরে কাজুবাদামের বাগানটিতে সবুজের ওপর চোখ রাখতাম । শান্তির বাতাস খেলে যেত । শহরটি তেমন নয় । এটি এমন একটি শহর যে মানুষদের রক্ত মাংস হিম করে দেয় । মানবিক শক্তিকে পরাস্থ করে । রাস্তা থেকে যুবতিদের তুলে নিয়ে যায় । ভোটের সময়র বোমা বারুদের তাণ্ডব চলে । যারা বিরোধিতা করে তাদের ঘরে বন্দী করে রাখে । আমি আশ্চর্যরকম ভাবে এ সব থেকে দূরত্বে রয়েছি কাজু বাদাম বাগানটির আন্তরিক স্নেহছায়ায় । এই এক ঘন্টা বিস্ময়কর ভাবে শূন্যে ভাসতে পারি ।
আমার ইচ্ছেরা ইচ্ছে মতো স্বাধীন হয়ে ওঠে । আমি ভেসে চলি ইথার তরঙ্গে বায়ুস্তরের ধূলিকণা এড়িয়ে মধ্যাকর্ষণ শক্তি ছাড়িয়ে নক্ষত্র পুঞ্জের দেশে । তাদের সাথে কথা বলি পৃথিবী সম্পর্কিত বিষয়ে ।ওরা আমাকে গ্যালাক্সির ইতিহাস শোনায় । আমি মনোযোগী ছাত্রের মতো শুনি । আমার প্রতিটি অঙ্গে শিহরন জাগে । কাঁপন শুরু হয় শরীর জুড়ে । আমি ফিরে আসি বাগানের সবুজ বিছানায় ।
 
পাতাগুলি ঝরে পড়ে আমার দেহ ঘিরে । বাতাস লাগে । শরীর ঠান্ডা হয় । তারপর সময় আমাকে ডেকে নেয় হোমের শৃঙ্খলার ভিতর । আমার স্বাধীন ইচ্ছেরা মুখ থুবড়ে পড়ে । ঘন্টা বাজে । প্রর্থনার সময় হয়ে যায় । সারি বেঁধে দাঁড়াই সকলে । সংগীত শুরু করে কেউ একজন । তারপর থালা হাতে রান্না ঘরের দিকে এগিয়ে যাই । টিফিন নিই লাইন দিয়ে । এই পর্ব শেষে পড়তে বসি । রাত্রি দশটা বাজলে ডিনারে যাব ।
 
চলবে ………

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: