মহা শূন্যের সংলাপ — ফজলুল হক – পর্ব – ১

মহা শূন্যের সংলাপ/    --  ফজলুল হক     -   পর্ব  - ১
এইভাবে একদিন সবকিছু নিজের মতো করে বলতে পারার ক্ষমতা অর্জন করে ফেলি পৃথিবীর নিয়মকে অস্বীকার করতে পারে সেই যাকে আমরা প্রকৃতি বলে থাকি এই সত্যে উপনীত হতে মানুষের প্রকৃত উপলব্ধি ছিল না
আমি তা সঞ্চয় করতে পরেছি , আর অবশেষে দশ মাসের একদিন কম থাকতে আমি তরল লালাযুক্ত পিচ্ছিল স্রোতে সাঁতার কাটতে কাটতে জন্ম গূহার প্রবেশ দ্বারটি খুঁজে পেলাম আমি বিশ্বাস করি এই সুক্ষ্ম কারুকার্যময় লৌকিক রহস্য দ্বারটি বিশ্বের সব থেকে আবেগ অনুভূতি প্রবণ ।এটি একটি আলোকোজ্জ্বল শূন্যতা ছাড়া কিছুই নয় , যার পবিত্র তরলীয় স্রোত ধারার অন্ধকারে আমার শরীর গঠনের প্রক্রিয়ার অশ্চর্য শিল্প সুসমায় প্রায় দশমাস কেটেছে তখনকার আধারের এই আশ্রয়ে ক্ষণে ক্ষণে বদলে যেত ভাঙাচোরার দিনগুলি: বুঝতে পারা না পারার মধ্যে কোনও দুঃখকষ্ট, বেদনা বোধ থাকত না কৌতূহলেরও কোনও স্থান ছিল না
উষ্ণশীতল, তরলকঠিন, আলো না অন্ধকার এসব নয় , কেবল আনিশ্চিত যাত্রা পথের অনিবার্য বিধি কিংবা প্রাকৃতিক নিয়ম প্রক্রিয়ার রূপান্তরে পৌঁছে যাওয়া উষ্ণ তরল লালাযুক্ত আচ্ছাদনে ঘেরা বায়ুহীন, আলোহীন আশ্রয়স্থলে এই দশ মাস এক অলৌকিক অনুকম্পা, বাধ্যতা অথবা প্রকৃতির স্বাভাবিকতা আমার জনা নেই আমি যে অবস্থায় সংলগ্ন ছিলাম মনে করা যেতে পারে একটি জাদুঘর
তার আশ্চর্য জাদুবলে বুঝতে পারি একটা চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে ঘরটিতে, যর কিছুটা আমার সম্পূর্ণ রক্তমাংসের শরীরে স্পর্শ করছে ওই ঘেরাটোপের ভিতর প্রবল গতিচাঞ্চল্যে পরিচালিত হচ্ছি,আমার ভীষণ কান্না পাচ্ছে ।অনুভব করতে পারছি এই আশ্রয়স্থল আমাকে ত্যগ করতে হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব আর এটাই সঠিক সময় ঠিক তার পরেই প্রবল গতিবেগে জন্মদ্বারের ফোকর গলে জোরে কাঁদতে কাঁদতে এই নিসর্গভূমে আছড়ে পড়লাম  
 
ওই প্রথম আমার কন্ঠস্বরে কেঁপে উঠল সভ্যতার ভূমণ্ডল , পৃথীবী নামক সভ্য আশ্রয় শব্দের গতিতরঙ্গে আর আমিও ঠিক তখন থেকে হয়ে গেলাম প্রথাগত মূল্যবোধের গৌরব গাঁথা উত্তরাধিকার আমাকে সম্মাননীয় অতিথি হিসাবে গ্রহণ করা হবে অথবা হবে না সে বিতর্ক থাকতেই পারে , তবে বলতে পারা যায় শব্দে নিজের অস্তিত্বকে প্রমান করার সুযোগ পেলাম  
সুযোগ করে দেয়া হল,সুন্দর যা কিছু তা ছাড়াও শঙ্কা ,উৎকণ্ঠা নারী পুরুষের বিভাজন, সৃষ্টির কুৎসিত দিকগুলোও সঙ্গে নিয়ে আসার বুঝতে পারি কেউ একজন আমাকে তুলে নিল আমি শিহরিত বিশেষ রীতির ছোঁয়ার বৈচিত্র্যে যা সব নবজাতকের বেলায় ঘটে থাকে আর শরীর থেকে তরলীয় লালা পরিষ্কার করতে ব্যস্ত যে, সে একজনকে বলল, গরম জল কর,অথবা স্টোরে যা সেখানে পেতে পারিস ব্যাকুল কন্ঠস্বরে যে জন আমার আগমনের উৎকন্ঠায় প্রহর গুনছিল , তারা সকলে একসঙ্গে বিষাদ আনন্দে চঞ্চল হয়ে ঊঠল তারা একে আপরকে বলতে লাগল ,আহারে ছেলে হয়েছে ছেলে কিংবা মেয়ে চিনে নেবার চিহ্নটি তাদের পরিচিত  
ছেলে হওয়ার মধ্যে বেশ গৌরব আছে সেটাও বুঝত তবে তারা নিশ্চিত যে এই গৌরব কোনও কাজে দেবে না এসব বুঝতে পারলেও ব্যক্ত করার ভাষা অথবা শব্দকে বর্ণে রূপান্তরিত করার কোনও ম্যাজিক আমার জানা ছিল না পরে সেই ম্যাজিক আপনা আপনি আমার আয়ুজীবনে মিশে যায় ; অথবা যে সংগ্রামের মধ্যে আমি নীরবে এসেছি সেখানে ভাষা ব্যবহারের কোনও নিয়ম ছিল না ওরা যাকে নার্স বলছিল তার নির্দেশ মতো আমার ওপর বিভিন্ন ধরনের ক্রিয়া কলাপ ঘটছিল যা বলার অযোগ্য আমি  
 
আর একটি ব্যাপারে ব্যস্ত হয়ে ওঠে একজন,যার গর্ভথলিটি আমার আধার ছিল অথবা যে আমাকে তার গর্ভথলি গর্ভের প্রবেশ দ্বারটি ব্যবহার করতে দিয়েছিল সে বুঝতে পেরেছিল তার জীবনে কিছু একটা ঘটবে ঘটার সব ব্যবস্থা পাকা, লক্ষণগুলিও চেনা দৈবও হতে পারে যা তার পছন্দের নয়, আর্তনাদের এইভাবে তার ভাবনাটা সত্যি হয়ে যায় ক্রমে তার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে ।তারপর বুঝতে পারি সেই মহান মানুষটিকে সকলে মিলে কোথায় নিয়ে গেল মুহূর্ত পরে জানতে পারি ওই নারী চিরদিনের মতো আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছেন তিনি শরীরী হয়ে আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না ; এই পৃথিবীর প্রচলিত নিয়ম ভেঙে আমার সব রকম দায় দায়িত্ব দুঃখ অথবা আনন্দ ছেড়ে তিনি চলে গেলেন কেন চলে গেলেন তা জানার কোনও উপ্য় ছিল না  
পৃথিবীর কত ধাপ নীচে অথবা কতটা শূন্যে তার স্থান হবে সেটি জানার ম্যজিক যন্ত্রটি এখনও গবেষণার বিষয় হয়ে ওঠেনি ঠিক তার কিছুক্ষণ পর আমাকেও নিয়ে গেল একটি শূন্য ট্রেচারে সময়ের পথ ধরে মহান মহিয়সীর অস্তিত্ত্ব মহা শূন্যে বিলীন হয়ে গেল বলে যারা নিশ্চিত হল; তারা জানল না আমার দেহের ভিতর কী ঘটে গেল তার শরীরের কাঠামোর ভিতর যে কোমল হৃদয়টি ছিল শুধু ভিতরে ভিতরে স্পর্শ করে আমাকে বোবা আর্তনাদের খাদে ফেলে গেল যারা পরিবার বলে প্রতিবেশী বলে এতদিন পরিচিতি লাভ করছিল, তারা আমার আমার জন্মদাত্রীর সম্পর্কের ভিতরের চিরন্তন সত্যটি অনুভব করল না শুধু ব্যস্ততার বিচিত্র চলা ফেরার মধ্যে তাদের শ্বাস দ্রুত অস্বাভাবিক চঞ্চল ছিল আত্মীয়, বলে যারা পরিচিত তারা হায় হায় করে কপাল চাপড়াতে অবসর না নিয়ে অনেকটা স্বস্তি পেল
 
পৃথিবী সম্পর্কে আমার নিবিড়তা এড়িয়ে,সত্যটিকে অস্বীকার করে আমাকে নিন্দুকের মতো আক্রমন করতেও থাকে তারা আমার অস্তিত্বের ব্যাপারটা ভুলে গিয়ে ওদের কোনও একজন, এই পরজীবী নির্দোষ তরল যেটি বিস্ময়কর ভাবে একটি মানব শিশুর রূপ নিয়েছে তাকে অবৈধ্য বলে অপমানিত করল গোপনে ফিস ফিস , ফুস ফাস করছিল তারা ভয়ংকর কথা বলে একে অপরের কাছে প্রিয় হবার চেষ্টা করছিল একজন অত্যন্ত প্রত্যয়ের সাথে বলল, আমি জানতাম যে ,ওই ছেলেটার সাথে অঘটনটা ঘটিয়েছিল
কোন ছেলেট ?
কালো কুচকুচে ডোমদের ছেলেটা
ওইজন্য ছেলেটা কেমন নাদার কালির মতো হয়েছে দেখছ
 
আমি সেই কালো কুচকুচে শিশু যে এই পৃথিবীকে স্পর্শ করার সাথে সাথে এমন পুরষ্কার পেলাম পুরুষটি যে কিনা তরল পদার্থের মালিক , যে কিনা মহান নারীর গর্ভে তরল পদার্থের বিন্দুগুলি ঢেলে দিয়েছিল , পৃথিবী যাকে পরম পুজনীয় পিতা ধর্ম, পিতা স্বর্গ বলে জানে , সে জানতেই পারল না তার শরীর বিক্রমের ফসল ফলেছে অথবা জানার প্রযোজন বোধও করেনি করবে না কখনও
আর চেষ্টা করে থাকলেও জানতে পারবেও না কোনোদিন যে রমণী আজ না হোক ,কাল না হোক ,কয়েক বছর পরেও জানাতে পারত ,তার মৃতদেহটি আর কিছুক্ষণের মধ্যে দাহ করা হবে এইসব ঘটনার সূত্রপাত থেকে শেষ অবধি মানসিক স্থিতাবস্তা হারাবার কোনও কারণ ছিল না আমার অনুভবের জায়গাটা মূল্যবান অথবা সক্রিয় কোনও ভূমিকা পালন করার যোগ্য হয়ে ওঠেনি
আমি পড়ে আছি একটা ট্রেচারে পাশ দিয়ে সাধারণ মানুষ , নার্স , ডাক্তারদের পায়ের শব্দে কেঁপে উঠছিলাম ঘন ঘন এর থেকে গর্ভথলির তরলীয় আচ্ছাদনে বোধহীন অবস্থাটা অনেক ভাল শ্বাসপ্রশ্বাস, খাবারের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল আতঙ্কের পরিবেশ ছিল না যার শরীরের কাঠামোর ভিতর আমার আশ্রয়ভিলাটি সে সব সময় সতর্ক থাকত আর সে নিজেকে একজন সিঙ্গেল মাদার বলে গর্ব করত আত্মীয় প্রতিবেশীদের তোয়াক্কা না করে তার পরিচয়ে আমি বড় হয়ে উঠব এই অহংকার স্বীকার করত
সময় বাড়ছে একাকী মৃত্যুর সাথে আমার এক ধরনের আবিষ্ঠতা শুরু হচ্ছে অবশ্য মুমূর্ষতার সাথে যতখানি মৃত্যুর সাথে ততটা নয় আমি নিশ্চিত নই যে আমি ঘুমিয়ে পড়েছি নীরাপত্তাহীন এক অদৃশ্য বেষ্টনীর মধ্যে একলা শূন্যতার ভিতর দিয়ে আমার মুখ ,মুখমণ্ডল এবং আমার শরীরের পরিপূর্ণ কক্ষগুলো , আঙ্গপ্রতঙ্গগুলো মানব রূপে যেভাবে বেরিয়ে এসেছিল ,সম্ভবত তাকে আর মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখার বায়ুমণ্ডলীয় কোনও স্তর নেই  
আমার হাত খুব দ্রুত কেঁপে কেঁপে উঠছিল বাতাসের স্থিতিস্থাপক স্থিরতা বিদায় নিচ্ছে ঠিক সেই সময়ে কোনো এক নারীর স্তনের বোঁটা আমার ঠোঁটের ফাঁকে ঢুকছে আমি যে কোনও রকম বোধ বুদ্ধি, অনুভব অনুভূতি, বিচার বিশ্লেষণের বাইরে অবস্থান করছি অথচ কোনও এক রহস্য জাদুবলে সবকিছু উপলব্ধি করার ক্ষমতা আমার রয়েছে বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করা হলে কিছুই বলতে পারব না কেন পারব না তাও অজানা  
তবে একদিন আমি বুঝতে পেরেছিলাম,আমার জীবন যতই গৌরবময় হোক না কেন মৃত্যুর বিরুদ্ধে সেটা খুব বেশি মূল্যবান হাতিয়ার নয় ,বরং স্তনের বোঁটাটি মুখে নিয়ে বুঝেছিলাম, জয়ের শক্তি অন্য কিছুতে লুকিয়ে রয়েছে সমুদ্রে ভয়ংকর ঘুর্ণির উচ্চতা অতিক্রম করার পর স্থির জলে পৌঁছানোর যে অনুভূতি তেমনি শক্তির অনুভূতি অনুভব করি আর আমি জিতে যাই
এইভাবে খাদের কিনারা থেকে আগামীদিনে বার বার আমি বেঁচে উঠব বিশ্বাস করি ওদিকে মৃতদেহটি যে কিনা আমার অভিশাপ অথবা আশীর্বাদ, একাকীত্বের নিবির আলিঙ্গন ছেড়ে দিয়েছিল , তার সৎকারের কাজটি করা হয়েছিল কোনও এক নদী তীরে, এক সবুজ নিবিড় শান্ত পাহাড়ের কোল থেকে ঝরে পড়েছিল বিবর্তণের যুগে কেউ মনে রাখার দায় অনুভব করে না, কতদিন ধরে , কত শীত বসন্ত তার ওপর বয়ে গেছে আমারও মনে করার অভিপ্রায় ছিল না , যদি না এই রক্ত মাংসের কাঠামোটিকে জারজ বলে চিহ্নিত না করত চারপাশের মানুষ  
আশ্চর্য কিংবা নাও হতে পারে এই জারজ শব্দটি আমি মৃত্যু পর্যন্ত বয়ে বেড়াব আর আমার ভুলে যাওয়ার সব রকম চেষ্টা ব্যর্থ করে দেবে পৃথিবীতে বসবাসকারী কথা বলা জীবগুলি আমার দিকে আঙুল তুলে চিহ্নিতকরণের কাজটি খুব স্বাভাবিক ভাবে প্রতিবেশীরা মজা করবে যারা হেঁটে বেড়ায় মাটির উপর , শুয়ে থাকে সবুজ ঘাসের উপর সাংসারিক গৌরব সমাজে প্রতিষ্ঠা পায় তারা যেমন প্রাণবন্ত তেমনি সব বোধের পরিবর্তন হয় না  
তারা দেখতে পায় মাথার উপর উড়ে যাওয়া মেঘ , শুনতে পায় চারপাশের গাছের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত বাতাসের মর্মরধ্বনি নিসর্গের এমন মনোহরণকারী রূপ তাদের দৃষ্টি গোচর হলেও কুৎসা রটানোর কাজটিতে ভুল করে না
চারদিন আমার শরীর ভারি স্তনের স্নেহকোমল আলিঙ্গনে কাটল কীভাবে কাটল , কেন কাটল এসব অর্থহীন প্রশ্ন কেবল বাচাল নিন্দুকদের মনে আসে  
 
তখন আমার ভিন্ন রকম প্রতিক্রিয়া, নিরাপদ আধার হয়ে ওঠা , স্নেহময়ী মানুষটির আদরকালীন তাতক্ষণিক উচ্চারিত স্নেহপরায়ন শব্দগুলি আপনা আপনি অর্পিত হতে থাকে যা বিস্ময়কর মনে হয় জানা যায় তার নিজের সদ্যজাত শিশুটি প্রাণ নিয়ে জন্মায়নি ফলে তার বুকে জমে থাকা পর্যাপ্ত তরল যা ওই মৃত শিশুটির জন্য সঞ্চিত ছিল আমি প্রাণ ভরে পান করলাম তার শরীরের স্নেহকোমল অঙ্গগুলি আমার শরীর বেষ্টন করে রইল চারদিন চার রাত  
পরের দিনটি কেমন যাবে তা আমার জানার কোনও সুবিধা নেই যা কেবল অল্লাহ বা ভগবানের কব্জায় একমাত্র নির্ভেজাল সত্যটি হল মৃত্যু যা অবধারিত তারপর আবার আমার অজান্তে অন্য আঁধার নেমে এল হাসপাতালের বেডের চারপাশে কোলাহল কোলাহল আমাকে ওই নারীকে ঘিরে কৌতূহল বশত রোগীদের অনেকেই ঘাড় তুলে ব্যাপারটি জানার চেষ্টা করে  


চলবে    ………………………..
ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: