মানসী // সংঘমিত্রা রায়চৌধুরী

012

রাতে সুশোভনের একেবারেই ঘুম আসছিলো না, শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই একটা ঘুমের ওষুধ খেয়েছিল সুশোভন| ঘুমটা পাতলা হলেও পুরো ভাঙে নি|

ইন্দুদির ডাকে চোখ মেললো সুশোভন, চোখটা সোজা দেওয়ালঘড়িতে ….বেশ বেলা হয়েছে! মাথাটা তখনও জ্যাম হয়েই আছে,এলোমেলো চিন্তার জটে সুশোভন আনমনা| ইন্দুদির জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে সুশোভনের ভারী অস্বস্তি হোলো| সুশোভন ইন্দুদির হাত থেকে চায়ের কাপটা নিয়ে বললো, “আজ আর অফিসে যাবো না, শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে, আর একটু ঘুম দরকার|

“ইন্দুদি হাসিমুখে বললো, “সেই ভালো, দুপুরে কতদিন বাড়ীতে খাও না, ছুটির দিনেও তো আজকাল সকালে জলখাবার খেয়েই হাসপাতালে মায়ের কাছে ছোটো, ফেরো সেই কত রাতে, ঠিকমত খাওয়াদাওয়া হচ্ছে কই? মা হাসপাতাল থেকে ফিরে তোমার এই অনিয়মের জন্য আমাকে বড্ড বকবেন|” একদমে কথাগুলো বলে ইন্দুদি থামলো|

সুশোভন যখন ক্লাস সেভেন তখন থেকে ইন্দুদি ওদের বাড়িতে, বাবার হঠাৎ চলে যাওয়ায় মা দিশাহারা, অফিস সংসার সব একাহাতে আর পারছিলো না, সেজোমামীর বাপেরবাড়ির পাশ থেকে ইন্দুদি এলো সুশোভনের মায়ের সংসার সামলাতে|

বছর সতেরোর সদ্যবিধবা শ্বশুরবাড়ি থেকে বিতাড়িত নিরীহ চেহারার ইন্দুদিকে দেখে মা প্রথমটায় একদম ভরসা পায় নি, কিন্তু কদিন না যেতেই ইন্দুদি মায়ের মন জয় করে নিলো, হয়ে উঠলো পরিবারের একান্ত আপনজন, সুশোভনের ইন্দুদি| ওদের আত্মীয়দের চেয়েও পরমাত্মীয়! এরপর থেকে ইন্দুদি আর কখনও নিজের বাড়িও যায় নি| সুশোভনের মা হয়ে উঠলো ইন্দুদির মা, আর সুশোভন ইন্দুদির ভাইবাবু|

ইন্দুদিই সামলাচ্ছে সর্বস্ব বুক দিয়ে, মা হাসপাতালে, ইন্দুদিই মাকে ভর্তি করিয়ে সুশোভনকে ফোন করেছে, সুশোভন অফিস ট্যুরে সাতদিনের জন্য তখন মুম্বাইতে| ইন্দুদির ফোন পেয়ে সুশোভন সেদিনই ফিরে এসেছে, তারপর থেকে মাকে আই.সি.ইউ থেকে বেডে দেওয়ার পর রোজ সকালে অফিস ছুঁয়ে অফিস থেকেই সোজা হাসপাতালে, মা একটু ভালোর দিকে আসাতে এই দুদিন সুশোভন রাতে বাড়ি ফিরছে |

এরমধ্যে সুশোভন আর কিছু ভাবার অবকাশ পায় নি, তবে মনে খটকাটা ছিলো, হঠাত্ কিইবা এমন হোলো মায়ের এরকম ম্যাসিভ সেরিব্রাল! কখনও মায়ের কোনও শারীরিক সমস্যার কথা তো সুশোভন জানতে পারে নি! তবে?

এইকদিন প্রবল মানসিক চাপে সুশোভনের আর কিছু মাথায় ছিলো না| গতকাল সন্ধ্যায় হাসপাতালের লাউঞ্জে বসে অপেক্ষা করছিলো ডাক্তারের সাথে মায়ের রিলিজ সংক্রান্ত বিষয়ে কথা বলার জন্য, এমনসময় কমলিকার ফোন, কমলিকা …….. সুশোভনের মনের মাধুরী মিশিয়ে গড়া মানসী! সুশোভন সত্যিই যেন এতদিন ভুলেই ছিলো কমলিকার অস্তিত্বকে, মাকে নিয়ে ব্যস্ততার কারণে সুশোভন অনিচ্ছাকৃত দুর্ব্যবহার করে ফেললো নাকি তার মনমানসী কমলিকার সঙ্গে?

সুশোভন কথা শুরু করার আগেই ইস্পাতকঠিন গলায় কমলিকা কেটে কেটে বললো সুশোভন যেন হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে একবার কমলিকাদের বাড়ি হয়ে যায়| কমলিকা কট্ করে ফোনটা কেটে দিলো|

ডাক্তারের সাথে আলোচনা করে সুশোভন ঠিক করলো আরও কয়েকদিন মাকে হাসপাতালেই রাখবে মনিটরিং-এর জন্য| ইন্দুদিকে ফোন করে বলে দিলো ফিরতে দেরী হলে ইন্দুদি যেন খেয়ে নেয়| মা সেরে উঠছে দ্রুত এই খবরে সুশোভন অনেকটা হালকা বোধ করছে, এবারে তার মনে হোলো তার মানসী কমলিকার অভিমান ভাঙাতে হবে, মায়ের সাথে দেখা করে কমলিকাদের বাড়ির পথ ধরলো |

বসার ঘরে কমলিকার বাবা মা আর মামা| কমলিকার বাড়িতে কোনওদিনই সুশোভন তেমন সচ্ছন্দ নয়, একটু অপ্রস্তুত ভাবেই ধপ করে সোফায় বসে পড়লো, ওর চোখদুটো ইতস্তত কমলিকাকে খুঁজছে| দেখলো ধীর পায়ে কমলিকা ওপর থেকে নামছে, সুশোভনের মনে হোলো স্বর্গ থেকে কোনও অপ্সরা যেন নামছে ….. তার মানসী …..তার কমলিকা!

কমলিকা তার উল্টোদিকের সোফায় বসলো, সবাই কেমন যেন চুপচাপ, একটু যেন থমথমে! এইতো কদিন আগেই মুম্বাই যাবার আগে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করার তাগিদটা যেন কমলিকাদেরই বেশী ছিলো, কিন্তু এখন বোধহয় মায়ের অসুস্থতার জন্যই সবাই চিন্তান্বিত|

সুশোভনই বললো, “সপ্তাহখানেকের মধ্যেই হয়তো মাকে রিলিজ করবে!” ভাবলেশহীন মুখে কমলিকার বাবা বললো, “ও, আচ্ছা!” তারপরে কয়েক সেকেণ্ডের নীরবতা ভঙ্গ করে কমলিকার মামার গলা, “আমাদের কুমু হঠাৎ করে একটা স্কোপ পেয়ে বলছে স্টেটস থেকে পি.এইচ.ডিটা করেই আসবে| “সুশোভন ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না তার সেই মুহূর্তে ঠিক কি বলা উচিত!” দেঁতো হেসে বললো, “সে তো খুবই ভালো কথা! কিন্তু……”সুশোভনকে থামিয়ে কমলিকার মায়ের গলা, “কোনও কিন্তু নয়,আগে কুমু ডিগ্রীটা কমপ্লিট করুক, এতোবড় সুযোগ বারবার আসে না!” এইকথাতেই সুশোভন মোটামুটি আন্দাজ করে নিলো এর পরের কথা ঠিক কোনদিকে এগোতে পারে , হাজার হোক ম্যানেজমেন্টের ছাত্র তো, চাকরিও করে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীর ম্যানেজারিয়াল পোস্টে! সুশোভন বুঝলো এবারে ওঠা উচিৎ, কথা হয়ে গেছে|

কমলিকার বাবার জলদগম্ভীর গলা, “কুমুর টিকিট কালকেই, মায়ের এই অবস্থায় তোমার আর আসার দরকার নেই|” সুশোভন ঠিকই বুঝেছে| পুরো সময়টাতে কমলিকা নিশ্চুপ! সুশোভনের আর ইচ্ছে হোলো না তার মানসীর দিকে একবার চেয়ে দেখে| সুশোভন দরজা পেরিয়ে পোর্টিকোয় নেমে এসেছে, তার মানসী কমলিকার গলা, “তুমি তোমার মাকে নিয়ে খুব ব্যস্ত ছিলে তাই …..” কৈফিয়তের ঢঙে বলা শেষ কথাগুলো সুশোভনের কানে পৌঁছলো কিনা বোঝা গেলো না|

পুরো ঘটনাক্রম সুশোভন নিজের মনে মনে একবার সাজিয়ে নিলো| ইন্দুদির সাথে একবার কথা বলতে হবে|

ইন্দুদি যথেষ্ট বুদ্ধিমতী এবং যথার্থ সুশোভনদের হিতাকাঙ্খী| ইন্দুদি বললো রিটায়ারমেন্টের কাগজপত্র আনতে মা অফিস গিয়েছিলো আর ফেরার সময় কমলিকাদের বাড়ি, ওদের ওখান থেকে ফিরে চা খেয়ে বিশ্রাম নেবার সময়ই অসুস্থ হয়ে পড়লো| এতক্ষণে সুশোভনের হিসেবটা মিলছে মনে হোলো| আরও কিছুক্ষণ শুয়ে রইলো, তারপর অনেকদিন পর দুপুরে খুব তৃপ্তি করে ভাত খেয়ে একটু ঘুমোলো, ঘুম থেকে উঠে মনটা বেশ হালকা বোধ হোলো সুশোভনের|

বিকেলের ভিজিটিং আওয়ারে সুশোভন মায়ের হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বললো, “মা, আমি ভেবে দেখলাম তোমার সেই স্কুলের বন্ধুর মেয়েকেই বিয়ে করবো, কারণ বিধবা মায়ের মেয়ে তো, ঠিক বিধবা শাশুড়ি-ননদের সংসারে মানিয়ে নেবে, কি দরকার কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষজনকে নিজেদের সাথে জড়ানোর?” মায়ের চোখের কোণ থেকে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো|

আজ হাসপাতালে মায়ের কাছে আসার সময়ে ট্যাক্সিতে বসে সুশোভন তার মানসী কমলিকার একটা লম্বা হোয়াট্স্যাপ মেসেজ পেয়েছিলো, আর আজ এখন ফেরার সময়ে সুশোভন ওয়ালেট থেকে কমলিকার ঠোঁটচাপা হাসিমুখ ছবিটা নিয়ে চারটুকরো করে হাওয়ায় উড়িয়ে দিলো| তারপরেই ফোন খুলে কমলিকার নাম্বার আর আর নিজের ফোনের ডিপিটা ডিলিট করলো|

ট্যাক্সিটা বাড়ির সামনে থামলো, মানসীকে বিদায় দিয়ে মনে মনে বললো , “মানসী, তুমি মনেই থেকো, দৈনন্দিন অস্তিত্বে নয়!”

Facebook Comments

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: