মহা শূন্যের সংলাপ — ফজলুল হক – পর্ব – ৩

মহা শূন্যের সংলাপ/ -- ফজলুল হক - পর্ব - ৩
 
ওকে সবাই ধানু বলে ডাকে, অবশ্য ওর অনেক নাম যার যা খুশি পছন্দ মতো নামে তাকে ডাকলেও তার বিরক্তি কারও নজরে পড়ে না তবে ধানু নামটি তার নিজের পছন্দ নিষিদ্ধ পল্লি বলতে যা বোঝায় এটা তেমন নয় অপেক্ষাকৃত সরু রাস্তা ,রাস্তা কামড়ে বহু যুগ ধরে দাঁড়িয় দাঁড়িয়ে বাড়িটি ক্লান্ত , অবসন্ন তার শরীর ছেঁদা করে বট ,অশ্বথ বিভিন্ন ধরনের লতাগুল্ম আশ্রয় নিয়েছে


পর পর মাটির ছিটেবেড়া এক কুঠুরি ঘর , পলিথিন বস্তা দিয়ে ঢাকা সব বাড়িগুলির একই হাল পাঁজরের মাটি খষে পড়বে কোনও এক অসতর্ক মুহূর্তে দালান বাড়িটি এই শহরের একজন বিখ্যাত ডাক্তার তার উপপত্নির জন্য বানিয়ে দিয়েছিলেন ব্রিটিস আমলে স্টেশন থেকে তিন ফুট দূরে ।দূর গাঁয়ে রোগী দেখে রেল গাড়ি থেকে নেমে কয়েক পা হেঁটে এই বাড়িতে বিশ্রাম নিতেন পরে তিনি মারা গেলে এই বাড়িটি যৌন বিনোদনের মহল হয়ে ওঠে


এখন সেই মহলের ভিজে স্যাঁত সেতে পরিবেশে রিক্সো চালক, টটো ,অটো ট্রাক চালকরা এখনকার মেয়েগুলির কাছে যাতায়ত করে ওদের বিছানা ময়লা চ্যাটচেটে। ছারপোকার তান্ডব বিস্ময়কর রকম একটা শহরে এর থেকে ভাল কিছু আশা করা অর্থহীন কম দামি খদ্দের শরীর ভেদাভেদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ তাদের নেই ধানুর গতর একই দরে বিকোয় তার কোল আমার আধার হয়ে ওঠে


আমি জীবন সম্পর্কে এত কথা বলছি, জানি আমার কোনও অস্তিত্ব নেই ,ছিল না, আর সেই জীবন বর্ণনা অন্যদের, পাঠক , শ্রোতাদের বিশ্বাস আতঙ্কিত হয়ে উঠতে পারে আমি দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে অঙ্গীকার করছি সুবিধাজনক মিথ্যভাষণের ওপর নিজে এমন দৃঢ়কন্ঠে ঘোষণার তাগিদ অনুভব করি না বাস্তবিক আমি জন্মগ্রহণ করেছিলাম আমার মৃত্যুর শুরুতে প্রায় মৃত যে মহিয়সী নারী আমাকে একাকী ছটফট করতে দেখেছিল , সে বুঝেছিল শিশুটি পুরোপুরি জীবিত তার ভারি স্তনের স্পর্শে আমি নিজেকে আবিষ্কার করি

মুহূর্তে ওই দুটো সময়ের ভিতরের সময়টুকু গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ওই চারদিন আমার পক্ষে মহাজাগতিক দয়ামায়া,প্রেমভলোবাসা, হিংসা বিদ্বেষ , স্বার্থপরতা প্রভৃতি বিষয়গুলির কৌশল রহস্যের সংজ্ঞার্থ নির্ণয় করা সহজ হয়ে ওঠে না তবে এক অতিতরঙ্গিত ইথারের শক্তি লাভ করি সহজেই বুঝতে পারি কী ঘটতে চলেছে এই ব্যাপারে আমার চারপাশে যারা অবস্থান করছিল তাদের মধ্যে একটা ধারণা স্পষ্ঠ হয় যে, আমি দৈব শ্ক্তির অধিকারি আর আমি নিজেও অনেক কিছু ঘটাতে পারি , মানুষ যা ভাবতেও পারে না আরে কী বোকার মতো বলছি , আমি নিজেও তো জানি না এই সহজাত প্রতিভার সাফল্য একা কেন ভোগ করব

মৃত্যুর সাথে প্রথম লড়াইটা জিতে গিয়ে এই শহরের কোথাও নিঃশ্বাস নিতে যেমন সহজ হয়েছে তেমনি , এই উদ্দীপ্ত যৌনতার বর্ণময় পল্লীটির প্রতিটি মহান নারীর কোল আদরের সম্মান লাভ করেছি তাদের কাজগুলিকে সহজ ভাবে দেখার সুযোগ হয়েছে তাদের নগ্ন শরীরে যখন খেলা করতাম যৌনতার স্পর্শ পাইনি অথচ ওই বিছানায় লম্পট মক্কেলগুলোকে দেখেছি প্রেমহীন ইন্দ্রিয়বিলাসে বিকৃত যৌনতার গভীরে ডুবে যেতে
ক্রমে নামহীন যৌনতার আড়ালে আমি কথা বলতে শিখে গেলাম সে কী আনন্দঘন মুহূর্ত ! পাড়ার সব মেয়েরা তাদের বাবুসোনার শব্দ উচ্ছারণে অস্পষ্টতা নিয়ে হাসি তামাশায় মেতে ওঠে অবসরের সময় তাদের কেউ কেউ বলে , বড় হয়ে আমাদের দেখবি তো বাবা , যখন আমরা বুড়িয়ে যাব ,আমাদের দেখে খদ্দের আসবে না আমার ঘাড় নাড়া দেখে ওরা হাসে বিশ্বাস অবিশ্বাসের অভিব্যক্তি আমাকে আলাদা ভাবে বাঁচতে শেখায় আমার ধারণাগুলো

কোনও প্রশ্ন ,ব্যাখ্যা ছাড়াই নিজের কাছে সত্যি হয়ে উঠছিল গরমের দাপট রাতে পৌঢ় দালানবাড়ির ছাদে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় একদিন, তারায় ভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি , এক সময় আমার মনে হল আমি উড়ে যাচ্ছি বায়ুস্তরে নিজেকে হলকা মনে হল গতি বাড়ালাম নিজেই নিজের নিয়ন্ত্রণ কর্তা হয়ে উঠেছি বুঝতে পারছি ক্ষুদে ক্ষুদে নক্ষত্রমণ্ডলী ইশারায় ডাকছে , এসো এসো আরও দ্রুত তারপর আমি ঢুকে গেলাম সেখানে যাকে বিজ্ঞানীরা গ্যাল্কসি বলে চেনে
ধানু মাকে আমি ধন বলে ডাকতাম সেও আমাকে ধন বলত বাকিরা কত নামে যে ডাকত মনে থাকে না মা ডাকটি আমার কাছে সহজ হয়ে ওঠেনি ধন নামেই অদ্ভুত মধু মাখানো ছিল অন্যদের যারা সারদিন রাতে খদ্দের ধরার কাজে ব্যস্ত থাকত , তারাও নিয়ম করে আমাকে ছাদের উন্মুক্ত হাওয়ায় আদরের বন্যা বইয়ে দিত অনেক অনেক মুহূর্ত খদ্দেরের উপস্থিতিতে থালায় মুড়ি দিয়ে বসিয়ে দিত ধানু জানতে পারলে বকাবকি করবে জেনেও বাধ্য হত কারণ সেই সময় হয়তো অন্যেরাও তাদের খদ্দের নিয়ে ব্যস্ত থাকত
 

শীতের এক দুপুরে রোদ গায়ে নিতে ছাদে ধনের সাথে শুয়েছিলাম আমার গায়ে জামা ছিল না ধন তার শাড়ী দিয়ে আমাকে বুকে জড়িয়ে ঢেকে নিয়েছিল আর এই দৃশ্যটি পৃথিবীর চিরন্তন হয়ে বেঁচে আছে ধন সেদিন একটু অন্য রকম তার স্বভাবের জায়গায় ছিল না অর্থের বিনিময়ে যে কাজটি সে করত , তাতে যে পরিমাণ প্রশ্রয় লাগে , খদ্দেররা টের পেত তারা তেমনটি পাচ্ছে না আমি টের পাচ্ছি তার হৃৎপিন্ডের উচ্চ কম্পন যা বেদনাদায়ক,মানসিকভাবে পীড়িত কথা বলি , ধন ?
খোলসের ভিতর থেকে চমকে ওঠে সে ,পরিচিত কন্ঠস্বর শুনতে পাই , হা বাবা , ধন আমার কী হল

আমার ঘুম আসছে না একটা গল্প বলবে


চলবে  …………………


Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: