মুক্তির সন্ধানে – নয়ন মালিক

শেষ পর্যন্ত চরম সিদ্ধান্তটা নেয়েই নেই রবিন। কিছুদিন ধরেই ভাবছিল এ ছাড়া আর কোনো পথ নেই। দিনের পর দিন, শুধু হসপিটাল আর ঘর। ক্লান্ত সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছে। পাঁচ পাঁচটা বছর! আর সত্যিই পেরে উঠছে না।

     রবিন চরণ সিদ্ধান্তটা নিলেও মনে মনে চিন্তা করলে শিঁউরে ওঠে তার সারা অঙ্গ। কিন্তু কিই বা করার আছে,এই ভাবে বেঁচে থাকাটা তো মৃত্যুরই নামান্তর। শুধু রাত পোহাবার অপেক্ষা, প্রতিদিনের মত আবারও ডাক্তার আর ঔষধ। গুচ্ছেন খানিক টাকার শ্রাদ্ধ। ইতিমধ্যে প্রভিডেন্ট ফান্ডে টাকাতেও পড়েছে থাবা।

     ডাক্তারবাবু পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, যে কটা দিন বাঁচবে এইভাবে চালিয়ে যেতে হবে চিকিৎসা।

     রবিন বুঝতে পারে কিছু দিন এভাবে চললে অর্থ জোগান দেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

     ঠিক ভোর চারটে ঘুম ভেঙে গেল রবিনের। এটাই উপযুক্ত সময়। শীতের এই হাড় কাঁপানো রাতে সবাই লেপের তলায় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। বাইরে জনাপ্রাণী থাকার সম্ভাবনা নেই। রবিন পাশ ফিরে স্ত্রীর দিকে চোখ ফেরালো। মনীষা লেপের তলায় শান্ত নয়নে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। রাত্রি একেবারে নিস্তব্ধ নিঝুম। শুধুমাত্র দেওয়াল ঘড়ির অবিরাম টিক টিক শব্দ আর মনীষার  শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কিছুই নেই।

     রবিন বিছানা ছেড়ে উঠে জানালার কাছে এগিয়ে গেল। জানালাটা খুলতে একঝলক শীতের ঠাণ্ডা বাতাস রাঙিয়ে দিল  তার সারা শরীর। জানালা দিয়ে বাইরেটা বোঝার কোন উপায় নেই।

     রবিন জানালাটা বন্ধ করে নিঃশব্দ বিড়াল শাবকের মত চুপিসারে বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে।

     রবিন আস্তে আস্তে দরজাটা ঠেলে উঁকি মারলো মায়ের ঘরে। আজ পাঁচ বছর মা প্যারালাইসট হয়ে পড়ে আছে বিছানায়। হাত দুটো আর চোখ ছাড়া বাকি সব অঙ্গই অবশ। কথা বলার সামর্থ্য পর্যন্ত হারিয়েছে মা। তব মনীষা অক্লান্ত পরিশ্রমে সেবা করে মায়ের। আজ পর্যন্ত কোন ত্রুটি পড়েনি তার চোখে। বিরক্তিও নেই মুখে।

     রবিন দরজা ঠেলে এগিয়ে গেল মায়ের কাছে ।মায়ের মুখের দিকে তাকাতে পারছে না। অসহ্য বেদনায় তার বুকের পাশটা কেঁদে ওঠে জোরে। মনটা শক্ত করে রবিন। আস্তে আস্তে মায়ের গায়ের লেপটা সরিয়ে কোলে তুলে নিল মাকে। মায়ের চোখ দুটো এখনো মুদ্রিত। শান্ত প্রশস্তি নয়নে পড়ে আছে ছেলের কোলে।

     রবিন আর দেরি করে না। দ্রুত সিড়ি বেয়ে উঠে এল ছাদে। ছাদে আসতেই এক  রাশ শীতলতা গ্রাস করল দুজনকে। চারদিক শুনসান, ধারে কাছে কোন প্রাণের স্পন্দনের চিহ্ন নেই। কুয়াশার চাদরটা বেশ জমাট বাঁধা অন্ধকার,ছেয়ে রেখেছে চারিদিকে। 

     মা বোধহয় জেগে গেছে, মায়ের শীতল হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরল রবিনের হাতের মুঠো।

     রবিনের হৃদপিণ্ড তোলপাড় শুরু করে। কেমন যেন টেনশন হচ্ছে তার সারা শরীর জুড়ে। পা টলছে। টলোমলো পায়ে এগিয়ে গেল ছাদের ধার ঘেষে। মায়ের ভারটা এখন  বড় হালকা লাগছে তার। রবিন দুচোখ বুজে মনে মনে বিড়বিড় করে—মুক্তি চাই— মুক্তি– মুক্তি! 

     তার কাঙ্ক্ষিত মুক্তি আর মাত্র কয়েক প্রস্থ ফারাক।এবার কি ফেলে দেবে মাকে প্রকৃতির কোলে! রবিন মনটাকে শক্ত করে, না আর বিলম্ব করা ঠিক নয় ,এটাই উত্তম সময়।

     রবির মায়ের দিকে তাকালো। মা ফ্যাল  ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তার চোখে যেন কত জিজ্ঞাসা। মা কি বুঝতে পেরেছি ? তার একমাত্র ছেলে তাকে মরণ-ঝাঁপের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

     মায়ের এই করুন জিজ্ঞাসাভরা দৃষ্টি রবিনের বুকের ভিতরটা পুড়িয়ে ছারখার করে দিল। এক অপরিসীম  ঘৃণায় তার চোখ দুটো বুজে আসে। বুকের ভিতর হৃদপিণ্ডটা বড় বেশি দাপাদাপি শুরু করে দেয়।

     এ কি করতে চলেছে রবিন ! যে তাকে এই পৃথিবীর আলো দেখালো, স্নেহ আদরে মানুষ করে তুললো ,আজ তাকে খুন করতে চলেছে ! ছিঃ.. ছিঃ.. নিজের প্রতি একরাশ ঘৃণায় কেঁপে ওঠে তার সারা অঙ্গ।

     ছাদের একপাশে নিরবে পড়ে থাকা চেয়ারে কোনরকমে বসিয়ে মায়ের পা দুটো জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠে রবিন।

——আমায় ক্ষমা করো মা,আমি তোমার অযোগ্য সন্তান, ছাদ থেকে তোমাকে ফেলে আমি মুক্তি পেতে চেয়েছিলাম।

     মায়ের চোখে তখন দুটো জলের ধারা নিঃশব্দে ঝরে পড়লো সন্তানের কপালে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top