মীনাক্ষি এক মা ইলিশ // পীযূষ কান্তি বড়ুয়া

13

বহুদিন ধরে চেষ্টা করে আসছে মীনাক্ষি। বিয়ে হয়েছে আজ তার বছর আটেক হলো।সদ্য কৈশোর পেরিয়ে যৌবন তার মাত্র দেহলতাকে জড়াতে শুরু করেছিলো। এরই মধ্যে বিয়ে। অষ্টম শ্রেণিতে উঠেছিল। তার ইচ্ছে ছিলো আরও পড়ার।কিন্তু দরিদ্র ধীবর-দুহিতার সব ইচ্ছেতো আর সত্যি হওয়ার নয়। তার ইচ্ছেও তাই মারা গেছে অঙ্কুরে। বিয়ে হয়ে গেছে পাশের গ্রামের মৃদুলের সাথে। মৃদুলও তার মতো ধীবর-সন্তান।মৃদুলের বিদ্যের দৌড়ও নন-মেট্রিক। নদী তার পরম আপন। নদীই জীবন ও জীবিকার আশ্রয়।

প্রতিদিন রাতে তারা দুই শ্বশুর-জামাই মিলে যায় মেঘনার বুকে ইলিশ আহরণে। নিজেদের জালও নেই নৌকাও নেই। শামসু মিয়ার নৌকা আর জাল নিয়ে তারা যায় মাছ ধরতে। মীনাক্ষীর বিয়ে দিতে গিয়ে বহুটাকা দেনা হয়েছিল তার বাবা আদিনাথের। আদিনাথও স্ট্যাম্পে সই দিয়ে বলেছিলো মাছ ধরে সেই টাকা শোধ দিবে। সেই থেকে চতুর শামসু মিয়া প্রতিবছর আদিনাথকে দাদন দিয়ে আসছে। আর আদিনাথও মৌসুমে বা বিনা মৌসুমে নিজের জীবনের শঙ্কা নিয়ে প্রতিরাতে নিজেকে সঁপে দেয় মা মেঘনার করুণার বুকে।

মীনাক্ষীর বর মৃদুলেরও অবস্থা একই। তার মায়ের হার্টের অপারেশন করতে ম্যালা টাকা লোন হয়েছে মৃদুলের। সেও শামসু মিয়ার দাদনের ফাঁদের বাধ্যগত শিকার। নদীতে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ থাকলেও তাদের যেতে হয় দায়ে পড়ে। না হলে বাড়ি-ভিটা চলে যাবে শামসু মিয়ার কব্জায়।যদিও নেওয়ার মতো কিছুই নাই,কেবল মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু ছাড়া। বেশ কয়েকবার নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়েছে তারা। একরকে একর তাদের পূর্বপুরুষের সম্পত্তি গিলে খেয়েছে মেঘনা।

এই মেঘনা নাকি আরও ষাট মাইল দক্ষিণে ছিলো। ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে মেঘনা হয়ে গেছে রাক্ষুসী। তবে এখন আর ভাঙ্গে না।নদীর তীরজুড়ে আঠার কিলোমিটারেরও অধিক পাড় বাঁধ দেওয়া হয়েছে। মৃদুল ও আদিনাথ তাই একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে শত দারিদ্র্যেও।

আট বছর ধরেই মীনাক্ষী একটা ডাক শোনার জন্যে উদগ্রীব। তার বছর পাঁচেক পরে বিয়ে হয়েও তার ননদের কোলে কী সুন্দর ফুটফুটে বাচ্চা এসেছে। মীনাক্ষীর শাশুড়ি তাকেপ্রতিদিন আড়েঠারে বলে। পুরুষ মানুষের মন।কখন বিগড়ে যায় বলা যায় না। সংসারে পুরুষকে বেঁধে রাখতে হয় মমতা দিয়ে। সন্তানের মুখ বাবাকে বাঁধে মায়ায়। এরকম অনেক ভাবেই মীনাক্ষীর শাশুড়ি হরিদাসী তাকে বুঝিয়েছে। কিন্তু মীনাক্ষীর তো কিছু করার নাই।

কতো ডাক্তার দেখালো স্বামী-স্ত্রী দুজনেই। কারো কোন দোষ নেই। দোষ কেবল কপালের। এই আট বছরে একবারও গর্ভ আটকায়নি মীনাক্ষীর। অনেক মানতও করেছে। পীর-ফকির,সাধু-গোঁসাই কত কী! তবুও কিছুতেই কিছু না।প্রতিমাসে সেই একইভাবে মাসিক হয় আর মীনাক্ষীর আশা ভাঙ্গে। প্রতিমাসে সে আশায় বুক বাঁধে এবার বুঝি কিছু একটা হলো। কিন্তু সময় আসলেই দেখা যায় কিছুই না। মাঝে মাঝে তাই নিজের উপর খুবই খারাপ লাগে। কবে যে মা ডাক সে শুনতে পাবে!

দেখতে দেখতে অক্টোবরের দিন এসে পড়ে।এসময়টায় ইলিশের মায়েরা মেঘনায় আসে ডিম ছাড়ার জন্যে। ইলিশ সারা বছর ডিম ছাড়লেও অক্টোবরের বড় পূর্ণিমায় প্রজননের হার অধিক।রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞার ফরমান আসে। অক্টোবরের বাইশদিন কোন রকম জাল নদীতে ফেলা যাবে না। ইলিশ মাছ এই কয়দিন ধরা,বিক্রি করা,বহণ ও মজুদ করা মানা। ধরা পড়লেই জেল-জরিমানা। কিন্তু বললেই কী! এককানে শোনে আর অন্য কানে বের করে দেয় আদিনাথ ও তার সহগোত্রীয়রা। রাতের গভীরে তারা প্যাঁচ কষে নদীতে নামার। আজ পয়লা দিন। তাই নজরদারি একটু কড়া অইব। তয় ভাইবো না মিয়ারা। আমি নৌপুলিশের হাবিলদাররে মিল কিরা রাখছি। তোমরা একটু চোখ-কান খোলা রাইখ্যা নদীতে নাইম্যো। কোন অসুবিধা নাই।- একটানা কথাগুলো বলে যায় শামসু মিয়া।

হঠাৎ শোরগোল শোনা যায় মৃদুলের বাড়ি হতে। কী অইলো কী অইলো? জানতে চায় আদিনাথ ও মৃদুল। হরিদাসী চিৎকার করে উঠে- মিদুল,অ মিদুল, কই গেলি?  তোর বউয়ের অবস্থা ভালা না।খালি বমি করে। একটা ডাক্তর লইয়া আয় তাড়াতাড়ি। আদিনাথ ও মৃদুল দৌড়ে আসে মৃদুলের বাড়িতে। মেয়েকে বমি করতে দেখে আদিনাথ চিন্তিত হয়ে পড়ে।মৃদুলের ঘসম ছোটে।আজ রাতে নদীতে নামবে কীভাবে? এমন সময় খবর পেয়ে মীনাক্ষীর মা মিনতি এসে পড়ে। মেয়ের ভাবভঙ্গি দেখেই সে বলে উঠে, মীনাক্ষীর বাপ,মিষ্টি খাওয়াও বেয়াইনরে। তেমার মাইয়ার আশা পুরাইতেছে। একথা শুনে খুশিও হয়ে উঠে আদিনাথ। মৃদুল তাড়াতাড়ি ডাক্তার আনতে যায়। মীনাক্ষীর শাশুড়ি তেঁতুলের আচার খেতে দেয় বৌমাকে। ডাক্তার ঘরে ঢোকে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলে যায়,বিশ্রামে থাকুন। ফ্ল্যাট স্যান্ডেল পায়ে দিবেন। বাম কাত হয়ে শোবেন। ভারী ওজন তুলবেন না। হাল্কা হাঁটাহাঁটি করবেন।

সবাই যে যার ঘরে চলে যায়। মুখে ও মনে তৃপ্তিভরা। মীনাক্ষী উঠে বসে। ডাক্তারের দেওয়া ঔষধে বমি কমে গেছে। হঠাৎ করে মীনাক্ষী মৃদুলের হাত ধরে। তারপর তার মাথায় ছুঁইয়ে দিয়ে বলে, কথা দাও তুমি আর মা মাছ মারবা না। মৃদুল বৌয়ের এই কথায় নরম হয়ে আসে। কথা দিতে সে বাধ্য হয়। তার সামনে ভেসে উঠে হাজার হাজার মা মাছ ঝাঁকে ঝাঁকে নির্ভয়ে চলছে। মৃদুলের চোখে ঘোর লাগে। একসময় প্রতিটি মা ইলিশের মুখের মধ্যে সে দেখে মীনাক্ষীর মুখ। জাটকারা যেন তার অবোধ সন্তান!

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: