মূর্খ পণ্ডিত // সুবীর কুমার রায়

250

চাকরির শুরু থেকে সেভিংস্, কারেন্ট, ড্রাফ্ট্, পে অর্ডার, এম.টি., এফ.ডি., ইত্যাদি নিয়ে এগারোটা বছর বেশ ছিলাম। কিন্তু ওই যে, ‘চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়’, কবি বাক্য তো আর মিথ্যা হতে পারে না। দুনিয়ায় এতো লোক থাকতে শনির দৃষ্টি আমার ওপরেই পড়লো।

 

প্রমোশন নিয়ে গ্রামে যেতেই হলো। তা আবার যে সে পোস্ট নয়, একবারে রুরাল ডেভেলপমেন্ট অফিসার, অনেকে আবার বলেন ফিল্ড অফিসার, স্থানীয় মানুষদের কথায় ফিলটার বাবু। আমার মতো একজন বিশেষজ্ঞ মানুষের অভাবে, একটা গোটা ব্লকের দু’-দু’টো অঞ্চলের প্রায় আশিটা গ্রাম, ও অপর একটা অঞ্চলের একটা গ্রামের অসংখ্য মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা নাকি প্রায় স্তব্ধ হয়ে মুখ থুবড়ে দাঁড়িয়ে গেছে।

 

আমার মতোই ওই জেলার বিভিন্ন শাখায়, প্রায় পঁচাত্তর জন করণিক প্রমোশন নিয়ে বিভিন্ন গ্রামের উন্নতি সাধন করতে গেছে।

প্রথম দিন অফিসে ঢোকার আগেই ভিতর থেকে তাঁত চলার মতো কিসের একটা আওয়াজ পেলাম। আগেই শুনেছিলাম, যে অফিসের ওই ছোট্ট বাড়িটা নাকি, আগে একটা বইয়ের দোকান ছিল। ভিতরে ঢুকে দেখি বাড়িটা ছোট হলেও, তার ভিতরে আগ্রা বা রাজস্থানের ঐতিহাসিক স্থাপত্যের মোটা মোটা থামের মতো, খান তিনেক থাম।

 

গ্রামের লোক যাতে অতি সহজেই তাদের প্রয়োজনীয় ফিলটার বাবুটির সাথে সাক্ষাৎ করতে পারে, তাই আমার বসার জায়গাটা একবারে দরজার কাছে। গোটা এলাকায় বিদ্যুৎ না আসায়, গোটা বাড়িটায় মাদুরের চারপাশে কঞ্চির ফ্রেম দিয়ে বাঁধানো পাখা, দড়ি দিয়ে পালা করে দু’জন ছেলে টেনে যাচ্ছে। প্রতিটা মাদুরের পাখায় এমনভাবে দড়ি বাঁধা,

 

যে ছেলেটি তার হাতের দড়ি ধরে টানলে, সবকটা পাখা একসাথে দুলে দুলে কর্মচারীদের হাওয়া খাওয়ার ব্যবস্থা করবে। বাইরে থেকে এটার আওয়াজকেই তাঁত চলার আওয়াজ ভেবেছিলাম। একবারে রাজারাজরা জমিদারদের মতো সুব্যবস্থা। কিন্তু এইজাতীয় কাজে ধারণাহীন আমার সমস্যাটা দেখা দিলো অন্যভাবে।

যে অঞ্চলে যে কর্মীটি তার কপাল গুণে বা দোষে পোস্টিং পেলো, তার কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা বা প্রশিক্ষণ ছাড়াই ধরে নেওয়া হলো, যে সে ওই অঞ্চলের প্রচলিত ব্যবসা বা চাষাবাদ সম্বন্ধে একজন যথার্থ বিশারদ। যেমন যে কর্মীটি ফুল চাষের জন্য বিখ্যাত কোন অঞ্চলে পোস্টিং পেলো, ধরে নেওয়াই হলো, যে তার মতো ফুল চাষে পাণ্ডিত্য, দুনিয়ায় আর দ্বিতীয় কারও নেই, থাকতেই পারে না।

আমি কপালগুণে যেখানে পোস্টিং পাই, সেটা একটা নদী ও মোহানা এলাকায় অবস্থিত। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সেখানকার অত্যন্ত গরিব মানুষগুলো নদী বা সমুদ্রে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতো, এবং এরজন্য তাদের নাইলন জাল ও নৌকার প্রয়োজন হতো। এছাড়া পান চাষ, শুয়োর পালন, বিভিন্ন রকম সামগ্রীর দোকান করা, ইত্যাদি ছিল গরীব মানুষগুলোর একমাত্র রুজি রোজগারের উপায়।

আমি কিছু শুয়োর দেখে থাকলেও, কোনদিন শুয়োরের মাংস খাইনি। পান সিগারেটের দোকান থেকে কিছু পান কিনে খেলেও, পান চাষের পদ্ধতি বা কি কি করণীয়, সে বিষয় কোন ধ্যানধারণা আমার ছিল না। ছিপ দিয়ে কিছু পুঁটি, বাটা, বা তেলাপিয়া মাছ ধরে থাকলেও, এবং বেশ কয়েকবার নৌকা চেপে থাকলেও, নৌকা চেপে জাল নিয়ে মাছ ধরতেও যাইনি।

 

অভিজ্ঞতাহীন এহেন আমাকে কোনরকম প্রশিক্ষণ ছাড়াই, বিস্তীর্ণ এলাকার অতগুলো গ্রামের দারিদ্রসীমার নীচের গরিব মানুষগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থার প্রভুত উন্নতি সাধনে, যোগ্যতম ব্যক্তি হিসাবে চুন চুনকে চয়ন করা হলো।

কথামতো তফসিলি জাতি, উপজাতি, বা সংখ্যা লঘু অঞ্চলে, বছরে নয়শত আই.আর.ডি.পি সরকারি ঋণ দিতে হবে। আমার দু’টো অঞ্চল, ও অপর অঞ্চলের গ্রামটি এই শ্রেণীভুক্ত হওয়ায়, নিয়ম অনুযায়ী আমাকে ওই নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক বৎসরে নয়শত নতুন ঋণ দিতে হবে।

 

গত বছরের প্রচুর লোন প্রপোজ্যাল এখনও বিতরণের অপেক্ষায় পড়ে আছে, তার ওপর এ বছরের বান্ডিল বান্ডিল লোন প্রপোজ্যাল অনুমোদনের অপেক্ষায় পড়ে আছে। কাজে যোগ দেওয়ার সাথে সাথেই, এই গন্ধমাদন পর্বতের বোঝা আমার কাঁধে এসে পড়ায়, ভয় পেয়ে গেলাম। কি করতে হয়, তাও আমার জানা নেই, দেখিয়ে বা বুঝিয়ে দেওয়ার লোকও নেই।

দিনকতক পরেই গ্রাম সেবকের সাথে জমে থাকা নতুন কিছু লোন প্রপোজ্যাল ইনসপেকশন করতে একজনের বাড়ি গিয়ে হাজির হলাম। সেখানে ওই অঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামের বেশ কিছু লোন আবেদনকারী এসে হাজির হয়েছে। আমাকে দেখেই তারা দাঁড়িয়ে উঠে হাতজোড় করে “নতুন ফিলটার বাবু আয়েটে” বলে অভ্যর্থনা করলো। একসাথে এতোগুলো গরিব গ্রাম্য মানুষের সাথে এই আমার প্রথম পরিচয়। বি.ডি.ও. অফিস থেকে লোন আবেদন আমাদের কাছে পাঠানো হয়।

 

আবেদন পত্রে সবকিছু বর্ণনা করা থাকে। আমার কাজ আবেদনকারীর সাথে কথা বলে বিচার করে দেখা, যে ওই জাতীয় কাজে তার পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে কী না, সে সত্যিই ওই কাজ করতে চায় কী না, বা করতে পারবে কী না, ইত্যাদি ইত্যাদি। যাতে সে টাকাগুলো নষ্ট না করে লোনের টাকায় নিজের পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি করতে পারে ও ব্যাঙ্কের ঋণ শোধ করতে সক্ষম হয়।

বেশ চলছিল, বিশেষজ্ঞের মতো কিছু প্রশ্ন করে তাদের বাজিয়ে নিয়ে মনের কথা বোঝার চেষ্টা করছিলাম। প্রশ্নোত্তরের নির্দিষ্ট ফর্মে প্রতিটা প্রশ্নের উত্তরে আবেদনকারীর বক্তব্য লিপিবদ্ধ করা হলে, নিজে সাক্ষর করে আবেদনকারীকে দিয়ে সাক্ষর করিয়ে, গ্রাম সেবককে সাক্ষর করার জন্য দিচ্ছিলাম। যাইহোক একসময় একজন আবেদনকারীর সাথে আমার কথোপকথন শুরু হলো। আমার পাণ্ডিত্বের নমুনা দিতেই এতো কথার অবতারণা।

“কিসের ব্যবসা করতে চাও”?

“আঁজ্ঞে মুরগির ব্যবসা হুজুর”।

“মুরগির ব্যবসা কতদিন করছো”?

“আঁজ্ঞে অনেক বছর ধরে হুজুর”।

“বাড়িতে এখন কতগুলো মুরগি আছে”?

“তা হুজুর বিশ-পঁচিশটা হবে”।

“বাড়ি গেলে মুরগিগুলো দেখাতে পারবে? এইক’টা মুরগি নিয়ে কি ব্যবসা হয় নাকি”?

“আঁজ্ঞে নিশ্চই পারবো ফিলটারবাবু। টাকা পেলে বড় করে করবো”।

এইভাবে দীর্ঘ প্রশ্নপত্রের উত্তর লিপিবদ্ধ করে তাকে দিয়ে সাক্ষর করিয়ে যখন গ্রামসেককে দিলাম, তখন তিনি বললেন, “এটা ভুল হয়েছে স্যার, ও মুরগির ব্যবসা করে না ও মুগরির ব্যবসা করে”।

বোঝ ঠ্যালা, মুগরিটা আবার কি পদার্থ? এতক্ষণে জানা গেল মুগরি হচ্ছে বাঁশ কেটে সরু সরু কাঠি তৈরি করে, তাই দিয়ে মাছ ধরার ফাঁদ তৈরি করা। আমাদের এখানে যাকে ঘুর্ণি বলে। ফর্মটা ছিঁড়ে ফেলে নতুন করে ফর্ম পুরণ করলাম।

মাঝে মাঝে নৌকার ইনসপেকশনে যেতে হতো। প্রায় মোহানার কাছে নদীর পাড়ে, পরপর অনেক নৌকা বাঁধা থাকতো। মাছ ধরার প্রকৃত সময়, নৌকার মালিকরা নদীর পাড়ে বাঁশ হোগলা ইত্যাদি দিয়ে, পরপর ঘর তৈরি করে থেকে যেত। আমি সেখানে গিয়ে নৌকা দেখতে চাইলে, “হাই সেটা আমার নৌকা” বলে আঙুল তুলে দেখিয়ে দিত। সেটা যে ওর নৌকা, বোঝার কোন উপায় ছিল না। তাছাড়া নৌকার কাছে যেতে গেলে, এক হাঁটু জল কাদা ভেঙে যেতে হবে।

 

ফলে বিশ্বাস করা ছাড়া, দ্বিতীয় কোন উপায় ছিল না। বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। তাই নিয়ম রক্ষার জন্য তাদের কথা মতো অনুসন্ধান রিপোর্ট লিখে রাখতাম। নৌকা মাপার একককে পদ বলে, এটাই ছিল আমার নৌকা সম্বন্ধে জ্ঞানের দৌড়। কিন্ত এই আমাকেই, নাইলন জাল বা নৌকা তৈরির জন্য নাইলন সুতো বিক্রেতা বা নৌকা প্রস্তুতকারককে ডেলিভারি অর্ডার দিতে হতো।

একদিন এক ঋণ গ্রহীতা এসে আমায় ধরলো, তাকে তার নৌকায় লাগাবার জন্য একটা ভুটভুটি মেশিন, অর্থাৎ মোটর কেনার লোন দিতে হবে। পূর্বের নৌকার লোনের টাকা সে প্রায় নিয়মিত পরিশোধ করে, কাজেই ভুটভুটি কেনার লোন তাকে দেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, তার নৌকায় কি জাতীয় মোটর লাগাতে হবে, তার দামই বা কতো হওয়া উচিৎ, কার কাছে জানতে যাবো। অনেকভাবে কাটাবার চেষ্টা করেও যখন সফল হলাম না, তখন বাধ্য হয়ে বললাম, যে তার নৌকাটা আগে একবার দেখাতে হবে।

 

সে তো সাথে সাথে রাজি হয়ে গিয়ে বললো কবে ‘ইনকুমারি’ করতে যাবেন বলুন। নৌকা কোথায় আছে জানতে চাওয়ায়, সে জানালো যে তার নৌকা জলদা খটিতে আছে। আমাকে প্রতিদিন নদী পেরিয়ে অফিস যাতায়াত করতে হতো। আমি পরিস্কার জানিয়ে দিলাম যে আমার পক্ষে জলদা খটিতে গিয়ে নৌকার ইনকোয়্যারি করতে যাওয়া সম্ভব নয়, তাকে এই নদীতে তার নৌকা নিয়ে আসতে হবে। সে অনেকভাবে তার অসুবিধার কথা জানিয়ে, শেষে নিমরাজি হয়ে ফিরে গেল। আমিও নিশ্চিন্ত হলাম এই ভেবে, যে জলদা খটি থেকে এই নদীর যা দূরত্ব, তাতে ‘ভিক্ষা চাইনা মা কুত্তা সামলাও’ নীতি মেনে, সে আর এই ঝামেলায় যাবে না।

ব্যাপারটা ভুলেই গেছিলাম। দিন কতক পরে অফিস আসার পথে আমি আর আমার এক সহকর্মী নদী পার হওয়ার জন্য মৃগেনের নৌকায় উঠতে যাবো, এমন সময় পিছন থেকে “ও ফিলটারবাবু নৌকা দেখবেন বলেছিলেন যে” শুনে পিছন ফিরে দেখি একজন আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। কাছে এসে সে বললো নৌকা দেখবেন বলেছিলেন, তাই নিয়ে এসেছি। আমি খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কার নৌকা? সে আমাকে দিন কতক আগের কথোপকথন উল্লেখ করে, জলদা খটি থেকে তার নৌকা নিয়ে আসার কারণ ব্যাখ্যা করলো।

 

বাধ্য হয়ে তার নৌকার দিকে এগিয়ে গেলাম। সহকর্মীটি এই নৌকায় যেতে রাজি হলো না, সে মৃগেনের নৌকাতেই নদী পার হয়ে অফিস যাবে বলে জানালো। আমি নৌকায় গিয়ে ওঠার পর লোকটি আমায় বললো “ফিলটারবাবু চলেন আপনাকে আমার নৌকায় খানিকটা ঘুরিয়ে আনি। এটাতো আপনাদেরই দয়ায় পাওয়া”। কে কবে একে নৌকাটা দিয়েছিল জানি না, শুধু জানি যে এই মানুষটা ঋণের টাকা শোধ করে। আমি বললাম যে আমার হাতে অত সময় নেই, অফিস যেতে হবে, তুমি ওপারের ঘাটে নৌকা লাগাও।

যদিও এটা শখের বোটে চড়া নয়, তবু নৌকা বিশেষজ্ঞ ফিলটারবাবুটি যখন ভুটভুটি দেওয়া যাবে কী না দেখবার জন্য তার নৌকায় উঠেছে, তখন ‘ইনকুমারি’ তো একটা করতেই হয়। তাই বিদ্যে বোঝাই বাবু মশাইয়ের মতো এটা সেটা কিছু প্রশ্ন করে, গম্ভীর গলায় সর্বজ্ঞের মতো জিজ্ঞাসা করলাম, “তোমার এটা কতো পদের নৌকা”?

“আঁজ্ঞে এগারো পদ বাবু”।

আমার তো নৌকাটা দেখে খুব একটা বড় বলে মনে হলো না, তাই বিজ্ঞের মতো বললাম, “অসম্ভব, এটা নয় পদের বেশি হতেই পারে না”।

“কি বলছেন বাবু? মেপে দেখেন, এটা এগারো পদের নৌকা”।

মনে মনে নৌকাটা কতটা লম্বা হতে পারে একটা হিসাব করে নিয়ে বললাম, “মেপে দেখার দরকার নেই, তোমায় ঠকিয়েছে এটা নয় পদের বেশি হতেই পারে না”।

“না বাবু, এটা এগরো পদের নৌকা, ঠিক আছে আমি আপনাকে মেপে দেখাচ্ছি”। সে নৌকার ওপর  পাতা পাটাতনগুলো সরিয়ে, আমাকে গুণে দেখাতে শুরু করলো। আমার ধারণা ছিল নৌকা কতটা লম্বা, তার ওপর কত পদের নৌকা নির্ভর করে। যদিও কতটা লম্বা হলে কত পদের হয়, তাও আমার জানা ছিল না।

 

কিন্তু এখন বুঝলাম, যে পরপর ছয় বা আট ইঞ্চি মতো যে তক্তাগুলো জুড়ে জুড়ে নৌকাটা তৈরি হয়, নীচ থেকে নৌকার ওপর পর্যন্ত তক্তার সংখ্যা বা উচ্চতার ওপর নৌকার মাপ বা পদ নির্ভর করে। তবু ফিলটারবাবু এই সহজ ব্যাপারটা না জানলে বিপদ আছে, তাই “হ্যাঁ তাই তো দেখছি, তবু তুমি অন্য কাউকে দিয়ে একবার ভালো করে মাপিয়ে নিও” বলে, ‘ইনকুমারি’ পর্বের ইতি টানলাম। ভুটভুটি কেনার টাকা তাকে দিয়েছিলাম, ঋণের টাকার কিস্তিও সে মোটামুটি নিয়মিত শোধও করতো।

দিন যায়, হঠাৎ একদিন একজন কাগজে মোড়া কি একটা জিনিস নিয়ে এসে, মোড়ক থেকে বার করে আমার টেবিলে রাখলো। চুনমাখা গয়না পরা লোমশ কি একটা পদার্থ দেখে, তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, এটা কি?

“শুয়োরের কান বাবু, শুয়োরটা মরে গেল, তাই কানটা কেটে নিয়ে এলাম। আপনি যা ব্যবস্থা করার করেন”।

শুয়োরের লোন দেওয়ার সময় বীমা করাতে হয়। বীমা কোম্পানি থেকে প্রতিটা শুয়োরের কানে একটা করে ট্যাগ পাঞ্চ করে লাগিয়ে দিয়ে যায়। কোন কারণে শুয়োর মরে গেলে, ব্যাঙ্কের মাধ্যমে ওই ট্যাগ সমেত দরখাস্ত করে ক্ষতিপুরণ চাইতে হয়। আমার মতো শুয়োর বিশেষজ্ঞ একজন দক্ষ ফিলটারবাবুর, শুয়োরের জীবনচক্র সম্বন্ধে হাতের তালুর মতো পরিস্কার ধারণা থাকা অবশ্যই বাঞ্ছনীয়। একটা শুয়োর কত বছর বয়সে বাচ্চা দেয়, এক একবারে কতগুলো বাচ্চা হয়, কতদিন অন্তর শুয়োরের বাচ্চা হয়, বাচ্চা কত বড় হলে কেটে খাবার উপযুক্ত হয় বা বিক্রি করা লাভজনক হয়, ইত্যাদি ইত্যাদি, আমার কাছে জলের মতো পরিস্কার হওয়া প্রয়োজন।

একটা কাগজে কানের ট্যাগটার নাম্বার লিখে রেখে, যদিও সেটা ঋণ গ্রহীতার লেজারের পাতায়ও লেখা আছে, কাটা কানটা একটা ছোট খামে ঢুকিয়ে, আঠা দিয়ে মুখ বন্ধ করে সেই খামটা আবার অপর একটা খামে রেখে, সেটার মুখও বন্ধ করে দিলাম। শাখার আর্মড গার্ড, নীমা তামাং কার্সিয়াং-এর বাসিন্দা। তার সাথে আমার বেশ মধুর সম্পর্ক। সে আমায় বললো, তাদের ধর্মে শুয়োর ছোঁয়া নিষিদ্ধ, তা নাহলে সে পোস্ট অফিসে গিয়ে বীমা কোম্পনিতে সেটা পাঠাবার ব্যবস্থা করে দিয়ে আসতো। অন্য কেউ এই উৎকৃষ্ট কাজটা করতে না চাওয়ায়, বাধ্য হয়ে খামটা আমার অফিস ব্যাগে পুরে রাখলাম।

পরের দিন থেকে শুয়োরের কানটা আমার সাথে আমার ব্যাগের ভিতর করে চোদ্দ কিলোমিটার বাস, তারপরে নদী পার হয়ে চার কিলোমিটার রাস্তা ভ্যান রিক্সায় যাতায়াত শুরু করলো। কানটাকে যথাস্থানে আর পাঠানোর সময় করে উঠতে পারি না। শেষে একদিন সম্ভবত কানের দুর্গন্ধ সহ্য করতে না পেরে, অফিস আসার পথে কান সমেত ব্যগটা আমায় না জানিয়ে আমায় ছেড়ে যেদিকে দু’চোখ যায় চলে গেল। মহা ঝামেলায় পড়লাম। আবেদন পত্রের সাথে ট্যাগ সমেত কান জমা না দিলে তো ক্ষতিপুরণ পাওয়া যাবে না। ব্যাগ ফিরৎ পাওয়ার আশায় ও কি করা যায় ভাবতে ভাবতেই, আরও কয়েকটা দিন কেটে গেল।

বীমা কোম্পানির এজেন্ট ছেলেটির সাথে আমার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল, আজ ছাব্বিশ সাতাশ বছর পরে এখনও আছে। তাকে সমস্ত ঘটনাটা খুলে বললাম। সে আমাকে পরামর্শ দিল, যে আমি যেন ব্যাঙ্কের প্যাডে ঋণ গ্রহীতার নাম, ট্যাগ নম্বর উল্লেখ করে, আমার কাছ থেকে ট্যাগটা হারিয়ে গেছে জানিয়ে ইনসুরেন্স কোম্পানিকে একটা চিঠি লিখি। যেহেতু আজ পর্যন্ত কোন ক্লেম এই শাখা থেকে করা হয়নি, তাই তারা ক্ষতিপুরণের টাকা দিয়ে দিতেও পারে। তাই করা হলো, এবং শেষপর্যন্ত টাকা পাওয়াও গেল। টাকা না পাওয়া গেলে আমার পকেট থেকেই টাকাটা গুনাগার দিতে হতো।

সবশেষে আর একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করি, যদিও এই ঘটনাটা লিখতে নিজেরই খারাপ লাগছে, লজ্জা করছে। তবু ঘটনাটা না বললে ব্যাঙ্কের গ্রামের শাখায় ডেভেলপমেন্ট অফিসারদের, যারা দু’দিন আগেও শহরের বুকে ডেবিট-ক্রেডিট, ড্রাফ্ট-পে অর্ডার, ক্যাশ-ক্লিয়ারিং নিয়ে ব্যস্ত থাকতো, কাজের ধরণের বর্ণনাটা অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।

একদিন এক ঋণ গ্রহীতা এসে আমায় বললো ফিলটারবাবু, আপনার সাথে একটা কথা আছে। আমি একটা বিপদে পড়েছি, আপনিই পারেন আমায় সুপরামর্শ দিতে। জানা গেল, লোকটির একটি ডেয়ারি লোন আছে। লোকটি আমায় বললো ফিলটারবাবু, আমার গরুটা কিছুতেই গাভিন হচ্ছে না। অনেক চেষ্টা করেও কিছু না হওয়ায়, এ. আই. পর্যন্ত করালাম, কিন্তু তাতেও কিছু ফল না হওয়ায়, ভাবছি একটা ষাঁড় দেই। আপনি অভিজ্ঞ মানুষ, তাই ভাবলাম আপনার কাছ থেকে সুপরামর্শ নিয়ে আসি। কাজের চাপে দম ফেলার সময় নেই, তারমধ্যে অতগুলো গ্রাম পেরিয়ে উনি আর কোন পরামর্শদাতা খুঁজে পেলেন না, আমার কাছে এসেছেন পরামর্শ করতে। এতো রাগ হলো, যে ভাবলাম বলি, না মনের কথাটা আর বললাম না, পাঠক-পাঠিকারাই বুঝে নিন।

এরও অনেক পরে, ফিরে আসার পর একদিন বাড়ির কাছের বাজারে গিয়ে একজন সবজি বিক্রেতাকে বললাম, “লাউ কতো করে”? লোকটি বেশ গম্ভীর হয়ে বললো “এটা লাউ নয়, এটা  চালকুমড়ো”। কথাটা শুনে হাসি পেল, এই বিদ্যে নিয়ে আমি প্রায় আশিটা গ্রামের প্রভুত উন্নতি করে এসেছি, বলা ভালো করতে বাধ্য হয়েছি, তাও আবার পান, নৌকা, জাল, শুয়োর, ইত্যাদি ইত্যাদি বিষয়। এটা শুধু আমার নয়, অধিকাংশ কর্মীর কপালেই এই দুর্ভাগ্য জুটেছিল। এটাই সিস্টেম, আমরা সেই হাস্যকর সিস্টেমের দাস মাত্র।

Facebook Comments

Published by Story And Article

Word Finder

0 0 vote
Article Rating

Leave a Reply

0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x
%d bloggers like this: