মিলনের পথে – সুদীপ ঘোষাল এক

মিলনের পথে   -   সুদীপ ঘোষাল   এক
গোপালবাবু যাত্রা বিশেষজ্ঞ। তিনি যুবকদের যাত্রাশিল্প পুনরুজ্জীবিত করার কথা বলেন। অরিন্দম বলে, যাত্রা করে এখন পেট ভরবে। কেউ দেখবে না। গোপালবাবু বলেন, সময়ের সঙ্গে তাল রেখে চলতে পারলে এই শিল্প চলবে নিশ্চয়। অরিন্দম গোপালবাবুর কাছে যাত্রাশিল্প সম্বন্ধে জানতে পারে অনেককিছু। অরিন্দম যাত্রার পাঠ নেয় গোপালবাবুর কাছে। গোপালবাবু বলেন, অষ্টাদশ শতকে(১৭০০ সাল) যাত্রা বাংলা ভূখণ্ডের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় শিশুরাম, পরমানন্দ অধিকারী, সুবল দাস ছিলেন যাত্রার জগতে প্রসিদ্ধ। 
উনবিংশ শতকে পৌরাণিক কাহিনিভিত্তিক যাত্রা খুব জনপ্রিয়তা পায়। মতিলাল রায় ও নীলকণ্ঠ মুখোপাধ্যায়ের যাত্রাদল প্রসিদ্ধি পায়। সে সময় কৃষ্ণলীলা এবং রামায়ণ-মহাভারতের পৌরাণিক কাহিনির পাশাপাশি বিদ্যাসুন্দর, লাইলি মজনু, ইউসুফ জোলেখা, বেহুলা লখিন্দর, মা মনসা, লক্ষ্মীর মহিমা, কমলাবতী রানী, ইত্যাদি প্রেমকাহিনি ও লোকজ কাহিনির অভিনয়ও প্রচলিত ছিল।
অরিন্দম বলে, আমি পড়েছি  বিংশ শতকের শেষে এবং বিশশতকের শুরুর দিকে যাত্রায় দেশপ্রেমমূলক কাহিনির অভিনয় শুরু হয়। এক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ মুকুন্দ দাশ। তার প্রকৃত নাম ছিল যজ্ঞেশ্বর। তিনি বিক্রমপুর থেকে বরিশাল গিয়ে দেশপ্রেমিক বিপ্লবী অশ্বিনী কুমারের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। মুকুন্দ দাশ যাত্রার মাধ্যমে দেশপ্রেম ও ব্রিটিশবিরোধী বক্তব্য প্রচার করেন। তিনি সমাজ সংস্কার মূলক বক্তব্য, পণপ্রথা, জাতিভেদে ইত্যাদির বিপক্ষেও বক্তব্য প্রচার কররেন।

তিনি ‘স্বদেশী যাত্রা’র সূচনা করেন। সে কারণে তাকে কারাবন্দিও থাকতে হয়। মুকুন্দ দাশের প্রেরণায় আরও অনেক স্বদেশী যাত্রার দল গড়ে ওঠে। তারা গ্রামে গ্রামে যাত্রার প্রদর্শন করে দেশপ্রেমমূলক কাহিনি প্রচার করতে থাকে। সে সময় ঈশা খাঁ, প্রতাপচন্দ্র, বারো ভুঁইয়া, সোনাভান, নবাব সিরাজউদ্দৌলা, ক্ষুদিরাম ও অন্যান্য বিপ্লবীর নামেও কাহিনি অভিনয় হতে থাকে।

স্বদেশী যাত্রা একসময় ইংরেজ শাসকদের রোষানলে পড়ে।মুকুন্দ দাসের আগে ঢাকায় কৃষ্ণকমল গোস্বামী নামে একজন পালাকার ‘স্বপ্নবিলাস’, ‘দিব্যোন্মাদ’, ‘বিচিত্রবিলাস’ পালা লিখে আলোড়ন তুলেছিলেন। ১৮৬০-১৮৭৮ এর মধ্যে তার পালা গ্রন্থাকারে প্রকাশ পায় এবং ঢাকাতেই প্রথম মঞ্চায়ন হয়। মনোমহন বসু নামেও আরেকজন পালাকার বেশ বিখ্যাত ছিলেন। নওগাঁজেলার ধামুরহাট থানার শ্রামপুর গ্রামে নফরউদ্দিন নামে আরেকজন পালাকার প্রথমে রাজনীতিকেন্দ্রিক পালা লিখে বেশ খ্যাতি পান। পরে তিনি মধুমালা, সাগরভাসা, কাঞ্চনবতী, বিন্দুমতি, পুষ্পমালা ইত্যাদি রূপকাথাভিত্তিক পালা লেখেন। বিখ্যাত সাহিত্যিক মীরমোশাররফ হোসেনও পালা লিখেছেন। তিনি বেহুলা নিয়ে যাত্রাপালা লেখেন।

 

গোপালবাবু বলেন, ঠিক সে সময় গ্রামে গঞ্জে বিষাদসিন্ধুর কাহিনি নিয়েও যাত্রা অভিনয় হতো। কারবালার কাহিনি নিয়ে যাত্রা পালা লেখা হতো।মানিকগঞ্জের ধানেশ্বরের আব্দুল করিম, নরসিংদির জালাল উদ্দিন, হিরেন্দ্র কৃষ্ণদাস, মুন্সিগঞ্জের আরশাদ আলী , ঢাকার কেরাণীগঞ্জের রফিকুল,পটুয়াখালির দুধল গ্রামের মাস্টার সেকেন্দার আলি, খুলনার ডুমুরিয়ার এম এ মজিদ (অগ্রদূত), ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইলের কফিল উদ্দিন ও মানিকগঞ্জ সদরের ডা. আবেদ আলীসহ অনেকেই সেসময় যাত্রা পালা লিখতেন।বিশ শতকে রূপবান-রহিম বাদশাহ, মালকা বানু, সয়ফুল মুলুক বদিউজ্জামাল, গুনাইবিবি, দুর্গামনি, কমলা রানীর বনবাস, কাজল রেখা, মলুয়া, ভেলুয়া সুন্দরী, সোনাভান, বীরাঙ্গনা সখিনা, গাজী কালু চম্পাবতী, বনবিবি ইত্যাদি পালা বেশ জনপ্রিয়তা পায়।১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর অনেক পালাকার ও যাত্রাদল পূর্ববঙ্গ ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে যায়। পাকিস্তানি শাসকরা এদেশের লোকজ সংস্কৃতিকে কখনও সুনজরে দেখেনি।

যাত্রাপালা ধর্মবিরোধী কাজ এমন ফতোয়াও জারি হয়েছে কখনও কখনও। অনেক গ্রামে ধর্মান্ধ গোষ্ঠি একত্রিত হয়ে অভিনয় বন্ধ করে দিয়েছে।১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন হলে অনেক যাত্রাদল নতুনভাবে গড়ে ওঠে। মাইকেল মধুসূদন, দেবদাস, রক্তাক্ত বাংলা, স্বাধীন বাংলা, বিজয় এনেছি, মা মাটি মানুষ, সোনার বাংলা, সোজন বাদিয়ার ঘাট, লালন ফকির, ইত্যাদি পালা বেশ জনপ্রিয়তা পায়। অমলেন্দু বিশাস, জ্যোস্না বিশ্বাসসহ অনেক যাত্রাশিল্পী ছিলেন নামকরা। সত্তর দশকের শেষভাগ এবং বিশেষ করে আশির দশকে যাত্রাশিল্পে অবক্ষয় শুরু হয়। তখন যাত্রার নামে অশ্লীল নৃত্য পরিবেশিত হতে থাকে। আবহমান কাল ধরে চলে আসা এই শিল্প ধ্বংসের মুখোমুখি হয় যাত্রার আসরে জুয়া ও অশালীন নাচের কারণে। যাত্রার আসরে সখী নৃত্য একসময় প্রচলিত ছিল যা কিছুটা অসংস্কৃত হলেও তাকে ঠিক অশালীন বলা যেত না। কিন্তু পরবর্তীতে গ্রামগঞ্জে পর্নগ্রাফির প্রভাবে প্রিন্সেসের নাচের নামে যাত্রার আসরে অশালীনতা ছড়িয়ে পড়ে। পরে যাত্রার প্রিন্সেস, সখীনৃত্য ইত্যাদির নামে চলে অশালীন নৃত্য।

 

অরিন্দম বলে, আমি আপনার লেখা” যাত্রা “বইয়ে পড়েছি  যাত্রাকে অশালীনতা থেকে মুক্ত করতে এবং যাত্রা শিল্পকে বাঁচাতে নতুন শতকে তৈরি হয় যাত্রা নীতিমালা। ২০১২ সালে যাত্রা নীতিমালা গেজেটভুক্ত হয়। ২০১৩ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৮৮টি যাত্রাদলকে নিবন্ধন করেছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। এখনকার নামকরা যাত্রাদলগুলো হলো যশোরের আনন্দ অপেরা, চ্যালেঞ্জার অপেরা, অগ্রগামী নাট্টসংস্থা, মাগুরার চৈতালি অপেরা, নারায়ণগঞ্জের ভোলানাথ যাত্রা সম্প্রদায়, কোহিনূর অপেরা, গাজীপুরের দিশারী অপেরা,  ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস যাত্রা ইউনিট, খুলনার স্বদেশ অপেরা, রাজমহল অপেরা, রঙমহল অপেরা, ফরিদপুরের মধুচ্ছন্দা যাত্রা ইউনিট, নাটোরের পদ্মযাত্রা ইউনিট, বাগেরহাটের সুন্দরবন অপেরা, লক্ষ্মীপুরের কেয়া যাত্রা ইউনিট ইত্যাদি।

 গোপালবাবু বলেন, বাঙালির বিনোদনের একটি প্রধান অনুসঙ্গ ছির যাত্রা পালা।‌ এর মধ্য দিয়ে শুধু বিনোদন নয় পুরাণ, ইতিহাস, লোকজ সাহিত্য সম্পর্কে শিক্ষাগ্রহণ চলতো।এখন সিনেমা, টেলিভিশনের কল্যাণে বিনোদনের রূপ পালটেছে। কিন্তু যাত্রার আবেদন গ্রামের মানুষের কাছে এখনও রয়েছে। রাতের পর রাত জেগে যাত্রার কাহিনি, অভিনয়, গানের মাধ্যমে লোকজ নীতিবোধ, শুভ-অশুভের দ্বন্দ্ব সম্পর্কে শিক্ষা নেয় দর্শকরা। যাত্রা আমাদের লোকজ সংস্কৃতির মূল্যবান সম্পদ। যাত্রা শিল্পকে বাঁচাতে প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের অধিকতর পৃষ্ঠপোষকতা।ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় একটি গ্রামের নাম রূপাডিহি।

সবুজ সবুজ গাছের মন কেড়ে নেওয়া শীতলতা  মনমাতানো বিশুদ্ধ বাতাস আর শীতল জলের সংস্পর্শে এই রূপাডিহিতে প্রত্যেক লােকই যেন প্রকৃতির রূপ সৌন্দর্য ভুলে থাকতে। এই গ্রামে ছোট্ট একটি পাড়ায় অরিন্দমের বাস। অরিন্দম,  অরিন্দম রায়। মদনমােহন রায়ের মেজ পুত্র অরিন্দম। আর দুই ছেলে বড়টির নাম সােহন, ছােট পুত্রের নাম শোভন। দুই কন্যা অনীতা আর দেবিকা। মদনমােহনের স্ত্রী সবিতাদেবী। সাতপাক ঘােরার পর থেকে বিলাসিতার মধ্যে কাটাতে পারেন নি সত্য, কিন্তু স্বামী, পুত্র ও কন্যাদের নিয়ে তিনি শান্তিতেই থাকেন। মধ্যবিত্ত পরিবার বলা চলে। বড় পুত্র সােহন একটি বেসরকারী কারখানায় কর্মী আর মদনমােহন ছােট্ট একটি মুদির দোকানের মালিক। এই সামান্য আয়ের উপর নির্ভর করে সাত সদস্য বিশিষ্ট সংসারটি ‘সংসার সমুদ্রে কোনও রকমে হাল ঠিক রেখে চলছিল। আজ ২০ শে ফাল্গুন।

মদনমোহনের বড় ছেলে সােহনের বিবাহ। রূপাডিহির পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দা শুভঙ্কর গাঙ্গুলির বড় কন্যা মনীস্কার সঙ্গে প্রেম ভালােবাসা ছিল সােহনের। তাছাড়া মদনমােহন ও শুভঙ্কর দুইজনে বরাবর একই সঙ্গে মেলামেশা করায় তাদের মধ্যে বন্ধুত্বটা প্রগাঢ় হয়ে ওঠে। তারই পরিণতি এই বিবাহে, এই বন্ধনে। কিন্তু আশ্চর্য এই যে গােপন পরামর্শ সােহন এবং মনীষা কিন্তু ঘুণাক্ষরে জানতাে না। যখন মনীষা এগারাে বৎসরের তখন শুভঙ্করবাবু একবার কন্যাকে নিয়ে সােহনদের বাড়িতে আসেন মদনমােহনের সঙ্গে দেখা করার জন্যে। ষােল বৎসরের সােহন তখন। পড়াশােনায় ব্যস্ত। হঠাৎ সুন্দরী কিশােরী মনীষার দিকে নজর যাওয়াতে সেই চোখ আর ফিরতে পারেনি। ক্রমে সেই ভালােলাগা ভালােবাসায় পরিণত হয়।

তারপর কত রাগ অনুরাগ, কথার পথ পেরিয়ে আজ সেই শুভদিন। উলুধ্বনি, শঙ্খধ্বনির মাঝে সকল চিৎকার চেঁচামেচির মধ্যে থেকেও সােহনের মা, বাবা কিন্তু ঈশ্বরের প্রার্থনায় মগ্ন! তারা চিন্তা করছিলেন কি বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে তারা আজ কিছুটা সুখের মুখ দেখতে পাচ্ছেন। চিন্তা করছেন এইবার বৌমার হাতে সংসারের ভার অর্পণ করে সুখী হবেন মদনমােহন বলছিলেন সবিতাদেবীকে মনে পড়ে তােমার, একবার সােহন পুকুরে ডুবে গিয়েও বেঁচে গিয়েছিল। সবিতা দেবী বাধা দিয়ে বলে ওঠেন, ওঃ তুমি সেই দুঃখের রাত্রির কথা আর বােলােনা, ওকথা শুনলে আমার কেমন ভয় করে।

 আজ শুভদিনে শুধু ঈশ্বরের কাছে সােহন আর বৌমার শুভ প্রার্থনা করি। ইত্যবসরে অরিন্দম। আজ কি আনন্দ আকাশে বাতাসে গানটি আবৃত্তি করতে করতে এসে বলল মা শুধু দাদা আর বৌমা ভালাে থাকবে আর আমরা -সবিতা দেবী। কথার মাকেই বলে উঠলেন, ওরে গাছের গোড়ায় জল দিলে কি আর কেউ গাছের ডগায় জল দেয়। তারা তাে একই বৃক্ষের শাখা প্রশাখা। অরিন্দম মায়ের কথায় প্রাত হয়ে কাজের কথায় ফিরে এসে বাবাকে বললাে, বাবা আমাদের কাজ মােটামুটি শেষ এখন তােমরা দুজনে কিছু খেয়ে নিলেই ব্যাস ফিনিস।

শােভন আজ রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে কার কত বয়স হলাে তারই হিসাব করছিলাে। চিন্তা করে দেখল তার বাবা ষাটে পা দিয়েছেন। মা একান্ন। আর বড়দি অনীতা বত্রিশ, তার বিয়ে হয়েছে আজ বছর দশেক হলাে। বড়দা ত্রিশ, বৌদি বাইশ, অরিন্দমদা চব্বিশ আর ছােটবােন দেবীকা সতের। শােভনের নিজের বয়স কুড়ি বৎসর দুই মাস। ভাবছে বয়স তাে ভালােই হলাে, কিন্তু একমাত্র সােহন ছাড়া আর কেউই কিছু
চলবে ……………….
ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: