মাতৃত্ব ….. একটি অনুভূতি : পৃথা সিনহা দাস

রবিবারের দুপুর টা ঘুমোবো না ঘুমোবো না করেও ঠিক সেই জমে ক্ষীর মার্কা একটা ভাত ঘুম হয়েই যায়। ঘুম ঘুম ভাবটাকে শরীরে জড়িয়ে নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো চিত্রাঙ্গদা।

“দিদি.. চা.. “

” হ্যাঁ.. দে.. ” হাত বাড়িয়ে রমার হাত থেকে চা টা নিল চিত্রাঙ্গদা। চায়ের কাপে সশব্দে একটা লঅম্বাআআ চুমুক মেরে বলল.. “আঃ! রমা রে… তোর হাতের এই চা খাওয়ার পর মরেও সুখ। কী জাদু আছে সখী তোমার ঐ হাতখানিতে, দিবা নিশি সাধ জাগে যে ও হাতের চা পান করিতে। “….

” দিদি.. তুমি না.. ” রমা লজ্জা পেয়ে ভেতরে চলে গেল।

“হাঃ হাঃ হাঃ… ” প্রাণ খুলে হাসলো চিত্রাঙ্গদা রমার লাজে রাঙা মুখটি দেখে।
রমা না থাকলে তার দুর্গতির শেষ থাকতো না.. ভাবে চিত্রাঙ্গদা। স্বামী পরিত্যক্তা, সন্তানহীনা রমনী টি আজ চিত্রাঙ্গদার বড় ভরসাস্থল। পরিপাটি করে, যত্নে সাজিয়ে রেখেছে সে চিত্রাঙ্গদার সংসারকে। কখনো মায়ের মত শাসন করে… কখনো বোনের মত আবদার করে আবার কখনো সখীর মত আগল ভাঙা মনের কথা ভাগ করে নেয় চিত্রাঙ্গদার সাথে।

চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বারান্দায় রাখা গদি আঁটা চেয়ারে আয়েশ করে বসল চিত্রাঙ্গদা। হঠাৎ তার নজর আটকে গেল উলটো দিকের ফুটপাতের একটি মনোরম দৃশ্যে।


ফুটপাত বাসী এক মা তার সন্তান কে পরম মমতায় স্তন্য পান করাচ্ছে। শিশু টি মায়ের একটি স্তনের অমৃত সুধা পান করছে এবং অপর স্তনটি আঁকড়ে রেখেছে তার ক্ষুদ্র মুষ্টির মধ্যে। অল্পবয়সী, কৃশ তরুণী টির সুডৌল বক্ষ পথচলতি কিছু মানুষের কামুক দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। চিত্রাঙ্গদা মনে মনে বলল.. দৃষ্টি সুখের কারবারি সব।

গোধূলির আবির রঙা আকাশের দিকে তাকিয়ে ক্ষণিকের তরে উদাস হল চিত্রাঙ্গদার মন… তাকে ছুঁয়ে বয়ে যাওয়া মৃদু মন্দ বাতাসে যেন মন কেমনের সুর। অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসল তার বুক নিংড়ে।

নিশি দিন ভরসা রাখিস হবেই হবে… ওরে মন
হবেই হবে …..

চিত্রাঙ্গদার প্রাণের কবি…কবিতায়,গানে যিনি তার সুখ দুঃখের সাথি … তার গানের সুরে মুঠোফোন
বেজে উঠল।

” হ্যালো. . হ্যাঁ.. হ্যাঁ… ঠিক দশটার সময়ে পৌঁছে যাব.. আচ্ছা আচ্ছা …কাগজপত্র সব নিয়ে যাব… ওকে ওকে… ঠিক আছে… নমস্কার। “

কথা শেষ করে চিত্রাঙ্গদা বারান্দা থেকে বসার ঘরে এসে সোফায় বসল। আগামী কাল তার জীবনের নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। দীর্ঘ এক বছরের প্রয়াস কাল ফলপ্রসূ হবে। সকল না পাওয়া, সকল ঠাট্টা, পরিহাসের অবসানে চিত্রাঙ্গদা পূর্ণতা লাভ করবে।

” ওমা… এ যে দেখি গড়ের মাঠ। হাওয়া খেতে সাথে যাব না কি? “

কলেজ ফিরতি চিত্রাঙ্গদা ঘুরে দাঁড়ালো… এগিয়ে গেলো বক্তার দিকে।

“অবশ্যই … আসুন না একসাথে হাওয়া খাবো… তার পর গড়ের মাঠে ফুটবল খেলবো। আমার বা পায়ের জোরটা একটু বেশি, ঐ পায়েই বলটা কিক্ করবো… ভালো হবে না? “

পাড়ার মোড়ের বখাটে ছোড়াদের রসগোল্লার মত হাঁ মুখের সামনে দিয়ে গটগটিয়ে বাড়ির পথ ধরল চিত্রাঙ্গদা।

বাড়ি ফিরে ঘরের দরজা বন্ধ করে উন্মুক্ত বসনা আপন প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে ছিল চিত্রাঙ্গদা। আরশিনগরে গৌরবর্ণা, তীক্ষ্ণ নাশা ,কুঞ্চিত কেশ, কাজলনয়নার প্রতিচ্ছবি। ধীরে ধীরে দৃষ্টি এসে স্থির হল বক্ষে। ধূ ধূ মরুভূমি যেন… কেবলই শুষ্কতা। শূন্যতার মাঝে প্রাণের ছোঁয়া সরূপ বারি বিন্দু সম স্তনবৃন্ত।

নয়নাশ্রু গাল বেয়ে টুপটাপ খসে পড়ে উন্মুক্ত বক্ষে।এই ধারা পাতে মিশে আছে কঠোর, কঠিন বহিরাবরণের অভ্যন্তরস্থ এক তরুণীর দীর্ঘশ্বাস… সমাজের পরিহাস, উপহাসের যন্ত্রনা। অন্তঃপুরের বাতাসে অনুরণন… হে প্রকৃতি কেন এই অপূর্ণতা, রূপের ডালি উজাড় করে দিয়েও যৌবনাকাশে কেবলই বিন্দু বিন্দু তারার আলো। সূর্যের প্রখর তেজ কেন মেঘাবৃত….. চিত্রাঙ্গদা আপন মনে গেয়ে ওঠে রবিঠাকুরের গান…

” দুঃখ যদি না পাবে তো দুঃখ তোমার ঘুচবে কবে?
বিষকে বিষের দাহ দিয়ে দহন করে মরতে হবে”…

চিত্রাঙ্গদার বান্ধবী সুজাতার বাড়িতে আজ একটা ছোট্ট মিলনোৎসব….ইউনিভার্সিটির গন্ডি পেড়িয়ে নিজ নিজ পথে যাত্রা করার পূর্বে একঝাঁক যৌবনের, সমবেত আনন্দ যাপনের উৎসব।

আজ শাড়ি পরার বাসনা জেগেছে চিত্রাঙ্গদার মনে। সবাই তাকে সুন্দরী বলে। পুরুষের চোখে , তার প্রতি ভালোলাগা কে সে উপভোগ করে।সন্তর্পণে আড়ালে রাখে তার অপূর্ণতা কে।

” লাল রঙা ঢাকাই পরিহিতা তুই, আজ যে কোন পুরুষের হৃদয়ে প্রেমের জোয়ার আনবি… কি লাগছে রে তোকে “….

সুজাতার কথায় চিত্রাঙ্গদার গালেও লালের ছোঁয়া
লাগল শাড়ির রঙে রঙ মিলিয়ে।

” আজ কিন্তু উপলদাও আসবে। তুই আসবি শুনেই সে তো আনন্দে আত্মহারা। তার ওপর তোর এই মারকাটারী সাজ…. বেচারা কে তো আর সামলানোই যাবে না”। বলেই চোখ টিপল সুজাতা।

উপল…. সুজাতার মামাতো দাদা। সুজাতার জন্মদিনের দিন আলাপ হয়েছিল চিত্রাঙ্গদার সাথে। তার পরেও দু একবার দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে তাদের সুজাতার বাড়িতেই। ফোনালাপ ও চলে দুজনের। তৈরি হয়েছে একটা পারস্পরিক ভালোলাগা । কাছাকাছি আগত দুটি মন বাঁধা পড়তে চায় চিরায়ত প্রেম ডোরে।

আসমানী রঙা বসন বদলে রাতের আকাশ লক্ষ্য হীরের দ্যুতি সম তারা জ্বলা কালো শাড়িতে যেন লাস্যময়ী নারী। হই হুল্লোড়, আড্ডা থেকে দলছুট চিত্রাঙ্গদা আর উপল রাতের ঐ তারা জ্বলা আকাশ কে সাক্ষী রেখে ছাদের নিভৃত নিরালায় মুখোমুখি… হাতে হাত.. চোখে চোখ।


গভীর আশ্লেষে জড়িয়ে ধরলো একে অপর কে। ধীরে ধীরে উপলের ঠোঁট নেমে এল চিত্রাঙ্গদার উষ্ণ ঠোঁটে। চিত্রাঙ্গদার বাহুডোরে আবদ্ধ উপলের হাত খুঁজে ফেরে নারী শরীরের দু খন্ড পেলবতা…. প্রস্ফুটিত কমলদ্বয় কে নিষ্পেষিত করতে চায়….কিন্তু বারংবার তার মুষ্টি গত হয় কেবলই শূন্যতা।


চিত্রাঙ্গদা বিভোর ,পুরুষের প্রথম স্পর্শ সুখে। তার অপূর্ণতা ভুলে আজ সে তার ভালোবাসার মানুষের সোহাগের লাগি উদ্বেল।
অকস্মাৎ ছন্দপতন। উপল যেন হঠাৎ, ভীষণ শীতল। কন্ঠলগ্না চিত্রাঙ্গদার বাহু পাশে যেন হাঁসফাঁস করতে লাগল।
মুহুর্তে চিত্রাঙ্গদার সম্বিত ফিরে আসল।আলুথালু নিজেকে সামলে সরে দাঁড়াল। উপলের জিজ্ঞাসু দৃষ্টির সাথে দৃষ্টি মিলিয়ে বলল..

” নারী শরীরের যে পেলবতার খোঁজে তুমি পাগলপারা হয়েছিলে… সেই স্পর্শ সুখ তোমায় দিতে আমি অপারগ। হৃদয়ের গভীরে যা সঞ্চিত আছে ,সেই সকল অনুভূতি, সেই সকল আবেগ সহ আপন করে নিতে পারো না আমায়? মন কে স্পর্শ করে দেখো একবার… সে স্পর্শ সুখের থেকে তুমি বঞ্চিত হবে না, কথা দিলাম”।

” নীচে যাওয়া যাক, অনেক্ষণ হল আমরা ছাদে এসেছি। ” উপল সিঁড়ি ভেঙে নীচে নেমে গেল।

প্রথম ভালোবাসা, প্রথম পুরুষের স্পর্শ, প্রথম প্রেম গড়ার মুখেই ভেঙে যেতে দেখল চিত্রাঙ্গদা। হায় রে পুরুষ…. অন্তঃপুরের প্রস্ফুটিত ভালোবাসার প্রতি তোমার লোভ নেই, তুমি কেবল বাহ্যিক মধু ভান্ড লোভী।
সেই ক্ষণে চিত্রাঙ্গদার মনে রবিঠাকুরের গানের দু কলি উঁকি দিয়ে গেল।

” আমার প্রাণের মাঝে সুধা আছে, চাও কি–
হায় বুঝি তার খবর পেলে না?
পারিজাতের মধুর গন্ধ পাও কি—-
হায় বুঝি তার নাগাল মেলে না।। “

পুরুষের ভালোবাসার প্রতি চিত্রাঙ্গদার ভক্তি উঠে গেছে। তারা কেবল শরীর চেনে। বক্ষ বিভাজিকার প্রতি তাদের আকর্ষণ, পীনপয়োধরাই তাদের কাম্য।

তবে এ তার ব্যক্তিগত মত। সব পুরুষ কি আর সমান হয়? হয়তো কেবল তার ভাগ্যেই এমন পুরুষ নেই, যে তার সকল অপূর্ণতা সহ তাকে ভালোবাসবে। চাকুরীরতা, স্বাবলম্বী চিত্রাঙ্গদা নিজ জীবন নিজ ইচ্ছায় বাঁচার মন্ত্রে নিজেকে দীক্ষিত করেছে।
বন্ধু বান্ধব, আত্মীয় স্বজনদের বার বার..”বিয়ে কর,বিয়ে কর”… “কী রে কবে বিয়ে করবি? “…. এ হেন কথায় মাঝে মাঝে বিরক্তির উদ্রেক হয়… কিন্তু… কখনও কখনও, মনের কোণে সুপ্ত কিছু ইচ্ছে উঁকি মেরে যায়। খেলাঘর বাঁধার সাধ জাগে নারী মনে।

অবশেষে, সুপ্ত ইচ্ছে , খেলাঘরের সাধ… বাস্তবায়িত হতে চলল চিত্রাঙ্গদার জীবনে। দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়ের ঘটকগিরির ফলে চিত্রাঙ্গদা আর কুশলের বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের দিনক্ষণ ঠিক হয়ে যায়।
ব্যাঙ্কে কর্মরত কুশল এর হাসিখুশি, বুদ্ধি দীপ্ত চেহারা চিত্রাঙ্গদার বেশ মনে ধরেছে। অতীতের তিক্ত স্মৃতি ভুলে পুনরায় নারী মন পতঙ্গ সম ঝাঁপ দিতে প্রস্তুত ভালোবাসার বহ্নি তে। চিত্রাঙ্গদার দু চোখে তখন নতুন জীবনের স্বপ্ন। মনের আনাচে কানাচে তার প্রাণের কবির সুরের মূর্ছনা….

” কী ধ্বনি বাজে গহন চেতনা মাঝে
কী আনন্দ উচ্ছ্বসিল মম তনুবীণা গহন চেতনা মাঝে
মন প্রাণহরা সুধা ঝরা
পরশে ভাবনা উদাসীনা”…..

একদিন কুশলের সামনাসামনি বসে নিজ অপূর্ণতার কথা অকপটে উজাড় করে দিল চিত্রাঙ্গদা। নিজের অপরিণত স্তন… ডাক্তারি ভাষায় যাকে মাইক্রোমাসটিয়া বা ম্যামারি হাইপোলেসিয়া বলে… সেই অসম্পূর্ণতার কথা জানিয়ে দিল তার ভবিষ্যৎ জীবন সঙ্গী কে…. মাতৃত্বের মাধ্যমে তার শরীরের সকল অপূর্ণতা, সকল অপরিণত দশার মুক্তি লাভ ঘটবে। প্রকৃতির নিয়মে মায়ের অমৃত ভান্ড পুষ্ট হবে নিজ সন্তানের তৃষ্ণা মেটাতে। সেই দিনের অপেক্ষা করব আমরা। আশার আলোয় আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠল চিত্রাঙ্গদার মুখ।
কোনো কথা না বলে কুশল কেবল চিত্রাঙ্গদার হাতের ওপর হাত রাখল। সে স্পর্শে ছিল ভরসা, সহমর্মিতা, ভালোবাসা।

কুশলের বাড়িতে আজ চিত্রাঙ্গদার দ্বিতীয় সকাল। সদ্যস্নাতা চিত্রাঙ্গদা ভোরের মিঠে আলো গায়ে মেখে শোওয়ার ঘর লাগোয়া ছোট্ট এক ফালি ছাদে এসে দাঁড়ালো। কার্নিশে কপোত কপোতীর প্রেমালাপ দেখছিল মুগ্ধ নয়নে। ঠোঁটে ঠোঁটে কথকতা, নরম আদরে ভরিয়ে দিচ্ছে একে অপরকে।

এমন কোমল সোহাগ যে সেও চেয়েছিল।চিত্রাঙ্গদার বুকের চামড়া জ্বালা করে উঠল আচমকা। মনে পরে গেল গত রাতের কুশলের পৈশাচিক দেহ লীলা।
এ কুশল তার অচেনা। যে ভরসার স্পর্শ পেয়েছিল একদিন নিজের সব কথা উজাড় করার কালে… সাহস করে পা বাড়িয়েছিল স্বপ্নের খেলাঘর কে বাস্তবায়িত করার পথে যার ভালোবাসার হাত ধরে…. গত রাতের স্পর্শে তো ছিল না সে সব কিছু…. সে স্পর্শে ছিল কেবল অধিকারের আস্ফালন, পৌরষত্বের অত্যাচার….. মন না ছুঁয়ে কেবল শরীর ছোঁয়ার তাগিদ।

যা পাওয়ার নয় তাই পাওয়ার চেষ্টায় কুশলের নখ, দন্তের আঁচড়ে রক্তাক্ত হল চিত্রাঙ্গদার বক্ষ…. ভিতরে,বাহিরে।আসুরিক শক্তি তে কেবল উষ্ণ বালি খনন স্রোতস্বিনীর আশায়, অনর্থক বলপ্রয়োগ। স্লাইকোনের ন্যায় আছড়ে পড়া কুশল লন্ডভন্ড করে দিয়ে গেল চিত্রাঙ্গদার শরীরের, মনের সকল আবেগ, অনুভূতি কে।এ ও একপ্রকারের ধর্ষণ…. বৈবাহিক ধর্ষণ।

মাঝে মাঝেই কুশল তাকে কৃত্রিমতা অবলম্বনে জোড় করত। বর্মাকারের বক্ষ আবরণী কিনে এনে দিয়ে ,কোন সামাজিক অনুষ্ঠানে বা কুশলের পরিচিত পরিমন্ডলে যাওয়ার সময় ঐ সকল ব্যবহারের মাধ্যমে তাকে তার অপুষ্টতা ঢাকতে বলত। চিত্রাঙ্গদা একবাক্যে সব নাকচ করে দিয়ে কুশলের উৎসাহের দ্বীপ ফুৎকারে নিভিয়ে দিত। দৃঢ় কন্ঠে ঘোষণা করেছিল…. ” আমি যেমন, তেমনই ভাল। আগে ভাবতাম এ আমার অপূর্ণতা…. আসলে অপূর্ণতা তাদের ,যাদের দৃষ্টি তে আমি অসম্পূর্ণ। সামান্য বক্ষ সৌন্দর্য কখনও নারীর সৌন্দর্যের মাপকাঠি হতে পারে না। সে নিজ গুনে অনন্যা”।

কুশলের নিশি আক্রমণ সহ্য করার কারণ কেবল মাত্র মাতৃত্ব লাভ। মন বিহীন এক সম্পর্ক বহন করতে করতে ক্লান্ত চিত্রাঙ্গদা অনেক দিন ধরে বলব বলব করে আজ সেই কথাটা কুশলকে বলেই ফেলল…

” আমি মা হতে চাই”…..
চিত্রাঙ্গদার কথায় ,ফোনের পর্দা থেকে মুখ তুলে
তার দিকে তাকালো কুশল।

পৈশাচিক অট্টহাসি তে ফেটে পড়ল।
” কী খাওয়াবে সদ্যোজাত কে? সে গুড়ে তো বালি। তোমার মত প্রতিবন্ধীর মা হওয়া সাজে না। আমাকে ঠকিয়েছো…. এবার সন্তান কে ও ঠকাবে? “

চিত্রাঙ্গদার ভাবতে ঘেন্না হচ্ছে এই মানুষটাকে ভরসা করে সে তার নারী জীবনের পূর্ণতা পেতে চাইছিল। পীনস্তনী নয় বলে সে প্রতিবন্ধী? মাতৃত্বের অধিকারী নয়? প্রকৃতির নিয়মে প্রত্যেক মায়ের মত চিত্রাঙ্গদার অমৃত ভান্ড পরিপূর্ণ হবে সে তো বলেছিল কুশল কে… তার সবটুকুই তো কুশলের জানা। তবে কীসের ঠকানো?
তাও…. শেষ চেষ্টা করেছিল সে…. কুশল ফিরে ও তাকায়নি।উপরন্তু নিজের বন্ধু বান্ধব দের কাছে তুলে ধরেছিল নিজ নারীর অসম্পূর্ণতার চিত্র।

আবারও…. চিত্রাঙ্গদা তার স্বপ্ন, তার মাতৃত্বের আশা, তার খেলাঘর ভেঙে যেতে দেখলো। হায় রে পুরুষ….. অন্তঃসলীলার নাগাল পেলে না…. কেবল আঘাত হানলে প্রস্তর খন্ডে।

বৈবাহিক বন্ধনের মিথ্যে প্রহসন মিটিয়ে চিত্রাঙ্গদা আজ মুক্ত।

” লোকে কী বলবে?”… “মানিয়ে নে, সব ঠিক হয়ে যাবে”.. ” মেয়ে মানুষের এত জেদ ভালো নয় “.. ” তোর তো খুঁত আছেই, একটু সহ্য করলেই তো হয়”…..

হিতাকাঙ্ক্ষী দের এ হেন বাক্য বাণে জর্জরিত চিত্রাঙ্গদা কঠিন ভাবে জানিয়ে দিয়েছিল সকল কে……
” যে পুরুষ নিজ স্ত্রীর কষ্ট কে দুনিয়ার সামনে বেআব্রু করতে পারে…তার আত্মার আত্মীয় হওয়ার বদলে কেবল স্বামীত্বের অধিকার ফলায়…. সর্বপরি,নিজ নারীকে মাতৃত্ব প্রদানে অস্বীকার করে….তার সাথে বাধ্যবাধকতার সহবাস করা গেলেও ভালোবাসায় বাস করা যায় না”।

” ও দিদি… ঘুমোলে না কি? “……

রমার ডাকে চিত্রাঙ্গদা সোজা হয়ে বসল। সোফায় বসে বসে কখন যে চোখ টা লেগে গেছিল…… অতীত পর্বের কিছু দৃশ্য ছবির মত চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল।
ফেলে আসা দিন কে চিরতরে মুছে ফেলতে চায় চিত্রাঙ্গদা। দুঃখ স্মৃতির ট্যাটু নিজের মনের মধ্যে এঁকে সে আর চলবে না। এবার নতুন ভাবে বাঁচবে। গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ালো সে।
“খেতে দিয়ে দে রমা…. কাল আবার সকাল সকাল বেরোতে হবে। তুই ও যাবি আমার সাথে”।

” আলোর অমল কমলখানি কে ফুটালে
নীল আকাশের ঘুম ছুটালে
আমার মনের ভাবনা গুলি বাহির হল পাখা তুলি
ওই কমলের পথে সেই ছুটালে। “

গাড়ি ছুটে চলেছে হাওয়ার বেগে। ভোরের মিঠে বাতাস খোলা জানালা দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে চিত্রাঙ্গদার চোখে মুখে। মৃদু সুরে বাজছে রবীন্দ্র সঙ্গীত। আর কিছুক্ষণের মধ্যে চিত্রাঙ্গদার জীবনের সঙ্গে জড়াতে চলেছে একটি ছোট্ট জীবন। টলমল পায়ে হাঁটতে হাঁটতে দৃঢ় পদক্ষেপে ছুটবে সে ভবিষ্যতের পথে, তার সঙ্গী হবে চিত্রাঙ্গদার মাতৃত্ব…. তার অপূর্ণ সকল স্বপ্নেরা।

কাগুজে নিয়মকানুনের শেষে অনাথ আশ্রম কর্তৃপক্ষ চিত্রাঙ্গদার কোলে তুলে দিল সাত মাসের ফুটফুটে শিশুকন্যা তুলি কে। পরম মমতায় চিত্রাঙ্গদা নিজ কন্যা কে বুকে আঁকড়ে ধরল। পূর্ণতা পেল তার নারীত্ব।

দিদির ঘরে তুলির দুধের বোতল নিয়ে ঢুকতে গিয়ে রমা থমকে দাঁড়ালো। এক অপরূপ যুগল মূর্তির দিকে তাকিয়ে রইল সে নির্নিমেষে।

খাটে অর্ধশায়িত চিত্রাঙ্গদা, উন্মুক্ত বক্ষ… ক্ষুদ্র স্তন বৃন্ত ,তার কন্যার লালা রসে শিক্ত। দু চোখ বেয়ে অধঃগামী জলধারা টুপটাপ খসে পড়ছে তুলির মাথায় এক মায়ের জমানো কষ্ট কথা রূপে। উদাত্ত কন্ঠে সে গেয়ে চলেছে রবি ঠাকুরের গান…..

“আমার সকল রসের ধারা, তোমাতে আজ হোক না হারা
জীবন জুড়ে লাগুক পরশ, ভুবন ব্যেপে জাগুক হরষ”

দরজায় দাঁড়ানো রমার সাথে চোখাচোখি হল চিত্রাঙ্গদার।

” দেখ রমা আমি মা হয়েছি.”….ঘরের দেওয়ালে দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হল নারীর অহংকার….. “সুডৌল বক্ষহীনা আমি নাকি মা হওয়ার যোগ্য নই? জন্মদিয়ে… স্তন্য পান করালেই কি শুধু মা হওয়া যায়? মাতৃত্ব আসলে এক অনুভূতি…. আমি অপূর্ণ, কুরূপা চিত্রাঙ্গদা …. আজ সেই অনুভূতির মাধ্যমে মা হয়ে সুরূপা হলাম……

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: